প্রতিদিন বাংলাদেশের অসংখ্য ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী চীন থেকে জুতা, ইলেকট্রনিক পণ্য, পোশাক ও নানা ধরনের পণ্য অর্ডার করে থাকেন। অর্ডারগুলো চূড়ান্ত করা হয় ফুচিয়ান কিংবা গুয়াংতং প্রদেশের কোনো উৎপাদনকারী বা সরবরাহকারীর সঙ্গে। তারপর আলিপে বা উইচ্যাটে এর মাধ্যমে অর্থ পরিশোধ করা হয়। পণ্যগুলো পৌঁছে যায় গুয়াংঝুর বাইয়ুন বা পানইউর কোনো গুদামে, যেখানে বাংলাদেশী আমদানিকারকদের অনেকেরই নিজস্ব লজিস্টিকস ব্যবস্থা রয়েছে। এরপর মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই পণ্য বাংলাদেশে উদ্দেশে রওনা হয়ে যায়।
পুরো ব্যবস্থাটি সম্পন্ন হয় অত্যন্ত দ্রুত, দক্ষ ও প্রযুক্তিনির্ভর। কিন্তু এর সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো, এটি প্রায় পুরোপুরি একমুখী। চীন থেকে বাংলাদেশে পণ্য আসছে, কিন্তু বাংলাদেশ থেকে চীনের ডিজিটাল বাজারে পণ্য যাচ্ছে না বললেই চলে। সেতু তৈরি হয়েছে, যান চলাচলও হচ্ছে; কিন্তু ফিরতি লেনটি যেন নেই। এটাই চীন-বাংলাদেশ বাণিজ্য সম্পর্কের ডিজিটাল যুগের সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য।
২০০৬ সাল থেকে চীন বাংলাদেশের বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার। সময়ের সঙ্গে দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরো গভীর হয়েছে। কিন্তু ডিজিটাল বাণিজ্যের বিস্তার যে বাংলাদেশের জন্য আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে রফতানির নতুন দরজা খুলে দিতে পারত, বাস্তবে তা এখনো ঘটেনি, বরং চীনের ডিজিটাল বাণিজ্য ব্যবস্থার সুবিধা নিয়ে বাংলাদেশ মূলত আমদানিই বাড়িয়েছে। এর পেছনে চীনের সাফল্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রয়েছে।
চীন কেবল অনলাইন প্লাটফর্ম তৈরি করেনি; তারা পুরো একটি ডিজিটাল বাণিজ্য অবকাঠামো গড়ে তুলেছে। ২০২৫ সালের চায়না (গুয়াংঝু) ক্রস-বর্ডার ই-কমার্স ফেয়ারের তথ্য অনুযায়ী, গুয়াংতংয়ের ক্রস-বর্ডার ই-কমার্স বাণিজ্য ২০১৫ সালের ১১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ইউয়ান থেকে বেড়ে ২০২৪ সালে ৭৪৫ দশমিক ৪ বিলিয়ন ইউয়ানে পৌঁছেছে যা মাত্র এক দশকে প্রায় ৬৬ গুণ বেশি। বর্তমানে এটি চীনের মোট ক্রস-বর্ডার ই-কমার্স বাণিজ্যের এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি।
আলিবাবা, ১৬৮৮, আলিএক্সপ্রেস ও পিনতুওতুও এর মতো প্লাটফর্ম বিশ্ববাজারে চীনা পণ্য পৌঁছে দিচ্ছে। চীনের সরকারি উদ্যোগে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ২ হাজার ৫০০টির বেশি ওভারসিজ ওয়্যারহাউজ গড়ে উঠেছে, যার মোট আয়তন প্রায় ৩০ মিলিয়ন বর্গমিটার। ফলে চীনা বিক্রেতারা বিদেশী ক্রেতাদের কাছে শুধু পণ্য বিক্রি করছেন না; তারা ক্রেতার কাছাকাছি গিয়ে বাজার তৈরি করছেন। এটি কোনো আকস্মিক সাফল্য নয়। শেনঝেন, গুয়াংঝু, হাংঝু ও শাংহাইয়ের মতো শহরকে ক্রস-বর্ডার ই-কমার্স পাইলট জোন হিসেবে গড়ে তুলে চীন অবকাঠামো, কাস্টমস, পেমেন্ট, গুদাম, লজিস্টিকস ও নীতিমালাকে একই কাঠামোর মধ্যে এনেছে। অর্থাৎ অনলাইন প্লাটফর্মের পাশাপাশি তারা তৈরি করেছে একটি পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল বাণিজ্য-ইকোসিস্টেম।
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা এখানেই। আমাদের উদ্যোক্তা আছে, পণ্য আছে, শ্রমশক্তি আছে, বাজার আছে। কিন্তু এ সবকিছুকে একসঙ্গে যুক্ত করার মতো সমন্বিত ক্রস-বর্ডার ই-কমার্স অবকাঠামো এখনো যথেষ্ট শক্তিশালী নয়। তবে বর্তমান পরিস্থিতি বাংলাদেশের জন্য শুধু সংকট নয়; এটি একটি বড় সুযোগও।
চীন বর্তমানে তার শিল্প কাঠামোয় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ২০২৬-৩০ সালের ১৫তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় চীন ‘নতুন মানের উৎপাদনশীল শক্তি’ বা উচ্চ মূল্য সংযোজন, প্রযুক্তিনির্ভর ও পুঁজিনির্ভর শিল্পকে আরো গুরুত্ব দিচ্ছে। বৈদ্যুতিক গাড়ি, টেলিযোগাযোগ, উন্নত ড্রোন ও অন্যান্য উচ্চ প্রযুক্তি খাতে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। এর ফলে পোশাক, জুতা, ইলেকট্রনিকস অ্যাসেম্বলি ও অন্যান্য শ্রমঘন শিল্পের একটি অংশ ধীরে ধীরে কম খরচের দেশগুলোতে স্থানান্তরের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
ভিয়েতনাম এরই মধ্যে এ পরিবর্তনের বড় সুবিধাভোগী। প্রতিযোগিতামূলক শ্রম ব্যয়, অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি এবং সুসংহত শিল্পনীতির মাধ্যমে দেশটি চীনের শিল্প পুনর্বিন্যাসের সুযোগ কাজে লাগিয়েছে।
বাংলাদেশও সেই সুযোগ নিতে পারে। আমাদের রয়েছে বৃহৎ, তরুণ ও তুলনামূলক কম ব্যয়ের শ্রমশক্তি। রয়েছে তৈরি পোশাক শিল্পের অভিজ্ঞতা এবং রফতানিমুখী উৎপাদনের ভিত্তি। এখন প্রয়োজন চীনা বিনিয়োগ আকর্ষণ করে শ্রমঘন শিল্পের উৎপাদন ভিত্তি শক্তিশালী করা এবং একই সঙ্গে ডিজিটাল বাণিজ্যের মাধ্যমে এসব পণ্য সরাসরি চীনা ও বৈশ্বিক ভোক্তার কাছে পৌঁছে দেয়া।
চীনা বিনিয়োগকারীদের আগ্রহেরও প্রমাণ আছে। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগের পরিমাণ ২ দশমিক ৬৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। রফতানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলগুলোতেও চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন বিনিয়োগ চুক্তিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। অর্থাৎ বিনিয়োগের আগ্রহ রয়েছে; এখন প্রয়োজন সেই আগ্রহকে রফতানি সক্ষমতায় রূপান্তর করার মতো নীতিগত পরিবেশ। এক্ষেত্রে বাংলাদেশকে অন্তত তিনটি বিষয়ে দ্রুত এগোতে হবে।
প্রথমত, একটি পূর্ণাঙ্গ ক্রস-বর্ডার ই-কমার্স নীতি চূড়ান্ত ও কার্যকর করতে হবে। এতে ডিজিটাল পেমেন্ট, অর্থ প্রত্যাবাসন, অনলাইন প্লাটফর্মের নিয়ন্ত্রণ, ছোট চালানের কাস্টমস প্রক্রিয়া এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের প্লাটফর্মে যুক্ত করার সহজ ব্যবস্থা থাকতে হবে। চীনের পাইলট জোনগুলোর অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেয়া যেতে পারে, তবে তা বাংলাদেশের বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে হবে।
দ্বিতীয়ত, চীনের সঙ্গে একটি দ্বিপক্ষীয় ক্রস-বর্ডার ই-কমার্স চুক্তি বিবেচনা করা যেতে পারে। বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের ডিজিটাল সিল্ক রোড কাঠামোর সঙ্গে এটি যুক্ত করা সম্ভব। গুয়াংঝুকে চীনা পক্ষের প্রধান লজিস্টিকস হাব এবং চট্টগ্রাম বা মোংলা বন্দরকে বাংলাদেশের প্রবেশদ্বার হিসেবে নির্ধারণ করে ছোট চালানের জন্য দ্রুত কাস্টমস ব্যবস্থা চালু করা গেলে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারাও সরাসরি রফতানিতে অংশ নিতে পারবেন।
তৃতীয়ত, বাংলাদেশকে নিজস্ব ডিজিটাল রফতানি পরিচয় তৈরি করতে হবে। জামদানি, মসলিন, আঞ্চলিক খাদ্যপণ্য, প্রাকৃতিক ও জৈব তন্তু এবং চামড়াজাত পণ্যের মতো ঐতিহ্য ও স্বাতন্ত্র্যসম্পন্ন পণ্য চীনা ভোক্তাদের কাছে তুলে ধরার বড় সুযোগ রয়েছে। এসব পণ্যের ভৌগোলিক নির্দেশক বা জিআই স্বীকৃতি চীনা বাজারে সুরক্ষিত করা এবং ‘বাংলাদেশী অরিজিন’ নামে একটি নির্ভরযোগ্য ডিজিটাল ব্র্যান্ড তৈরি করা যেতে পারে। টিমল গ্লোবাল ও আলি বাবার মতো প্লাটফর্মে যাচাইকৃত বাংলাদেশী পণ্যের উপস্থিতি সেই আস্থার ভিত্তি তৈরি করতে পারে। এর সঙ্গে অবশ্যই যুক্ত করতে হবে, আধুনিক লজিস্টিকস, চীনা প্লাটফর্মের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা, বন্দরকেন্দ্রিক বন্ডেড ওয়্যারহাউজ, দ্রুত কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স এবং শেষ মাইল ডেলিভারি নেটওয়ার্ক।
বাংলাদেশের ই-কমার্স বাজার ২০২৮ সালের মধ্যে ৯ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে বলে পূর্বাভাস রয়েছে। আমাদের বিশাল ও তরুণ ভোক্তা শ্রেণী ক্রমেই ডিজিটাল হচ্ছে। কিন্তু বাজার বড় হলেই রফতানি বাড়বে না। সম্ভাবনাকে রফতানি আয়ে রূপান্তর করতে হলে প্রয়োজন নীতি, অবকাঠামো ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার সমন্বয়।
গুয়াংঝুর যে গুদাম আজ বাংলাদেশী ব্যবসায়ীদের জন্য মূলত চীন থেকে পণ্য আনার একটি পথ, সেটিই ভবিষ্যতে বাংলাদেশী পণ্য চীনা ও বৈশ্বিক বাজারে পাঠানোর কেন্দ্র হতে পারে। একদিকে চীনা বিনিয়োগ বাংলাদেশে উৎপাদন বাড়াবে, অন্যদিকে ডিজিটাল প্লাটফর্ম সেই উৎপাদনকে সরাসরি ভোক্তার কাছে পৌঁছে দেবে।
বাংলাদেশের সামনে এখন তাই শুধু আমদানি বাড়ানোর প্রশ্ন নয়; প্রশ্ন হলো, ডিজিটাল যুগে আমরা কি উৎপাদন ও রফতানির নতুন সুযোগটি কাজে লাগাতে পারব? সেতুটি এরই মধ্যে তৈরি হয়েছে। চীনের সঙ্গে আমাদের বাণিজ্যিক যোগাযোগও শক্তিশালী। এখন প্রয়োজন শুধু ফিরতি লেনটি তৈরি করা—যে লেন দিয়ে বাংলাদেশী পণ্য, উদ্যোক্তা ও ব্র্যান্ড চীনের বিশাল বাজারে পৌঁছাবে।
সুযোগের জানালা দীর্ঘদিন খোলা থাকবে না। তাই এখনই সিদ্ধান্ত নেয়ার সময়—ডিজিটাল বাণিজ্যের সেতু কি শুধু আমদানির জন্য থাকবে, নাকি এর ওপর দিয়ে বাংলাদেশের রফতানিও দুই দিকে চলাচল করবে?
মো. সৈকত হোসেন: চীনের চিয়াংশি ইউনিভার্সিটি অব ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইকোনমিকস বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিকস অ্যান্ড পলিটিকসের পিএইচডি শিক্ষার্থী ও গবেষক
ড. মোহাম্মদ ছাইয়েদুল ইসলাম: চীনের ফুচিয়ান প্রদেশের সানমিং বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব ওভারসিজ এডুকেশনের (স্কুল অব ফরেন ল্যাঙ্গুয়েজ) সিনিয়র প্রভাষক ও গবেষক এবং বাংলাদেশের ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির বেল্ট অ্যান্ড রোড রিসার্চ সেন্টারের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো










