আমি কৃষিতে প্রায় সাড়ে চার দশক ধরে কাজ করছি। খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গবেষণার গুরুত্ব অনেক বেশি। বর্ধিত খাদ্য চাহিদা, জলবায়ু পরিবর্তন, কৃষিজমি হ্রাস এবং উৎপাদন খরচ বৃদ্ধির বাস্তবতায় টেকসই খাদ্য ব্যবস্থার জন্য গবেষণাভিত্তিক সমাধান অত্যন্ত আবশ্যক। উচ্চফলনশীল, জলবায়ু সহনশীল ও রোগ প্রতিরোধ জাত উৎপাদনের মাধ্যমে গবেষণা ও কৃষি উৎপাদনশীলতায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন হয়ে গেছে সারা বিশ্বে। এগ্রোফুড ভ্যালুচেইন বলতে ফসল গবেষণা উৎপাদন, অন্বেষণ থেকে শুরু করে সংগ্রহ, সংরক্ষণ, পরিবহন, প্রক্রিয়াজাত ও বাজার ব্যবস্থার প্রতিটি ধাপকে বোঝায়। প্রতিটি ধাপেই কিন্তু গবেষণার সুযোগ আছে এবং গবেষণার মাধ্যমে এটিকে উৎপাদনশীল করা সম্ভব। সেখানে খরচ কমানো যায়। ফলে কৃষক তার পণ্যের মূল্য পান এবং সে লাভবান হন। এগ্রি ফুড ভ্যালুচেইনের মাধ্যমে কৃষকই যে শুধু লাভবান হচ্ছেন তা-ই নয়, এখানে প্রতিটি মুহূর্তে এনভায়রনমেন্টের সঙ্গে ফাইট করে ফসলকে টিকে রাখা এবং সেখান থেকে উৎপাদনশীলতা বের করে আনার সময় এসেছে।

বর্তমান কৃষি গবেষণায় বিশ্বব্যাপী একটি কৌশলগত খাত হিসেবে পরিচিত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত, নেদারল্যান্ডস ও ব্রাজিলের মতো দেশগুলো কৃষি গবেষণায় যে বিনিয়োগ করেছে তা শুধু ফসল বৃদ্ধির জন্য নয়, বরং জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানো, রোগ প্রতিরোধ, পুষ্টিমান উন্নয়ন ও টেকসই উৎপাদন ব্যবস্থার লক্ষ্যে পরিচালিত হয়েছে। উদাহারণস্বরূপ চীন প্রতি বছর ২০০টিরও বেশি ধান ও গমের জাত উদ্ভাবন করে। ভারত প্রতি বছর ৩০০টিরও বেশি ফসল নিয়ে গবেষণা করে। যুক্তরাষ্ট্র জেনম এডিটিং করে বায়োটেকনোলজি ব্যবহার করে উচ্চ প্রোটিন-সমৃদ্ধ তাপ সহনশীল গম ও সয়াবিনের জাত উদ্ভাবন করছে। এ উদাহরণগুলো একটি কারণে দিচ্ছি। সেটি হলো আমাদের আকাঙ্ক্ষাগুলো কী এবং কোন জায়গায় যাওয়া সম্ভব। এ তুলনায় বাংলাদেশের শস্য গবেষণায় কিছুটা গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি দেখা গেছে। অধিকাংশই ধানভিত্তিক। কিন্তু গম, ভুট্টা ও তৈলজাতীয় ফসলের উন্নয়ন গবেষণার কার্যক্রম আরো শক্তিশালী করার সুযোগ আছে। এ ফসলগুলোর টেকসই জাত, বাজার উপযোগিতা ও জলবায়ু সহনশীলতা নিশ্চিত করতে আরো গবেষণা অত্যন্ত প্রয়োজন।

প্রাণিসম্পদ ক্ষেত্রে বিশ্বের অগ্রগতি চোখে পড়ার মতো। উদাহরণস্বরূপ নেদারল্যান্ডস, অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র আধুনিক জেনেটিক উন্নয়নের মাধ্যমে ডিজিটাল হ্যালথ ট্র্যাকিং ও সুষম পুষ্টি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে গবাদিপশুর উৎপাদন ক্ষমতা অনেক গুণ বাড়িয়ে ফেলেছে। বাংলাদেশের বাস্তবতা যদি তুলনা করি তাহলে দেখা যাবে, আমরা একটি গাভী থেকে প্রতিদিন দুই-আড়াই লিটার দুধ পাই। সেখানে ভারতে ১০ লিটার ও ইউরোপে ২৫ লিটার দুধ পায়। এখান থেকে সহজেই অনুমান করা যায়, আমাদের কতদূর যেতে হবে।

প্রতি বছর খরা, বন্যা, লবণাক্ততা ও নতুন রোগবালাইয়ের কারণে কৃষির ক্ষতি হচ্ছে। অথচ গবেষণায় উদ্ভাবিত জলবায়ু সহনশীল জাত ব্যবহারে প্রতিকূল পরিবেশে ২০-৩০ শতাংশ পর্যন্ত আমাদের উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব। তবে বাংলাদেশের গবেষণার ক্ষেত্রে এখনো অনেক সীমাবদ্ধতা আছে। বর্তমানে বাংলাদেশের কৃষি গবেষণায় জিডিপির মাত্র ১ শতাংশের কম ব্যয় করা হয়ে থাকে। অথচ উন্নয়নশীল দেশগুলোয় বিভিন্ন ধরনের গবেষণায় জিডিপির ২-৩ শতাংশ পর্যন্ত ব্যয় করা হয়ে থাকে।

এছাড়া খাদ্য প্রক্রিয়াকরণে গবেষণা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।বাংলাদেশে বর্তমানে যে খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ হয় তার সিংহভাগ কাঁচামাল আমদানীকৃত। গম, তেল ও চিনি আমদানি করতে হয়। অথচ আমাদের দেশের চাল থেকে ভিন্ন জাতের গবেষণা করে নিজস্ব প্রক্রিয়ায় আমাদের খাদ্য উৎপাদন করতে পারি।

গবেষণা কোনো একটি ল্যাবরেটরিভিত্তিক কার্যক্রম নয়, এটি কৃষি ও খাদ্যনিরাপত্তার কৌশলগত ভিত্তি। শস্য, প্রাণিজাত সম্পদ ও খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ—তিন খাত ঘিরে যদি আমরা গবেষণার গভীরতা ও বিস্তার বাড়াতে পারি তাহলে কৃষক লাভবান হবেন। বিশ্ববাসী ফসল, মাছ, পোলট্রি ও প্রাণিসম্পদ গবেষণা থেকে উদ্ভাবিত কিছু উল্লেখযোগ্য সাফল্যের মধ্যে বিশ্বের সর্বোচ্চ ফলনশীল ফসলের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্ভাবিত ভুট্টা এখন ১৮-২০ টন উৎপাদন হয়। যেখানে বাংলাদেশে ১০-১২ টন উৎপাদন হয়। ফিলিপাইনে তেলাপিয়া মাছ প্রতি হেক্টরে ১৫-২০ টন উৎপাদন হয়। বাংলাদেশের কব-৫০০ জাতের ব্রয়লার মুরগি মাত্র ছয় সপ্তাহে আড়াই-তিন কেজি ওজন পাওয়া সম্ভব। হাইলাইন ডব্লিউ ৩৬ জাতের মুরগি বছরে ৩০০টিরও বেশি ডিম দেয়। হলস্টেইন ফ্রিজিয়ান গরু বছরে ১০-১২ হাজার লিটার দুধ দেয়। বেলজিয়ান ব্লু জাতের গরুর অতিরিক্ত মাংসপেশির কারণে দুই বছরে দেড়-দুই টন পর্যন্ত মাংস উৎপাদন করা সম্ভব। বর্তমানে এসব বাংলাদেশে হচ্ছে। অনেক উদাহরণ আছে। আমাদের আকাঙ্ক্ষা আছে। এ লক্ষ্যে ২০৩০ সালের মধ্যে হেক্টরপ্রতি ১০ টন উচ্চফলনশীল ধানের জাত ও ১৫ টন উৎপাদনশীল হাইব্রিড ধানের জাত আমাদের উদ্ভাবন করতে হবে। কারণ একটিই। বাংলাদেশের ৭০ শতাংশ জমিতে ধান উৎপাদন হয়। এখন যদি অন্যান্য ফসল উৎপাদন করার মতো বা পশু-পাখি উৎপাদন করার মতো জায়গা না থাকে তাহলে আমরা কী করব? সেক্ষেত্রে ধানের উৎপাদন বাড়িয়ে জায়গা কমিয়ে অন্যান্য ফসল ও পশু-পাখি পালন করতে হবে। এসব উচ্চফলনশীল জাত মাঠে দিতে পারলে ধানের জমি আমদানীকৃত হাই ভ্যালু ফসল উৎপাদনের জন্য জমি ছাড় পাবে। এতে কৃষক লাভবান হবে। দেশের গবেষণা থেকে প্রকৃত সুফল পেতে হলে এসব পদক্ষেপ নিতে হবে। গবেষণার রিটার্ন দীর্ঘমেয়াদি। তাই বেসরকারি খাতের জন্য স্বল্পসুদে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ দিতে হবে। কৃষি গবেষণার জিন ব্যাংক, ডিজিটাল ল্যাব, বায়োইনফরমেটিকসের প্লাটফর্ম করতে হবে। তরুণ কৃষিবিজ্ঞানীদের জন্য আন্তর্জাতিক ভিত্তিতে প্রশিক্ষণের সুযোগ দিতে হবে। স্থানীয় কাঁচামালভিত্তিক প্রক্রিয়াকরণ ও সংরক্ষণ প্রযুক্তি উন্নয়নের গবেষণার জোরদার করতে হবে। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব বাড়িয়ে উদ্ভাবিত প্রযুক্তি মাঠপর্যায়ে নিতে হবে।

কৃষি যান্ত্রিকীকরণ ও কৃষিতে তরুণদের অন্তর্ভুক্তিকরণ নিয়ে কিছু কথা বলা প্রয়োজন। আজকে কৃষি বাস্তবতায় সারা পৃথিবী যেমন একটি দেশ হয়ে গেছে। এক দেশের পণ্য অন্য দেশে রফতানি ও আমদানি হচ্ছে। ফলে আমাদের উৎপাদিত ফসলগুলো একটি প্রতিযোগিতার মধ্যে পড়ছে। তাই আমাদের ফসলে যান্ত্রিকীকরণের মাধ্যমে উৎপাদন খরচ কমাতে হবে। তখন আমরা বিশ্বব্যাপী প্রতিযোগিতা করতে পারব। যান্ত্রিকীকরণের মাধ্যমে একদিকে যেমন কৃষির উৎপাদনশীলতা বাড়বে, অন্যদিকে খরচ ও শ্রমনির্ভরতা উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পাবে। উদাহরণস্বরূপ ট্রাক্টর ও রাইস প্লান্টার ও কম্বাইন হারভেস্টার দিয়ে যদি ধান উৎপাদন করা যায় তাহলে প্রতি হেক্টর জমিতে যে ধান উৎপাদন হয় তাতে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত খরচ কমানো সম্ভব। এটি আমাদের দেশে করা দরকার। যদিও কিছু কিছু ক্ষেত্রে এটি শুরু হয়েছে। বিশ্বব্যাপী কৃষি যান্ত্রিকীকরণ দ্রুতগতিতে অগ্রসর হচ্ছে। উন্নত দেশগুলো মধ্যে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও জার্মানি অধিকাংশ কৃষিকাজে সম্পূর্ণ যান্ত্রিকীকরণ করে ফেলেছে। উদাহরণস্বরূপ জাপানের কৃষি খাত অত্যন্ত যান্ত্রিক এবং সেখানে ফসলের নিবিড়তা বা ক্রপিং ইনটেনসিটি ১২০-১৫০ শতাংশ। অথচ তারা তাদের এক হেক্টর জমিতে ৭-১০ কিলোওয়াট শক্তি ব্যবহার করে। বাংলাদেশর ক্রপিং ইনটেনসিটি প্রায় আড়াই শতাংশ পর্যন্ত হয়েছে। কিন্তু আমরা এক হেক্টর জমিতে মাত্র দেড়-দুই কিলোওয়াট শক্তি ব্যবহার করি। এর অর্থ হচ্ছে, আমাদের দেশে যান্ত্রিকীকরণের অনেক বড় সুযোগ আছে। বাংলাদেশের যান্ত্রিকীকরণ প্রধানত ধানকেন্দ্রিক। গম, ভুট্টা, আলু, তেল ও সবজি চাষসহ সর্বক্ষেত্রে যান্ত্রিকীকরণের বিস্তার ঘটাতে হবে। বিশেষ করে আলু উত্তোলন, সবজি রোপণ ও সেচে বর্তমানে আধুনিক যন্ত্রের অভাবে ফলন কমে যায় এবং উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায়। তাই যান্ত্রিকীকরণ হলে উৎপাদনশীলতা বাড়বে ও কৃষকের আয় বাড়বে। এক্ষেত্রে নন-রাইস ফসলের যন্ত্রের উদ্ভাবন ও ব্যবহারে সহজলভ্যতা নিশ্চিত করতে হবে। প্রশিক্ষিত অপারেটর ও সার্ভিস প্রোভাইডার তৈরি করতে হবে। যান্ত্রিকীকরণ কৃষিসেবা মডেল গড়ে তুলতে হবে যা তরুণদের জন্য আয় ও কর্মসংস্থানের জন্য নতুন পথ খুলে দেবে। বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হলে বাংলাদেশকে ধানভিত্তিক যান্ত্রিকীকরণ থেকে বেরিয়ে এসে অন্য ফসলে যান্ত্রিকীকরণে মনোযোগ দিতে হবে। অনেকেই প্রশ্ন করেন, কৃষি যান্ত্রিকীকরণ বাড়লে কৃষি শ্রমিকদের কর্মসংস্থানের কী হবে? বাস্তবতা হলো, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কৃষি শ্রমিকের সংখ্যা এমনিতেই কমছে। ১৯৬০ সালে কৃষি শ্রমিকের সংখ্যা ছিল ৬০ শতাংশ। বর্তমানে তা ৩৭ শতাংশ। ২০৩০ সালের মধ্যে এটি কমে দাঁড়াবে ২৫ শতাংশে। এক্ষেত্রে দরকার তরুণদের যাদের হাতে যন্ত্র তুলে দিতে হবে। এ তথ্য থেকেও স্পষ্ট, কৃষি শ্রমিকের সংখ্যা কমলেও যারা কৃষিতে থাকবেন তাদের হতে হবে দক্ষ ও প্রযুক্তিজ্ঞানসম্পন্ন। এজন্য আধুনিক কৃষিযন্ত্র তাদের হাতে পৌঁছে দিতে হবে। সঠিক ব্যবহারের জন্য দিতে হবে প্রশিক্ষণ। এতে কর্মসংস্থান যেমন সৃষ্টি হবে তেমনি যান্ত্রিক উৎপাদন ব্যবস্থায় কৃষি হবে আরো উৎপাদনশীল। এতে কৃষকের আয় বাড়বে এবং নিশ্চিত হবে তাদের ন্যায্যতা। পরিশেষে গবেষণা ও যান্ত্রিকীকরণের মাধ্যমে কৃষি আধুনিক, উৎপাদনশীলতা, টেকসই ও প্রতিযোগিতামূলক করে গড়ে তুলতে হবে। গবেষণা ও যান্ত্রিকীকরণকে অগ্রাধিকার দিলে খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত হবে, কৃষকের আয় ও ন্যায্যতা অর্জন সম্ভব হবে।

ড. এফএইচ আনসারী: প্রেসিডেন্ট, এসিআই এগ্রিবিজনেস ডিভিশন

[বণিক বার্তা আয়োজিত কৃষি, খাদ্যনিরাপত্তা ও প্রাণ-প্রকৃতি সম্মেলনের ‘খাদ্যনিরাপত্তা ও কৃষকের ন্যায্যতা’ বিষয়ক অধিবেশনে প্যানেল আলোচকের বক্তব্যে]