স্বাভাবিকভাবেই অসফল শিক্ষার্থীদের অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন। শিক্ষাসংশ্লিষ্ট অনেকের মতে, ২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলনসহ বিভিন্ন অস্থিরতার কারণে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটেছে এবং এবারের ফলাফল তাই সাময়িক পরিস্থিতির প্রতিফলন। কিন্তু ইংরেজি ও গণিতের মতো মৌলিক বিষয়ে শিক্ষার্থীদের দুর্বল ফলাফলকে শুধু সাময়িক পরিস্থিতি দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় কিনা সেটিই বড় প্রশ্ন।

এ বছরের ফলাফলকে কোনো বিচ্ছিন্ন ব্যর্থতা কিংবা শিক্ষার্থীদের সক্ষমতা কমে যাওয়ার নিদর্শন হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে টানা ১০ বছর পড়াশোনা করার পর শিক্ষার্থীরা এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয়। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা কেন একজন শিক্ষার্থীকে এসএসসি পর্যন্ত নিয়ে এল, অথচ সে সাফল্যের জন্য প্রয়োজনীয় মৌলিক জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন করতে পারল না?

মূলত প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক পর্যন্ত দীর্ঘ সময়ে জমে ওঠা শেখার ঘাটতিরই দৃশ্যমান পরিণতি এবারের ফলাফল। তাই এটিকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে না দেখে শিক্ষা ব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতার একটি সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা প্রয়োজন।

শিক্ষার ভিত্তি গড়ে ওঠে প্রাথমিক পর্যায়ে। কিন্তু অনেক শিক্ষার্থী মৌলিক দক্ষতা অর্জন না করেই এক শ্রেণী থেকে পরবর্তী শ্রেণীতে উঠে যায়। ইংরেজি, গণিত, ভাষাগত দক্ষতা ও বিশ্লেষণী চিন্তার ভিত্তি দুর্বল থাকলে পরবর্তী শ্রেণীর পাঠ্যক্রম যত জটিল হয়, শিক্ষার্থীর সমস্যাও তত বাড়তে থাকে। ফলে এসএসসিতে গিয়ে দুর্বলতা হঠাৎ দৃশ্যমান হয়; কিন্তু এর শিকড় অনেক আগেই তৈরি হয়।

স্কুল শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান অর্জনের জায়গা নয়। এটি শিশুর শারীরিক, মানসিক, সামাজিক ও নৈতিক বিকাশেরও অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। প্রাথমিক পর্যায়ে শিশুদের সামাজিকীকরণ, আবেগ নিয়ন্ত্রণ, যোগাযোগ, সৃজনশীলতা ও সহযোগিতার মতো জীবনমুখী দক্ষতা গড়ে তোলা প্রয়োজন। মাধ্যমিক পর্যায়ে এর সঙ্গে যুক্ত হবে সমস্যা সমাধান, সমালোচনামূলক চিন্তা, কার্যকর যোগাযোগ, ডিজিটাল দক্ষতা এবং নেতৃত্বের মতো সক্ষমতা। শিক্ষার লক্ষ্য তাই শুধু পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়া হতে পারে না; শিক্ষার্থীকে জীবন ও কর্মক্ষেত্রের জন্য প্রস্তুত করাও এর গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য।

দশকের পর দশক ধরে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার একটি বড় অংশ প্রকৃত বোঝাপড়ার পরিবর্তে মুখস্থবিদ্যা, পরীক্ষার নম্বর ও জিপিএ ৫ অর্জনের ওপর অতিরিক্ত গুরুত্ব দিয়েছে। শিক্ষার্থীদের বিশ্লেষণ, প্রশ্ন করা, জ্ঞান প্রয়োগ ও সমস্যা সমাধানের পরিবর্তে অনেক সময় পাঠ্যবইয়ের বিষয়বস্তু প্রায় হুবহু পুনরুৎপাদনে উৎসাহিত করা হয়। ফলে গাইডবই, সাজেশন, মডেল উত্তর ও পরীক্ষাকেন্দ্রিক প্রস্তুতির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে।

তাই পরীক্ষায় যখন মুখস্থ জ্ঞানের পরিবর্তে ধারণাগত বোঝাপড়া ও প্রয়োগের সক্ষমতা যাচাই করা হয়, তখন অনেক শিক্ষার্থী সমস্যায় পড়ে। সমস্যাটি শুধু কঠিন প্রশ্নের উত্তর দিতে না পারা নয়; বরং শিক্ষা ব্যবস্থা তাদের ধারাবাহিকভাবে কীভাবে চিন্তা করতে, প্রশ্ন করতে এবং সমস্যার সমাধান করতে হয়—সেটি যথেষ্ট শেখাতে পারেনি।

এ পরিস্থিতিতে শিক্ষকের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষক নিয়োগের স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাদের যথাযথ পদায়ন এবং ধারাবাহিক পেশাগত উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে বড় শহরের বাইরে অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ইংরেজি, গণিতসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে যোগ্য শিক্ষকের সংকট রয়েছে। শুধু যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ করলেই হবে না। তাদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ, কার্যকর মূল্যায়ন, পেশাগত সহায়তা ও জবাবদিহির ব্যবস্থাও থাকতে হবে। অর্থাৎ শিক্ষকতার পুরো জীবনচক্র—নিয়োগ থেকে প্রশিক্ষণ, পেশাগত উন্নয়ন ও জবাবদিহি—শিক্ষা সংস্কারের অংশ হতে হবে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বিদ্যালয়ে শিক্ষা কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা। রাজনৈতিক অস্থিরতা, শিক্ষার্থীদের সংঘাত, প্রাতিষ্ঠানিক বিরোধ এবং প্রশাসনিক জটিলতার কারণে অনেক সময় পাঠদানের সময় কমে যায়। এতে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ও শেখার ধারাবাহিকতা ব্যাহত হয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে তাই শিক্ষা, বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ ও একাডেমিক স্বাধীনতার নিরাপদ পরিবেশ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়কে দলীয় রাজনীতি ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ থেকে মুক্ত রাখার বিষয়ে সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে একটি ন্যূনতম জাতীয় ঐকমত্য প্রয়োজন।

শিক্ষায় বৈষম্যও একটি বড় সমস্যা। বড় শহরের ভালো সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং গ্রাম বা সুবিধাবঞ্চিত এলাকার বিদ্যালয়ের মধ্যে এখনো উল্লেখযোগ্য ব্যবধান রয়েছে। কোথাও যোগ্য শিক্ষক, ডিজিটাল অবকাঠামো ও অন্যান্য সুযোগের অভাব প্রকট। সরকারি বিনিয়োগের অগ্রাধিকার তাই হওয়া উচিত সেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো, যেখানে শিক্ষার প্রয়োজনীয় সম্পদ সবচেয়ে কম।

কোচিং সেন্টার ও প্রাইভেট টিউশনের ব্যাপক বিস্তারও মূলধারার শিক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতার একটি লক্ষণ। শ্রেণীকক্ষের পাঠদানের ওপর আস্থা কমলে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা স্বাভাবিকভাবেই বিকল্প ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকবেন। কিন্তু বাণিজ্যিক কোচিং সাধারণত প্রকৃত বোঝাপড়ার চেয়ে পরীক্ষায় ভালো করার কৌশলের ওপর বেশি গুরুত্ব দেয়। একই সঙ্গে প্রাইভেট টিউশনের ওপর নির্ভরতা শিক্ষা ক্ষেত্রে বৈষম্য বাড়ায়, কারণ সচ্ছল পরিবারগুলো অতিরিক্ত শিক্ষাসহায়তার ব্যয় সহজে বহন করতে পারে। এর স্থায়ী সমাধান তাই কোচিং বন্ধের প্রশাসনিক উদ্যোগে নয়; বরং শ্রেণীকক্ষের শিক্ষার মান উন্নত করে জনগণের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার মধ্যে।

শিক্ষানীতির ধারাবাহিকতাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক পালাবদলের সঙ্গে যেন শিক্ষার লক্ষ্য, পাঠ্যক্রম ও মূল্যায়ন পদ্ধতি বারবার পরিবর্তিত না হয়। বাংলাদেশের প্রয়োজন তথ্য-প্রমাণ ও ব্যাপক পরামর্শের ভিত্তিতে প্রণীত একটি স্থিতিশীল, দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় শিক্ষানীতি। এজন্য শিক্ষক, গবেষক, শিক্ষাবিদ, প্রশাসক ও অন্যান্য অংশীজনের সমন্বয়ে একটি স্থায়ী ও স্বাধীন জাতীয় শিক্ষা কমিশন গঠন করা যেতে পারে। কমিশন নির্দিষ্ট সময় পরপর পাঠ্যক্রম, মূল্যায়ন ব্যবস্থা ও শিক্ষক উন্নয়ন কার্যক্রম পর্যালোচনা করতে পারে।

এ সংস্কারের অন্যতম লক্ষ্য হওয়া উচিত প্রাথমিক থেকে উচ্চ শিক্ষা পর্যন্ত শিক্ষা ব্যবস্থাকে ফলাফলভিত্তিক বা দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার (আউটকাম বেজড এডুকেশন/কমপিটেন্সি বেজড এডুকেশন) দিকে এগিয়ে নেয়া। এর অর্থ শুধু নতুন একটি পদ্ধতির নাম গ্রহণ করা নয়; বরং শিক্ষার্থী শিক্ষা শেষে কী জানবে, কী বুঝবে এবং কী করতে পারবে—তা স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা এবং সেই অনুযায়ী পাঠদান ও মূল্যায়ন করা। ভারত ও মালয়েশিয়ার শিক্ষা সংস্কারের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে বাংলাদেশ তার নিজস্ব বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারে।

মূল্যায়ন ব্যবস্থার উদ্দেশ্য হওয়া উচিত শিক্ষার্থী প্রত্যাশিত জ্ঞান ও দক্ষতা আয়ত্ত করেছে কিনা তা যাচাই করা—মুখস্থ করা বিষয় কতটা ভালোভাবে পুনরুৎপাদন করতে পারে, তা নয়। পরীক্ষার ফলাফল তখনই শিক্ষার প্রকৃত মানের প্রতিফলন হবে, যখন পরীক্ষা শিক্ষার্থীর বোঝাপড়া, প্রয়োগক্ষমতা, বিশ্লেষণী চিন্তা ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতা পরিমাপ করবে।

সাম্প্রতিক এসএসসি ফলাফল আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে করিয়ে দিয়েছে: শুধু পাসের হার দিয়ে শিক্ষার মান বিচার করা যায় না। উচ্চ পাসের হার প্রকৃত শেখা নিশ্চিত করে না; একইভাবে কম পাসের হারের জন্য শুধু শিক্ষার্থীদের দায়ী করাও যুক্তিসংগত নয়।

শিক্ষায় প্রবেশাধিকার সম্প্রসারণে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো প্রকৃত শেখা ও বোঝাপড়া নিশ্চিত করা। আমাদের এমন একটি তরুণ প্রজন্ম গড়ে তুলতে হবে, যারা সমালোচনামূলকভাবে চিন্তা করতে পারবে, সমস্যা সমাধান করতে পারবে, কার্যকরভাবে যোগাযোগ করতে পারবে এবং বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারবে।

তাই এবারের এসএসসি ফলাফলকে শুধু একটি পরীক্ষার ব্যর্থতা হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার দীর্ঘদিনের কিছু দুর্বলতার দিকে তাকানোর একটি সুযোগ। পাস-ফেলের হিসাবের বাইরে গিয়ে এখন আমাদের মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত—আমরা কি সত্যিই আমাদের সন্তানদের ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করতে পারছি? সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে শিক্ষা ব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি, প্রমাণভিত্তিক ও কার্যকর সংস্কার শুরু করাই হবে এবারের ফলাফলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।

এমএম শহিদুল হাসান: ডিস্টিংগুইশড প্রফেসর, ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি ও সাবেক উপাচার্য, ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ