দেশে একসময় বিদ্যুতের উৎপাদন ও বিতরণের একক নিয়ন্ত্রণ ছিল বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি)। দেশের বিদ্যুৎ চাহিদা ও গ্রাহক বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্রায়ত্ত উৎপাদন কোম্পানি ও বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ বেড়েছে। বিশেষ করে বিদ্যুতের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে গিয়ে একক ক্রেতাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে বিপিডিবির নিজস্ব সক্ষমতা এখন অর্থের হিসেব-নিকেশের কারণে বসিয়ে রাখতে হচ্ছে। তাতে দেখা গেছে, বর্তমানে আমদানি করা বিদ্যুতের পরিমাণ বেড়েছে অনেক বেশি আর বিপিডিবির নিজস্ব উৎপাদন কেন্দ্র এখন বছরের বেশি সময় ধরে সীমিত উৎপাদনে থাকছে। বিপিডিবির মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা রয়েছে দৈনিক ৬ হাজার ১১৪ মেগাওয়াট। কিন্তু কোম্পানিটির বিদ্যুৎ কেন্দ্র বছরের বেশির ভাগ সময় অব্যবহৃত থেকে যাচ্ছে। বিপুল সক্ষমতার পেছনে বিপিডিবির যে জনবল নিয়োজিত রয়েছে তাদের পেছনে বিপুল পরিমাণ অর্থ গুনতে হচ্ছে। বর্তমানে বিদ্যুৎ খাতে যে লোকসান হচ্ছে সেই লোকসান কমাতে হলে বিপিডিবির দক্ষ বিদ্যুৎ কেন্দ্র ব্যবহার করতে হবে। পাশাপাশি আমদানিনির্ভরতা কমাতে হবে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো এমনভাবে পরিচালনা করতে হবে, যাতে বিপিডিবির সামগ্রিক উৎপাদন ব্যয় কম হয়।
বিপিডিবির চলতি বছরের জুন ও জুলাইয়ের প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এ দুই মাসে সংস্থাটির নিজস্ব বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর প্লান্ট ফ্যাক্টর ছিল গড়ে ২০-২২ শতাংশ। তবে এ হিসাব সংস্থাটির চালু ও বন্ধ থাকা কেন্দ্রের গড় প্লান্ট ফ্যাক্টর ধরে। আর এককভাবে গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর প্লান্ট ফ্যাক্টর ধরলে তা দাঁড়ায় গড়ে ২০-৩০ শতাংশের মতো, যা ২০২৩-২৪ অর্থবছরের চেয়েও কম। অন্যদিকে আন্তঃসীমান্ত বিদ্যুৎ বাণিজ্যের আওতায় প্রতিবেশী দেশ ভারত ও নেপালের সঙ্গে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ আমদানি চুক্তি রয়েছে মোট ২ হাজার ৮০০ মেগাওয়াটের। বিদ্যুতের চাহিদা পূরণে বর্তমানে এর ৮০ শতাংশ পর্যন্ত আমদানি করা হচ্ছে। এ থেকে প্রতীয়মান হচ্ছে, দেশে বিদ্যুতে আমদানিনির্ভরতা বেড়েছে, যেখানে জ্বালানি সংকটসহ বিভিন্ন কারণে বিপিডিবির নিজস্ব উৎপাদন সক্ষমতা ব্যবহার করা হচ্ছে অত্যন্ত সীমিত পরিসরে। এভাবে ব্যয়সাশ্রয়ী নিজস্ব উৎপাদন সক্ষমতা অব্যবহৃত রেখে বিদেশ থেকে উচ্চমূল্যে বিদ্যুৎ আমদানির ফলে একদিকে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়ছে, অন্যদিকে বিপিডিবির কেন্দ্রগুলোয় উৎপাদন না হলেও রক্ষণাবেক্ষণ ও জনবল খাতে বিপুল ব্যয় করতে হচ্ছে।
আমদানিনির্ভর এ কাঠামো থেকে ধীরে ধীরে বেরিয়ে এসে বিপিডিবির নিজস্ব বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোয় জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করে উৎপাদনে ফিরিয়ে আনা উচিত। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, বিপিডিবির বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনাকে আর্থিকভাবে লাভজনক ও ব্যয়সাশ্রয়ী করা দরকার। যেসব কেন্দ্র উৎপাদনে অক্ষম বা জ্বালানি ব্যয় সাশ্রয়ের দিক থেকে অকার্যকর হয়ে পড়েছে, সেগুলো ধাপে ধাপে বন্ধ করে দিতে হবে। বিদ্যুৎ খাতের বাস্তব চাহিদা ও দেশীয় সক্ষমতা মূল্যায়ন করে আমদানি কমিয়ে উৎপাদন সক্ষমতাকে ব্যয়সাশ্রয়ী উপায়ে কাজে লাগানো উচিত, যাতে তা বিপিডিবির ঋণ ও লোকসানের চাপকে প্রশমন করতে পারে।
দেশের অর্থনীতির জন্য জ্বালানিনিরাপত্তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। জ্বালানি হিসেবে গ্যাসের সহজলভ্যতা দেশের অর্থনীতিকে অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে গেছে। দেশে পর্যাপ্ত উত্তোলনযোগ্য গ্যাস আবিষ্কৃত হয়েছে। অথচ সঠিক পরিকল্পনা ও সিদ্ধান্তের অভাবে মজুদকৃত গ্যাস উত্তোলন করা যাচ্ছে না। ফলে দেশে গ্যাস সংকট নিরসনে আবিষ্কৃত উত্তোলনযোগ্য গ্যাস কোনো কাজে আসছে না। আমদানি করেও গ্যাসের চাহিদা পূরণ করা যাচ্ছে না। গ্যাস সংকটে বিপিডিবির গ্যাসভিত্তিক নিজস্ব কেন্দ্রগুলোয় সক্ষমতার পুরো অংশ কাজে লাগানো যাচ্ছে না।
বিগত সময়ে জ্বালানি খাতে আমদানিনির্ভরতা গড়ে তোলা হয়েছে। বর্তমানে দেশের চলমান সংকট নিরসনে আমদানিনির্ভর জ্বালানি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না। জ্বালানি সংকট নিরসনে দেশের উত্তোলনযোগ্য গ্যাস উত্তোলনে ও ব্যবহারে সরকারের পদক্ষেপ জরুরি। দেশীয় গ্যাস উৎপাদনের মাধ্যমে দেশের জ্বালানি সংকট নিরসন করে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব।
বিপিডিবিসহ রাষ্ট্রায়ত্ত অন্য সংস্থাগুলোর বিদ্যুৎ কেন্দ্র বসে থাকার বড় কারণ বেসরকারি খাত থেকে বিদ্যুৎ কেনা ও আমদানিনির্ভরতা বাড়িয়ে দেয়া। ব্যয়সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ কেন্দ্র বসিয়ে রেখে বেসরকারি কেন্দ্রগুলোর কাছ থেকে উচ্চ দামে বিদ্যুৎ কেনা হচ্ছে। এতে সামগ্রিকভাবে বিপিডিবির আর্থিক ব্যয় বাড়ছে। বসে থাকছে সংস্থাটির বিপুল সক্ষমতা। আমদানীকৃত বিদ্যুৎ বেশি কেনার ফলে একদিকে যেমন বেশি বিদেশী বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করতে হচ্ছে, অন্যদিকে স্থানীয় কেন্দ্র বসিয়ে রেখেও ক্যাপাসিটি চার্জ বাড়ছে সরকারের। বিদ্যুৎ খাতে দেশীয় সক্ষমতার বড় অংশ বসিয়ে রেখে আদানিসহ ভারতের উৎপাদনকৃত বিদ্যুৎনির্ভরতা দেশের বিদ্যুৎ খাতে ব্যয় বাড়াচ্ছে।
বিপিডিবির অধিকাংশ বিদ্যুৎ কেন্দ্রই পুরনো এবং জ্বালানি সংকটের কারণে কার্যত বন্ধ থাকলেও এসব কেন্দ্র পরিচালনায় এখনো বিপুল পরিমাণ জনবল নিযুক্ত রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে আর্থিক সংকটে থাকা এ সংস্থার ব্যয় হ্রাসে জনবল ব্যবস্থাপনায় সাশ্রয়ী নীতি গ্রহণ করা জরুরি। পাশাপাশি যেসব বিদ্যুৎ কেন্দ্র অদক্ষ সেগুলোকে উৎপাদন তালিকা থেকে বাদ দিয়ে বাস্তবভিত্তিক প্রকৃত উৎপাদন সক্ষমতা নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও সেগুলো ব্যবহার না করায় সেগুলো এক রকম নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ছে। কিন্তু এসব কেন্দ্র নিষ্ক্রিয় থাকলেও ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ বিপুল পরিমাণ জরিমানা দিতে হচ্ছে। অন্যদিকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি আমদানি বাবদ বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। এ অব্যবস্থাপনার ফলে কেবল উৎপাদন খাতই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে না বরং বিপিডিবির নিজস্ব কেন্দ্রে জনবল ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় অর্থনৈতিক চাপ আরো বাড়ছে।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের দেড় দশকের শাসনামলে জনবিমুখ ও আমদানিনির্ভর জ্বালানি নীতির কারণে এখন ঝুঁকিতে দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত। জ্বালানি নিশ্চিত না করেই একের পর এক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছে। ফলে বর্তমানে বিদ্যুতের চাহিদার তুলনায় উৎপাদন সক্ষমতা বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ। জ্বালানির অভাবে উৎপাদন সক্ষমতার অর্ধেকেরও বেশি অব্যবহৃত থাকছে। ফলে প্রতি বছর অলস বসিয়ে রেখে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ভাড়া বাবদ গুনতে হচ্ছে বিপুল পরিমাণ অর্থ। ফলে খরচের চাপ সামলাতে বিগত সময়ে ভোক্তা পর্যায়ে দফায় দফায় বেড়েছে বিদ্যুতের দাম এবং দায় বেড়েছে সরকারের। আর অপ্রয়োজনীয় সক্ষমতা বাড়িয়ে ডেকে আনা হয়েছে দেশের বিপুল পরিমাণ আর্থিক ক্ষতি। এছাড়া বিনষ্ট করা হয়েছে বিদ্যুতের প্রতিযোগিতার বাজার। ফলে মুনাফা লুফে নিয়েছে দেশের মুষ্টিমেয় ব্যবসায়ী গোষ্ঠী। এছাড়া চাহিদা অনুযায়ী আমদানিও করা যাচ্ছে না জ্বালানি। দেশের জ্বালানিনিরাপত্তা নিশ্চিতে দরকার নিজস্ব অনুসন্ধান ও উৎপাদন।
পরিকল্পনা ও পরিচালনায় দক্ষতার অভাব, অদক্ষ কেন্দ্রগুলো বাদ না দেয়া ও গ্যাস সংকটের কারণে উৎপাদনে অনীহা বিদ্যুৎ খাতকে আরো দুর্বল করে তুলছে। আদানির মতো বেসরকারি বিদেশী প্রতিষ্ঠান থেকে উচ্চমূল্যে বিদ্যুৎ কিনে সস্তা দেশীয় উৎপাদন কেন্দ্র বসিয়ে রাখা কোনোভাবেই যৌক্তিক নয়। সরকারের উচিত বিদ্যুৎ খাতের আমদানিনির্ভর কাঠামো পুনর্বিবেচনা করা, বাস্তব সক্ষমতা নির্ধারণ করে অদক্ষ কেন্দ্রগুলো বাদ দেয়া এবং পরিকল্পিতভাবে দেশীয় উৎস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো। বিদ্যুৎ খাতে টেকসই ও স্বনির্ভর নীতি গ্রহণে এখনই সিদ্ধান্ত না নিলে ভবিষ্যতে এর খেসারত হবে আরো ব্যয়বহুল।










