জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৯২ সালে। বিশ্ববিদ্যালয়টির আইনে কলেজ অধিভুক্তকরণের পাশাপাশি প্রাগ্রসর শিক্ষায় গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। প্রাগ্রসর শিক্ষার স্বার্থে এ বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি উৎকৃষ্ট গ্রন্থাগার, বিজ্ঞান গবেষণার জন্য ল্যাবরেটরি এবং অন্যান্য গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো থাকবে। প্রতিষ্ঠানটির অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল সেশনজট নিরসন করা। দুর্ভাগ্যের বিষয়, প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রাগ্রসর শিক্ষার গোড়াপত্তন ও বিকাশে তেমন ভূমিকা রাখতে পারেনি। রয়েছে ভয়াবহ সেশনজট। সেশনজট কমানোয়ও তেমন ভূমিকা রাখতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি। শুধু কলেজগুলোকে অধিভুক্তকরণ করাই এর কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শুরুর দিকে যেনতেন কলেজে স্নাতক (সম্মান), স্নাতকোত্তর ও ডিগ্রি (পাস কোর্স) চালু করতে দেয়া হয়নি। পরবর্তীকালে রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক বিবেচনায় পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত না করেই ঢালাওভাবে চালু করা হয়েছে স্নাতক (সম্মান), স্নাতকোত্তর ও ডিগ্রি (পাস কোর্স) কোর্স। যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষক ও শিক্ষার উপযুক্ত পরিবেশ আছে কিনা তা যাচাই-বাছাই না করেই বিভিন্ন কলেজকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত করা হয়েছে। ফলে সারা দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজের সংখ্যা ও আসন সংখ্যা বেড়েছে ঠিকই, কিন্তু কলেজগুলোয় মানসম্পন্ন শিক্ষক ও উপযুক্ত শিক্ষার পরিবেশ না থাকায় প্রতি বছরই বিপুল পরিমাণ আসন ফাঁকা থাকছে। বিশ্ববিদ্যালয়টির পাঠ্যক্রম শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী না হওয়ায় অনেকেই পড়াশোনা শেষ করেও বেকার থাকছেন।
ইউজিসির বার্ষিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ সালে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক প্রথম বর্ষের আসন সংখ্যা ছিল ৬ লাখ ৮ হাজার ৪০৮। এর বিপরীতে শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছিল ৫ লাখ ৪০ হাজার ৬৩৯। আসন শূন্য ছিল ৬৭ হাজার ৭৬৯। তবে এর পর থেকেই শূন্য আসনের সংখ্যা বাড়তে থাকে। ২০১৮ সালে শূন্য আসনের সংখ্যা ছিল ৩ লাখ ৪৫ হাজার ৮১৭। ২০১৯ সালে শূন্য আসন ছিল ২ লাখ ২৩ হাজার ৭৪৩, ২০২০ সালে ২ লাখ ২২ হাজার ৪২৯, ২০২১ সালে ৩ লাখ ৯৬ হাজার ৬৫৮, ২০২২ সালে ১ লাখ ৯৭ হাজার ৩৪৯ এবং ২০২৩ সালে ৩ লাখ ১৩ হাজার ২৪২ আসন ফাঁকা ছিল।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে আসন ফাঁকা থাকার অন্যতম কারণ হলো চাহিদা বিবেচনা ছাড়াই আসন সংখ্যা বৃদ্ধি করা। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, কোনো প্রতিষ্ঠানে কতজন শিক্ষার্থী ওই বিষয়ে ভর্তি হতে আগ্রহী বা শ্রমবাজারে সেই বিষয়ের প্রয়োজন আছে কিনা তা বিবেচনা না করেই বিভাগ খোলা হয়েছে ও আসন বাড়ানো হয়েছে। ফলে এমন অনেক বিষয়ে আসন বাড়ানো হলেও সেখানে শিক্ষার্থী পাওয়া যাচ্ছে না।
অন্যদিকে রাজনৈতিক প্রভাবে পর্যাপ্ত অবকাঠামো, যোগ্য শিক্ষক বা মানসম্পন্ন শিক্ষার পরিবেশ না থাকা সত্ত্বেও বহু কলেজকে অধিভুক্ত করা হয়েছে। এসব কলেজে শিক্ষার মান নিম্নমানের হওয়ায় শিক্ষার্থীরা ভর্তিতে আগ্রহ হারাচ্ছেন। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—শ্রমবাজারে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারীরা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে। বিশ্ববিদ্যালয়টির অনেক শিক্ষার্থী স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ করেও বেকার থাকছেন। কারণ পাঠ্যক্রমের সঙ্গে শ্রমবাজারের সঙ্গে বিশাল তফাৎ রয়েছে। কর্মমুখী শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ, যোগাযোগ ও প্রযুক্তিনির্ভর প্রশিক্ষণ না থাকায় তারা সরকারি বা বেসরকারি চাকরির বাজারের চাহিদা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করতে পারছে না। ফলে মানসম্মত শিক্ষা না পাওয়া ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত থাকার কারণে ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীদের জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি আগ্রহ ক্রমেই কমছে। এ প্রবণতা যদি অব্যাহত থাকে, তাহলে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের এত বড় অবকাঠামো থাকা সত্ত্বেও সেটি ক্রমে অকার্যকর হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাম্প্রতিক এক গবেষণা বলছে, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আওতায় দেশের বিভিন্ন প্রান্তে অবস্থিত কলেজগুলো থেকে স্নাতক শিক্ষার্থীদের মধ্যে ২৮ দশমিক ২৪ শতাংশই বেকার। বাকিদের মধ্যে অধিকাংশই স্বল্প আয়ের চাকরিতে নিযুক্ত। এছাড়া নারী ও গ্রামের শিক্ষার্থীর মধ্যে বেকারত্বের হার তুলনামূলক বেশি। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন কলেজগুলোয় বিজ্ঞান বিভাগের তুলনায় ব্যবসায় শিক্ষা এবং সামাজিক বিজ্ঞান ও মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি। এর মধ্যে বিএ (পাস কোর্স), রাষ্ট্রবিজ্ঞান, লাইব্রেরি ম্যানেজমেন্ট, বাংলা ও ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ থেকে পাস করা শিক্ষার্থীদের বেকারত্বের হার বেশি। তবে ইংরেজি, অর্থনীতি, অ্যাকাউন্টিং, সমাজবিজ্ঞান, ফাইন্যান্স ও ব্যাংকিং থেকে পাস করা শিক্ষার্থীদের তেমন বেকার থাকতে হয় না। গবেষণায় কলেজগুলোর মানের ঘাটতি, শিক্ষার্থীদের কম উপস্থিতি, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ ও প্রণোদনার অভাব এবং চাকরির বাজারমুখী শিক্ষার অভাব সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উঠে আসে।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদ্যমান সমস্যাগুলো দূর করতে বেশকিছু পদক্ষেপ নিতে হবে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে। প্রথমত, কলেজ অধিভুক্তির ক্ষেত্রে কঠোর মানদণ্ড অনুসরণ করতে হবে। যেসব কলেজে মানসম্পন্ন ও প্রয়োজনীয় শিক্ষক বা অবকাঠামো নেই, সেগুলোয় অস্থায়ীভাবে ভর্তি স্থগিত বা অধিভুক্তি বাতিলের পদক্ষেপ নিতে হবে। দ্বিতীয়ত, শিক্ষকদের মানোন্নয়নে প্রশিক্ষণ ও প্রণোদনা বাড়ানো প্রয়োজন। শিক্ষকরা যদি আধুনিক জ্ঞানসম্পন্ন ও দক্ষ হন, শিক্ষার মানও উন্নত হবে। তৃতীয়ত, শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী পাঠ্যক্রমকে যুগোপযোগী করতে হবে। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার পাশাপাশি দক্ষতা অর্জনে গুরুত্ব দিতে হবে।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় দেশের সর্ববৃহৎ উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। তাই প্রতিষ্ঠানটিকে মানসম্মত শিক্ষা, সঠিক পরিকল্পনা ও দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির ওপর জোর দিতে হবে। বাংলাদেশ এখন উন্নয়নযাত্রায় এগিয়ে চলেছে। এ যাত্রাকে টেকসই করতে হলে উচ্চশিক্ষাকে শ্রমবাজার ও প্রযুক্তির সঙ্গে সংযুক্ত করা ছাড়া বিকল্প নেই। বর্তমান বিশ্বে উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্য কেবল ডিগ্রি অর্জন নয়, বরং শিক্ষার্থীকে এমনভাবে প্রস্তুত করা যাতে সে কর্মক্ষেত্রে সরাসরি নিজের জ্ঞান ও দক্ষতা প্রয়োগ করতে পারে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রম যদি আধুনিক, যুগোপযোগী ও শ্রমবাজার উপযোগী করা যায়, তাহলে শিক্ষার্থীরা দক্ষ ও কর্মক্ষম নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠবে। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়টির কর্তৃপক্ষকে সেশনজট নিরসনেও উদ্যোগী হওয়া প্রয়োজন।










