ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে দুর্যোগপ্রবণ দেশগুলোর একটি হলো বাংলাদেশ। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব। বর্তমানে এ দুই কারণে দুর্যোগের ঝুঁকি অতীতের তুলনায় বেড়েছে। প্রায় প্রতি বছরই বন্যা, খরা, ঝড়, তাপপ্রবাহ, বজ্রপাতের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ এ দেশে আঘাত হানে। গত দুই দশকে প্রায় ১৮৫টি প্রাকৃতিক দুর্যোগ সংঘটিত হয়েছে। এতে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়েছে। অর্থনৈতিক ক্ষতিও হয়েছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগে এ দেশের ৬৩ লাখের বেশি মানুষের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে বলে জার্মানওয়াচের ‘দ্য ক্লাইমেট রিস্ক ইনডেক্স ২০২৫’ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। প্রতিবেদনটিতে আরো উল্লেখ করা হয়, দুর্যোগের কারণে প্রতি বছর প্রায় ৩০০ কোটি ডলার ক্ষতি হয়।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। তবে জনসচেতনতা ও পূর্ব প্রস্তুতির মাধ্যমে এর ঝুঁকি ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কমানো সম্ভব। এ লক্ষ্যে বিশ্বব্যাপী প্রতি বছর ১৩ অক্টোবর পালন হয়ে আসছে আন্তর্জাতিক দুর্যোগ প্রশমন দিবস। দুর্যোগ প্রশমনের আন্তর্জাতিক কৌশল হলো পরিবেশসহ জনগণের সামাজিক, অর্থনৈতিক ক্ষতি কমানোর পরিকল্পনা নেয়া। একই সঙ্গে টেকসই উন্নয়নের প্রয়োজনীয় অংশ হিসেবে দ্রুত দুর্যোগের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে পারে এমন জনগোষ্ঠী তৈরি করা। কেবল এ দুই দিক বিচারে দেখা যায় দেশে দুর্যোগের ঝুঁকি ও ক্ষয়ক্ষতি কমানোর উদ্যোগের ক্ষেত্রে দেশ পিছিয়ে আছে। যদিও দেশ বিগত সময়ে ঘূর্ণিঝড় মোকাবেলায় বেশ সাফল্য দেখিয়েছে। আবার দুর্যোগ মোকাবেলায় এ পর্যন্ত নানা নীতি-কৌশল নেয়া হয়েছে, যেমন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আইন ২০১২, জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা ২০১০-২০১৫, দুর্যোগবিষয়ক স্থায়ী আদেশাবলি ২০১৯। এছাড়া ঘূর্ণিঝড় আশ্রয় কেন্দ্র নির্মাণ, রক্ষণাবেক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা নীতিমালা ২০১১, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা নীতিমালা ২০১৫ ও প্রণয়ন করা হয়েছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় খাদ্য ও দুর্যোগ মন্ত্রণালয়, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ বিভাগ, ত্রাণ ও পুনর্বাসন অধিদপ্তর, ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কেন্দ্র, বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর, বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্ক সংকেত কেন্দ্র এবং বিভিন্ন সামরিক ও বেসামরিক বাহিনী সমন্বিতভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
দুর্যোগ প্রশমনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো কার্যকর পূর্বাভাস ব্যবস্থা। গত মাসে ঢাকার বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে পূর্বাভাসভিত্তিক আগাম সাড়াদান কার্যক্রমের তৃতীয় জাতীয় সংলাপ আয়োজন হয়। এ অনুষ্ঠানে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ উপদেষ্টা তার বক্তব্যে উল্লেখ করেন যে দুর্যোগ মোকাবেলার চেয়ে প্রশমন এখন বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আগাম প্রস্তুতি ও পূর্বাভাসভিত্তিক পদক্ষেপই মানুষের জীবন ও সম্পদ রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু সত্য হলো পূর্বাভাসভিত্তিক ব্যবস্থাটি এখনো খুব বেশি কার্যকর করে গড়ে তোলা যায়নি। ফলে প্রস্তুতির ক্ষেত্রেও ঘাটতি থেকে যায়। পূর্বাভাস কার্যকর না হওয়ার উদাহরণ হিসেবে দেশের একটি জাতীয় দৈনিকের প্রতিবেদনের কথা উল্লেখ করা যায়। ‘আবহাওয়ার পূর্বাভাস হয় জটিল ভাষায়, বোঝেন না কৃষক’ নামের ওই প্রতিবেদন জানাচ্ছে, দেশের আবহাওয়া অধিদপ্তরের বার্তাগুলো মূলত জাহাজ আর বন্দরকেন্দ্রিক হয়। কৃষকের জন্য কোনো আলাদা সতর্কবার্তা দেয়া হয় না। যদিও বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ২০১৬ সালে ‘কৃষি আবহাওয়া তথ্য পদ্ধতি উন্নতকরণ’ নামে একটি প্রকল্প নিয়েছিল। সে প্রকল্প ২০২৪ সালে শেষও হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় দেশের ৪৯২ উপজেলার ৪ হাজার ৫৫৪ ইউনিয়নে আবহাওয়া তথ্য বোর্ড, কিওস্ক, অটোমেটিক রেইন গজ, ট্যাব আর ১২টি কমিউনিটি রেডিও স্টেশন স্থাপন করা হয়। কিন্তু এরই মধ্যে ১০টি স্টেশন বন্ধ হয়ে গেছে। কোথাও ট্রান্সমিটার নষ্ট, কোথাও কম্পিউটার অকেজো। দুটি স্টেশন টিকে আছে নামমাত্র। অর্থাৎ প্রকল্পটির কোনো সুফল কৃষকরা পাচ্ছেন না।
দুর্যোগ প্রশমনের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক কৌশলগুলোর একটি হলো জনসম্পৃক্ততা বাড়ানো। জনসম্পৃক্তা বাড়ানোর পূর্বশর্ত হলো জনগণকে সচেতন করে তোলা। এজন্য পূর্বাভাস ও প্রস্তুতির পরামর্শ যথাসময়ে দেয়া প্রয়োজন। কিন্তু বেশির ভাগ প্রায় ৯৫ শতাংশ কৃষক কোনো আগাম তথ্য ছাড়াই চাষাবাদ করেন বলে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিআরআরআই) গবেষণায় বলা হয়েছে। যে কারণে প্রাকৃতিক দুর্যোগে কৃষকদের ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) তথ্যে দেখা গেছে, গত বছর কুমিল্লা, ফেনী, নোয়াখালী ও লক্ষ্মীপুরসহ দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের ভয়াবহ বন্যায় ১৪ হাজার ৪২১ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, যা জিডিপির ২৬ শতাংশ। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে কৃষি খাতে, ৫ হাজার ১৬৯ কোটি টাকা। এছাড়া অবকাঠামোয় ৪ হাজার ৬৫৩ কোটি টাকা এবং ঘরবাড়ি খাতে ২ হাজার ৪০৭ কোটি টাকার সমপরিমাণ ক্ষতি হয়েছে। এসব ক্ষতির পরিমাণ বলে দেয় দুর্যোগের পূর্ব প্রস্তুতি নেয়ার ক্ষেত্রে বেশ দুর্বলতা রয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে কার্যকর পূর্বাভাস ব্যবস্থা ও বাস্তবসম্মত পূর্ব প্রস্তুতি নিশ্চিত করা ছাড়া যে দুর্যোগের ঝুঁকি কমানো কঠিন হবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
বর্তমানে দুর্যোগের ধরন পাল্টাচ্ছে। তাই পদক্ষেপের ধরনও ভিন্ন ভিন্ন হতে হবে। সব ক্ষেত্রেই পূর্বাভাস বা পূর্ব প্রস্তুতি জোরদার করা প্রয়োজন। বিশ্বব্যাপী তীব্র তাপমাত্রা বর্তমানে বড় ধরনের দুর্যোগ। দেশের তাপমাত্রাও দিন দিন বাড়ছে। জলবায়ুসংক্রান্ত আন্তর্জাতিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ক্লাইমেট সেন্ট্রালের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ঝুঁকিপূর্ণ তাপমাত্রার মুখোমুখি মানুষের সংখ্যায় বাংলাদেশ বিশ্বের মধ্যে দশম স্থানে রয়েছে। ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন থেকে আগস্টে দেশের মোট জনসংখ্যার ৩৪ শতাংশ তীব্র তাপপ্রবাহে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তারা ৩০ দিনেরও বেশি সময় ধরে মানবস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ এমন তীব্র তাপমাত্রা সহ্য করেছে। তাপমাত্রা কমাতে হলে দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ নিতে হবে। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, জলাধার ভরাট, বন ধ্বংস, অতিমাত্রায় কার্বন নিঃসরণ ইত্যাদি কর্মকাণ্ড প্রকৃতি পরিবেশ নষ্ট করেছে। ফলে ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বেড়েছে। এসব কাজ কমিয়ে আনতে হবে। প্রকৃতি রক্ষায় জোর দেয়া জরুরি, নয়তো ভবিষ্যতে তাপমাত্রা বৃদ্ধিজনিত দুর্যোগ বাড়তে থাকবে। এর বাইরে ঢাকাসহ বড় শহরগুলো বর্তমানে ঘনবসতিপূর্ণ এবং এখানকার ভবনগুলো খুব বেশি দুর্যোগ সহনীয় নয়। গবেষণা বলছে, বড় ধরনের ভূমিকম্প হলে রাজধানীর অর্ধেক ভবন আংশিক বা সম্পূর্ণ ধসে পড়ার আশঙ্কা আছে। অথচ নগর পরিকল্পনা, বিল্ডিং কোড বাস্তবায়ন বা জরুরি উদ্ধার সক্ষমতার দিক থেকে প্রস্তুতি এখনো অপ্রতুল।
আবার ২০১৬ সালে বজ্রপাতকে জাতীয় দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। প্রায় প্রতি বছর কমবেশি ৩০০ জন বজ্রপাতে মারা যাচ্ছে, যার অধিকাংশই কৃষক। এক্ষেত্রে জনসচেতনতা বা প্রস্তুতিমূলক কোনো কার্যকর ব্যবস্থা আজও নিশ্চিত করা যায়নি। বজ্রপাতে মৃত্যুহার কমাতে সরকারের বিভিন্ন সংস্থা এ পর্যন্ত প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকার বেশি বিভিন্ন প্রকল্পে ব্যয় করেছে, কিন্তু কোনো প্রকল্পই আলোর মুখ দেখেনি। বজ্রপাতের মতো স্থানীয় দুর্যোগ মোকাবেলায় এলাকাভিত্তিক পরিকল্পনা গড়ে তোলা হয়নি। এমন বাস্তবতায় উন্নত পূর্বাভাস ব্যবস্থা ও পর্যাপ্ত পূর্ব প্রস্তুতির দিকে মনোযোগ দেয়া প্রয়োজন। নয়তো আগামীতে দেশ দুর্যোগে আরো বেশি ঝুঁকিপ্রবণ হয়ে উঠবে।










