নেপালের সাম্প্রতিক দুর্যোগ আমাদের আসলে কী বার্তা দেয়?

নেপালের ঘটনাটি আমাদের এ বার্তাই দেয় যে আমরা যতই অবকাঠামোগত উন্নয়ন করি না কেন, প্রকৃতি যখন ক্ষুব্ধ হয় তখন সেই অবকাঠামো ধ্বংস হতে সময় লাগে না। প্রকৃতি আমাদের একদিকে যেমন মায়ের মতো আগলে রাখে, অন্যদিকে তার ওপর অত্যাচার করা হলে প্রতিক্রিয়াও হয় ভয়াবহ। আমরা যখন পরিবেশ দূষিত করি, তার বিরূপ প্রভাব আমাদের ওপরই ফিরে আসে। যেমন পাহাড় কাটার ফলে প্রতি বর্ষায় চট্টগ্রাম ও পার্বত্যাঞ্চলে পাহাড়ধসে মানুষের প্রাণহানি ঘটে। যারা অবৈধভাবে পাহাড় ও মাটি কাটেন, তাদের অবশ্যই সতর্ক হতে হবে এবং পরিবেশ মন্ত্রণালয়ও এ বিষয়ে কঠোর হচ্ছে। একইভাবে নদীর দূষণ আমাদের খাদ্যশৃঙ্খলেও প্রভাব ফেলছে; দূষিত মাটির কেমিক্যাল সরাসরি আমাদের খাদ্যে চলে আসছে। নেপালের ঘটনাটি প্রমাণ করে যে মানবসৃষ্ট বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও কার্বন নিঃসরণের ফলে হিমবাহ গলে গিয়ে হঠাৎ প্লাবন বা বিপর্যয় ঘটতে পারে। আমরা যখন প্রকৃতির ওপর অন্যায় হস্তক্ষেপ করি, তার মাশুল মানবজাতিকেই দিতে হয়। সুতরাং আমাদের নিজেদের অস্তিত্বের স্বার্থেই নদী, লেক, বন, পাহাড় ও সমুদ্রকে রক্ষা করতে হবে—এ চেতনা সবার মধ্যে গড়ে তুলতে হবে।

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু এ তিন ক্ষেত্রে বাংলাদেশের বর্তমান চিত্রটি কেমন?

স্বাধীনতার ৫৫ বছর পেরিয়েছে কিন্তু পরিবেশ সংরক্ষণে আমাদের নাজুক ব্যবস্থাপনা অস্বীকারের সুযোগ নেই। অধিকাংশ নদীই দূষিত। বায়ুদূষণের দিক থেকে ঢাকা পৃথিবীর সবচেয়ে খারাপ শহরগুলোর একটি। ঢাকার আশপাশের শহরের মাটি শিল্পায়নের কারণে দূষিত। আবার বর্জ্য ব্যবস্থাপনাও এখানে ভীষণ নাজুক। এজন্য পরিবেশগত ঝুঁকির দিক থেকে আমরা ভালো অবস্থানে রয়েছি তা বলার সুযোগ আর নেই। অভ্যন্তরীণ এসব সমস্যার সঙ্গে বৈশ্বিক সমস্যাও যুক্ত হতে শুরু করেছে। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের বিরূপ প্রভাবে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে। উপকূলীয় অঞ্চলের মাটি ও পানিতে লবণাক্ততা বা স্যালাইনিটি বাড়ছে, যা সরাসরি ফসলের উৎপাদনের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে। এর সঙ্গে স্বাস্থ্যগত ঝুঁকির পাশাপাশি রয়েছে অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতি। অর্থাৎ জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে মানুষকে বাধ্য হয়ে ভিটেমাটি ছেড়ে শহরে বা অন্য কোথাও চলে যেতে হচ্ছে। বাংলাদেশ এভাবে বহুমুখী সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আর বহুমুখী সংকটের কারণেই নির্বাচনী প্রচারণার শুরু থেকেই আমাদের পরিকল্পনা ও প্রতিশ্রুতির মধ্যে পরিবেশকে আমরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছি। পরিবেশগত যেসব সমস্যা রয়েছে, সে সম্পর্কে আমরা পূর্ণ ওয়াকিবহাল এবং সামনের দিনে তা সমাধানের জন্য আমরা বদ্ধপরিকর।

সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের ছয় মাস পূর্ণ হয়েছে। এ সময়ে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু খাতে কতটুকু অগ্রগতি হয়েছে?

আমরা আগে থেকেই কিছু পরিকল্পনা করে রেখেছিলাম। ক্ষমতায় এসে কার্বন নিঃসরণের হার কমানো, বাতাসের গুণগত মানোন্নয়ন এবং দেশজুড়ে সবুজায়নের জন্য আমরা পদক্ষেপ নিই। আমাদের অন্যতম ফ্ল্যাগশিপ প্রজেক্ট, আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ। শুধু তাই নয়, এগুলোর যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করাও আমাদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। এ লক্ষ্যে আমরা শুরু থেকেই কাজ করছি। সম্প্রতি আমাদের ১৮০ দিনের পর্যালোচনায় দেখা গেছে, বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেছে। তাদের হিসাব অনুযায়ী প্রায় আড়াই কোটি গাছ রোপণ করা হয়েছে। এনজিও অ্যাফেয়ার্স ব্যুরোর তথ্য এমনকি বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থাও তাদের প্রতিবেদনে প্রায় ৪০ লাখ গাছ রোপণের কথা জানিয়েছে।

এখন আপনি প্রশ্ন তুলতে পারেন যে এ বৃক্ষরোপণ আসলেই করা হয়েছে কিনা। অনেকেই এ প্রশ্নটি করছেন, গাছ আদৌ লাগানো হয়েছে কিনা কিংবা লাগানোর পর রক্ষণাবেক্ষণ করা হচ্ছে কিনা এবং তা নিয়ে আমাদের পরিকল্পনা কী। কারণ শুধু বৃক্ষরোপণ করলেই হবে না, রোপণকৃত গাছের যথাযথ পরিচর্যা নিশ্চিত করাই মূল বিষয়। এ লক্ষ্যে আমরা একটি ‘ট্রি মনিটরিং অ্যাপ’ চালু করেছি। এ অ্যাপটির উদ্যোগে শুধু পরিবেশ মন্ত্রণালয় নয়; বরং বন বিভাগ, বাংলাদেশ ব্যুরো অব স্ট্যাটিস্টিকস (বিবিএস) এবং আইসিটি মন্ত্রণালয় যৌথভাবে কাজ করবে। সরকারি সক্ষমতা ব্যবহারের পাশাপাশি বেসরকারি খাতে যারা এমন অ্যাপ তৈরিতে অভিজ্ঞ, তাদের সমন্বয়ে এটি তৈরি করা হবে। এর মাধ্যমে কোনো একটি অঞ্চলে কতগুলো গাছ লাগানো হয়েছে, কী প্রজাতির গাছ লাগানো হয়েছে এবং সেগুলোর বর্তমান অবস্থা কেমন—সবই ট্র্যাক করা সম্ভব হবে। অতীতে বিভিন্ন সময় বৃক্ষরোপণ প্রকল্প নেয়া হলেও শেষ পর্যন্ত সেই গাছগুলোর কী পরিণতি হতো, তার কোনো সুনির্দিষ্ট হিসাব সরকারের কাছে থাকত না। আমরা সেই ব্যবস্থার পরিবর্তন আনতে চাচ্ছি; যাতে গাছ লাগানোর পাশাপাশি সেগুলোর সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত হয় এবং তা পরিবেশের ইতিবাচক পরিবর্তনে ভূমিকা রাখতে পারে।

সরকার ‘গ্রিন পলিসি’ বা সবুজ নীতি গ্রহণ করেছে। এ নীতিকে স্বয়ং সরকারপ্রধান কীভাবে ধারণ করছেন?

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার ব্যক্তিগত জীবন, দৈনন্দিন কর্মকাণ্ড, অফিস, সভা বা সফরসহ সর্বক্ষেত্রেই পরিবেশ রক্ষার নীতিকে প্রাধান্য দেন। তিনি পরিবেশ রক্ষা, বৃক্ষরোপণ এবং শহর পরিচ্ছন্ন রাখার বিষয়ে প্রতিনিয়ত তাগিদ দিচ্ছেন। আমাদের দৈনন্দিন জীবনচর্চা ও সংস্কৃতিতেই যেন পরিবেশ রক্ষার বিষয়টি যুক্ত হয়, সে বিষয়ে তিনি জোর দিচ্ছেন। তিনি ‘ওয়ান চাইল্ড, ওয়ান ট্রি’ অর্থাৎ একটি শিশু জন্ম নিলে তার নামে একটি বৃক্ষরোপণের কথা বলেছেন। বিভিন্ন বক্তৃতায় তিনি ‘ওয়ান স্টুডেন্ট, ওয়ান ট্রি’ অর্থাৎ প্রতিটি শিক্ষার্থী একটি করে গাছ লাগাবে এবং তার যত্ন নেবে, এ ধারণার কথা তুলে ধরছেন। পরিবেশ রক্ষার এ সংস্কৃতি সমাজে ছড়িয়ে দেয়ার ও চর্চায় পরিণত করার যে প্রয়াস, সে কারণে অনেকে তাকে ‘গ্রিন প্রাইম মিনিস্টার’ হিসেবে অভিহিত করছেন। শুধু বৃক্ষরোপণই নয়, আমরা সারা দেশে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন ও নদী পুনরুদ্ধারের বড় পরিকল্পনা হাতে নিয়েছি।

নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে আরো বেশি উৎসাহ ও প্রণোদনা দেয়ার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। দেশের বিভিন্ন ভবনের ছাদে রুফটপ সোলার প্যানেল এবং অন্যান্য খালি জায়গায় সোলার প্যানেল বসানোর পাশাপাশি উইন্ড পাওয়ার ও হাইড্রো পাওয়ারের মতো নবায়নযোগ্য উৎস যুক্ত করার চেষ্টা হচ্ছে। আমরা মূলত প্রাকৃতিক উপাদান ব্যবহার করে জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর অর্থনীতি থেকে নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক অর্থনীতির দিকে ধাপে ধাপে রূপান্তর বা ট্রানজিশন চাইছি। ডিজেল বা পেট্রলভিত্তিক আমাদের বর্তমান অর্থনীতি মূলত আমদানিনির্ভর। সেখানে নানা সংকট তৈরি হয়। যেমন বর্তমানে হরমুজ প্রণালির যুদ্ধাবস্থা এবং অন্যান্য বৈশ্বিক কারণে আমরা বাংলাদেশে একটি তীব্র জ্বালানি সংকট দেখতে পাচ্ছি, যা বিশ্বের আরো অনেক দেশেই কম-বেশি দেখা যাচ্ছে। এ সংকট মোকাবেলার বড় উপায় হলো নিজস্ব প্রাকৃতিক সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার। আমাদের দেশে যে পর্যাপ্ত রোদ বা সূর্যালোক রয়েছে, সেটি একটি বড় আশীর্বাদ। স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলোর মতো আমাদের সূর্যের আলোর অভাব নেই। এ সূর্যালোককে যদি সোলার এনার্জির মাধ্যমে রূপান্তর করে আমরা জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করতে পারি, তবে প্রকৃতি থেকেই জ্বালানি নিরাপত্তার সমাধান সম্ভব। সরকারের নতুন নীতিগুলোতে আমরা নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে তাই অগ্রাধিকার দিয়েছি।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। আমাদের নির্বাচনী ইশতাহার ও বর্তমান সরকারের গ্রিন প্ল্যানে বর্জ্যকে শুধু ‘আবর্জনা’ না ভেবে ‘সম্পদে’ রূপান্তরের পরিকল্পনা রাখা হয়েছে। বর্জ্যকে কীভাবে সম্পদে পরিণত করা যায়? আমরা এরই মধ্যে আমিনবাজারে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি তৈরির উদ্যোগ নিয়েছি। ঢাকা দক্ষিণ সিটিতেও নতুন পরিকল্পনা নেয়া হচ্ছে। পুরো ঢাকায় এমন আরো প্লান্ট হবে, যেখানে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির পাশাপাশি বায়োগ্যাস, জৈব সার এবং লার্ভা তৈরি করা হবে। এমনকি প্লাস্টিক বর্জ্য থেকে আসবাব তৈরির মতো আধুনিক প্রযুক্তিও এখন রয়েছে। অর্থাৎ বর্জ্য সংগ্রহ করা, জনগণকে সচেতন করা এবং বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তরের যে ধারণা তা কেবল ঢাকায় নয়, দেশের বড় বড় বিভাগীয় শহর, পৌরসভা এবং উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত ছড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।

বিগত সরকারের আমলেও পরিবেশ রক্ষা, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি রোধ কিংবা বৃক্ষরোপণ নিয়ে নানান রূপরেখা বা নীতির কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু কার্যত সেগুলোর কোনো দৃশ্যমান ফল দেখা যায়নি। তখনকার বাস্তবায়নে কী কী ঘাটতি ছিল? আর আপনাদের বর্তমান নীতিগুলোর ক্ষেত্রে কীভাবে নিশ্চিত করছেন যে এগুলো সত্যিই বাস্তবায়ন হবে?

বিগত সরকারের সঙ্গে আমাদের সরকারের মূল ও গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্যটি হচ্ছে ‘জবাবদিহিতা’। আমরা জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হয়ে সরকার গঠন করেছি। ফলে জনগণের কাছে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে আমাদের কোনো আপস করার সুযোগ নেই। কারণ পরবর্তী নির্বাচনে জনগণই মূল্যায়ন করবে আমরা রাষ্ট্র পরিচালনা সঠিকভাবে করতে পেরেছি কিনা। সেই দায়বদ্ধতা থেকেই আমাদের প্রতিশ্রুতি ও পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। যেমন বৃক্ষরোপণের কথাই যদি বলি, আগে কোনো আধুনিক মনিটরিং ব্যবস্থা ছিল না। বাজেট বরাদ্দ হতো, এমনকি মোটা অংকের অর্থও খরচ হতো; কিন্তু সেই গাছগুলো কীভাবে টিকিয়ে রাখা হবে বা তদারক করা হবে—তার কোনো সঠিক পরিকল্পনা ছিল না। পাশাপাশি মানুষের গঠনমূলক সমালোচনা করার অধিকারও কেড়ে নেয়া হয়েছিল। বর্তমান সরকার বাকস্বাধীনতা ও সমালোচনাকে নাগরিক অধিকারের অংশ মনে করে এবং একে পূর্ণ স্বাগত জানায়।

বর্তমানে সরকারের প্রতিটি কাজ মিডিয়া, জনগণ এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থার মাধ্যমে নিবিড় তদারকি ও পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তাই সংক্ষেপে বিগত সরকারের সঙ্গে আমাদের পার্থক্য হলো আমরা একটি জনসম্পৃক্ত ও জবাবদিহিমূলক সরকার, আমাদের একটি কার্যকর মনিটরিং মেকানিজম রয়েছে এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে জনগণের প্রতিটি মতামতকে আমরা গুরুত্বের সঙ্গে নিই।

সম্প্রতি ‘দি ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট’-এর ‘গ্লোবাল লিভেবিলিটি ইনডেক্স-২০২৬’-এ ঢাকাকে বিশ্বের তৃতীয় বসবাস অযোগ্য শহর হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে ঢাকাকে নিয়ে আপনারা কী ভাবছেন?

আন্তর্জাতিক সূচকগুলোতে বসবাসযোগ্যতার দিক থেকে ঢাকার অবস্থান নিচের দিকে। তবে এ পরিস্থিতি একদিনে তৈরি হয়নি; দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, দূষণ এবং অপশাসনের ফলেই আজকের ঢাকার সৃষ্টি। আশার বিষয় হলো বর্তমান সরকার শুধু ঢাকা নয়, পুরো বাংলাদেশকে একটি উন্নত ও বসবাসযোগ্য স্থানে পরিণত করতে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিয়ে কাজ শুরু করেছে। বায়ুদূষণ রোধে আমরা এরই মধ্যে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সভা করে প্রস্তুতি নিয়েছি। বুড়িগঙ্গা নদী থেকে শুরু করে গুলশান ও বনানী লেক পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। উচ্চ ভবন ও প্রতিষ্ঠানগুলোতে সুয়্যারেজ ট্রিটমেন্ট প্লান্ট (এসটিপি) বাধ্যতামূলক করার কাজ চলছে, যাতে অপরিশোধিত বর্জ্য জলাশয়ে না পড়ে। পাশাপাশি শিল্প-কারখানা ও গার্মেন্টস সেক্টরে এফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্লান্ট (ইটিপি) চালু রাখা বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে, যাতে রাসায়নিকযুক্ত দূষিত পানি পরিবেশ ও নদীতে মিশতে না পারে।

প্রধানমন্ত্রী নিজেও অনেক সময় শহর ঘুরে দেখে তাৎক্ষণিক সমস্যাগুলো চিহ্নিত করছেন। দুই সিটি করপোরেশনের সঙ্গে প্রতিনিয়ত বৈঠক হচ্ছে, যাতে ঢাকাকে বসবাসযোগ্য করতে সমন্বিত ব্যবস্থা নেয়া যায়। তবে একটি বিষয় আমাদের মনে রাখা দরকার, তা হলো ঢাকার অতিরিক্ত জনসংখ্যার ঘনত্ব। যেমন যুক্তরাষ্ট্রে নিউইয়র্ক শহরের বাইরে আর ভেতরের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন; ওখানেও ট্রাফিক জ্যাম বা পরিচ্ছন্নতার সমস্যা দেখা যায় কেবল অতিরিক্ত জনঘনত্বের কারণে। ঢাকার ক্ষেত্রে অপরিকল্পিত নগরায়ণের সঙ্গে পৃথিবীর অন্যতম সর্বোচ্চ জনঘনত্ব যুক্ত হয়েছে। তাই রাতারাতি সব বদলে ফেলা কঠিন। এ চাপের টেকসই সমাধান হতে পারে প্রশাসনিক ও নাগরিক সুযোগ-সুবিধা শহরের বাইরে সম্প্রসারণ করা। নগরবিদরা দীর্ঘদিন ধরে পূর্বাচলে শহরের গুরুত্বপূর্ণ অংশ স্থানান্তরের যে প্রস্তাব দিয়ে আসছেন, সেটি বাস্তবায়ন হলে মূল ঢাকার ওপর চাপ অনেকটাই কমবে। তবে এ সবকিছুর জন্যই আমাদের একটি সুদূরপ্রসারী সুপরিকল্পনা ও সঠিক ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন।

বাংলাদেশ ও প্রতিবেশী দেশগুলোর সম্পর্ক মূলত নদীর উজান-ভাটির সম্পর্ক। নদী বা পানির সঠিক ডেটা প্রতিনিয়ত না পেলে সঠিক নীতি প্রণয়ন করা কঠিন হয়ে পড়ে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার সম্পর্কের গতিমুখ নিয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ জানতে চাই?

পানির ন্যায্য হিস্যা না পাওয়ার কারণে আমাদের দেশে মরুকরণ (ডেজারটিফিকেশন) প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, যার ফলে কৃষি উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে চাপ তৈরি হচ্ছে। আমাদের নদীকেন্দ্রিক নৌপথ, খাদ্য উৎপাদন ও পরিবেশের ভারসাম্য—সবই কিন্তু পানির ন্যায্য হিস্যার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। গঙ্গা চুক্তির মেয়াদ এ বছরই শেষ হতে যাচ্ছে এবং আমরা বিষয়টি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই-বাছাই করছি। বর্তমান সরকার কোনো নতজানু পররাষ্ট্রনীতির ওপর দাঁড়িয়ে এ চুক্তিতে স্বাক্ষর করবে না। অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন-সংক্রান্ত যেকোনো চুক্তিতে আমরা শিরদাঁড়া উঁচু করে কথা বলব এবং আমাদের প্রধান অগ্রাধিকার থাকবে ‘জাতীয় স্বার্থ’। তিস্তা বা গঙ্গা-পদ্মা—প্রতিটি ক্ষেত্রে আমরা সুনির্দিষ্ট ‘গ্যারান্টি ক্লজ’ চাই, যাতে নির্দিষ্ট পরিমাণ পানিবণ্টন নিশ্চিত হয়। যেহেতু আমরা ভাটির দেশ (লোয়ার রিপারিয়ান কান্ট্রি), তাই ফারাক্কাসহ অন্যান্য ব্যারাজের মাধ্যমে ভারত কী পরিমাণ পানি ছাড়ছে, তার ওপর আমাদের অনেকটাই নির্ভর করতে হয়। গঙ্গা বেসিনে ভারত চার-পাঁচটি বড় ব্যারাজ এবং ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ৮০০টি ব্যারাজ তৈরি করেছে। অন্যদিকে আমরা পানি ধরে রাখার জন্য মাত্র একটি পদ্মা বা গঙ্গা ব্যারাজ তৈরির পরিকল্পনা করছি; যাতে বর্ষাকালের অতিরিক্ত পানি ধরে রেখে পরবর্তী সময়ে আমাদের নদী ও খালগুলোতে বণ্টন করা যায়। আন্তর্জাতিক ও দ্বিপক্ষীয়—উভয় ক্ষেত্রেই বাংলাদেশের শক্ত অবস্থান নেয়ার সময় এসেছে। আমাদের সরকার সেই পররাষ্ট্রনীতিতেই বিশ্বাস করে, যা জাতীয় স্বার্থ ও পানির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করে। তাই আগামী দিনে আমরা যে চুক্তিই করি না কেন, তাতে ডেটা শেয়ারিং, জ্ঞান বিনিময় ও প্রযুক্তি হস্তান্তরের পাশাপাশি জাতীয় স্বার্থ অনুযায়ী পানির ন্যায্য দাবি আদায় করা হবে। দ্বিপক্ষীয়ভাবে সমস্যার সমাধান না হলে আমরা বহুপক্ষীয় (মাল্টিল্যাটারাল) ফোরাম বা আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বিষয়টি জোরালোভাবে উত্থাপন করব।

প্রধানমন্ত্রী প্রথম সফর হিসেবে মালয়েশিয়া ও চীনে গিয়েছেন। এখন ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র সফর নিয়েও আলোচনা হচ্ছে। ভারতের সঙ্গে পানি চুক্তির ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর সফরের সময়সূচি কী কোনো প্রভাব ফেলবে?

একটি রাষ্ট্রীয় সফর কোনো দুটি দেশের সামগ্রিক সম্পর্কের মূল ভিত্তি হতে পারে না। সফর ছাড়াও আমাদের মধ্যে বাণিজ্যিক ও নানা দ্বিপক্ষীয় কর্ম-সম্পর্ক রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী কখন কোন দেশ সফর করবেন, তা নির্ভর করে ওনার সময়সূচি, বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট ও দেশের ভেতরের সামগ্রিক পরিস্থিতির ওপর। তবে আমরা আমাদের প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক ও কার্যকরী কর্ম-সম্পর্ক বজায় রাখতে চাই। প্রধানমন্ত্রী সময়, সুযোগ-সুবিধা অনুযায়ী অবশ্যই ভারত সফর করবেন; তবে সফরের চূড়ান্ত তারিখ নির্ধারণ হলে তা গণমাধ্যমকে জানানো হবে। আমাদের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মূল চালিকাশক্তি হলো বাণিজ্যিক সম্পর্ক। এ বাণিজ্যিক চাহিদার কারণেই প্রধানমন্ত্রী চীন ও মালয়েশিয়া সফর করেছেন, সামনে হয়তো সৌদি আরব, যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশেও যাবেন। তাই নির্দিষ্ট একটি দেশের সফর কোনো মুখ্য বিষয় নয়; মুখ্য হলো দেশের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্বার্থে নতুন মিত্র তৈরি করা। প্রয়োজন অনুযায়ী আমাদের প্রধানমন্ত্রী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী বা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীরা বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন দেশ সফর করবেন। আমরা এখন আর সেই যুগে নেই যে একটি নির্দিষ্ট দেশ আমাদের পররাষ্ট্রনীতি বা বৈশ্বিক মিত্র নির্ধারণ করে দেবে। দেশের বাণিজ্যিক স্বার্থ এবং জাতীয় নিরাপত্তা বিবেচনা করে আমাদের কূটনৈতিক সিদ্ধান্ত আমরা নিজেই নেব।

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু—এ বিষয়গুলো একে অন্যের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। আপনাদের নেয়া নীতিগুলোর দৃশ্যমান পরিবর্তন বা ফল আনুমানিক কবে নাগাদ দেখা যেতে পারে? এমন কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা বা প্রজেকশন কি আপনাদের আছে?

অবশ্যই। আমাদের কর্মপরিকল্পনাগুলোকে ছয় মাস, এক বছর, দুই বছর এবং পাঁচ বছরের মেয়াদে ভাগ করা হয়েছে। পরিবেশগত উদ্যোগগুলোর ফলাফল প্রথম ছয় মাসে দৃশ্যমান হয় না। কারণ শুরুর ছয় মাস মূলত গবেষণা, ফিজিবিলিটি স্টাডি এবং প্রস্তুতিমূলক কাজের জন্য প্রয়োজন হয়। তবে অন্তত এক বছর পর প্রকল্পগুলোর বাস্তব প্রভাব দৃশ্যমান হতে শুরু করবে। আজ একটি চারা রোপণ করলে তা বড় হতে সময় লাগে। কিংবা যে মনিটরিং অ্যাপটির কথা আমরা বলছি, সেটি তৈরির জন্য কারিগরি সম্ভাব্যতা যাচাই ও ডেটা স্ট্রাকচার তৈরির একটা প্রস্তুতিমূলক সময় দরকার হয়। বর্তমানে প্রস্তুতি পর্বটিই চলছে। আমার বিশ্বাস, আগামী এক বছরের মধ্যে আমাদের পদক্ষেপ ও প্রতিশ্রুতিগুলোর দৃশ্যমান পরিবর্তন দেশবাসী দেখতে পাবেন।

পরিবেশ রক্ষায় সাধারণ নাগরিকদেরও একটি বড় দায়িত্ব রয়েছে। নাগরিকদের প্রতি আপনাদের কী আহ্বান থাকবে?

সাধারণ নাগরিক এবং নাগরিক সমাজের প্রতি আমাদের বার্তা হলো পরিবেশ রক্ষায় সরকারের নেয়া ফ্ল্যাগশিপ প্রোগ্রাম ও প্রজেক্টগুলোতে আপনারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নিন। আমরা পরিবেশ সুরক্ষাকে কেবল সরকারের একক কাজ না ভেবে একটি ‘সামাজিক আন্দোলন’ হিসেবে দেখতে চাই। বৃক্ষরোপণ, সমন্বিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, খাল খনন কিংবা নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো, এগুলোর প্রতিটিই এক একটি সামাজিক আন্দোলন। সরকারের পাশাপাশি সমাজের সর্বস্তরের মানুষ যখন এতে যুক্ত হবেন, তখনই এটি পূর্ণাঙ্গ সফলতা পাবে।