স্বাধীনতার পর দেশের বড় অগ্রাধিকার ছিল দারিদ্র্য বিমোচন। দারিদ্র্য বিমোচনের অন্যতম উপায় হিসেবে শুরু হয় ক্ষুদ্র ঋণ কার্যক্রম। ক্ষুদ্র ঋণের ইতিহাস দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে লড়াই এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। নিম্ন আয়ের ও কর্মহীন মানুষদের স্বনির্ভর করতে এবং তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে ক্ষুদ্র ঋণ গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। প্রান্তিক ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীকে, বিশেষ করে নারীর ক্ষমতায়নে এর ভূমিকা অনস্বীকার্য। ক্ষুদ্র ঋণ খাতে সদস্যদের বড় অংকের সঞ্চয়ও গড়ে উঠেছে। এ খাত উদ্যোক্তা সৃষ্টি, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং সামাজিক উন্নয়ন উৎসাহিত করছে।

মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটির (এমআরএ) তথ্য অনুযায়ী ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৩ লাখ কোটি টাকার বেশি মাইক্রোক্রেডিট ও মাইক্রোএন্টারপ্রাইজ ঋণ বিতরণ করা হয়েছে। বর্তমানে এনজিও-এমএফআই খাতে সদস্য সংখ্যা ৬ কোটির বেশি এবং ঋণগ্রহীতার সংখ্যা প্রায় ৫ কোটি। প্রায় ৯০ শতাংশ গ্রাহক নারী। এসব প্রতিষ্ঠানে সদস্যদের সঞ্চয় রয়েছে ৭০ হাজার কোটি টাকার মতো। বিপুল জনগোষ্ঠীর সম্পৃক্ততা থাকায় ক্ষুদ্র অর্থায়ন খাত আর্থিক অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে একটি বড় অর্জন। শুরুর দিকে মাইক্রোফাইন্যান্স প্রতিষ্ঠানগুলো হাতে-কলমে পরিচালিত প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করত। বর্তমানে তারা নিজেদের অনেক কাজ ডিজিটালাইজেশনের আওতায় এনেছে। অনেক প্রতিষ্ঠান ঋণ ব্যবস্থাপনা সিস্টেম ব্যবহার করছে, যা অন্যান্য অ্যাপ্লিকেশন যেমন ফাইন্যান্সিয়াল ইনফরমেশন সিস্টেম, ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম এবং হিউম্যান রিসোর্স ইনফরমেশন সিস্টেমের সঙ্গে সমন্বিত। এতে অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়াগুলো দ্রুত, নির্ভরযোগ্য ও স্বচ্ছ হয়ে উঠছে। ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা তাদের পরিচালন ব্যয় কমাতে সহায়তা করছে।

ক্ষুদ্র ঋণ খাতে দক্ষতা ও গতিশীলতা বাড়িয়েছে এমএফএসের ব্যবহার: মাইক্রোফাইন্যান্স প্রতিষ্ঠান সাধারণত ঐতিহ্যগতভাবে মাঠকর্মীদের নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। সরাসরি নগদ টাকায় ঋণ বিতরণ ও সঞ্চয় সংগ্রহ করা হয়। মাঠকর্মীরা কিস্তি সংগ্রহ করেন অথবা সদস্যরা স্থানীয় অফিসে যেয়ে কিস্তি দেন। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ডিজিটাল অবকাঠামোর বিকাশ, মোবাইল প্রযুক্তির সহজলভ্যতা এবং মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেসের (এমএফএস) সম্প্রসারণ নগদ টাকা থেকে ডিজিটাল লেনদেনে রূপান্তরের পথ সুগম করেছে। রূপান্তরের মূলে রয়েছে এমএফএসের মাধ্যমে পেমেন্ট, অনলাইন পেমেন্ট সিস্টেম, ডিজিটাল ক্রেডিট স্কোরিং এবং তৃতীয় পক্ষের সফটওয়্যার ব্যবহার করে উপাত্তের বিশ্লেষণ গ্রহণ।

সম্প্রতি প্রকাশিত সংবাদের তথ্যানুসারে ব্র্যাক, টিএমএসএস, এসএসএস, পদক্ষেপ, ব্যুরো বাংলাদেশ, শক্তি ফাউন্ডেশনের মতো শীর্ষস্থানীয় প্রায় ৫৩টি এনজিওর গ্রাহকরা বিকাশ অ্যাপ থেকেই ঋণ ও সঞ্চয়ের কিস্তি পরিশোধ করার সেবা নিচ্ছেন। মোবাইল ফোন থেকেই বিকাশের মতো এমএফএস অ্যাপের মাধ্যমে সহজে ও নিরাপদে লেনদেন করছেন গ্রাহকরা। যেকোনো জায়গা থেকেই তারা কিস্তি পরিশোধ করছেন। এ সুবিধা শুধু গ্রাহক পাচ্ছেন তা নয়, এনজিওর জন্যও সহজ ও নিরাপদ পরিশোধ ব্যবস্থা। সহজেই ঋণের কিস্তি ও সঞ্চয়ের টাকা সংগ্রহ, ২৪/৭ লেনদেনের রিপোর্টিং, ক্যাশ বহন করার ঝুঁকি এড়ানো, কর্মঘণ্টা সাশ্রয় ও কর্মক্ষমতা বাড়িয়ে সার্বিক ক্ষুদ্র ঋণ খাতে দক্ষতা ও গতিশীলতা আনছে। এমএফএস সেবার দেশজুড়ে সম্প্রসারিত শক্তিশালী নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ডিজিটাল পেমেন্ট ক্ষুদ্র অর্থায়ন খাতে একটি মৌলিক পরিবর্তন এনেছে। এখন মাইক্রোফাইন্যান্স প্রতিষ্ঠানগুলো ডিজিটালভাবে সেবা দিতে পারছে, যেখানে ঋণগ্রহীতারা মোবাইলের মাধ্যমে ঋণ গ্রহণ ও কিস্তি পরিশোধ করতে পারেন। এর ফলে লেনদেন আরো দ্রুত, নিরাপদ ও স্বচ্ছ হচ্ছে। ঋণগ্রহীতাদের মাঠকর্মীদের জন্য অপেক্ষা করতে হয় না। ঋণ কর্মকর্তারাও নগদ টাকায় লেনদেনের পরিবর্তে গ্রাহক সহায়তা ও আর্থিক শিক্ষার মতো কাজে বেশি সময় দিতে পারছেন।

ডিজিটাল রূপান্তরে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি: ২০০৬ সাল পর্যন্ত মাইক্রোফাইন্যান্স প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য কোনো আনুষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রক কাঠামো ছিল না। সেই বছর সরকার মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি (এমআরএ) প্রতিষ্ঠা করে, যার উদ্দেশ্য ছিল দেশের এমএফআই কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং কার্যকারিতা বাড়ানো। এমআরএ এরই মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের সহযোগিতায় ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরো প্রতিষ্ঠা করছে। এই সিআইবি সমন্বিত ঋণসংক্রান্ত তথ্য সরবরাহ করবে, যা উন্নত ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণকে আরো কার্যকর করবে। এমআরএ গ্রাহকদের জাতীয় পরিচয়পত্র যাচাইয়ের জন্য বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এছাড়া একটি জাতীয় ডাটাবেজ তৈরি করেছে, যেখানে অনলাইনভিত্তিক তথ্য সংগ্রহ ব্যবস্থা এবং তার নিরাপদ সংরক্ষণ নিশ্চিত করা হয়েছে। এসব কার্যক্রম ক্ষুদ্র ঋণ খাতের ডিজিটাল রূপান্তরের কাজ এগিয়ে নেবে।

নিম্ন আয়ের মানুষের আবাসন চাহিদা পূরণ: বাংলাদেশের ক্ষুদ্র ঋণ খাতে ডিজিটাল আর্থিক সেবা এবং স্বল্প ও মধ্যমেয়াদি গৃহঋণ সুবিধা দিতে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য গত এপ্রিলে বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রতিষ্ঠান আইএফসির সঙ্গে একটি চুক্তি করেছে এমআরএ। এর লক্ষ্য ক্ষুদ্র অর্থায়ন প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণ কার্যক্রমকে ডিজিটাল ব্যবস্থায় রূপান্তরে সহায়তা করা এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর উন্নত আবাসন সুবিধা দেয়ার নীতি পরিবেশ গড়ে তোলা। দেশের দরিদ্র, প্রাতিষ্ঠানিক ঋণ সুবিধাবঞ্চিত, পিছিয়ে পড়া ও স্বল্প আয়ের অনেকের ঘর তৈরির নিজস্ব জমি আছে, কিন্তু ঘর নেই। থাকলেও এখনকার ঘর বসবাসের অনুপযোগী। যারা ঋণ পরিশোধে সক্ষম এমন পরিবারের জন্য এনজিওদের মাধ্যমে বিতরণ করতে সরকারের গৃহায়ন তহবিল রয়েছে। এ ঋণের সুদের হার গ্রাহক পর্যায়ে মাত্র সাড়ে ৫ শতাংশ। গৃহায়ন তহবিল থেকে টাকা নিতে এনজিওদের জন্য সুদহার মাত্র দেড় শতাংশ। গৃহ ঋণ কার্যক্রম ডিজিটাল হলে নিম্ন আয়ের মানুষের আবাসন চাহিদা পূরণের চেষ্টায় খুবই সহায়ক হবে।

আর্থিক অন্তর্ভুক্তি, সাশ্রয়ী লেনদেন ও কার্বন নিঃসরণ কমানো: ডিজিটাল পেমেন্ট এমএফআইগুলোকে সুবিধাবঞ্চিত মানুষের কাছে আরো কার্যকরভাবে পৌঁছাতে সক্ষম করছে। গ্রামীণ এলাকায় ব্যাংকের শাখা খুবই সীমিত এবং প্রথাগত ব্যাংকিং সেবা দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষের নাগালের বাইরে। মোবাইল ফোনের ব্যাপক ব্যবহার এবং বিকাশের মতো মোবাইল ব্যাংকিং সেবা সহজলভ্য হওয়ার কারণে প্রত্যন্ত এলাকার মানুষ আর্থিক সেবা গ্রহণ করতে পারছে। এতে ভৌত অবকাঠামোর ওপর নির্ভরতা কমছে এবং আরো বেশি মানুষ আনুষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হতে পারছে। আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো ডিজিটাল লেনদেন মানুষের চলাচল কমিয়ে জ্বালানি সাশ্রয় করছে, যা কার্বন নিঃসরণ কমানোর মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় ভূমিকা রাখছে। বলা যায়, ডিজিটাল কার্যক্রম যত বাড়বে অর্থনীতি তত টেকসই হবে। ডিজিটাল পেমেন্ট এনজিও এবং ঋণগ্রহীতা ও সঞ্চয়কারী সবার জন্যই লেনদেন ব্যয় কমিয়ে দেয়। নগদ লেনদেনে পরিবহন খরচ থাকে, জনবলের প্রয়োজন হয় এবং নিরাপত্তার ঝুঁকি থাকে। অন্যদিকে ডিজিটাল পেমেন্ট খরচসাশ্রয়ী ও নিরাপদ, যা আর্থিক সেবা দেয়ার মোট ব্যয় কমিয়ে আনে। ব্যয় কমলে ঋণগ্রহীতাদের অপেক্ষাকৃত কম সুদে টাকা দেয়া সম্ভব হবে।

ক্ষুদ্র ঋণ পরিচালনায় দক্ষতা, স্বচ্ছতা ও নিরাপত্তা বৃদ্ধি: ডিজিটাল পেমেন্ট ক্ষুদ্র ঋণ প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমেও দক্ষতা আনছে। ঋণ বিতরণ ও কিস্তি পরিশোধ প্রক্রিয়াকে সহজতর করছে। হাতে-কলমে কাজের প্রয়োজন কমিয়েছে এবং ত্রুটির আশঙ্কা কমিয়েছে। ফলে ঋণ অনুমোদন ও বিতরণের সময়সীমা কমছে এবং ঋণগ্রহীতাদের জন্য সেবা গ্রহণের অভিজ্ঞতা উন্নত হয়েছে। এছাড়া ডিজিটাল পেমেন্ট লেনদেনের স্বচ্ছতা বাড়িয়েছে। নগদভিত্তিক লেনদেনের অন্যতম চ্যালেঞ্জ হলো অর্থের গতিপথ জানা ও নিরীক্ষা করা। অন্যদিকে ডিজিটাল লেনদেনে রেকর্ড থাকে, যা সহজে আর্থিক কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ ও অডিট করতে সহায়তা করে। ফলে প্রতারণা ও দুর্নীতি কমে, যা নগদভিত্তিক ক্ষুদ্র ঋণ কার্যক্রমে একটি বড় উদ্বেগের বিষয়।

মোটা দাগে বলা যায়, ক্ষুদ্র ঋণ খাতে ডিজিটাল পেমেন্ট অর্থনীতির আনুষ্ঠানিকীকরণে অবদান রাখছে। সরকারের অন্যতম লক্ষ্য ‘ক্যাশলেস ইকোনমি’ গঠনে সহায়তা করছে। ডিজিটাল পেমেন্ট সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর কাছে আরো কার্যকরভাবে পৌঁছাতে, লেনদেন ব্যয় কমাতে এবং বিশেষ করে নারীদের মধ্যে আর্থিক স্বনির্ভরতা বাড়াতে সহায়তা করছে। এগুলো সবই বর্তমান বাংলাদেশে অর্থনৈতিক উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ এজেন্ডা।

মাহবুবুল হক ভূইয়া: উপনির্বাহী পরিচালক সোসাইটি ফর সোশ্যাল সার্ভিস (এসএসএস)