ঈদ মানে আনন্দ। দীর্ঘ এক মাস সিয়াম সাধনার পর পালিত হয় পবিত্র ঈদুল ফিতর। এ ঈদ মুসলমানদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব। তবে উৎসবের রেশ ধর্মের গণ্ডি পেরিয়ে ছড়িয়ে পড়ে সব মানুষের মাঝে। উঁচু-নিচু, জাত-ধর্মের ভেদাভেদ ভুলে সবাই এ আনন্দ উৎসবে শরিক হন। যেন ধর্মীয় উৎসব বৈষম্য দূর করে সম্প্রীতির বন্ধনকে দৃঢ় করে তোলে। ঈদ পরিণত হয় বিশ্বজনীন এক উৎসবে। মানুষের সঙ্গে কুশল বিনিময়, নানা আয়োজন-আপ্যায়ন, জাকাত-ফিতরা ও সাধারণ দানের মাধ্যমে সমাজের দরিদ্র-অসহায় মানুষের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি এ দিনকে তাৎপর্যময় করে তোলে।
ঈদের আনন্দ সর্বজনীন। সমাজের সর্বস্তরের মানুষ যেন ঈদের আনন্দ উপভোগ করতে পারে তাই ইসলামে জাকাতের বিধান দেয়া হয়েছে। উপযুক্ত গ্রহীতাকে জাকাত প্রদানের মাধ্যমে সমাজে ধনী ও দরিদ্রের ভেদাভেদ কিছুটা কমিয়ে আনা সম্ভব। এতে সচ্ছলভাবে ঈদ উদযাপন করতে পারে সবাই। এছাড়া ঈদ যথাযথভাবে আনন্দে পালনের জন্য কর্মজীবীদের দেয়া হয় উৎসব ভাতা। সরকারের পক্ষ থেকে ঈদের আগেই কর্মক্ষেত্রের সবাইকে বেতন ও বোনাস প্রদানের নির্দেশ দেয়া হয়। যদিও প্রতিবারই দেখা যায় শিল্প মালিকরা এ নিয়মের ব্যত্যয় ঘটান। বিশেষত গার্মেন্ট শ্রমিকরা সময়মতো বেতন-ভাতা পান না। বণিক বার্তার গতকালের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ৭ এপ্রিল পর্যন্ত শিল্প অধ্যুষিত আট এলাকার কেবল ৩২ শতাংশ কারখানা মার্চের বেতন পরিশোধ করেছে। এ হিসাবে ৬৮ শতাংশের বেতন এখনো অপরিশোধিত। আর ঈদ বোনাস পরিশোধ করেছে ৭০ শতাংশ কারখানা।
ঈদের আগে প্রায় প্রতি বছরই এমন চিত্র দেখা যায় দেশের শিল্প অধ্যুষিত এলাকার কারখানাগুলোয়। এ বছর ঈদেও বেতন-বোনাস পরিশোধে সমস্যা হতে পারে, এমন ৪১৬টি কারখানা চিহ্নিত করে এ বিষয়ে নীতিনির্ধারক ও শিল্প মালিকদের আগেই অবহিত করেছিল শিল্প পুলিশ। এমনকি এ-সংক্রান্ত এক সভায় বিরূপ পরিস্থিতি মোকাবেলায় বেশকিছু সিদ্ধান্তও নেয়া হয়। এর মধ্যে ছিল বিভিন্ন কলকারখানার বেতন পরিশোধের বর্তমান অবস্থা পর্যালোচনা করা।
কোনো গার্মেন্ট মালিক বেতন-ভাতা দিতে ব্যর্থ হলে শিল্প পুলিশের উচিত বিকল্প উপায় বের করা। মালিক-শ্রমিক সমঝোতার ভিত্তিতে ঈদের ছুটি নির্ধারণ, বেতন-ভাতা পরিশোধ এবং ঈদের আগে যুক্তিসংগত কারণ ছাড়া কোনো শ্রমিক ছাঁটাই না করতে পারে, এ বিষয়ে শিল্প পুলিশের তৎপরতা বাড়াতে হবে। ঈদের সময় শ্রমিকদের এমন হয়রানি কোনো অবস্থাতেই কাম্য নয়। এ উৎসবে চাওয়া শ্রমিকদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ দূর হোক, মালিক-শ্রমিকের মধ্যে সম্প্রীতির সম্পর্ক গড়ে উঠুক।
কর্ম কিংবা শিক্ষার তাগিদে পরিবার থেকে দূরে, অন্যত্র থাকা মানুষজন ঈদ উদযাপনে বাড়ি ফিরতে চায়। তাই ঈদের বেশ কয়েক দিন আগে থেকেই সড়ক-মহাসড়ক, রেল ও নৌপথে ব্যস্ততা বাড়ে। নির্বিঘ্ন ও নিরাপদ ঈদযাত্রার প্রত্যাশা করে সব যাত্রী। যাত্রায় নিরাপত্তা নিশ্চিতে সংশ্লিষ্টদের তৎপরতা দেখা যায়। তবুও অতিরিক্ত ভাড়া, টিকিট পেতে ভোগান্তি, কালোবাজারি টিকিট গোষ্ঠীর দৌরাত্ম্য, যানজট, দুর্ঘটনাসহ নানা বিশৃঙ্খলা ঘুরেফিরে ঈদযাত্রাকে এক প্রকার ক্লান্তি ও বিভীষিকাময় করে তোলে।
ঈদের সময় হয় যানজট থাকে কিংবা ফাঁকা রাস্তায় বেপরোয়াভাবে চলতে থাকে গাড়ি। আবার সড়কে-মহাসড়কে দেখা যায় ফিটনেসবিহীন লক্করঝক্কর গাড়ি। এসব কারণে ঈদযাত্রায় সড়ক দুর্ঘটনা প্রতি বছরই ঘটছে। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির হিসাব অনুযায়ী, গত কয়েক বছরে পবিত্র ঈদুল ফিতরে সড়ক দুর্ঘটনার ভয়াবহ চিত্র দেখা যায়। তাদের তথ্যমতে, ২০২৩ সালে ঈদযাত্রায় ঈদের আগে ও পরে ১৫ দিনে ৩৭২টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৪১৬ জন নিহত ও ৮৪৪ জন আহত হন। সড়ক, রেল ও নৌপথে সম্মিলিতভাবে ৪০২টি দুর্ঘটনায় ৪৪৩ জন নিহত ও ৮৬৮ জন আহত হন। ২০২২ সালে ঈদযাত্রায় ৩৭২টি দুর্ঘটনায় নিহত হন ৪১৬ জন, আহত হন ৮৪৪ জন। ২০১৯ সালে সারা দেশে ২৩২টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২৭৩ জন মারা গেছেন এবং ৮৪৯ জন আহত হয়েছেন। এসব তথ্যই বলে দেয় আমরা যাত্রাপথে কতটা অনিরাপদ ও কতটা অনিশ্চিত আমাদের জীবন।
দুর্ঘটনা এড়াতে মহাসড়কে যানবাহন চালানোর ক্ষেত্রে সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে। দূরপাল্লার যাত্রায় কোনো চালক যেন চোখে ঘুম নিয়ে গাড়ি না চালান সেজন্য বিকল্প চালকের ব্যবস্থা করতে হবে। আমাদের দেশে ঈদের সময়ে টানা ১২-১৮ ঘণ্টাও কখনো চালকরা গাড়ি চালান। যেখানে উন্নত দেশগুলোয় দূরপাল্লার যাত্রায় দুজন চালক ছাড়া গাড়ি চালানোর অনুমতি নেই। এ ধরনের অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা বন্ধে পুলিশের তদারকি বাড়াতে হবে। লঞ্চে অতিরিক্ত যাত্রী বহন করা যাবে না, ট্রেনের ছাদেও যেন কেউ ঝুঁকি নিয়ে যাতায়াত না করে সেটি কর্তৃপক্ষকে দেখতে হবে। যদিও প্রায় ৩৫ শতাংশ মানুষের ঈদযাত্রার জন্য কোনো বিকল্প না থাকায় তারা বিভিন্নভাবে ট্রেনের-বাসের ছাদে করে যেতে বাধ্য হয়। তাদের যাতায়াতের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে না পারলে ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা বন্ধ করা যাবে না। এছাড়া ঈদযাত্রার সময় প্রতারক চক্রের তৎপরতা বেড়ে যায়। গত বছর রেলযাত্রায় স্বস্তি আনতে ‘টিকিট যার, ভ্রমণ তার’ নীতি চালু করা হলেও টিকিটিং সিস্টেমের দুর্নীতি বসে আনা যায়নি। কালোবাজারি ও প্রতারক চক্রকে চিহ্নিত করে উপযুক্ত শাস্তি প্রদানের দায়িত্ব আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর। ঈদের ছুটিতে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য সদা সক্রিয় থাকতে হবে। আর সড়ক পরিবহনে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করার প্রবণতাকে প্রতিহত করতে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট করপোরেশনের (বিআরটিসি) সক্রিয় ভূমিকা জরুরি। সরকারি ব্যবস্থাপনায় ঈদে ঘরমুখো যাত্রীদের নিরাপদ ভ্রমণ কীভাবে নিশ্চিত করা যায়, সে বিষয়ে সরকারকে আরো ভাবতে হবে।
পরিবার-পরিজনদের সঙ্গে ঈদ কাটানোর আনন্দ পথের ক্লান্তি, ভোগান্তির ছাপ মুছে দেয় মুহূর্তেই। কিন্তু আনন্দ দ্বিগুণ হয় যখন কর্মজীবী মানুষরা ঘরে ফিরতে পারে পরিবারের সদস্যদের জন্য নতুন পোশাক কিনে। এবার রমজান শুরুর আগে থেকেই বাজারমূল্য নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি। দফায় দফায় মূল্য বেঁধে দিয়েও সুবিধা করতে পারেনি সরকার। উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও উচ্চ মূল্যস্তরে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠেছে। নিম্ন আয়ের অনেক পরিবার প্রয়োজনীয় পুষ্টিকর খাবার কিনতে পারেনি। যদিও ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) পক্ষ থেকে সাশ্রয়ী মূল্যে খাদ্যদ্রব্যের ব্যবস্থা করা হয়, তবে তা যথেষ্ট নয়। প্রতি বছরই রমজান মাস এলে দ্রব্যের দাম বৃদ্ধির প্রক্রিয়ার কার্যকর সমাধান দরকার। সেজন্য সংশ্লিষ্টদের দূরদর্শী হওয়া প্রয়োজন।
ঈদের কয়েকদিন পরেই বাঙালির ঐতিহ্যবাহী আনন্দ উৎসব বাংলা নববর্ষ। ঈদ ও বাংলা নববর্ষ মিলিয়ে এবার ছুটিও তাই বেশি পাচ্ছেন কর্মজীবীরা। বিশেষত প্রথমবারের মতো টানা ছয়দনি ছুটি কাটাবেন সংবাদপত্রের কর্মীরা। ঈদের ইতিহাসে এটিই সবচেয়ে দীর্ঘ ছুটি। তবে ধর্মীয় অনুভূতি ও পহেলা বৈশাখকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে সাম্প্রদায়িক দ্বন্দ্ব যেন চড়াও না হতে পারে সে বিষয়ে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। হিংসা, বিদ্বেষ আর রেষারেষিকে পরিহার করে ঈদের শিক্ষা সাম্য, ভ্রাতৃত্ব ও একাত্মবোধের মাধ্যমে আনন্দ উপভোগ এবং পারস্পরিক সাহায্য-সহযোগিতা আমাদের প্রতিদিনের যাপনে সঞ্চারিত হোক।
দেশে গ্রীষ্মকাল চলছে। আর বৈশাখ আসা মানেই তীব্র গরম কিংবা বৃষ্টির শীতলতা, সঙ্গে ঝড়-ঝঞ্ঝা। সবাইকে যাত্রাপথে সচেতন হতে হবে। নদীপথে ভ্রমণের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হবে। নয়তো আনন্দ বিষাদে রূপ নিতে কতক্ষণ! ঈদের আনন্দ অটুট থাকুক এটিই প্রত্যাশা। উৎসবের আনন্দে বৈষম্য ঘুচে যাক, সম্প্রীতির বন্ধন দৃঢ় হোক। সবাইকে ঈদের অগ্রিম শুভেচ্ছা, ঈদ মোবারক।










