প্রথাগত বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো পাঠ কার্যক্রম এ বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা করে না। অধিভুক্ত কলেজগুলোকে প্রশাসনিক সহায়তার মাধ্যমে পাঠদান কার্যক্রম পরিচালিত হয়। আপাতদৃষ্টে সারা দেশে উচ্চ শিক্ষার সুবিধা প্রসারের বড় লক্ষ্য পূরণে এখনো ব্যর্থ বিশ্ববিদ্যালয়টি, বরং উচ্চ শিক্ষায় এটি এক ধরনের হতাশার প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। সংখ্যার দিকে বিশ্বে শীর্ষ অথচ আন্তর্জাতিক র্যাংকিংয়ের কোথাও ঠাঁই না পাওয়া—এমন বৈপরীত্য ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ঝুঁকি। কারণ দেশে উচ্চ শিক্ষায় অধ্যয়নরত ৭০ শতাংশ শিক্ষার্থীর শিক্ষার সুযোগ তৈরি করে দেয়া এ প্রতিষ্ঠান শুধু আনুষ্ঠানিক সনদ দেয়ার কারখানা হয়ে আছে। ফলে জনমিতিক লভ্যাংশ আদায়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাথমিক ভূমিকা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় পূরণ করতে পারছে না।
বর্তমানে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজের সংখ্যা ২ হাজার ২৫৭। বিশ্বের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের এত বেশি অধিভুক্ত কলেজ নেই। শুধু পাকিস্তানের পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত ১ হাজার ৩৮ কলেজ। এছাড়া ভারতের কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৫০ এবং দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে তা ৮৬টি। উচ্চ শিক্ষার বিকেন্দ্রীকরণ, শিক্ষার প্রসার, ব্যবস্থাপনা বিকেন্দ্রীকরণের জন্য বিশ্বের অনেক বিশ্ববিদ্যালয় বিভিন্ন সময় কলেজ অধিভুক্তি করে। খ্যাতনামা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কলেজ অধিভুক্তির সংখ্যা ১০০-১৫০-তে সীমাবদ্ধ রাখে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে বিষয়টি বিপরীত। প্রশাসনিক সক্ষমতার তুলনায় অতিরিক্ত কলেজ অধিভুক্ত করতে গিয়ে তদারকি ব্যবস্থা দুর্বল হয়েছে। তাই প্রত্যেক কলেজে গুণমান নিশ্চিত করা প্রায় অসম্ভব।
বিগত কয়েক দশকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় স্নাতকের সংখ্যা বাড়াতে ব্যাপকভাবে সফল। কিন্তু এ বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকদের সিংহভাগই শিক্ষাকালে কর্মসংস্থানযোগ্য দক্ষতা অর্জন করেননি। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) ২০২৪ সালের গবেষণা অনুযায়ী, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় গ্র্যাজুয়েটদের মধ্যে বেকারত্বের হার ২৮ দশমিক ২৪ শতাংশ, যখন সর্বোচ্চ শিক্ষিত গোষ্ঠীর গড় বেকারত্বের হার মাত্র ১৩ দশমিক ১১ শতাংশ। অধিকাংশ গ্র্যাজুয়েট স্বল্প আয়ের কাজে নিযুক্ত থাকছেন। নারী শিক্ষার্থী ও গ্রামের শিক্ষার্থীদের মধ্যে বেকারত্বের হার আরো বেশি। এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতি বছর কয়েক লাখ আসন ফাঁকা থাকছে এবং কয়েক বছরে সেই সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। এ প্রতিষ্ঠান সংখ্যা বৃদ্ধি করেছে অথচ শিক্ষার্থীর আসন পূর্ণ হচ্ছে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব আইনে অধিভুক্ত কলেজগুলোকে স্নাতক কর্মসূচি পরিচালনার জন্য ন্যূনতম অবকাঠামোর থাকলেও সেই মানদণ্ড সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করা হচ্ছে। অনেক কলেজে শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত ঐতিহ্যবাহী শ্রেণীকক্ষের জন্যও উপযুক্ত নয়, স্নাতক কর্মসূচির জন্য তো অসম্ভব। শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন ও শিখন পদ্ধতিও বাজারে প্রচলিত জনপ্রিয় গাইড ও পূর্ববর্তী পরীক্ষার প্রশ্নের আধুনিক সম্পাদনা মুখস্থের ওপর নির্ভরশীল। এভাবে বিশ্লেষণাত্মক বা ধারণাগত দক্ষতা ছাড়াই তারা স্নাতক হচ্ছেন।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কাঠামোতেও রয়েছে গভীর ত্রুটি। একাডেমিক বিষয়ে পরিচালনা পর্ষদ এবং স্টাডিজ বোর্ডের নেতৃত্ব দিতে হলেও দীর্ঘদিন এ গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা দুটি নিষ্ক্রিয় থেকেছে। একাডেমি-বহির্ভূত কর্মচারীরা অতিরিক্ত ক্ষমতা পেয়েছেন, যা একাডেমিক বিষয়ে তাদের অযথা হস্তক্ষেপের কারণ হয়েছে। এর ফলে শিক্ষার নীতিগত বিষয়গুলো হয়ে উঠেছে প্রশাসনিক জটিলতার শিকার। শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, গবেষণার জন্য উৎসাহ এবং পেশাদার উন্নয়নে কোনো উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়টি কেন প্রতিষ্ঠা হয়েছিল তার সঠিক একাডেমিক মূল্যায়ন না করার কারণে জটিলতা আরো বাড়ছে।
এদিকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নবনিযুক্ত উপাচার্য বিশ্ববিদ্যালয়ের আমূল পরিবর্তনে কিছু আশাব্যঞ্জক কথা বলেছেন। তিনি দক্ষতাভিত্তিক পাঠ্যক্রম প্রণয়ন, মূল্যায়ন পদ্ধতির আধুনিকীকরণ, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া লিংকেজ, ক্যারিয়ার সেন্টার স্থাপন এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার কথা বলছেন। তবে একটি প্রশ্ন আমাদের থামিয়ে দেয়। এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে পর্যাপ্ত বাজেট তারা পাবেন কিনা। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৮০১ কোটি ৪ লাখ ৬০ হাজার টাকা। প্রতিটি কলেজে গড়ে বরাদ্দ মাত্র ৩৫-৪০ লাখ টাকা। এত অল্প বাজেট দিয়ে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, পাঠ্যক্রম উন্নয়ন, প্রযুক্তি অবকাঠামো এবং গবেষণা সুবিধার জন্য বিশেষ বরাদ্দ প্রায় অসম্ভব। আমূল পরিবর্তনের জন্য শিক্ষকদের প্রশিক্ষণে বিনিয়োগ, আধুনিক ল্যাব ও কর্মশালার জন্য অবকাঠামো, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য সমন্বয়ের ব্যয় অনেক দরকার। যেহেতু বরাদ্দ কম তাই বিকল্প উপায়ে অর্থায়নের উৎস খুঁজতে হবে। আবার কলেজের কলেবর বিবেচনায় দুই হাজারের বেশি কলেজে একই মানের সেবা দেয়া অসম্ভব।
যুক্তরাজ্যের প্রতিষ্ঠিত র্যাংকিং সংস্থা কিউএস এবং টাইমস হায়ার এডুকেশন বিশ্বব্যাপী বিশ্ববিদ্যালয়ের র্যাংকিং প্রকাশ করে, যা শিক্ষার মান, গবেষণা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং নিয়োগকর্তাদের মূল্যায়নের ওপর ভিত্তি করে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় এ দুটি র্যাংকিংয়েই এখন পর্যন্ত স্থান পায়নি। সংখ্যার ভারে জর্জরিত এ সমস্যা থেকে নিস্তার পাওয়ার উপায় তবে কী? আংশিক সংস্কারের দিকে না ঝুঁকে বিশ্ববিদ্যালয়ের মান ও শিক্ষার্থীদের দক্ষ করার জন্য সাহসী ও যৌক্তিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বর্তমানে অধিভুক্ত কলেজের মান যাচাইয়ের আগে নতুন কোনো প্রতিষ্ঠানকে অধিভুক্তি দেয়া যাবে না। প্রতিটি কলেজের একাডেমিক অবকাঠামো, শিক্ষকদের যোগ্যতা, পরীক্ষা ব্যবস্থা এবং স্নাতকদের কর্মসংস্থান সক্ষমতা মূল্যায়ন করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। শিক্ষক নিয়োগে আন্তর্জাতিক মানের যোগ্যতা পরীক্ষা করতে হবে। এছাড়া নিয়মিত শিক্ষক প্রশিক্ষণ কর্মসূচি বাধ্যতামূলক এবং গবেষণার জন্য উৎসাহ ও প্রণোদনা বাড়াতে হবে।
সম্প্রতি সারা দেশে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোগে কলেজ শিক্ষকদের দক্ষতা বাড়ানোর একটি কর্মসূচিতে প্রধানমন্ত্রী উপস্থিত ছিলেন। তিনি প্রাথমিকভাবে বিভাগীয় শহরগুলোর বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে স্থানীয় শিল্প ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের কর্মদক্ষতা বাড়ানোর উদ্যোগের কথা বলেন। এ সুযোগ অধিভুক্ত কলেজগুলো নিতে পারে। সেক্ষেত্রে পঠিত প্রতিটি বিষয়ে শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষতাভিত্তিক কোর্স যুক্ত করতে হবে। ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া লিংকেজ প্রতিষ্ঠা ও ইন্টার্নশিপ প্রোগ্রাম বাধ্যতামূলক করতে হবে। মুখস্থ ও বিগত বছরের প্রশ্ন থেকে কমননির্ভর পরীক্ষা ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে প্রশ্ন এমনভাবে করতে হবে যাতে ধারণাগত ও বিশ্লেষণাত্মক দক্ষতা পরীক্ষা করা যায়। অনলাইন পরীক্ষা ও অটোমেটেড ফলাফল প্রক্রিয়াকরণ অনিয়ম কমাতে সাহায্য করতে পারে।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিস্থিতি যতই নাজুক থাকুক না কেন, নেতৃত্ব স্থানীয়রা দায়িত্ব নেয়ার পর এটিকে বিশ্বমানে পৌঁছানোর দাবি করেন। কিন্তু বুঝতে হবে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্দেশ্য কি? উচ্চ শিক্ষার প্রসার নাকি সহজে সনদ বিতরণ? দ্বিতীয়টি হলে সংখ্যার বিস্তারেই তা সম্ভব। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা নিহিত থাকে নতুন জ্ঞান সৃষ্টিতে, বিশ্লেষণাত্মক চিন্তায় এবং সমাজের উন্নয়নে অবদান রাখায়। সেই উদ্দেশ্য ছাড়া শুধু পাঠদান করা প্রতিষ্ঠানের একটি নাম বড় কিছুই নয়।










