দেশের মানুষের প্রধান খাদ্যশস্য চালের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা খুবই জরুরি। কিন্তু দেশের বন্যা এবারের আমন আবাদে ব্যাঘাত ঘটিয়েছে। বন্যায় ফসল তলিয়ে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। পানি নামতে বিলম্ব হওয়ায় কোনো কোনো এলাকায় দেরিতে আবাদ শুরু হয়েছে। এসব কারণে ধানের ফলন গতবারের তুলনায় কম হওয়ার পূর্বাভাস মিলছে। যথাসময়ে সঠিক পদক্ষেপ না নেয়ায় চালের বাজারে এমনতেই অস্থিরতা বিরাজ করছে। প্রায় শুল্কমুক্ত আমদানির অনুমতি দিয়ে এবং খোলাবাজারে বিক্রি বাড়িয়েও সরকার চালের মূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারছে না। ক্রমেই বাড়ছে এর দাম। এখন আমনের ভরা মৌসুমেও পণ্যটির দাম কমছে না। বাজারে বিরাজমান ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতার মধ্যেই দেশে চাল উৎপাদন কমার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। মার্কিন কৃষি বিভাগের (ইউএসডিএ) প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, বন্যার কারণে এবার আমনের ফলন লক্ষ্যের তুলনায় ২৮ লাখ টন কম হতে পারে। সংস্থাটির প্রাক্কলন গভীরভাবে আমলে নিয়ে সরকারকে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে আমদানির মাধ্যমে চালের মজুদ বাড়াতে পদক্ষেপ নিতে হবে।

গত মঙ্গলবার বণিক বার্তায় প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ২০২৩-২৪ অর্থবছরের আমন মৌসুমে ধানের ফলন হয়েছিল ১ কোটি ৬৬ লাখ টনের বেশি। চলতি অর্থবছরে ১ কোটি ৭৮ লাখ টন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই)। আর খাদ্য মন্ত্রণালয়ের খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ ইউনিটের (এফপিএমইউ) হিসাবে ফলনের লক্ষ্য ধরা হয়েছিল ১ কোটি ৬৮ লাখ টন। তবে সাম্প্রতিক দুটি বন্যা এবার আমনের উৎপাদনে ব্যাঘাত ঘটায় ধানের ফলন গতবারের তুলনায় কমে ১ কোটি ৪০ লাখ টনে নেমে আসার আশঙ্কা করছে ইউএসডিএ। সে অনুযায়ী, এফপিএমইউর লক্ষ্যের তুলনায় এবার ২৮ লাখ টন কম ফলন হতে পারে।

প্রধান খাদ্যশস্য চালের পেছনে দরিদ্র মানুষের খাদ্য ব্যয়ের একটি বড় অংশ চলে যায়। চালের দাম এমন সময় বাড়ছে, যখন ভোজ্যতেল, চিনি, সবজি, ডিম, মুরগির মাংসসহ প্রায় সব নিত্যপণ্যের দাম চড়া। আমন চাল উৎপাদনের দ্বিতীয় প্রধান মৌসুম। দেশে এখন আমনের ভরা মৌসুম। ভরা মৌসুমে যেকোনো পণ্যের সরবরাহ বাড়ে এবং দাম কমে। কিন্তু চালের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। আমনের ভরা মৌসুমেও পাইকারিতে চালের দাম বেড়েছে। ১৬ ডিসেম্বরের তথ্য বলছে, চালের দাম বস্তাপ্রতি ২০০-২৫০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। তাতে খুচরা পর্যায়ে সরু চালের দাম কেজিতে ৩-৫ এবং মোটা ও মাঝারি চালের দাম ২-৩ টাকা বেড়েছে। চালের বাজারে স্থিতিশীলতা আনতে প্রায় শুল্কমুক্ত আমদানির অনুমোদন দিয়েছে সরকার। কিন্তু নানা কারণে আমদানিতে ব্যবসায়ীদের তেমন আগ্রহ দেখা যায়নি। ফলে বাজারে তেমন প্রভাব পড়েনি।

দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বন্যায় আমন চাষ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, অনেক জায়গায় বীজতলা নষ্ট হয়েছে। সরকার কৃষি উপকরণসহ প্রয়োজনীয় সহায়তা দিলেও শতভাগ জমিতে আমন ধান লাগানো সম্ভব হয়নি। ফলে আমনের উৎপাদনে বড় বিপর্যয়ের কারণে চাল উৎপাদন কমতে যাচ্ছে। গত বুধবার ভারত থেকে সরকারি উদ্যোগে ২৪ হাজার ৬৯০ টন চাল আমদানি করা হয়েছে। দেশের চাহিদা ও আমনের ফলন কম হওয়ার বিষয়টি মাথায় রেখে চাল আমদানি যথাসময়ে করতে হবে। আগেই সঠিক পদক্ষেপ নেয়া না গেলে আপৎকালীন পরিস্থিতি সামাল দেয়া যেমন কঠিন হবে, বাজার অস্থিতিশীলতা রোধ করাও সম্ভব হবে না। এটি অবশ্যই মাথায় রাখতে হবে।

সরকার আমন ধান ও চাল সংগ্রহ শুরু করেছে ১৭ নভেম্বর থেকে। চলবে ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। আতপ চাল সংগ্রহ করা হবে ১৫ মার্চ পর্যন্ত। এবার ধান সংগ্রহ করা হবে ৩ লাখ ৫০ হাজার টন, সেদ্ধ চাল ৫ লাখ ৫০ হাজার টন ও আতপ চাল এক লাখ টন। মোট সংগ্রহ ১০ লাখ টন। ধানকে চাল হিসেবে বিবেচনায় ধরে মোট চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা হলো ৮ লাখ ৮০ হাজার টন, যা সম্ভাব্য মোট চাল উৎপাদনের প্রায় সাড়ে ৫ শতাংশ। সংগ্রহ মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে প্রতি কেজি ধান ৩৩ টাকা, সেদ্ধ চাল ৪৭ ও আতপ চাল ৪৬ টাকা। কয়েক বছর ধরেই ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা অর্ধেকও অর্জন করা সম্ভব হচ্ছে না। এবার যেহেতু আমনের ফলন কম হয়েছে, তাই সরকারের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করাও কঠিন হবে। চালের বাজারের অস্থিতিশীলতা কমাতে সরকারকে আমদানির মাধ্যমে সরকারি মজুদের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে হবে। ফলন কম হওয়ায় কৃষকরাও চাল মজুদ করবেন। পাশাপাশি আড়তদার ও মিল মালিকরাও চাল মজুদ করবেন। এতে বাজারে কৃত্রিম সরবরাহ সংকট প্রকট হবে। তাই আগের ব্যর্থতা পর্যালোচনা করে লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী সরকারকে আমদানির মাধ্যমে চালের মজুদ বাড়াতে হবে। উল্লেখ করা দরকার যে বাজার নিয়ন্ত্রণ এবং খাদ্যসম্পর্কিত নীতি প্রণয়নে যথাযথ তথ্য-উপাত্ত খুব গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি মজুদের পরিমাণ জানা গেলেও বেসরকারি খাতে চালের মজুদ কত আছে, তার পরিসংখ্যান জানা নেই। এ-সম্পর্কিত তথ্য প্রথমে সংগ্রহ করতে হবে। সঠিক তথ্যের মাধ্যমে ঘাটতি নির্ণয়পূর্বক আমদানি করতে হবে। সরকার শুল্ক কর তুলে নিয়ে প্রায় ১৫ লাখ টন চাল আমদানির অনুমতি দেয়। যদিও এটি দিয়ে মজুদ পরিস্থিতির খুব উন্নতি করা যাবে কিনা এবং বাজারে স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনতে ঠিক কী পরিমাণ চাল আমদানি করা প্রয়োজন, তা নিরূপণ করা জরুরি।

অনেক সময় মজুদ সন্তোষজনক থাকলেও বাজার কারসাজি ঘটে। মূলত বাজারকে অস্থির করে বিপুল মুনাফা হাতিয়ে নেয়ার জন্য এক শ্রেণীর ব্যবসায়ী এমনটি করেন। কাজেই নিয়মিত বাজার নজরদারিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চালের দাম বাড়ার জন্য প্রকৃত দায় কার তা নির্ণয় ও চালের বাজারের অস্থিতিশীলতা দূর করার দায়িত্ব সরকারের। সেজন্য প্রয়োজন সার্বক্ষণিক তদারকি। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও খাদ্য মন্ত্রণালয়ের এক্ষেত্রে বিশেষ সক্রিয়তা দরকার। শুধু মজুদ থাকলে হবে না, বাজারে তার জোগানও নিশ্চিত করতে হবে। বিশ্ববাজার ও স্থানীয় পরিস্থিতি বিবেচনায় আমদানির মাধ্যমে চালের মজুদ বৃদ্ধির পাশাপাশি বাজার অস্থিরতা রোধে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় দ্রুত পদক্ষেপ নেবে, এটিই প্রত্যাশা।