টাইটানিক সিনেমার কথা মনে আছে? বিগত শতাব্দীর বাণিজ্যসফল চলচ্চিত্রের একটি। নির্মাণ ব্যয় ছিল ২০ কোটি ডলার। বক্স অফিসে আয় করেছিল প্রায় ২৩০ কোটি ডলার। প্রাইম ভিডিওতে এ সিনেমা আজও দেখে দর্শক। চলচ্চিত্রটির ভাষা ইংরেজি। তৈরি হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রে। এ সিনেমা জনপ্রিয় হওয়ার পর বিশ্বব্যাপী এর নায়ক-নায়িকার পোশাক ও জুতার কদর তৈরি হয়েছিল। আর বিভিন্ন দেশে টাইটানিক নামে কত শত স্থাপনা তৈরি হয়েছে তার ইয়ত্তা নেই।
হ্যারি পটারের নাম শোনেনি এমন মানুষ কম আছে। গত তিন দশকে এ সিরিজের সাতটি গ্রন্থ দুনিয়াজুড়ে প্রায় ৫২ কোটি ২০ লাখ কপি বিক্রি হয়েছে। তৈরি হয়েছে সিনেমা ও ভিডিও গেম। লেখক জে কে রাউলিং ব্রিটিশ। লন্ডন শহরের কিংস ক্রস স্টেশনের পৌনে ১০ নম্বর প্লাটফর্ম এ কল্পকাহিনীর কারণে বিখ্যাত হয়ে উঠেছে। ক্রমে এটি পর্যটকদের গন্তব্যস্থল হয়ে উঠছে।
এই যে উপন্যাস বা সিনেমা থেকে বাইরের দেশে প্রভাব বিস্তার করা—একে বলে সফট পাওয়ার। সোজা বাংলায় বুদ্ধিবৃত্তিক শক্তি। হার্ড পাওয়ারের (পেশিশক্তি) বিপরীত। পৃথিবীর কোন দেশ কতটা সফট পাওয়ারের অধিকারী তা নির্ণয় করা যায়। এজন্য কিছু মাপকাঠি রয়েছে। কয়েকটি সংস্থা এ নিয়ে কাজও করে। এর মধ্যে যুক্তরাজ্যভিত্তিক বিপণন পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ব্র্যান্ড ফাইন্যান্স সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য। সম্প্রতি এ প্রতিষ্ঠান বৈশ্বিক সফট পাওয়ার সূচক ২০২৪ প্রকাশ করেছে।
সর্বশেষ প্রকাশিত এ সূচকে শীর্ষ দশে রয়েছে যথাক্রমে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, চীন, জাপান, জার্মানি, ফ্রান্স, কানাডা, সুইজারল্যান্ড, ইতালি ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। এ তালিকায় দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে শীর্ষে রয়েছে ভারত, অবস্থান ২৯তম। এরপর রয়েছে পাকিস্তান, অবস্থান ৮১তম। তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ, সামগ্রিকভাবে ১৯৩ দেশের তালিকায় ৯৬তম। গত বছর বাংলাদেশ ছিল ৯৭তম।
ব্র্যান্ড ফাইন্যান্স ১৯৯৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হলেও ২০২০ সাল থেকে বৈশ্বিক সফট পাওয়ার সূচক প্রকাশ করে আসছে। প্রতিষ্ঠানটির চলতি বছরের ইনডেক্স অনুসারে, গত বছরের তুলনায় সবচেয়ে অগ্রগতি হয়েছে চীনের। গত বছরের তুলনায় দেশটি পঞ্চম থেকে চলতি বছর তৃতীয় অবস্থানে উঠে এসেছে। আর পাঁচ বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই), সৌদি আরব, কাতার ও তুরস্কের। সামরিক সংঘাতে জড়িয়ে রাশিয়া, ইউক্রেন ও ইসরায়েলের র্যাংকিংয়ে পতন হয়েছে।
১২টি শর্তের ওপর সফট পাওয়ার সূচক তৈরি করা হয়। এর মধ্যে আটটিকে সফট পাওয়ারের ভিত্তি বলে মনে করা হয়। এগুলো হচ্ছে, ব্যবসা ও বাণিজ্য, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, শিক্ষা ও বিজ্ঞান, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য, শাসন ব্যবস্থা, গণমাধ্যম ও যোগাযোগ, টেকসই ভবিষ্যৎ এবং জনগণ ও মূল্যবোধ। এর সঙ্গে আরো তিনটি বিষয় বিবেচনায় নেয়া হয়েছে। এগুলো হচ্ছে, জনগণের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া (ফ্যামিলিয়ারিটি), রাষ্ট্রের খ্যাতি ও বৈশ্বিক প্রভাব। এছাড়া অলিম্পিক গেমসে কতটি পদক অর্জন করেছে, তাও বিবেচনায় নেয়া হয়।
সূচকটি নতুন হলেও সফট পাওয়ার বা বুদ্ধিবৃত্তিক শক্তির এ ধারণা গত শতাব্দীর। হার্ড পাওয়ার বা পেশিশক্তির বিপরীতে এ ধারণার কথা প্রথম বলেন জোসেফ এস নাই। তিনি মূলত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী। হার্ভার্ড কেনেডি স্কুলের ইমেরিটাস অধ্যাপক ও যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক সহকারী প্রতিরক্ষামন্ত্রী। সংস্কৃতি, মূল্যবোধ ও পররাষ্ট্রনীতির ওপর ভিত্তি করে তিনি ১৯৮০-এর দশকে এ তত্ত্ব প্রবর্তন করেন। এ নিয়ে তার সাড়া জাগানো বই ‘সফট পাওয়ার, দ্য মিনস টু সাকসেস ইন ওয়ার্ল্ড পলিটিকস’।
বৈশ্বিক সফট পাওয়ার সূচক ২০২৪ অনুযায়ী, মোট ১০০ নম্বরের মধ্যে বাংলাদেশের স্কোর ৩৪ দশমিক ৬, আগের বছর ছিল ৩৫ দশমিক ১। চলতি বছর বাংলাদেশের ব্র্যান্ড ভ্যালু ৫২৯ মিলিয়ন ডলার, গত বছর ছিল ৫০৭ মিলিয়ন ডলার। ১২টি ক্ষেত্রের মধ্যে বাংলাদেশ ফ্যামিলিয়ারিটিতে ৪ দশমিক ৮, প্রভাবে ৩ দশমিক ৫, খ্যাতিতে ৫ দশমিক ২, ব্যবসা-বাণিজ্যে ৩ দশমিক ২, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যে ২ দশমিক ৭, শাসন ব্যবস্থায় ২ দশমিক ৩, আন্তর্জাতিক সম্পর্কে ৩, গণামাধ্যম ও যোগাযোগে ২ দশমিক ৭, জনগণ ও মূল্যবোধে ৩ দশমিক ১, শিক্ষা ও বিজ্ঞানে ২ দশমিক ৩, টেকসই ভবিষ্যতে ২ দশমিক ৭ এবং পদকে শূন্য।
১৯৩টি দেশের ৫৪টি ভাষায় ১ লাখ ৭০ হাজার মানুষের মতামত নিয়ে এবারের সূচক তৈরি করা হয়েছে। ১২টি শর্ত অনুসারে সূচকে এবারই প্রথম পাঁচটি ক্যাটাগরিতে ‘গ্লোবাল সফট পাওয়ার অ্যাওয়ার্ডস’ দেয়া হয়েছে। কাজের জন্য এবং বিনিয়োগের জন্য সেরা দেশ হয়েছে সুইজারল্যান্ড। লেখাপড়ার জন্য সেরা দেশ হয়েছে যুক্তরাজ্য। ভ্রমণের জন্য সেরা দেশ হয়েছে ইতালি। পণ্য ক্রয় ও সেবা গ্রহণে সেরা হয়েছে জার্মানি।
দশের মধ্যে বাংলাদেশ ৩-এরও কম পেয়েছে সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য (২ দশমিক ৭), শাসন ব্যবস্থা (২ দশমিক ৩), গণামাধ্যম ও যোগাযোগ (২ দশমিক ৭), শিক্ষা ও বিজ্ঞান (২ দশমিক ৩), টেকসই ভবিষ্যৎ (২ দশমিক ৭) এবং পদকে (শূন্য)।
সংস্কৃতি যখন কোনো দেশে ব্যবসায়িক প্রভাবের সহযোগী হয়ে ওঠে, সে দেশে সফট পাওয়ার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ক্রমে এসব দেশ ব্যবসায় এগিয়ে যায় এবং বিদেশী বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে পারে। বৈশ্বিক সফট পাওয়ার সূচকে যেসব দেশ ভালো অবস্থানে রয়েছে, সেসব দেশে প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগ বেশি। এরাই আবার সবচেয়ে শক্তিশালী অর্থনীতির দেশ।
প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগ (এফডিআই) বিশেষজ্ঞ কোর্টনি ফিংগার বলেন, ‘ব্যবসা ও বিনিয়োগের সঙ্গে সফট পাওয়ারের সম্পর্ক রয়েছে। কারণ সফট পাওয়ার নির্ভর করে বৈশ্বিক ক্ষেত্রে খ্যাতি প্রতিষ্ঠা ও আস্থা তৈরির ওপর। কোনো দেশের শক্তিশালী ও ইতিবাচক ভাবমূর্তি অধিক পরিমাণে বিদেশী অংশীদার, বিনিয়োগকারী ও ভোক্তা আকর্ষণ করতে পারে। সাংস্কৃতিক আকর্ষণ, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও দায়িত্বশীল বৈশ্বিক নেতৃত্ব আস্থা তৈরিতে অবদান রাখে। এসব অনুষঙ্গ বিনিয়োগকারীদের পুঁজির সম্ভাব্য গতিপথ নির্ধারণের ক্ষেত্রে প্রভাবক হিসেবে কাজ করে।’
বিষয়টিকে আরো সহজ করে বোঝানোর জন্য উদাহরণ দেয়া যায়। একটি দেশের সফট পাওয়ার কোনো কোনো ক্ষেত্রে বৈশ্বিক ভোক্তা চাহিদায় প্রভাব বিস্তার করতে পারে। একটি দেশের সাংস্কৃতিক কোনো পণ্য (চলচ্চিত্র, সংগীত বা সাহিত্য) যদি আন্তর্জাতিকভাবে শক্তিশালী আবেদন তৈরি করে, তাহলে বিদেশের মানুষ ওই দেশের জনগণ ও উৎপাদিত পণ্যের প্রতি কৌতূহলী হয়ে ওঠে। এভাবে সাংস্কৃতিক প্রভাব বিদেশের মার্কেটে ব্যবসা-বাণিজ্যকে সহজ করে দেয়, যা তাৎক্ষণিকভাবে বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণ করে। কারণ রফতানি হওয়া সাংস্কৃতিক পণ্য সবচেয়ে দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও আইনের শাসন সফট পাওয়ারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। যে দেশ বিশ্বব্যাপী উদ্যোগে জড়িত, মানবাধিকার সমুন্নত রাখে এবং দায়িত্বশীল নেতৃত্ব দেখাতে পারে, এমন দেশই দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ পায়। এসব দেশ প্রায়ই আরো স্থিতিশীল ও আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। কেবল উন্নয়ন দিয়ে উন্নত দেশ হওয়া যাবে না। সেজন্য সবার আগে প্রয়োজন শক্তিশালী সফট পাওয়ার।
হানযালা হান: জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক, বণিক বার্তা










