বিশ্ব অর্থনীতি একটি ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। সরকারের সার্বিক কর্মকাণ্ডে কৃচ্ছ্রসাধন করেও অর্থনৈতিক অস্থিরতা কাটানো যাচ্ছে না। বার্ষিক বাজেট প্রণয়ন সরকারের একটি চলমান প্রক্রিয়া। তার অংশ হিসেবে চলতি মাসে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৭ লাখ ৬১ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করেছেন। বার্ষিক বাজেট প্রণয়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের বিশেষায়িত জনবল প্রায় সারা বছরই কাজ করে। বাজেট প্রণয়নকালে সরকারের নীতিনির্ধারণী মহল ক্ষমতাসীন দলীয় সরকারের দীর্ঘমেয়াদি ভিশন, উন্নয়ন অগ্রাধিকার ও নীতি-কৌশল আমলে নিয়ে সার্বিক দিকনির্দেশনা প্রদান করে। দেশের জিডিপির ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি বজায় রাখা এবং জনগণের জীবনমানের গুণগত উন্নয়নে শিক্ষা, কৃষি, শিল্প ও সেবা খাতসহ সব কাজের সমন্বিত উন্নয়নের নিমিত্তে সুষম বরাদ্দ প্রদানের লক্ষ্য নিয়ে বাজেট কমিটি কাজ করে। এ দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক নারী। নারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া টেকসই উন্নয়ন যেমন অসম্ভব, তেমনি নেতৃত্বে নারীর কার্যকর অংশগ্রহণ ছাড়া জেন্ডার সমতা ও সুশাসন নিশ্চিত করাও সম্ভব নয়। দেশের নারী উন্নয়নসংক্রান্ত কার্যক্রম ও অগ্রাধিকার দিয়ে আগামী অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত বাজেটে নারী-পুরুষের মধ্যকার বৈষম্য কমিয়ে সমতা আনতে এবং নারীর সার্বিক অবস্থান উন্নত করার লক্ষ্যে এবারের প্রস্তাবিত বাজেটের মাঝে জেন্ডার বাজেটের আকার বাড়ানো হয়েছে। মূলত বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নারীরা পুরুষের তুলনায় পিছিয়ে থাকার কারণে নারী উন্নয়ন, নারীর ক্ষমতায়ন ও নারীর কর্মসংস্থানের মতো বিষয়গুলো এবারের বাজেটে প্রাধান্য পেয়েছে। এবার প্রস্তাবিত মোট বাজেটে জেন্ডার বরাদ্দের সম্পৃক্ততা ৩৪ শতাংশ, কিন্তু বিশ্লেষকরা নারী-পুরুষের মধ্যে সমতা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বাজেটের বাস্তবায়নে যথাযথ পদক্ষেপের অভাব চিহ্নিত করেছেন, যার ফলে ২০৪১ সালে দেশের সর্বক্ষেত্রে নারী-পুরুষের মধ্যে সমতা অর্জনের লক্ষ্য বাধার সম্মুখীন হবে বলে তারা আশঙ্কা করছেন।
টেকসই আগামীর পূর্বশর্ত লিঙ্গ সমতা। টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট-৫-এ নারীদের সমঅধিকার এবং নারী ও কন্যাশিশুদের ক্ষমতায়নে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। তাই সব পর্যায়ে নারীর সক্রিয় অংশগ্রহণ, নেতৃত্ব এবং সমঅধিকার ও ক্ষমতায়ন নিশ্চিত না হলে টেকসই উন্নয়ন অর্জন অসম্ভব। মূলত এ লক্ষ্য অর্জনে ২০০৯-১০ অর্থবছরে প্রথমবারের মতো চালু হয়েছিল জেন্ডার বাজেট। সেই বাজেটের পরিমাণ ছিল ২৭ হাজার ২৪৮ কোটি টাকা। তখন মাত্র চারটি মন্ত্রণালয়কে অন্তর্ভুক্ত করে বরাদ্দ করা হয়েছিল। মন্ত্রণালয় ও দেশের বিভাগগুলোয় জেন্ডারসংশ্লিষ্ট বাজেটে বরাদ্দের পাশাপাশি দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটেও জেন্ডার বৈষম্য দূরীকরণে সামগ্রিক নীতি-কৌশলে নারীর অগ্রাধিকারের বিষয়টি প্রতিফলিত হয়ে থাকে এই জেন্ডার বাজেটে। বর্তমানে ৪০টি মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে জেন্ডার বাজেটের বরাদ্দ করা হয়। বণিক বার্তার প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের (২০২২-২৩) প্রস্তাবিত মোট বাজেটে জেন্ডার সম্পৃক্ত বরাদ্দ ছিল ২ লাখ ২৯ হাজার ৬৭৭ কোটি টাকা। টাকার এ অংকে নারী উন্নয়নে বরাদ্দ হিসেবে দেখানো হয়েছে। বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে ৩২ হাজার ১১০ কোটি টাকা। ২০২৩-২৪ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত বাজেটে জেন্ডার সম্পৃক্ত বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২ লাখ ৬১ হাজার ৭৮৭ কোটি টাকা। ১ জুন আগামী অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাব উত্থাপনের সময় সহায়ক প্রকাশনা হিসেবে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ থেকে যে ‘জেন্ডার বাজেট প্রতিবেদন ২০২৩-২৪’ প্রকাশ করা হয় সেখানেই বিষয়টি উঠে এসেছে। সে প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে মোট বাজেটের ৩৪ দশমিক ৩৭ শতাংশ নারী উন্নয়নে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে, যা মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির ৫ দশমিক ২৩ শতাংশ। বর্তমানে নারী উন্নয়ন ও জেন্ডার বৈষম্য দূরীকরণে সরকারের ৪৪টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোর অনুকূলে এ বরাদ্দ দেয়া হয়। এদিকে আগের অর্থবছরে বাজেট প্রস্তাবে দেখা যায়, সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগকে তিনটি থিমেটিক এরিয়ায় বিভক্ত করা হয়েছিল। বরাদ্দের দিক দিয়ে তিনটি থিমেটিক এরিয়ার মধ্যে জেন্ডার বাজেটের সর্বোচ্চ বরাদ্দ পেয়েছিল ‘সরকারি সেবাপ্রাপ্তিতে নারীর সুযোগ বৃদ্ধি’ শীর্ষক থিমেটিক এরিয়া। তবে এ অংশে মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সংখ্যাও সবচেয়ে বেশি ছিল। বরাদ্দের দিক থেকে এর পরই এসেছে ‘নারীর ক্ষমতায়ন ও সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি’ আর ‘উৎপাদন, শ্রমবাজার ও আয়বর্ধক কাজে নারীর অধিকতর অংশগ্রহণ’ সংক্রান্ত থিমেটিক এরিয়াটি।
জেন্ডার সমতার ক্ষেত্রে বিশ্ব বেশ এগিয়েছে, কিন্তু বিশ্বব্যাপী নারীরা এখনো অহরহ যেসব আইন ও বিধিনিষেধের মুখোমুখি হচ্ছেন, সেটি তাদের অর্থনৈতিক সুযোগ কমিয়ে আনছে বলে মনে করছে বিশ্বব্যাংক। বিশেষ করে কর্মক্ষেত্রে নারীদের নিম্ন পারিশ্রমিক ও পারিবারিক দিকনির্দেশনার ঘাটতিকে জেন্ডার সমতার অন্যতম প্রতিবন্ধকতা হিসেবে দায়ী করছে সংস্থাটি তাদের প্রতিবেদনে। একজন নারীর অর্থনৈতিক মুক্তি তাকে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় শক্তিশালী নাগরিক হিসেবে মাথা তুলে দাঁড়াতে অন্যতম ভূমিকা পালন করে। মূলত জেন্ডার বাজেট কিন্তু নারীর জন্য আলাদা কোনো বাজেট নয়, বরং এটি একটি পদ্ধতি, যার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় হিসাব-নিকাশের সাহায্যে জাতীয় বাজেটের জেন্ডার-সংবেদনশীলতা বিশ্লেষণ করা যায়। জেন্ডার বাজেটের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে, সরকারের বিভিন্ন প্রকল্পের জেন্ডার সংবেদনশীলতা চিহ্নিত করে বাজেটে সম্পদের যথাযথ বণ্টনের মাধ্যমে নারী-পুরুষের সমতা বাড়ানো বা অসমতা কমানো। মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়সহ ৪০টি মন্ত্রণালয়ের বাজেটে জেন্ডার বাজেট দেয়া হয়ে থাকে। কিন্তু কারো জানা নেই বাজেটের এ বরাদ্দটা কোন খাতে কতটুকু ব্যয় করা হয়? বাজেটের বরাদ্দ কি কেবল উন্নয়ন-কর্মশালা পর্যন্ত সীমাবদ্ধ, নাকি এটি নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা, বাল্যবিবাহ রোধের ক্ষেত্রেও সমান বরাদ্দ রেখেছে? এক্ষেত্রে স্বচ্ছতা তুলে ধরা জরুরি। আমাদের তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত প্রতিটি খাতে যখন জেন্ডার বাজেটের সমবণ্টন, বরাদ্দ থাকবে, তখন নারীর প্রতি সহিংসতা, বাল্যবিবাহসহ অন্যান্য জেন্ডারভিত্তিক সমস্যা অনেকাংশে কমে যাবে। যেমন আইনের আশ্রয়প্রার্থী নারীর খরচ, বাল্যবিবাহ বন্ধে কিশোরীর পড়াশোনার ব্যয় বহনের মাধ্যমে জেন্ডার বাজেটের উপযুক্ত ব্যবহার একটি ক্ষেত্র হিসেবে আমরা ব্যবহার করতে পারি। আবার সন্তান লালন-পালনে সহায়তা দেয়ার মাধ্যমে আমরা দেশের শিক্ষিত নারীদের কর্মক্ষেত্র থেকে ঝরে পড়া কমাতে পারি।
আমাদের সংবিধান নারীর অধিকারের প্রতি এক অসাধারণ স্বীকৃতি। সাংবিধানিকভাবে নারী-পুরুষে বৈষম্য করার কোনো সুযোগ নেই। বাংলাদেশের সংবিধানের ১৯নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘জাতীয় জীবনের সর্বস্তরে মহিলাদের অংশগ্রহণ ও সুযোগের সমতা রাষ্ট্র নিশ্চিত করবে।’ এছাড়া সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আইনের দৃষ্টিতে সমতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে আর সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকার এবং সংবিধানের ৪০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী যোগ্যতার ভিত্তিতে পেশা বাছাইয়ের অধিকার নারী-পুরুষ উভয়ের রয়েছে। আর সংবিধানের ৬৫(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী জাতীয় সংসদে ৫০টি আসন নারীদের জন্য সংরক্ষিত করা হয়েছে। প্রকৃত অর্থে বাংলাদেশের সংবিধানের প্রতি পূর্ণরূপে বিশ্বস্ত থাকলে নারীর প্রতি কোনো রকম বৈষম্য থাকার বা বৈষম্যমূলক আচরণের সুযোগ নেই। শুধু সংবিধান নয়, নারীর পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র সর্বক্ষেত্রে সুরক্ষায় বিভিন্ন সময়ে তৈরি করা হয়েছে আইন ও বিভিন্ন নীতি। এ নীতিমালা বাস্তবায়নে অনেক ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা থাকলেও নারীর অধিকার রক্ষা ও নির্যাতন রোধে আইনগুলো বেশ কঠোরভাবেই প্রয়োগ হওয়ার কারণে কিছু ইতিবাচক ফল দেখেছি আমরা। যে কারণে আজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্রে নারীর প্রতি বৈষম্য এবং পারিবারিকভাবে নারী নির্যাতন বা যৌতুকের মতো অপরাধের ক্ষেত্রে যথেষ্ট প্রতিকার পাচ্ছেন নারীরা।
মনে রাখা দরকার দেশের মোট জনসংখ্যার ৫০ শতাংশ নারী। নারীর সক্রিয় পদচারণায় মুখর কৃষি, শিক্ষা, সংস্কৃতি, ক্রীড়া, রাজনীতি, ব্যবসাসহ সব শ্রেণী-পেশা। তাই নারীর উন্নয়ন কেবল তাদের একার নয়; একই সঙ্গে সমাজ ও দেশেরও, তারা এ উন্নয়নের অংশীদার। সাম্প্রতিক বাংলাদেশের অগ্রগতিতে নারীর রয়েছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবদান। সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক মুক্তি, নারীর ক্ষমতায়ন তৈরি করতে হলে কেবল সামাজিক নিরপত্তা বেষ্টনী প্রকল্প কিংবা ক্ষুদ্র ঋণভিত্তিক কর্মসূচিতে নারীর উন্নয়ন সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না, বরং বৃহত্তর পরিসরে নারী সমাজের ক্ষমতায়ন ও জাতীয় উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে নারীর অংশগ্রহণ সহায়ক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। জাতীয় বাজেটে জেন্ডার বাজেট প্রতিবেদনে সংখ্যাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে বরাদ্দ দেখানোর পাশাপাশি সেই বরাদ্দকৃত বাজেট আসলে নারীর কোন কোন কৌশলগত জেন্ডার চাহিদা পূরণ করছে এবং তার অগ্রগতি কতটুকু হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত বিশ্লেষণ করতে হবে। জেন্ডার বাজেটে অস্পষ্টতা এর সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে দেখা দিয়েছে। নারীদের উন্নয়ন ও ক্ষমতায়নকে কার্যকর রূপে সফল করে লিঙ্গসমতা অর্জন করতে চাইলে, আমাদের জেন্ডার বাজেটকে মূলধারায় নিয়ে এসে বিভিন্ন প্রকল্প নিয়ে কাজ করতে হবে। পাশাপাশি যেসব খাতে নারীর অংশগ্রহণ পিছিয়ে, তা নিয়েও কাজ করতে হবে। আর জেন্ডার বাজেটের ফলে আগে কতটুকু সমতা অর্জিত হয়েছে তার স্পষ্ট মূল্যায়ন প্রয়োজন। তবেই বোঝা যাবে জেন্ডার বাজেট কতটুকু কার্যকর হচ্ছে ও ভবিষ্যতের জন্য আমাদের আর কী করতে হবে। এভাবে বিভিন্ন খাতে লিঙ্গসমতা অর্জনের মধ্য দিয়ে আমাদের সামগ্রিকভাবে সমতা অর্জন সম্ভব হবে।










