গত বছর আমি উল্লেখ করেছিলাম, স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নয়নে রাজনৈতিক অঙ্গীকার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আমরা যত আলোচনা-পর্যালোচনা করি না কেন, যত বড় পরিসরে সভা-সেমিনার আয়োজন করি না কেন, ব্যবসায়ী কিংবা পেশাজীবী বলুন, রাজনৈতিক অঙ্গীকার ছাড়া স্বাস্থ্য ব্যবস্থার প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব নয়।

আজকের এ অনুষ্ঠান সফল, কারণ অনুষ্ঠানে একটি রাজনৈতিক অঙ্গীকার পেয়েছি। আমাদের রাজনৈতিক নেতাদের কাছ থেকে বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দ রাখার প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে। বর্তমানে এ খাতে বরাদ্দ জিডিপির ১ শতাংশের কাছাকাছি। সুতরাং রাজনৈতিক নেতাদের কাছ থেকে আসা এ প্রতিশ্রুতি নিঃসন্দেহে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এবং আমি এজন্য আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।

আমার আলোচনার বিষয় ছিল—সুপার স্পেশালিটি সার্ভিস, উচ্চতর মেডিকেল শিক্ষা এবং আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা। সংক্ষেপে বলতে গেলে, সুপার স্পেশালিটি সার্ভিস দিতে গিয়ে শিক্ষা কার্যক্রম অনেকাংশেই পিছিয়ে পড়ছে। চিকিৎসাসেবার চাপে মানসম্মত শিক্ষা ও গবেষণার গুণগত মান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অথচ যদি একটি কার্যকর রেফারেল সিস্টেম থাকত, তাহলে এ ভারসাম্যহীনতা অনেকটাই দূর করা যেত।

পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন মেডিকেল এডুকেশন কী অবস্থায় আছে তা নিয়ে আমরা একটি জরিপ করেছিলাম। সেখানে দুই হাজার শিক্ষার্থীর মধ্যে ৮১ শতাংশই বলেছে, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ শিক্ষা কার্যক্রমকে ব্যাহত করছে। শুধু শিক্ষার্থী নয়, শিক্ষকরাও একই কথা বলেছেন। সেবার অতিরিক্ত চাপের কারণে আমাদের একাডেমিক কর্মকাণ্ড বর্তমানে ক্রমে দুর্বল হয়ে পড়ছে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ আমাদের উচ্চতর শিক্ষা এবং উচ্চতর সেবায় গুরুতর প্রভাব ফেলছে।

আমাদের পেশা ও শিল্প খাতের মধ্যে একটি অস্বাস্থ্যকর সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। দুঃখজনক হলেও সত্য, সেটি দিন দিন আরো বাড়ছে। এ বাস্তবতা অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। তাই আমি বলতে চাই, এটি নিয়ে এখন আর নীরব থাকার সময় নেই। আমাদের অবশ্যই এ সমস্যার সমাধান করতে হবে, কারণ সংশোধন এখন একান্তই প্রয়োজন।

সবচেয়ে আতঙ্কজনক দিক হচ্ছে—এ অস্বাস্থ্যকর সম্পর্ক ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। আমরা যদি এখনই এর সমাধান না করি, তবে এর চাপ সরাসরি গিয়ে পড়বে আমাদের রোগীদের ওপর। আর রোগীদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

একটি ছোট উদাহরণ দিই। হেপাটাইটিস-সি ভাইরাসের ওষুধ একসময় আমাদের দেশে পৃথিবীর সর্বনিম্ন দামে পাওয়া যেত। ২০১৮ সালে অস্ট্রেলিয়া ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) যৌথভাবে আয়োজিত একটি কর্মসূচিতে আমি অংশ নিয়েছিলাম। সেখানে তারা দাবি করছিলেন যে আমাদের প্রতিবেশী দেশেই এ ওষুধের দাম সবচেয়ে কম। তখন আমি উঠে দাঁড়িয়ে বলেছিলাম—না, বাংলাদেশের দামই সবচেয়ে কম।

সে সময় ডব্লিউএইচওর এক প্রতিনিধি অবাক হয়ে বলেছিলেন, এখানে যে বাংলাদেশের প্রতিনিধি উপস্থিত আছেন তা তিনি জানতেন না। যদি জানতেন, তবে নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের নামই উল্লেখ করতেন।

তবে আজকে দাবি করতে পারছি না, হেপাটাইটিস-সি ভাইরাসের ওষুধ বাংলাদেশে সবচেয়ে কম দাম। এটাই আমাদের জন্য উদ্বেগজনক বাস্তবতা।

অতএব চিকিৎসা পেশার নৈতিক অবস্থান পুনর্মূল্যায়ন ও সংশোধন করা এখন সময়ের দাবি। চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী ও সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীদের জন্য এ নৈতিক অবস্থান দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। তা হোক কারিকুলামের মাধ্যমে, হোক নিয়ম-কানুনের মাধ্যমে কিংবা প্রশাসনিক পদক্ষেপের মাধ্যমে—কোনো না কোনোভাবে এ নিয়ন্ত্রণ অবশ্যই প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

অধ্যাপক ডা. মো. শাহিনুল আলম: উপাচার্য, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়

[বণিক বার্তা আয়োজিত প্রথম ‘বাংলাদেশ হেলথ কনক্লেভ ২০২৫’-এ প্যানেল আলোচকের বক্তৃতায়]