বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সাম্প্রতিক প্রতিবেদন বলছে, ক্ষুদ্র কৃষকরা উৎপাদন খরচ, বাজারঝুঁকি ও জলবায়ুজনিত ক্ষতির কারণে পর্যাপ্ত আয় করতে পারছেন না। ক্ষুদ্র কৃষকদের মোট আয়ের বড় অংশই আসে গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগি পালন করে। ধান, সবজি ও অন্যান্য অস্থায়ী ফসল থেকে আয় আসে তুলনামূলক কম। অর্থাৎ জমিতে ফসল ফলানো অনেক ক্ষুদ্র কৃষকের জন্য লাভজনক ব্যবসা হতে পারেনি। আধুনিক কৃষিপ্রযুক্তি, সরকারি নীতি সহায়তা ও প্রণোদনার পাশাপাশি প্রশিক্ষণ কর্মসূচি রয়েছে। তার পরও ক্ষুদ্র কৃষকরা কেন লাভবান হতে পারছেন না? এর প্রধান কারণ হতে পারে, এখনো ক্ষুদ্র কৃষকের উৎপাদনকে অনানুষ্ঠানিক হিসাবের আওতায় রাখা হচ্ছে। ফলে মধ্যস্বত্বভোগী ও দালালরা তাদের ফসল সংগ্রহ করে লাভবান হচ্ছে। ক্ষুদ্র কৃষককে টেকসই উদ্যোক্তায় রূপান্তর করতে না পারলে কৃষি খাতের উৎপাদনশীলতা নানাভাবে ঝুঁকির মধ্যে পড়বে।

ক্ষুদ্র কৃষকদের কম আয়ের সমস্যাটি কাঠামোগত। ক্ষুদ্র ও খণ্ডিত জমিতে কৃষক প্রয়োজনীয় পরিমাণ পণ্য উৎপাদন করতে পারেন না। অল্প শস্য থাকায় বড় ক্রেতা, প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠান বা রফতানিকারকদের সঙ্গে তারা দরকষাকষির ক্ষমতা রাখেন না, বরং একেক কৃষকের পণ্য একেক সময়, ভিন্ন মানে ও অল্প পরিমাণে বাজারে পাওয়া যায়। এ ধরনের বিচ্ছিন্ন উৎপাদন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য নির্ভরযোগ্য কাঁচামাল সরবরাহের কাজটি অনেক কঠিন করে ফেলে। আবার ক্ষুদ্র কৃষকের ফসল সংরক্ষণে সীমাবদ্ধতা আছে। তাই তারা ফসল কাটার পর দ্রুত বিক্রি করতে বাধ্য হন। বাজারদর ওঠার জন্য অপেক্ষা করার সুযোগ তাদের সীমিত। আর পচনশীল পণ্য হলে ঝুঁকি আরো বেশি থাকে। বলা যেতে পারে, ক্ষুদ্র কৃষকের কম আয়ের পেছনে মধ্যস্বত্বভোগীদের উপস্থিতি প্রধান সমস্যা নয়। কৃষক ও ভোক্তার মধ্যে বাজার ব্যবস্থা স্বচ্ছ, প্রতিযোগিতামূলক ও জবাবদিহিমূলক না হওয়াই বড় সমস্যা।

কৃষি শিল্পায়ন না হওয়ার অন্যতম কারণ হলো, কৃষিকে এখনো কেবল উৎপাদন হিসেবে দেখা হয়। এ অর্থনৈতিক কার্যক্রমকে পূর্ণাঙ্গ মূল্যশৃঙ্খল ভাবা হয় না। ফসলের উন্নত বীজ, উৎপাদন, ফসল সংগ্রহ, বাছাই, মান নির্ধারণ, সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাত, প্যাকেজিং, বিপণন ও রফতানি—প্রত্যেকটি ধাপের মধ্যে সমন্বয় হচ্ছে না। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক এ সমন্বয়হীনতার কয়েকটি স্থায়ী সমস্যা চিহ্নিত করেছে। ক্ষুদ্র কৃষকের জমি স্বল্পতার কারণে কম উৎপাদনশীলতা, সীমিত মূল্য সংযোজন, দুর্বল বাজার সংযোগ ও খাদ্যনিরাপত্তার ঘাটতির পাশাপাশি নীতির বিচ্ছিন্নতাও বড় বাধা হয়ে আছে। আবার অনুপস্থিত ভূস্বামীর কারণেও অনেক আবাদি জমিতে চাষ হয় না। জমি হারানোর ভয়ে অনেকে বর্গা দিতেও ভয় পান। এ জটিলতা এড়াতে দ্বিতীয় প্রজন্মের ভূমি সংস্কারের কথা ভাবতে হবে। ভূমি ব্যবহার, চুক্তিভিত্তিক সুরক্ষা এবং কাঠামোগত একত্রীকরণের ওপর ভিত্তি করে সংস্কারের রূপরেখা প্রণয়ন করতে হবে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের লক্ষ্য উৎপাদন বাড়ানো। প্রক্রিয়াজাতের বিষয়টি শিল্প মন্ত্রণালয়ের মনোযোগ পায়। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বাজার ও রফতানি নিয়েই কাজ করে। অর্থ মন্ত্রণালয় বরাদ্দ ঠিক করে। এটি সমস্যার কারণ কৃষি উদ্যোক্তারা এসব সেবা এক জায়গায় পান না। ঋণ পাওয়ার জন্য জামানত লাগে, কৃষি পরামর্শ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই উৎপাদনকেন্দ্রিক। ক্ষুদ্র কৃষক অদক্ষ না হলেও অর্থের অভাবে আধুনিক প্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণের পূর্ণাঙ্গ প্রয়োগ করতে পারেন না।

কৃষি উৎপাদনে ব্যয় বাড়ার অন্যতম বড় কারণ উপকরণ ও প্রক্রিয়াজাতের ধাপ আমদানিনির্ভর। কীটনাশক, কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে জটিলতা, অনুমোদন প্রক্রিয়া ও বাজারে বড় আমদানিকারকদের প্রভাব দেশীয় উৎপাদনকে বাধাগ্রস্ত করছে। কৃষি শিল্পায়ন করতে হলে ক্ষুদ্র কৃষককে শুধু কারখানার কাঁচামাল সরবরাহকারী বানিয়ে রাখলে হবে না। দেশের কৃষির বাস্তবতায় ক্ষুদ্র কৃষকদের উচ্ছেদ করে কৃষি শিল্পায়ন গ্রামীণ বৈষম্যই বাড়াবে। এজন্য ভূমি সংস্কারের পাশাপাশি কৃষি উৎপাদন সংস্থা তৈরির কথা ভাবতে হবে। এক্ষেত্রে ভারত, মিশর, ভিয়েতনাম ও চীনের মডেল অনুসরণ করা যেতে পারে। বড় করপোরেট খামারকে ক্ষুদ্র কৃষকদের নিরাপত্তার সমাধান ভাবাটা বিপজ্জনক নানা কারণে, বরং ক্ষুদ্র কৃষকদের সমবায়, উৎপাদক সংগঠন বা কৃষকভিত্তিক কোম্পানির মাধ্যমে তাদের একত্র করতে হবে। কৃষিজোত তৈরি হলে ক্ষুদ্র কৃষকরা যৌথভাবে যন্ত্র, বীজ, সার ও সেচ সুবিধা নিতে পারবেন। তখন উৎপাদনও বাড়বে আর কৃষক বড় ক্রেতার কাছে মানসম্মত ও পর্যাপ্ত পরিমাণ পণ্য সরবরাহ করতে পারবেন। এককভাবে চাপ কৃষকের ওপর পড়বে না। খাদ্য প্রক্রিয়াজাতের সুবিধা দিয়ে ক্ষুদ্র কৃষকের উন্নয়ন হবে না। উন্নত মানের বীজ, কৃষিযন্ত্র, জৈব সার, নিরাপদ কীটনাশক, প্যাকেজিং ও হিমাগারের দেশীয় সক্ষমতা গড়তে হবে।

কৃষককে সহযোগিতা করতে সরকার কৃষক কার্ডের মতো ইতিবাচক পদক্ষেপ নিয়েছে। তবে এর সুবিধা এখনো পরীক্ষামূলক ও সীমিত। এক্ষেত্রে কৃষক কার্ডের পূর্ণাঙ্গ সুফল পেতে সরকার কৃষি সমবায় ও সংগঠনগুলোকে কাগুজে নয়, বাস্তব রূপ দিতে পারে। এর সঙ্গে সহজ শর্তে কৃষি ঋণ, ফসল বীমা, ডিজিটাল বাজার তথ্য, গুদাম রসিদভিত্তিক অর্থায়ন এবং স্থানীয় সংগ্রহ কেন্দ্র স্থাপন জরুরি। কৃষক যাতে বাধ্য হয়ে ফসল কাটার সঙ্গে সঙ্গে বিক্রি না করেন, সেজন্য উপজেলা পর্যায়ে সংরক্ষণ ও প্রাথমিক প্রক্রিয়াজাত অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে কৃষি সম্প্রসারণ সেবাকে ধানকেন্দ্রিক মনোভাব থেকে বের করে ফল, সবজি, মাছ, দুগ্ধ, মাংস ও পোলট্রির মূল্যশৃঙ্খলের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। ডিজিটাল ফার্মিং ম্যানেজমেন্টের দিকেও এগোতে হবে। এক্ষেত্রে দেশের কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও অন্যান্য গবেষণাপ্রতিষ্ঠানকে যুক্ত করা যেতে পারে।

কৃষি শিল্পায়নের অর্থ কৃষককে কারখানার কাঁচামাল সরবরাহকারীতে পরিণত করা নয়; তাকে মূল্যশৃঙ্খলের ন্যায্য অংশীদার করা। কৃষকের হাতে যদি উৎপাদন, বাজার ও দরকষাকষির ক্ষমতা না থাকে, তাহলে কৃষিভিত্তিক শিল্পের প্রবৃদ্ধি তার আয় বাড়াবে না। নীতির কেন্দ্রে রাখতে হবে ক্ষুদ্র কৃষকের আয়, ঝুঁকি কমানো ও বাজারক্ষমতা। কৃষিকে সত্যিকার শিল্পে রূপ দিতে হলে প্রথমে কৃষককে টেকসই উদ্যোক্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে—এটাই এখন বাংলাদেশের কৃষিনীতি ও শিল্পনীতির প্রধান পরীক্ষা।