‘স্বাস্থ্যই সকল সুখের মূল’—এ প্রবাদ সর্বজনীন। আমাদের সব অর্জন বা সম্পদ থাকলেও যদি সুস্বাস্থ্য না থাকে, তবে সব আয়োজনই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। বাংলাদেশের প্রায় ১৭ কোটি মানুষের স্বাস্থ্যসেবার বিশাল দায়িত্ব সরকারের একার পক্ষে নিশ্চিত করা অত্যন্ত কঠিন। আজকের বাস্তবতা হলো, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষে দেশের সব নাগরিকের স্বাস্থ্যসেবার পুরোটা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। আমরা দেখছি যে দেশের মোট স্বাস্থ্যসেবার প্রায় ৭০-৭৩ শতাংশই আসছে সরকারি কাঠামোর বাইরের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে, যার মধ্যে রয়েছে অসংখ্য বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও এনজিও পরিচালিত স্বাস্থ্য কেন্দ্র। এ প্রতিষ্ঠানগুলো স্বাস্থ্য খাতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও একটি বড় ঘাটতি রয়ে গেছে, আর তা হলো সমন্বয়ের অভাব। আমাদের সবার বক্তব্য থেকেই বিষয়টি উঠে এসেছে। এ সমন্বয়ের ঘাটতি কীভাবে কমানো যায়, তা নিয়ে আমাদের ইতিবাচকভাবে ভাবতে হবে। একে অন্যকে দোষারোপ না করে, সেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আমাদের এক হতে হবে। একত্রিত হওয়ার কোনো বিকল্প নেই।
আমাদের হাতে সময় কম। এ কারণে আমরা ১০০ দিনের একটি কর্মপরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছি। এ সীমিত সময়ের মধ্যে আমাদের পক্ষে যতটুকু করা সম্ভব ততটুকু করার চেষ্টা থাকবে। সেখান থেকে পরবর্তী রাজনৈতিক সরকার বাকিটা এগিয়ে নিয়ে যাবে।
আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার আরেকটি দুর্বল দিক হলো, আমরা রোগ প্রতিকারের ওপর যতটা জোর দিই, প্রতিরোধের ওপর ততটা দিই না। আমাদের সব আয়োজনই মূলত অসুস্থ হওয়ার পরের সেবাকেন্দ্রিক। মানুষকে রোগ সম্পর্কে সচেতন করা বা রোগ যেন না হয়, সেদিকে আমাদের আয়োজন খুবই অপ্রতুল। বেশ কয়েকজনের আলোচনাতেই প্রসঙ্গটি এসেছে। আপনারা হয়তো জানেন, প্রধান উপদেষ্টার উপস্থিতিতে ৩৫টি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে একটি যৌথ ঘোষণার ব্যবস্থা করেছি। যেমন খাদ্য খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয় এক্ষেত্রে। এজন্য খাদ্য মন্ত্রণালয়কে যুক্ত করা হয়েছে। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ও এখানে খুব জরুরি। এখানে বলতে হবে, আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় স্বাস্থ্যপাঠ উপেক্ষিত। আমরা শিক্ষার্থীদের গোল্ডেন প্লাস পাওয়ার জন্য উৎসাহিত করছি, কিন্তু তাকে যে একজন সুস্বাস্থ্যবান নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে হবে, সেই জায়গায় আমাদের মনোযোগ কম। একইভাবে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় খেলাধুলার আয়োজন করছে, কিন্তু সুস্বাস্থ্যের জন্য খেলাধুলা যে একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান, সেই বার্তাটি অনুপস্থিত। এ সমস্যা সমাধানে সম্প্রতি আমরা ৩৫টি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে একটি যৌথ ঘোষণার ব্যবস্থা করেছি, যাতে প্রতিটি মন্ত্রণালয় তাদের সব কাজের মধ্যে স্বাস্থ্যের বিষয়টি বিবেচনায় রাখে।
এ বিষয় স্বীকার করতেই হবে, বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিকের লাইসেন্সের ব্যাপারে আমরা অনেক পিছিয়ে আছি। অনেক লাইসেন্স দীর্ঘদিন ধরে পেন্ডিং অবস্থায় আছে। কিছু কিছু লাইেসন্স ২০১৭ সাল থেকে পেন্ডিং আছে। এ প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের সেবা দিয়ে যাচ্ছে। এ বিষয়গুলোর দিকে আমাদের অবশ্যই মনোযোগ দিতে হবে। আপনাদের অবগতির জন্য জানাতে চাই, গত সপ্তাহেই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে নিযুক্ত প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারীর সঙ্গে সভা করেছি। তিনি নির্দেশনা দিয়েছেন, চার মাসের মধ্যে বিশেষ শর্ত পূরণ সাপেক্ষে যেন পেন্ডিং লাইসেন্সগুলো দিই। প্রয়োজনীয় কিছু শর্ত পূরণের জন্য তাদেরকে একটা সময় বেঁধে দেয়া হতে পারে। এখানে বেসরকারি খাতের নেতারা রয়েছেন। এটা বলতে হবে, সব বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার কিন্তু লাইসেন্স পাওয়ার উপযুক্ত নয়। এ জায়গায় আপনাদের সহযোগিতা একান্তভাবে কাম্য। ন্যূনতম মান যেন বজায় থাকে সেক্ষেত্রে আপনাদের সহযোগিতা চাই।
শহর ও গ্রামের স্বাস্থ্যসেবার মধ্যে একটি বড় পার্থক্য লক্ষণীয়। বিশেষ করে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে গ্রামের চেয়ে নগরের অবস্থা বেশি নাজুক। গ্রামে একজন মানুষ খুব সহজেই ১৫-২০ মিনিটের মধ্যে ভ্যান বা রিকশায় চড়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পৌঁছে তার প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিতে পারে। কিন্তু ঢাকা শহরে একজন মানুষের জন্য সাধারণ রক্তচাপ বা ব্লাড সুগার মাপার মতো কাজের জন্যও ডিএমসি, সোহরাওয়ার্দী বা মিটফোর্ডের মতো বড় হাসপাতালে গিয়ে বিশাল লাইনে দাঁড়াতে হয়, যা অত্যন্ত কষ্টকর। এ পরিস্থিতি বদলাতে আমরা প্রাথমিকভাবে ঢাকা শহরের ২১টি গভর্নমেন্ট আউটডোর ডিসপেনসারিকে (জিওডি) কার্যকর করার জন্য কাজ করছি। স্বাস্থ্য খাতের সার্বিক উন্নয়নের জন্য সরকারের একটি ১০০ দিনের পরিকল্পনা রয়েছে। এ সময়ের মধ্যে যতটুকু করা সম্ভব, আমরা করব এবং আমরা আশা করি, পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক সরকার এ উদ্যোগকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।
পরিশেষে, আমাদের অনেক সরকারি ভবন অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে। আমরা ভবন নির্মাণে আগ্রহী, কিন্তু সেখানে প্রয়োজনীয় জনবল বা যন্ত্রপাতি নিয়োগের পরিকল্পনা আমাদের থাকে না। এ অব্যবহৃত ভবনগুলোকে কীভাবে পিপিপির মাধ্যমে কার্যকর করা যায়, তা আমাদের বিবেচনায় রয়েছে। আসলে ১৭ কোটি মানুষের স্বাস্থ্যের জিম্মাদারি আমাদের সবার। একা কোনো মন্ত্রণালয় বা বিভাগ এ সমস্যা সমাধান করতে পারবে না। সংশ্লিষ্ট সব বিভাগের সমন্বয়ের দায়িত্ব সরকারের। যারা সরকারি দায়িত্বে রয়েছি, তাদের উচিত সবাইকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করা। আমরা যদি আমাদের মধ্যকার দূরত্ব কমিয়ে গ্রাম কিংবা শহর, শিশু কিংবা বৃদ্ধ—সবার জন্য কাঙ্ক্ষিত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে পারি, তবেই আমরা একটি সুস্থ জাতি গঠন করতে পারব।
মো. সাইদুর রহমান: সচিব, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়
[বণিক বার্তা আয়োজিত প্রথম ‘বাংলাদেশ হেলথ কনক্লেভ ২০২৫’-এ সম্মানিত অতিথির বক্তৃতায়]










