ড. রুশিদান ইসলাম রহমান বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক গবেষণা পরিচালক। তিনি ১৬ বছর এ পদে কর্মরত ছিলেন। পেশাজীবনের শুরুতে ছিলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সদস্যও ছিলেন। তিনি যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব সাসেক্স থেকে এমএ এবং অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। জিডিপি প্রবৃদ্ধি ও এর সুবিধাগুলোর অসম বণ্টন, আয়বৈষম্য, তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের করণীয় এসব প্রসঙ্গে কথা বলেছেন বণিক বার্তায়। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সাবরিনা স্বর্ণা

আমাদের জিডিপির প্রবৃদ্ধি হলেও এর সুবিধাগুলোর ন্যায্য বণ্টন হয়নি, যা বৈষম্য বাড়িয়েছে। বিশেষ করে আয়বৈষম্য প্রকট হয়েছে। এ অবস্থায় আমাদের প্রাধান্য কী হওয়া উচিত—জিডিপি প্রবৃদ্ধি নাকি বৈষম্য হ্রাস? বৈষম্য কমানোর উদ্যোগ কি জিডিপি প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়াবে?

দু-তিন দশক ধরে বাংলাদেশে জিডিপি প্রবৃদ্ধি বাড়ছিল। কিন্তু এর সঙ্গে বেড়েছে বৈষম্য। তার অর্থ এই নয় যে প্রবৃদ্ধি ও বৈষম্য হ্রাসের মধ্যে বিরোধ আছে। এ দুইয়ের সম্পর্ক নির্ভর করে প্রবৃদ্ধির ধরন কী বা কোন কৌশলে তা অর্জিত হয়েছে তার ওপর। কারণ কৌশল অনুযায়ী প্রবৃদ্ধির সুফল ভাগাভাগি হয়। সমতাভিত্তিক উন্নয়নে প্রবৃদ্ধি অর্জন সহায়ক ভূমিকা রাখবে যদি শ্রমঘন উৎপাদন কৌশল ব্যবহার করা হয়। সুতরাং বিষয়টি এমন নয় যে দুইয়ের একটি বেছে নিতে হবে। বিগত শতকে একটি তত্ত্ব চালু হয়েছিল যে জিডিপি প্রবৃদ্ধির প্রথম বছরগুলোয় বৈষম্য বাড়ে, তারপর তা কমতে থাকে। বেশ কয়েকটি তথ্যভিত্তিক গবেষণার ফল ও অনেক দেশের অভিজ্ঞতা এ তত্ত্বের বিপক্ষে সাক্ষ্য দেয়। তাতে বোঝা যায় যে প্রবৃদ্ধি ও সমতাভিত্তিক অর্থনীতির মধ্যে বিরোধ নেই। 

জিডিপি প্রবৃদ্ধি বা গড় আয়ের বৃদ্ধি সত্ত্বেও এ দেশে বৈষম্য বেড়েছিল, কারণ বিগত দশকগুলোয় সরকারের নীতির ফলে বিভিন্ন খাতে পুঁজি ঘনত্ব বেড়েছিল, কর্মসংস্থান বাড়েনি। তার ফলে প্রকৃত মজুরি কমে যাচ্ছিল। দুর্নীতি, আর্থিক খাতের অনিয়মের ফলে কীভাবে সরকারি সমর্থনে স্বল্পসংখ্যক ব্যক্তি বিপুল অনার্জিত আয় ও অবৈধ সম্পদের মালিক হয়ে বৈষম্য বাড়িয়েছে তা এখন সবার জানা।

ন্যায্য ও সমতাভিত্তিক প্রবৃদ্ধি কীভাবে নিশ্চিত করা যায়?

এ প্রশ্নের উত্তর সংক্ষেপে এ আলোচনার পরিসরে দেয়া কঠিন। তবু দু-একটি বিষয় উল্লেখ করি। একই সঙ্গে প্রবৃদ্ধির ত্বরণ ও সমতাভিত্তিক উন্নয়নের জন্য সামগ্রিক উন্নয়ন কৌশল পরিবর্তন দরকার। সেখানে শুধু দেশজ আয় বৃদ্ধি নয়, শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন, শিল্প, কৃষি ও সেবা—সব খাতের জন্য নতুন শ্রমঘন পথ ঢেলে সাজাতে হবে। নতুন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পক্ষে সম্ভব সেটা করা। আমার ব্যক্তিগত প্রত্যাশা যে এসব মিলিয়ে আগামী ১০ বা ১৫ বছরের জন্য সামগ্রিক উন্নয়ন কৌশলের পথরেখা তৈরি করা হবে। সেটাতে এমন উপায় থাকবে যে বছর বছর পর্যালোচনা করে দরকারে কিছুটা পরিবর্তন করা যায়। এ পথরেখা ও উন্নয়ন গন্তব্য নির্ধারণের কাজ সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে, বিভিন্ন শ্রেণীর ও জনগোষ্ঠীর চাওয়া-পাওয়া বিষয়ে জেনে-বুঝে করতে হবে। 

কোটা সংস্কার আন্দোলন দেশে ক্রমবর্ধমান হারে বাড়তে থাকা তরুণ বেকারত্বের এক প্রকার প্রতিফলন ছিল বলা যায়?

আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে যে তরুণদের মধ্যে বিরাজমান বেকারত্ব এবং চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে বৈষম্য এবারের আন্দোলনের মূল কারণ। তরুণদের শিক্ষাজীবনের তিক্ত অভিজ্ঞতা, চাকরিতে প্রবেশের প্রক্রিয়া, উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার পথে বাধা সবকিছু মিলিয়ে যে বঞ্চনার অনুভূতি সেগুলোও এখানে যোগ হয়েছে। এসব ক্ষেত্রে সহায়তা করার মতো প্রতিষ্ঠান ছিল না, অনুপ্রাণিত করার মতো নেতৃত্ব ছিল না। বরং পেছনে ঠেলে দেয়ার, দমিয়ে দেয়ার প্রক্রিয়া ছিল। এমনকি নিজের সমস্যার কথা বলার ক্ষেত্রে বাধা ছিল। অন্যদিকে তরুণদের মধ্যেই একটি গোষ্ঠী রাজনৈতিক আনুগত্যের মাধ্যমে, চাঁদাবাজির মাধ্যমে, কাজ না করেও মাতব্বরি করছিল, আনন্দ-বিলাসপূর্ণ জীবনের প্রদর্শনী করছিল। ফলে বৈষম্য শুধু আয়বৈষম্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি, তা সর্বব্যাপী দানবীয় আকার নিয়েছিল, যেটা ভাঙতে এ আন্দোলন হয়েছে। স্বাভাবিক অর্থনৈতিক প্রক্রিয়ায় যে আয়বৈষম্য তৈরি হতে পারে তার ওপর আরো চাপিয়ে দেয়া হয়েছে শিক্ষা ব্যবস্থার ভেতরে গেঁথে দেয়া ভেদাভেদ, গ্রাম-শহরে শিক্ষার মানের তারতম্য।

তরুণদের মধ্যে যে বেকারত্ব, নীতিনির্ধারকরা তার স্বরূপ বুঝতে চেষ্টা করেনি। যেমন অনেকে বেকার নাম ঘুচাতে নামমাত্র ছাত্র হিসেবে ভর্তি থেকেছে, পরিবারে কাজ ভাগ করে সাহায্য করেছে বা বিদেশে যাওয়ার জন্য যোগাযোগের ধান্দায় ঘুরেছে। অনেকে চাকরি না পেয়ে হতাশ হয়ে আর চাকরি খুঁজছে না, আন্তর্জাতিক সংজ্ঞায় তারা বেকার নয়। এদের সবাইকে ধরলে তরুণদের এক বড় অংশ জীবনের সবচেয়ে উৎপাদনশীল সময়ে কয়েকটি বছর হারিয়ে ফেলেছে। আর যখন বেসরকারি খাতে কোনো চাকরি পায়, সেটা তাদের দিতে পারে না জীবনধারণের সম্মানজনক মান; তাতে থাকে না স্থায়িত্বের সম্ভাবনা, পদোন্নতির আকর্ষণ। শ্রমশক্তি জরিপ থেকে হিসাব করে দেখেছি যে প্রকৃত বেতনের আয় গত ১০ বছরে কমেছে। উন্নতমানের কর্মনিয়োজনের অনুপাত কমেছে। সব মিলিয়ে তরুণদের স্বপ্ন হরণ করা হয়েছে। উদ্যম নিভিয়ে দেয়া হয়েছে। তখন প্রতিবাদী হতেই হয়।

কর্মসংস্থান বৃদ্ধির মাধ্যমে বৈষম্য হ্রাস করা কি সম্ভব হবে, যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) হাত ধরে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের কথা বলা হচ্ছে? 

চতুর্থ শিল্প বিপ্লব নিয়ে অহেতুক কিছু ভীতি দেখা যায় যে তাতে অনেক ধরনের কর্মসংস্থান কাটছাঁট হবে। কিন্তু আসলে কী হবে তার কোনো পরিসংখ্যান নেই। কর্মসংস্থান কমবে কিনা তা নির্ভর করবে বাংলাদেশের প্রস্তুতির ওপর। যদি উপযুক্ত শিক্ষা ও দক্ষতা তৈরি করা যায় তাহলে সুযোগ বরং বাড়তে পারে। এখন থেকে যথাযথ উন্নয়ন কৌশল নিয়ে এগোলে উচ্চ আয়ের কর্মসুযোগ তৈরি হতে পারে। তাতে শ্রম আয় বেড়ে বৈষম্য কমতে পারে। আর শিক্ষায় যারা অনগ্রসর তাদের কর্মসংস্থানের আলাদা কৌশল নিতে হবে। 

পুরো আন্দোলনজুড়ে ও পরবর্তী সময়ে তরুণদের অংশগ্রহণ ছিল সবচেয়ে বেশি। কোনো প্রশিক্ষণ ছাড়াই তারা সড়কে ট্রাফিক পুলিশের কাজও করেছে। তাদের বর্তমানে কীভাবে উন্নয়নে সঙ্গে সম্পৃক্ত করা যায়? যার ফলে বেকারত্বও কমবে, দেশও এগিয়ে যাবে।

এই মাত্র যে সর্বাঙ্গীণ নতুন উন্নয়ন কৌশলের কথা বললাম সেটাই দরকার। তরুণদের জন্য উন্নয়ন কৌশল তৈরির ক্ষেত্রে এবং সেটা প্রণয়নে তাদের অংশগ্রহণ ও মতামতকে প্রাধান্য দিতে হবে। বিগত কয়েক সপ্তাহের অভিজ্ঞতা থেকে বোঝা যায় যে তারা এমন সব নতুন সম্ভাবনা নিয়ে ভাবতে পারে যেটা প্রচলিত ধারার বাইরে। এখন সেটাই বিভিন্ন দিকে এগোতে সাহায্য করবে। 

আধুনিক দক্ষতা তৈরি করতে হবে। এক্ষেত্রে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি খাত বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। উদ্যোক্তা হওয়ার দিকে যাদের আগ্রহ তাদের জন্য নতুন উদ্যোগ স্থাপন, ব্যবস্থাপনা ও হিসাবরক্ষণ প্রশিক্ষণের জোগাড় করতে হবে। এভাবে কিছু কর্মসংস্থান হওয়ার পর তারাই আবার নতুনদের শিক্ষানবিশ হিসেবে নিতে পারবে। এনজিওর সঙ্গে সহযোগিতার মাধ্যমে কিছু দায়িত্ব তাদের হাতে দেয়া যায়। 

এখানে একটি বিষয় মনে করানো দরকার যে শুধু এইচএসসি বা স্নাতক শিক্ষিত বেকারদের দিকে নজর দেয়া যথেষ্ট নয়। স্কুল শিক্ষা যারা শেষ করেনি তাদের কথা মনে রেখে তাদের দক্ষতা বৃদ্ধি, তাদের জন্য অধিকতর উৎপাদনশীল স্বকর্মসংস্থান দরকার, সেজন্য অর্থায়ন জরুরি। মজুরিভিত্তিক কর্মসংস্থান বাড়ানোর জন্য বিনিয়োগ প্রবাহ বাড়াতে হবে, বিশেষত ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগে। 

নারীর কর্মনিয়োজনের সাম্প্রতিক ধারা কেমন? সেখানে নারী-পুরুষ বৈষম্য কী রূপে বিদ্যমান? 

এ বিষয়ের বিস্তারিত বিশ্লেষণের দরকার। এখানে সংক্ষেপে বলতে পারি যে নারীর কর্মসংস্থান এবং এর মাধ্যমে ক্ষমতায়নের বেশ অগ্রগতি হয়েছিল। কিন্তু কয়েক বছর ধরে সে ধারায় ছেদ পড়েছে। যেমন ২০১৭ সালে উৎপাদন শিল্পে নিয়োজিতদের ৩৩ শতাংশ ছিল নারী, সেটা হ্রাস পেয়ে ২০২২ সালে দাঁড়িয়েছে ২৬ শতাংশে। এ সময়ের মধ্যে নারী-পুরুষের মজুরির অনুপাত কমেছে। উচ্চ শিক্ষায় বা স্কুল শিক্ষা সমাপনে পুরুষের তুলনায় নারীর অংশ অনেক কম।

সমাজে নারীর সামগ্রিক অবস্থান জোরালো না হলে কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য বাড়তে থাকবেই। যেমন এ দেশে নারীর প্রথম বিয়ের বয়স কম এবং সময়ের সঙ্গে তা আশানুরূপ বাড়ছে না। পাকিস্তান বা ভারতের তুলনায় সেটা বেশ কম। এত কম বয়সে বিয়ের পর স্বাধীনভাবে চাকরি খোঁজা বা পাওয়া বা পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা কম। সব মিলিয়ে নারী-পুরুষ বৈষম্য কমানোর জন্য বড় ধরনের সামাজিক পরিবর্তনের দিকে যেতে হবে। 

আন্দোলন চলাকালীন বা পরবর্তী সময়ে বহুল উচ্চারিত একটি শব্দ হলো ‘রাষ্ট্র সংস্কার বা রাষ্ট্র মেরামত’। নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের ভেতর সংস্কারের কোনো পথনকশা কি দেখতে পাচ্ছেন?

দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে সংস্কার অনেক ক্ষেত্রেই প্রয়োজন। তবে সেই আলোচনায় যাওয়ার আগে আমার খুব নিজস্ব একটি অনুভূতির বিষয় পরিষ্কার করতে চাই। এখন সংস্কার দরকার দেশের প্রতিষ্ঠানগুলোয়। কিন্তু রাষ্ট্র তো আরো অনেক বড়। রাষ্ট্র একাধারে আমাদের ভূখণ্ড, আমাদের সার্বভৌমত্ব, সব জনগণ এবং সরকার ও তার প্রতিষ্ঠান মিলিয়ে। এটি আমাদের বুকের ধন, গর্বের সৃষ্টি, চির অম্লান। সরকারের প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল হতে পারে, ক্ষয় ও দুর্নীতিগ্রস্ত হতে পারে এবং সম্প্রতি হয়েছেও। সেগুলোর সংস্কার করতে হবে। এখানে শব্দ চয়নের বিষয়ে একটু মনোযোগ দরকার। ভাষাবিদদের কাছ থেকে শব্দ প্রয়োগের ক্ষেত্রে সাহায্য নেয়া যেতে পারে। একই কথা মেরামত, রাজনৈতিক বন্দোবস্ত ইত্যাদি শব্দের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। মেরামত শব্দটি জীর্ণ হয়ে যাওয়া বস্তুকে পুনর্ব্যবহারের উপযোগী করার প্রক্রিয়াকে বোঝায়! রাষ্ট্র তো তেমন বস্তু নয়। কাজেই আমি মনে করি, এখানে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার বোঝানো হচ্ছে। রাজনৈতিক পরিস্থিতি, প্রক্রিয়া সংস্কার হতে হবে। তার অর্থ হলো সব রাজনৈতিক দলের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, আস্থা, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ওপর জোর, জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা থাকতে হবে।