জ্বালানি দেশের অর্থনীতির প্রাণশক্তি। শিল্প, কৃষি, পরিবহন থেকে শুরু করে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও দৈনন্দিন জীবনযাত্রার প্রতিটি ক্ষেত্রে জ্বালানি অপরিহার্য। পর্যাপ্ত ও সাশ্রয়ী জ্বালানি ছাড়া শিল্পায়ন ও উৎপাদন প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়। দেশের সমুদ্রসীমায় প্রায় এক দশকের বেশি সময় তেল-গ্যাস অনুসন্ধান নেই বললেই চলে। বিশেষ করে ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রসীমা নিষ্পত্তি হওয়ার পর ১০ বছর কোনো দরপত্র আহ্বান করা যায়নি। অথচ এ সময়ের মধ্যে প্রতিবেশী দেশ দুটি তাদের সাগরসীমায় তেল-গ্যাস অনুসন্ধান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ মজুদ নিশ্চিত করেছে। এছাড়া চীনের সহযোগিতায় আরব সাগরের তলদেশে সম্প্রতি বিপুল পরিমাণ গ্যাসের মজুদ আবিষ্কার করেছে পাকিস্তান। এ তিন দেশের বিপরীত পথে অনেকটা বাংলাদেশ। বিশেষত আমদানিনির্ভর গ্যাস, অপর্যাপ্ত অনুসন্ধান জরিপ, রাজনৈতিক সিদ্ধান্তহীনতা ও বিদেশী বিনিয়োগের অপেক্ষায় থেকে সময়ক্ষেপণ করেছে। দীর্ঘদিনের এ স্থবিরতা সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান দরপত্রে তার নেতিবাচক প্রভাব দেখা গেছে। বঙ্গোপসাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে ডাকা সবশেষ দরপত্রে (মার্চ, ২০২৪) সাতটি বিদেশী কোম্পানি তথ্য-উপাত্ত কিনলেও শেষ পর্যন্ত কোনো বিদেশী কোম্পানি আর দরপত্র জমা দেয়নি। সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে বছরের পর বছর বিদেশী বিনিয়োগ নির্ভরতা ও প্রযুক্তিগত অদক্ষতার দোহাই দিয়ে অনুসন্ধান স্থবির করা রাখা হয়েছে।

ভারত, মিয়ানমার বা পাকিস্তান নিজেদের সমুদ্রসীমায় যে সাফল্য পেয়েছে তা থেকে বাংলাদেশ শিক্ষা নিতে পারে। ভারত বিদেশী কোম্পানির পাশাপাশি নিজস্ব রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানকেও শক্তিশালী করেছে। মিয়ানমার আবিষ্কৃত গ্যাস দিয়ে শুধু নিজস্ব চাহিদা মেটাচ্ছে না, চীনে রফতানিও করছে। পাকিস্তানও চীনের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে অনুসন্ধানে নেমেছে এবং বড় আবিষ্কারের ইঙ্গিত দিয়েছে। বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান ও সমুদ্রসীমার আয়তন বিবেচনা করলে এখানেও গ্যাস ও তেলের উল্লেখযোগ্য মজুদ থাকার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু সেই প্রচেষ্টা কোথায়? সরকার পূর্ণ দরপত্র আহ্বানে যেভাবে এগোচ্ছে, তাতে ঠিক কত দিনে দরপত্র কোম্পানি নির্বাচন করা যাবে, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।

এখন প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ কীভাবে এ অচলাবস্থা কাটিয়ে উঠতে পারে। প্রথমত, বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণে স্পষ্ট নীতি প্রণয়ন করতে হবে। কোম্পানির প্রফিট শেয়ার, প্রযুক্তিগত সচ্ছলতা, জরিপের নির্ভরযোগ্য তথ্য পরিষ্কার হতে হবে। দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক দরপত্র প্রক্রিয়া আধুনিকায়ন জরুরি। প্রতিবেশী দেশগুলোর মতো দরপত্রে সুবিধা-অসুবিধাগুলো সুনির্দিষ্ট করে দেয়া দরকার, যাতে বিদেশী কোম্পানি আগ্রহী হয়। তৃতীয়ত, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান পেট্রোবাংলাকে আধুনিক প্রযুক্তি ও দক্ষ লোকবল সমৃদ্ধ করতে হবে, সেই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় অর্থায়নের আকারও বাড়াতে হবে।

প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে প্রযুক্তিগত সহযোগিতা ও অভিজ্ঞতা বিনিময় বাড়ানো দরকার। সর্বোপরি, আমদানিনির্ভর নীতি থেকে সরে আসতে হবে। স্বল্পমেয়াদে এলএনজি আমদানি করা গেলেও দীর্ঘমেয়াদে এটি অর্থনীতির জন্য টেকসই নয়।

দেশে ব্যাপকহারে শিল্প-কারখানা প্রসারের পেছনে রয়েছে সাশ্রয়ী মূল্যের গ্যাসের সরবরাহ। স্থানীয় উৎস থেকে গ্যাসের জোগান নিয়ে স্বল্প মূল্যে শিল্প ও বিদ্যুৎ খাতে গ্যাসের ব্যবহার হয়েছে। এতে স্বল্প মূল্যে পণ্য উৎপাদন করা গেছে, যা আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা ও অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটাতে ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে। সমুদ্র থেকে তেল ও গ্যাস উত্তোলন করা সম্ভব হলে দেশের জ্বালানিনিরাপত্তা যেমন নিশ্চিত হবে, তেমনি জ্বালানির আমদানিনির্ভরতা কমে আসবে। জ্বালানি আমদানি কমে গেলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ চাপে পড়বে না। এতে আর্থিক স্থিতিশীলতা বাড়বে। জ্বালানি খাতে স্বনির্ভরতা নিশ্চিত করতে হলে সমুদ্রে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধান বেগবান করতে হবে। বাস্তবতা হলো, দেশে গ্যাস অনুসন্ধান এখনো পরিপক্ব হয়নি, বরং প্রাথমিক পর্যায়ে আছে। দেশের ভূখণ্ডের অনেক অংশই এখনো অনুসন্ধানের আওতার বাইরে রয়েছে।

গভীর সমুদ্রে অনুসন্ধান জটিল ও সময়সাপেক্ষ হওয়ায় বিগত সরকার তুলনামূলক সহজ পথ অর্থাৎ আমদানিনির্ভর জ্বালানি নীতির দিকে অগ্রসর হয়েছিল। বিশেষ করে ২০১৮ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকার এলএনজি আমদানি করা হয়েছে। জ্বালানি আমদানির মাধ্যমে স্বল্পমেয়াদে সমস্যার সমাধান হলেও দীর্ঘমেয়াদে পরিস্থিতিকে আরো জটিল করা হয়েছে। অথচ বিগত সরকারের ভুল নীতির কারণে দেশীয় সম্ভাবনা অনাবিষ্কৃত রয়ে গেছে।

আমদানিনির্ভর জ্বালানির ওপর নির্ভর করে পরিকল্পনা প্রণয়নের নানামুখী ঝুঁকি থাকে। আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতি, উৎপাদন, দাম নিয়ে কারসাজিসহ বিভিন্ন কারণে জ্বালানির বাজার সারা বছরই দোদুল্যমান থাকে। মাঝে মাঝেই দাম বেড়ে রেকর্ড করে। ফলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের ওপর নির্ভর করে পরিকল্পনা প্রণয়নের মাধ্যমে উন্নয়নের ধারাবাহিকতা ধরে রাখা কঠিন। বিদ্যুৎ খাতের মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের সময় বিশেষজ্ঞরা এলএনজির ওপর অতিনির্ভরতার বিষয়ে সতর্ক করেছিলেন। এক্ষেত্রে তাদের পরামর্শ ছিল নবায়নযোগ্য ও দেশীয় জ্বালানিনির্ভর বিদ্যুৎ প্রকল্প গ্রহণের। কারণ হিসেবে বলা হয়েছিল এলএনজি, জ্বালানি তেল প্রভৃতির বাজার অস্থিতিশীল। এর দাম দ্রুত ওঠানামা করে। বিগত সরকারের সমন্বিত মহাপরিকল্পনায় গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থাপনার বড় অংশই আমদানীকৃত এলএনজিকে ঘিরে। বর্তমানেও আমদানির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। এর ওপর অধিক নির্ভরতা অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের বিপর্যয় নিয়ে আসতে পারে। এছাড়া এলএনজির দাম বাড়লে বিদ্যুৎ উৎপাদন থেকে শুরু করে শিল্প উৎপাদনে ব্যয় বেড়ে যায়, যা সার্বিক মূল্যস্ফীতিতেও প্রভাব রাখে।

উৎপাদন অংশীদারত্ব চুক্তি (পিএসসি) ২০০৮-এর আওতায় ২০১০ সালে গভীর সমুদ্রে দুটি ব্লকে কাজ নেয় মার্কিন কোম্পানি কনোকোফিলিপস। তারা দ্বিমাত্রিক জরিপ চালালেও ২০১৫ সালে গ্যাসের দাম বাড়ানোর দাবি পূরণ না হওয়ায় কাজ ছেড়ে যায়। পরবর্তী সময়ে ভারতের ওএনজিসি ভিদেশ, অস্ট্রেলিয়ার স্যান্তোস ও সিঙ্গাপুরের ক্রিস এনার্জি, দক্ষিণ কোরিয়ার পস্কো দাইয়ু—সবাই নির্দিষ্ট সময় পর ব্লক ছেড়ে চলে গেছে। এর পেছনে নীতিগত অনিশ্চয়তা এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশের অভাব কাজ করেছে।

বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরেই জ্বালানি সংকটে ভুগছে। আমদানি করেও জ্বালানির চাহিদা মেটানো যাচ্ছে না। শিল্প-কারখানা, বিদ্যুৎ উৎপাদন, পরিবহন—সব খাতেই এর প্রভাব পড়ছে। প্রতিবেশী দেশগুলো যখন সমুদ্রসীমায় অনুসন্ধান ও উত্তোলনে সাফল্যের মুখ দেখছে, তখন বাংলাদেশ আমদানি নীতির কারণে দেশীয় তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানে পিছিয়ে পড়ছে। ফলে জ্বালানিনিরাপত্তা আরো অনিশ্চিত হচ্ছে।

সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে প্রতিবেশী দেশগুলোর মতো সাফল্য পেতে হলে বাংলাদেশের নীতিগত জটিলতা কাটিয়ে স্বচ্ছ ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে। দেশীয় জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ ও শিল্প উৎপাদন বাড়ানো গেলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অবকাঠামো উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়বে। সুতরাং অর্থনীতির সার্বিক উন্নয়ন, জ্বালানিনিরাপত্তা ও বৈদেশিক নির্ভরতা হ্রাসে সমুদ্রে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধান জরুরি।