রোগ নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজন রোগের বিস্তার ও রোগাক্রান্তের অবস্থা সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ ধারণা। সামগ্রিক অবস্থা না জেনে চিকিৎসার জন্য সঠিক ও কার্যকরী পদক্ষেপ নেয়া কখনো সম্ভব নয়। এজন্য প্রয়োজন প্রকৃত হিসাব। নয়তো রোগ নিয়ন্ত্রণে একদিকে যেমন বেগ পোহাতে হতে পারে, তেমনি একটি রোগ মহামারীর আকার ধারণ করতে পারে। কোনো রোগে আক্রান্ত ও মৃত্যুর প্রকৃত চিত্র জানা তাই জরুরি। বণিক বার্তার প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, সরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান থেকে রোগ, রোগী ভর্তি ও মৃত্যুর হিসাব পাওয়া গেলেও বেসরকারি চিকিৎসার হিসাব পায় না সরকার। যেখানে দেশে চিকিৎসাসেবা খাতের ৬২ শতাংশ পরিচালিত হয় বেসরকারি ব্যবস্থাপনায়। অর্থাৎ বেসরকারি হাসপাতালে প্রতি বছর কত রোগী কোন রোগে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নেয় এবং এর মধ্যে কতজন মারা যায় তার কোনো হিসাব নেই। 

দেশে স্বাস্থ্যসেবার পরিসর বেড়েছে। একদিকে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীর সংখ্যা বেড়েছে। অন্যদিকে মৃতের সংখ্যাও বেড়েছে, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে সরকারি হাসপাতালের সংখ্যা ৬৪০ (ইউনিয়ন পর্যায় বাদে) এবং বেসরকারি হাসপাতালের সংখ্যা ৭ হাজার ৮৫৪। এ প্রতিষ্ঠানগুলোয় মোট ১ লাখ ৭৯ হাজার ৩০১টি শয্যা রয়েছে। এর মধ্যে সরকারিতে ৬৮ হাজারের কিছু বেশি। আর বেসরকারিতে শয্যা রয়েছে প্রায় ১ লাখ ১১ হাজার। ২০২০ সালে সরকারি হাসপাতালে ১ লাখ ২১ হাজার ৬৮৫ রোগীর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে শূন্য থেকে চার বছর বয়সী সাড়ে ২৪ হাজার এবং পাঁচ বছরের বেশি বয়সের রোগী ছিল সোয়া ৯৭ হাজার। মৃতের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে হৃদজটিলতা নিয়ে ভর্তি হওয়া রোগীরা। এরপর রয়েছে স্ট্রোকের রোগী। তবে এ সব তথ্যই সরকারি হাসপাতালগুলোয় রোগী ভর্তি ও মৃত্যুর তথ্য। বেসরকারি হাসপাতাল থেকে এ ধরনের কোনো তথ্য থাকে না সরকারের কাছে। আবার দেখা যাচ্ছে, দেশে প্রতি বছর চিকিৎসাধীন অবস্থায় শুধু সরকারি হাসপাতালগুলোয় কমপক্ষে সোয়া লাখ রোগীর মৃত্যু হয়, যাদের মৃত্যুর সঠিক পূর্ণাঙ্গ ক্লিনিক্যাল বিশ্লেষণ এবং এ-সংক্রান্ত কোনো সরকারি তথ্যও নেই। অথচ বিশ্বের সবখানেই হাসপাতালে মৃত রোগীদের ডেথ রিভিউ বা মৃত্যু পর্যালোচনাকে অতিগুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কেননা রোগীর মৃত্যু প্রতিরোধ ও চিকিৎসার সঠিক পদ্ধতি নির্ধারণ করতে ডেথ রিভিউ সহায়ক ভূমিকা পালন করে। এজন্য সরকারি হাসপাতালগুলোর পাশাপাশি বেসরকারি হাসপাতালগুলো থেকে প্রকৃত তথ্যপ্রাপ্তি নিশ্চিত করতে হবে। এক্ষেত্রে সব ধরনের হাসপাতালের তথ্যের সমন্বয় সাধন আবশ্যক। সব হাসপাতালের যাবতীয় প্রাসঙ্গিক তথ্য নিয়মিতভাবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে যেন পাঠানো হয়, সেজন্য এ অধিদপ্তরকে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। পাশাপাশি যেকোনো স্বাস্থ্যসেবা কর্তৃপক্ষ, গবেষক ও নীতিনির্ধারকরা যেন প্রয়োজন অনুসারে তথ্য পান, সে বিষয়ে সুব্যবস্থা নিতে হবে। তাহলে নীতিনির্ধারণ বাস্তবসম্মত হবে।

দেশে প্রতি বছর মারা যাওয়া রোগীর মধ্যে অসংক্রামক রোগাক্রান্ত ৬৭ শতাংশ বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। তবে এ তথ্য পুরোটা সরকারি হাসপাতালভিত্তিক। অসংক্রামক রোগের মধ্যে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ক্যান্সার। ৩০ শতাংশের মৃত্যু হয় হৃদরোগে। আর ক্যান্সারে মৃত্যু হয় ১২ শতাংশের। তবে মৃতের এ সংখ্যা প্রাক্কলিত। বাংলাদেশে জাতীয় পর্যায়ে কোনো ক্যান্সার রেজিস্ট্রি নেই। বছরে সারা দেশে কত রোগী ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়েছে ও মারা গেছে এমন হিসাবও নেই। এছাড়া সম্প্রতি ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত বা মৃতের সংখ্যা সংখ্যা কত, এর সঠিক তথ্য নেই। রোগতত্ত্ববিদ ও বিশেষজ্ঞদের মতে, বেসরকারি হাসপাতালের চিকিৎসাসংক্রান্ত তথ্য না থাকায় বড় একটি সংখ্যা অজানা থেকে যাচ্ছে।

সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, হাসপাতালে যে পরিমাণ রোগী থাকে, এর অন্তত পাঁচ গুণ রোগী পাওয়া যায় ওই এলাকায়। হাসপাতাল এলাকাভুক্ত শহর বা গ্রামে গবেষণা করলে দেখা যাবে, যত রোগী ভর্তি হয়েছে এর চেয়ে বেশি রোগী ওই এলাকায় বাস করে। এভাবে হাসপাতালের বাইরের মানুষকে গণনায় আনা যায় না বলে রোগের প্রকৃতচ্রচিত্র তুলে ধরা সম্ভব হয় না। 

এর পেছনে দুই ধরনের কারণ থাকতে পারে। প্রথমত, আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বেশি হলে সামাজিক ভীতি ছড়াতে পারে; দ্বিতীয়ত, চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা, অর্থাৎ সিস্টেমের ফাঁকফোকর সামনে চলে আসার ভীতি। এজন্য সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। প্রযুক্তিকে এক্ষেত্রে কাজে লাগাতে হবে।

প্রতিটি জেলার তথ্য নির্দিষ্ট সার্ভারে সংযুক্ত করলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সব তথ্য একসঙ্গে পেতে পারে। একযোগে তথ্য দেয়ার জন্য সঠিক ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে হবে। এজন্য জনবল, অর্থ, প্রশিক্ষণ অনেক বিষয় রয়েছে। সেগুলোও ধীরে ধীরে বাস্তবায়নে উদ্যোগী হতে হবে।