দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত খবর, মহামান্য আদালতের অনুমতি নিয়ে দেশের সমুদ্র উপকূলীয় জেলাগুলোর এক শ্রেণীর অসাধু মৎস্য ব্যবসায়ী ছোট্ট কাঠের নৌকায় ইঞ্জিন বসিয়ে সেটিকে যান্ত্রিক ট্রলার নাম দিয়ে ও সেখানে অতিসূক্ষ্ম ছিদ্রযুক্ত জাল সংযোজন করে সমুদ্রে দেদার মাছ শিকার করে যাচ্ছে (প্রথম আলো, গত ১৭ জুলাই)। জানা যায়, বেহুন্দি নামে পরিচিত ওই জালের ছিদ্র বা ফাঁস অতিসূক্ষ্ম হওয়ার কারণে পানি ব্যতীত আর প্রায় কিছুই এর ফাঁক গলিয়ে বেরিয়ে যেতে পারে না। অর্থাৎ এ জাল গভীর বা অগভীর সমুদ্রের যেখানেই ফেলা হোক না কেন, সেখানকার সমুদয় মাছ, মাছের পোনা, রেণু, ডিম, শামুক, ঝিনুক, কাঁকড়া, প্রবাল, শৈবাল এ সবই এতে আটকা পড়ে যায়। ফলে এ ক্ষেত্রে মূল উদ্দেশ্য মাছ ধরা হলেও এতে করে বাস্তবে সমুদ্রের অধিকাংশ মৎস্য ও অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। উল্লিখিত প্রতিবেদনের তথ্য, এ সর্বনাশা কাজটি অব্যাহত রাখার পক্ষে মহামান্য আদালতের অনুমতি পাওয়া যায় ২০২৩ সালের শেষ দিকে, যে অনুমতি পরবর্তী সময়ে আরো কয়েক দফায় নবায়ন করা হয়েছে। আর আদালত থেকে প্রাপ্ত ওই অনুমতির ভিত্তিতে মাত্র দেড় বছরের ব্যবধানে বেহুন্দি জালে মাছ ধরা কার্যক্রম বরগুনা থেকে শুরু হয়ে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, ভোলা, পটুয়াখালী প্রভৃতি বিভিন্ন জেলায় ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। উল্লিখিত জেলাগুলোয় বেহুন্দি জালযুক্ত ট্রলারের সংখ্যা এরই মধ্যে ৪০০ ছাড়িয়ে গেছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ওই জালের সংখ্যা সহসাই হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে।

সাম্প্রতিক সময়ে নিকট সমুদ্রে এবং সমুদ্রের মুখে অবস্থিত নদ-নদীগুলোয় ইলিশ ও অন্যান্য মাছ ধরা পড়ার হার ব্যাপকভাবে কমে গেছে কিংবা কোনো কোনো এলাকায় তা একেবারেই ধরা পড়ছে না। বিশেষজ্ঞ অভিমত, এর পেছনে উল্লিখিত বেহুন্দি জালের একটি বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। আর পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথ্যও ওই অভিমতকেই সমর্থন করছে। তার মানে, বেহুন্দি জালের ব্যাপকভিত্তিক নেতিবাচক প্রভাব এরই মধ্যে দেশের মৎস্য খাতের ওপর পড়তে শুরু করেছে এবং ধারণা করা যায়, বেহুন্দি জালে মাছ ধরার এ দাপট অব্যাহত থাকলে শুধু মাছ নয়, সমুদ্রের অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদও অচিরেই বড় ধরনের হুমকির মুখে পড়বে। আর এমনটি ঘটা মানে দেশের সমগ্র জীববৈচিত্র্যকে এমন এক সংকটে ফেলে দেয়া যে, যেখান থেকে শত চেষ্টায়ও আর কখনই পূর্বাবস্থায় ফিরে যাওয়া সম্ভব হবে না, যেমনটি সম্ভব নয় ঢাকার অধিকাংশ জলাভূমি জবরদখল করে ভবন, রাস্তা ও অন্যান্য স্থাপনা নির্মাণের পর এখন আর সেগুলোকে পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে নেয়া। এ প্রসঙ্গে একইভাবে আসতে পারে সারা দেশের অসংখ্য খাল-বিল, নদী-নালা, বিল-ঝিল ও হাওরের ভরাট হয়ে যাওয়ার নানা করুণ ঘটনার কথাও, যেগুলোর পুনরুদ্ধার এখন প্রায় পুরোপুরিই অসম্ভব।

বাংলাদেশের সামুদ্রিক জলভাগ এ দেশের অর্থনীতির এক বিরাট সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র। স্থলভাগের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা যখন নানা কারণে ক্রমেই সংকুচিত ও সমস্যাগ্রস্ত হয়ে পড়ছে, তখন সমুদ্র ও সমুদ্র উপকূলীয় নদ-নদীগুলোর মৎস্যসম্পদ আমাদের জন্য নানাভাবেই নতুন আশার সঞ্চার করছে। কিন্তু বেহুন্দি জালের মাধ্যমে মৎস্য নিধনের এ সর্বনাশা কর্মকাণ্ড যদি চলমান গতিতে অব্যাহত থাকে, তাহলে উল্লিখিত সম্ভাবনা যে অচিরেই হতাশায় পর্যবসিত হবে, তাতে কোনোই সন্দেহ নেই। বেহুন্দি জালে যারা মাছ ধরছেন, বিষয়টি তারাও বুঝেন। কিন্তু তারা তাদের লোভ ও লালসার কাছে পরাজিত। তবে তাদের এ লোভ-লালসা যাতে বিস্তার লাভ করতে না পারে, তজ্জন্য গোড়াতেই একে ঠেকিয়ে দিতে পারত স্থানীয় প্রশাসন তথা মৎস্য বিভাগ। পত্রিকার খবর পড়ে মনে হচ্ছে, সেটি তারা প্রথমদিকে খানিকটা বোধহয় করেওছিল, যে কারণে ওই বেহুন্দি জালধারী ব্যবসায়ীদের তাদের লালসা টিকিয়ে রাখতে সহযোগিতার জন্য উচ্চ আদালতের আশ্রয় নিতে হয়েছিল। কিন্তু সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সে তৎপরতা পরবর্তী সময়ে ধারাবাহিকভাবে ও নিষ্ঠার সঙ্গে অব্যাহত থাকেনি বলেই বেহুন্দি জালের মালিকরা একাধিক দফায় আদালতের শরণাপন্ন হয়ে প্রতিবারই সফল হয়েছেন, অর্থাৎ এ নিষ্ঠুর প্রক্রিয়ায় মাছ ধরা অব্যাহত থেকেছে।

মহামান্য আদালত লোভী বেহুন্দিদের উপস্থাপিত কাগজপত্র দেখে ও তাদের আইনজীবীদের বক্তব্য শুনে সেগুলোকেই হয়তো যৌক্তিক মনে করেছেন এবং সেসবে সন্তুষ্ট হয়ে বেহুন্দি জালে মাছ ধরা অব্যাহত রাখার অনুমতি দিয়েছেন। কিন্তু আমার বিশ্বাস, বেহুন্দি জালের ব্যবহার-যে সমুদ্র ও সমুদ্র উপকূলীয় অঞ্চলের নদ-নদীগুলোর মৎস্য সম্পদকে প্রায় পুরোপুরি ধ্বংস করে দিচ্ছে, বেহুন্দিদের বিপরীতে দাঁড়িয়ে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা যদি সেটি উপযুক্ত যুক্তি ও তথ্যপ্রমাণসহ আদালতের সামনে তুলে ধরতেন তাহলে আদালতের সিদ্ধান্ত হয়তো এরূপ হতো না। কিন্তু রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা কি সেটি করেছিলেন? প্রথমবার যখন মহামান্য আদালত বেহুন্দি জালে মাছ ধরার অনুমতি দিলেন, তখন সে সিদ্ধান্ত পর্যালোচনাপূর্বক ওই অনুমতি বাতিলের জন্য রাষ্ট্রপক্ষ কি যথাসময়ে বা কখনো কিংবা প্রতিবার আপিল করেছিলেন? যদি না করে থাকেন, তাহলে বেআইনি ও অযৌক্তিক বেহুন্দি জালে মাছ ধরার কারণে বাংলাদেশের একটি বিস্তীর্ণ বা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মৎস্য-অঞ্চলের মাছ যে ক্রমান্বয়ে বিলুপ্তির পথে এগুচ্ছে, তার দায় কে নেবে? কেউ নেবে না। কারণ জবাবদিহিবিহীন বাংলাদেশের রাষ্ট্র ব্যবস্থায় জনগণ ও রাষ্ট্রের যা কিছু ক্ষয়ক্ষতি, তার দায় আসলে কেউই কখনো গ্রহণ করে না। সে ক্ষেত্রে ধরেই নেয়া হয় যে, এটি হচ্ছে এ দেশে জনগণের ভাগ্যের নির্মম পরিহাস!

উল্লেখ্য, ১৯৯১-পরবর্তী বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সমাজ ও অর্থনীতির একটি উল্লেখযোগ্য প্রবণতা হয়ে দাঁড়িয়েছে কথায় কথায় রাষ্ট্রের বিভিন্ন যৌক্তিক সিদ্ধান্তকেও স্থগিত, পরিবর্তন বা সংশোধনের জন্য হীন উদ্দেশ্যে আদালতের শরণাপন্ন হওয়া। উদাহরণস্বরূপ: কেউ একজন হয়তো প্রশাসনের উদাসীনতার সুযোগ নিয়ে কিংবা তাদের কারো সঙ্গে গোপন যোগসাজশে রাষ্ট্রের খাসজমি বেআইনিভাবে দখল করেন সেখানে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ করে ভোগদখল করছে। এ অবস্থায় সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান যদি ওই জমি থেকে অবৈধ দখলদারকে উচ্ছেদ করতে যায়, প্রচলিত প্রবণতা অনুযায়ী ওই দখলদার তখন আদালতে গিয়ে প্রায় সঙ্গে সঙ্গে ওই উচ্ছেদের বিরুদ্ধে একটি নিষেধাজ্ঞা ও স্থিতাবস্থা বজায় রাখার আদেশ নিয়ে আসেন এবং দফায় সে নিষেধাজ্ঞা ও আদেশের মেয়াদ বাড়িয়ে চলেন। আর এর ফলে বছরের পর বছর ধরে ওইসব খাসজমি বা রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি অবৈধ দখলদারদের ভোগ ও নিয়ন্ত্রণের আওতাতেই থেকে যায় এবং প্রায় কখনই তা দখলমুক্ত হয় না কিংবা রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি রাষ্ট্রের দখলে থাকে না। অবশ্য বলা প্রয়োজন যে, এসব ঘটনায় অধিকাংশ ক্ষেত্রে সম্পদ-সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর একশ্রেণীর অসৎ কর্মচারী ও আইনজীবীর গোপন যোগসাজশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে বলে জানা ও শোনা যায়। বেহুন্দি জালে মাছ ধরা অব্যাহত রাখার ক্ষেত্রেও এমনটি আছে কিনা, তা খতিয়ে দেখার দাবি রাখে।

মিঠাপানির মাছ উৎপাদনে পৃথিবীর দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান একসময় চার/পাঁচ দিকের থাকলেও বর্তমানে তা দশম স্থানে নেমে এসেছে। অন্যদিকে সামগ্রিক মৎস্য রফতানিতে বাংলাদেশের অবস্থান এখন ১৮তম। আর উল্লিখিত উভয় ক্ষেত্রেই চীনের অবস্থান ১ নম্বরে এবং প্রতিবেশী ভারতের অবস্থান যথাক্রমে ষষ্ঠ ও পঞ্চম। এ অবস্থায় মোটামুটি বিশাল সমুদ্র উপকূল এবং বিপুলসংখ্যক খাল-বিল, নদী-নালা ও হাওর-বাঁওড় পরিবেষ্টিত বাংলাদেশের জন্য এ চিত্র কি আদৌ সুখকর? আমরা প্রায় রফতানি বৃদ্ধির লক্ষ্যে রফতানিপণ্যের বহুমুখীকরণ ও বিকল্প পণ্য অনুসন্ধানের কথা বলি। সে ক্ষেত্রে সমুদ্রাঞ্চল ও মিঠাপানির জলাভূমি উভয় ক্ষেত্রেই উৎপাদন বাড়িয়ে মাছকে কি অচিরেই বাংলাদেশের শীর্ষ পর্যায়ের রফতানি পণ্যে উন্নীত করা যায় না? কিন্তু বেহুন্দি জালে মাছ ধরা অব্যাহত রেখে সেটি কতটুকু সম্ভব? এ প্রথা বন্ধ হলেই মাছ উৎপাদনে রাতারাতি বাংলাদেশের অবস্থান অনেক ওপরে ওঠে যাবে, তা হয়তো নয়। কিন্তু এ ক্ষেত্রে বেহুন্দি জাল অবশ্যই একটি বড় বাধা। আর তার চেয়েও বড় কথা, এ জাল শুধু মাছের প্রজনন, বিচরণ ও বিস্তারকেই বিনষ্ট করছে না—মাছসহ সমুদ্রের অন্য সব প্রাণী এবং শেওলা ও ছত্রাকের অস্তিত্বকেও ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। অর্থাৎ বেহুন্দি জালের সংখ্যা ও জালবাহী ট্রলারের বিচরণক্ষেত্রকে আপাতদৃষ্টে যতটা ছোট ও সীমিত পরিসরের বলে মনে হচ্ছে, বাস্তবে এর প্রভাব ও ক্ষতির মাত্রা তারচেয়ে অনেক বেশি। বাংলাদেশের সমুদ্র উপকূলীয় অঞ্চলের জীববৈচিত্র্যের জন্য বেহুন্দি জাল বস্তুতই অতি বড় ধরনের এক হুমকি। আর জনগণের পুষ্টি চাহিদা পূরণের পথেও এটি একটি বড় বাধা।

এমতাবস্থায় বিষয়টির প্রতি অন্তত দুটি কারণে মহামান্য উচ্চ আদালতের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি: এক. গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের সূত্রে দেশের সাধারণ মানুষ জানতে পারছে যে, এক শ্রেণীর অসাধু মৎস্য ব্যবসায়ী অসৎ উদ্দেশ্যে আদালতকে ব্যবহার করে নিজেদের ফাঁয়দা হাসিল করছে। ফলে ওইসব অসৎ ধূর্ত ব্যবসায়ী যাতে হীন উদ্দেশ্য আদালতকে ব্যবহার করতে না পারে, তজ্জন্য এ ব্যাপারে মহামান্য আদালতের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। দুই. মৎস্য সম্পদের উন্নয়ন ও রফতানি বৃদ্ধির পথে বেহুন্দি জাল একটি বড় বাধা। ফলে মহামান্য আদালতের হস্তক্ষেপ যদি সে বাধা অপসারণে সহায়ক হয়, তাহলে দেশের বৃহত্তর স্বার্থে সাধারণ মানুষ সে ধরনের হস্তক্ষেপের প্রত্যাশা করতেই পারে। আর এই সূত্রে একটি বিনীত প্রত্যাশা: কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যখন আদালতের কাছে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কোনো নালিশ করেন, তখন রাষ্ট্রপক্ষ যেন সে বিষয়ে যথাযথ কাগজপত্র, দলিলাদি ও উপযুক্ত যুক্তিগুলো আদালতের সামনে পেশ করেন—সে বিষয়ে রাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগের প্রতি একটি নির্দেশনা জারি করা হোক। কারণ নির্বাহী বিভাগ এ কাজটি বর্তমানে মোটেও যথাযথ গুরুত্ব ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে সম্পন্ন করছে না। যদি করত তাহলে দেশের মৎস্য সম্পদ বিনষ্টকারী বেহুন্দি জালের বিস্তার আজ এতগুলো জেলায় এত দ্রুততার সঙ্গে এত বড় সংখ্যায় ঘটতে পারত না। বাংলাদেশের উচ্চ আদালত রাষ্ট্র ও জনগণের বৃহত্তর স্বার্থে বহুবারই স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে বহু নির্দেশনা ও রুল জারি করেছেন। আশা করব, বেহুন্দি জাল নিষিদ্ধকরণের মাধ্যমে দেশের মৎস্য সম্পদের উন্নয়নের জন্যও সেভাবেই জনপ্রত্যাশার পরিপূরণ ঘটবে।

আবু তাহের খান: অ্যাডজাঙ্কট ফ্যাকাল্টি, ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগ, প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটি; সাবেক পরিচালক, বিসিক, শিল্প মন্ত্রণালয়