জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন একটি রাষ্ট্রের মৌলিক নাগরিক সেবা। একজন নাগরিকের অস্তিত্ব রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় জন্ম নিবন্ধনের মাধ্যমে। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, ভোটার তালিকা, পাসপোর্ট, সম্পত্তি হস্তান্তর কিংবা উত্তরাধিকার—প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই জন্মসনদ প্রাথমিক শর্ত। একইভাবে মৃত্যু নিবন্ধনও রাষ্ট্রের জনস্বাস্থ্য, পরিসংখ্যান ও উন্নয়ন পরিকল্পনার জন্য অপরিহার্য। উন্নত বিশ্বে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন নাগরিক সেবা, সামাজিক নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনার অন্যতম ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সেসব দেশে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনকে নাগরিক অধিকার ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব হিসেবে দেখা হয়। ফলে এটি শতভাগ কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা হয়। কিন্তু বাংলাদেশের জন্ম ও মৃত্যুর নিবন্ধন থেকে শুরু করে অর্থনীতির প্রায় প্রতিটি খাতের তথ্যই প্রশ্নবিদ্ধ। বিভিন্ন সংস্থা ভিন্ন ভিন্ন তথ্য দেয়। কোনো তথ্যের ওপরই শতভাগ নির্ভর করা যায় না। আবার সংস্থাগুলো যেসব তথ্য হালনাগাদ হিসেবে প্রকাশ করে সেগুলোও কয়েক বছরের পুরনো। ফলে তথ্যের গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন কার্যক্রম চালু রয়েছে। অথচ এখনো বাংলাদেশে জন্ম ও মৃত্যুর নির্ভরযোগ্য ও হালনাগাদ তথ্যভাণ্ডার গড়ে তোলা যায়নি। এর অন্যতম কারণ পরিসংখ্যান প্রণয়নকারী সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতা। এ সমন্বয়হীনতা দূর করে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের সঠিক ও নির্ভরযোগ্য হালনাগাদ তথ্যভাণ্ডার গড়ে তোলা এখন অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।
উন্নত দেশগুলোয় শিশুর জন্মের সঙ্গে সঙ্গেই তার জন্ম নিবন্ধন করা হয়। এ পরিচয়ের মাধ্যমেই সে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক নিরাপত্তা, ভোটাধিকার ও অন্যান্য সরকারি সুবিধা গ্রহণ করে। বিশ্বের অনেক দেশে জন্ম নিবন্ধন না থাকলে স্কুলে ভর্তি, চিকিৎসা সুবিধা বা এমনকি পাসপোর্ট পাওয়া সম্ভব নয়। তাই উন্নত দেশগুলোয় জন্ম সনদকে নাগরিক জীবনের প্রাথমিক ধাপ হিসেবে গণ্য করা হয়। অন্যদিকে উন্নত বিশ্বের দেশগুলোয় মৃত্যুর সনদ ছাড়া সম্পত্তি বণ্টন, বীমা দাবি, উত্তরাধিকার নির্ধারণ করা যায় না। একই সঙ্গে মৃত্যুর তথ্য জনস্বাস্থ্য পরিকল্পনা, রোগ প্রতিরোধ কর্মসূচি ও বয়স্ক জনগোষ্ঠীর সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অর্থাৎ উন্নত দেশগুলোয় জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন রাষ্ট্রীয় পরিসংখ্যান ও উন্নয়ন পরিকল্পনার মূল ভিত্তি। এসব তথ্য ব্যবহার করে সরকার জনসংখ্যার বৃদ্ধি, গড় আয়ু, শিশুমৃত্যুর হার, স্বাস্থ্য খাতের চাহিদা ও সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি নির্ধারণ করে। নির্ভুল তথ্যভাণ্ডার থাকায় সেখানে বাজেট পরিকল্পনা, নীতিনির্ধারণ ও সম্পদ বণ্টন আরো কার্যকর হয়।
কিন্তু বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত যত জন্ম নিবন্ধন হয়েছে, এর মধ্যে অনেকগুলোরই দ্বৈততা রয়েছে। তাছাড়া জন্ম নিবন্ধনের মোট সংখ্যাকে প্রকৃত নিবন্ধিত সংখ্যা হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। অনেকে একাধিক জায়গা থেকে জন্ম নিবন্ধন নিয়েছেন। কোনো ব্যক্তির একক জন্ম বা মৃত্যু নিবন্ধন নিশ্চিত করা যাচ্ছে না এখনো। সরকারি নথি ই-ডকুমেন্টে, এমনকি জাতীয় পরিচয়পত্র ও পাসপোর্টও ডাটাবেজের সঙ্গে যুক্ত। এর পরও এখন পর্যন্ত দেশের জনসংখ্যার সঠিক তথ্য নিয়ে একেক প্রতিষ্ঠান একেক রকম তথ্য দিচ্ছে। নির্বাচন কমিশনের (ইসি) হিসাবে বর্তমানে দেশের মোট জনসংখ্যা ১৯ কোটি। অন্যদিকে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২ অনুযায়ী, দেশের জনসংখ্যা ১৬ কোটি ৯৮ লাখ ৩০ হাজার। এছাড়া সংস্থাটির স্যাম্পল ভাইটাল রেজিস্ট্রেশন সিস্টেম (এসভিআরএস) ২০২৩ অনুযায়ী, জনসংখ্যা ১৭ কোটি ২৯ লাখ ২০ হাজার। আবার জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের (ইউএনএফপিএ) বিশ্ব জনসংখ্যা পরিস্থিতি ২০২৫ প্রতিবেদন জানাচ্ছে, বাংলাদেশের জনসংখ্যা ১৭ কোটি ৫৭ লাখ। অর্থাৎ সরকারি দুই সংস্থা ও আন্তর্জাতিক সংস্থার পরিসংখ্যানে এক থেকে আড়াই কোটি মানুষের অমিল থেকে যাচ্ছে।
অন্যদিকে এসভিআরএস ২০২৩-এর চূড়ান্ত প্রতিবেদনের তথ্যানুসারে, দেশে প্রতি বছর গড়ে ১০ লাখ ৪১ হাজার ৩৩১ জন মৃত্যুবরণ করে। বর্তমানে স্থানীয় সরকার বিভাগের আওতাধীন রেজিস্ট্রার জেনারেল কার্যালয়ের জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন বিভাগ জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এ কার্যালয়ের জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে ৭ লাখ ৩০ হাজার ৯৩৬ জন বা অন্তত ৭০ শতাংশ মানুষের মৃত্যু নিবন্ধন করা হয়েছে। ফলে ৩ লাখ ১০ হাজার ৩৯৫ জন বা প্রায় ৩০ শতাংশ মৃত ব্যক্তি নিবন্ধনের বাইরে রয়েছে।
এ পরিসংখ্যান থেকে স্পষ্ট জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের সঠিক তথ্য সরকারের কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছেই নেই। এর পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ রয়েছে। প্রথমত, প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়ের অভাব। ভিন্ন প্রতিষ্ঠান ভিন্নভাবে তথ্য গ্রহণ করে তা প্রকাশ করে। ফলে একই বিষয়ে একাধিক পরিসংখ্যান তৈরি হয় ও তাতে গরমিল দেখা দেয়। এছাড়া বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের তথ্য হালনাগাদ ও যাচাই করার সমন্বিত কোনো ব্যবস্থা নেই। দ্বিতীয়ত, নিয়মিত ও নির্ভুল জরিপের অভাব। বাংলাদেশে জরিপগুলো একেক প্রতিষ্ঠান একেক সময়ে করে। ফলে তথ্যের ধারাবাহিকতা ও নির্ভরযোগ্যতা থাকে না। অনেক ক্ষেত্রেই জরিপ শেষ হওয়ার পর ফলাফল প্রকাশে দীর্ঘ সময় লেগে যায়। ফলে তথ্য পুরনো হয়ে পড়ে। তৃতীয়ত, রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও অগ্রাধিকারহীনতাও সঠিক তথ্য নিশ্চিতে প্রতিবন্ধতা তৈরি করছে। জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনকে উন্নয়ন পরিকল্পনার কেন্দ্রীয় উপাদান হিসেবে গুরুত্ব দেয়া হয়নি। ফলে সঠিক তথ্য প্রকাশ এখনো উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে। এছাড়া দেশের জনগণের মধ্যে সচেতনতার অভাবও প্রকট। অনেক মানুষ এখনো জানে না জন্ম বা মৃত্যু নিবন্ধন কেন জরুরি। গ্রামীণ এলাকাগুলোয় নাগরিকরা মনে করেন নিবন্ধন শুধু কাগজের আনুষ্ঠানিকতা, এর প্রকৃত প্রয়োজন সম্পর্কে তারা এখনো সচেতন নন।
উন্নয়ন পরিকল্পনা, জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা, বাজেট বণ্টন এবং সুশাসনে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন নিশ্চিত করার অন্যতম গুরত্বপূর্ণ মাধ্যম জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন। জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনের ক্ষেত্রেও জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে বিবেচিত। এ লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে জন্ম নিবন্ধন শতভাগ এবং মৃত্যু নিবন্ধন ৮০ শতাংশ করতে হবে। কিন্তু বেশকিছু আইনি দুর্বলতা এ লক্ষ্য পূরণে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশ যেমন মালদ্বীপ ও শ্রীলংকা এরই মধ্যে প্রায় সর্বজনীন নিবন্ধন নিশ্চিত করেছে, সেখানে বাংলাদেশ এখনো অনেক পিছিয়ে। উন্নত দেশগুলোয় নিবন্ধন প্রক্রিয়া হাসপাতালভিত্তিক। বাংলাদেশে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন আইন, ২০০৪ সংশোধন করে হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানকে আইনগতভাবে নিবন্ধনের দায়িত্ব দেয়া উচিত। এতে স্বাস্থ্যসেবার আওতায় জন্ম নেয়া শিশুরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিবন্ধনের আওতায় আসবে। পাশাপাশি মৃত্যু নিবন্ধন নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে উত্তরাধিকার, সামাজিক নিরাপত্তা ও নারীর অধিকার সুরক্ষা করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে নিবন্ধন তথ্য ব্যবহার করে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) মাধ্যমে ‘ভাইটাল স্ট্যাটিস্টিকস’ প্রস্তুত বাধ্যতামূলক করা উচিত।
নিবন্ধন প্রক্রিয়া একটি রাষ্ট্রের সুশাসন, সামাজিক নিরাপত্তা ও উন্নয়ন পরিকল্পনার অপরিহার্য ভিত্তি। তাই প্রতিটি নাগরিকের উচিত সময়মতো জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন সম্পন্ন করা। রাষ্ট্রেরও দায়িত্ব এ প্রক্রিয়াকে আরো সহজ, স্বচ্ছ ও প্রযুক্তিনির্ভর করে তোলা। তাই জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের প্রকৃত তথ্য নিশ্চিত করতে কঠোর আইন প্রয়োগ, হাসপাতালভিত্তিক নিবন্ধন, একক ডাটাবেজ, প্রশাসনিক সমন্বয় ও নাগরিক সচেতনতার ওপর জোর দিতে হবে। বাংলাদেশ যদি উন্নত দেশগুলোর সফল মডেলগুলো অনুসরণ করে প্রযুক্তিনির্ভর ও সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারে, তবেই জনমিতিক তথ্য ব্যবস্থাপনায়ও শৃঙ্খলা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।










