বর্তমান সময়ে আমাদের সামনে দুটি বড় চ্যালেঞ্জ দাঁড়িয়ে আছে: শিল্পক্ষেত্রকে আধুনিকায়নের মাধ্যমে অর্থনৈতিক শক্তি বাড়ানো, আর চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের প্রেক্ষাপটে উচ্চশিক্ষাকে নতুন রূপে সাজানো। এ দুটি ইস্যু আলাদা নয়, বরং গভীরভাবে পরস্পর সম্পর্কিত। প্রশ্ন হলো আমরা কি ধীরে ধীরে পরিবর্তনের পথে হাঁটব, যাতে প্রতিষ্ঠান ও সমাজের অভিযোজন সহজ হয়, নাকি দরকার একটি সাহসী পদক্ষেপ, যা আমাদের দ্রুত বৈশ্বিক রূপান্তরের ধারায় যুক্ত করবে?

দশকের পর দশক ধরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নির্ভর করেছে কম খরচের শ্রমের ওপর—গার্মেন্টস, জুতা, চামড়া, কৃষি, মৎস্য ও সেবাক্ষেত্রে। এ মডেল অর্থনৈতিক লাভ দিয়েছে, তবে স্বয়ংক্রিয়তা, রোবোটিকস ও ইন্টারনেট অব থিংসের সঙ্গে সংযুক্ত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দ্বারা পরিচালিত বিশ্বে দীর্ঘমেয়াদি প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করতে পারে না। ‘‌স্মার্ট লেবারের’ দিকে বিশ্বব্যাপী পরিবর্তন স্পষ্টভাবে দেখাচ্ছে, বাংলাদেশকে তার দৃষ্টিভঙ্গি পুনর্বিবেচনা করতে হবে।

কেবল শিল্প খাতের ওপর ভরসা করে এ অগ্রযাত্রা সম্ভব নয়। যদি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সৃজনশীল, অভিযোজনক্ষম ও ডিজিটাল দক্ষতাসম্পন্ন স্নাতক তৈরি করতে ব্যর্থ হয়, তবে শিল্পের আধুনিকায়নও বাধাগ্রস্ত হবে। এরই মধ্যে অনেক এশীয় দেশ শিল্পোন্নয়নের পাশাপাশি উচ্চশিক্ষায় সংস্কার এনেছে, যাতে তারা প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকতে পারে। বাংলাদেশের সামনে চ্যালেঞ্জ দ্বিমুখী: পোশাক, ওষুধ, মৎস্য ও কৃষি প্রসেসিং খাতে মানোন্নয়নে উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং ঠিক করা—এ পরিবর্তন ধাপে ধাপে ঘটানো হবে, নাকি প্রয়োজন এক যুগান্তকারী রূপান্তর।

ধাপে ধাপে পরিবর্তনের পথ স্থিতিশীলতা দেয়। শিল্প, প্রতিষ্ঠান ও কর্মী পর্যায়ক্রমে মানিয়ে নিতে পারে—স্বয়ংক্রিয়তা ধাপে ধাপে প্রবর্তন, কর্মীদের পুনঃপ্রশিক্ষণ, বিশ্ববিদ্যালয় নতুন পাঠ্যক্রমের পাইলট চালু করে সম্পূর্ণরূপে রোলআউটের আগে পরীক্ষা করা। তবে ঝুঁকি হলো খুব ধীরে চললে বাংলাদেশ কম মূল্যের কর্মকাণ্ডে আটকে যাবে, যখন প্রতিদ্বন্দ্বীরা দ্রুত এগিয়ে যাবে।

যুগান্তকারী পরিবর্তন সাহসী নীতি, দ্রুত প্রযুক্তি গ্রহণ ও উচ্চশিক্ষার দ্রুত সংস্কারের দাবি রাখে। ঝুঁকি বাস্তব—প্রতিরোধ, খরচ এবং স্বল্পমেয়াদি ব্যাঘাত। কিন্তু সুফলও একইভাবে রয়েছে। অপেক্ষা করলে যে ক্ষতি হবে, তা আরো বেশি: এমন এক দৌড়ে পিছিয়ে পড়া যেখানে বিলম্ব মানে প্রাসঙ্গিকতার অভাব।

জনবহুল দেশগুলোতে স্বাভাবিকভাবেই এক ধরনের দুশ্চিন্তা কাজ করে—স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি যত বাড়বে, ততই মানুষের কাজের ক্ষেত্র সংকুচিত হতে পারে। এর প্রভাব পড়তে পারে বেকারত্ব ও সামাজিক স্থিতিশীলতার ওপর। তবে ইন্ডাস্ট্রি-৪ থেকে ইন্ডাস্ট্রি-৫-এ উত্তরণ এক নতুন আশ্বাস দেয়। কারণ ইন্ডাস্ট্রি-৫ মানুষের ভূমিকাকে আবারো সামনে আনে, যেখানে সৃজনশীলতা, পারস্পরিক সহযোগিতা ও স্থায়িত্বকে অগ্রাধিকার দেয়া হয়।

ইন্ডাস্ট্রি-৪-এর মূল বৈশিষ্ট্য যন্ত্র ও ডিজিটাল সিস্টেমের প্রাধান্য, যেখানে মানুষকে প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মেলাতে হয়। কিন্তু ইন্ডাস্ট্রি-৫ মানুষ ও উন্নত প্রযুক্তিকে একত্র করে—কোবট, জেনারেটিভ এআই ও ডিজিটাল টুইনের মতো উদ্ভাবন মানুষের সঙ্গে মিলে সমাধান তৈরি করে। ইন্ডাস্ট্রি-৪-এ একটি গাড়ি কারখানা রোবট ও আইওটি ব্যবহার করে দ্রুত উৎপাদন নিশ্চিত করে, আর ইন্ডাস্ট্রি-৫-এ একই কারখানায় রোবটরা মানুষের পাশে কাজ করে; গাড়িগুলো হয় পুনর্ব্যবহারযোগ্য নকশায় তৈরি, চলে নবায়নযোগ্য শক্তিতে ও উদ্ভাবনের চালিকাশক্তি না হয় মানব সৃজনশীলতা। উভয় ক্ষেত্রেই আসল চালক হলো স্মার্ট, অভিযোজ্য কর্মীশক্তি। জাপান, চীন, ভারত ও দক্ষিণ কোরিয়া এরই মধ্যে নেতৃত্ব দিচ্ছে—জাপান ধারণাগত কাঠামো দিয়ে, চীন ও ভারত দ্রুত সম্প্রসারণে আর দক্ষিণ কোরিয়া ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাসে। তবে এশিয়ার বহু অংশে ইন্ডাস্ট্রি-৫ এখনো শুরুর পথে, যেখানে বড় ধরনের ডিজিটাল রূপান্তর আসার অপেক্ষায়।

বাংলাদেশের জন্য চতুর্থ শিল্প বিপ্লব এক বিরল সুযোগ এনে দিয়েছে। এটি শুধু গার্মেন্টসের গণ্ডি পেরিয়ে যাওয়ার নয়, বরং একটি বৈচিত্র্যময়, টেকসই ও উদ্ভাবননির্ভর শিল্পভিত্তি গড়ে তোলার সুযোগ। যদি আমরা কেবল আমদানি প্রযুক্তির ওপর নির্ভর না করে নিজস্ব উদ্ভাবন কেন্দ্র গড়ে তুলতে পারি, তবে শিল্প, বিশ্ববিদ্যালয় ও স্টার্টআপ মিলে নবায়নযোগ্য শক্তি, এগ্রো-টেক, ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা এবং জলবায়ু সহনশীলতায় নতুন সমাধান তৈরি করতে সক্ষম হবে। সাহসী পদক্ষেপ যদি নেয়া যায় ব্লকচেইন, ফিনটেক, ই-কমার্স ও সার্কুলার অর্থনীতির মতো খাতে, তবে বাংলাদেশ নতুন শিল্প যুগে কেবল অংশগ্রহণকারী নয়, আঞ্চলিক নেতৃত্বের আসনে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।

প্রযুক্তি শুধু উৎপাদন বাড়ায় না, এটি নতুন সম্ভাবনার দ্বারও খুলে দেয়। ফার্মাসিউটিক্যাল ও এগ্রো-টেক খাত সেই উদাহরণ। বায়োটেকনোলজি, জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং এবং এআই-চালিত ওষুধ উদ্ভাবনের মাধ্যমে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার বায়োফার্মা হাব হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে। এদিকে আইওটি সেন্সর, ড্রোন ও এআই কৃষি খাতকে স্মার্ট কৃষিতে রূপান্তরিত করবে—অপচয় হ্রাস, ফলন বৃদ্ধি ও রফতানিযোগ্য মানসম্মত খাদ্য প্রসেসিং সম্ভব হবে।

বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার সামনে সমান্তরাল চ্যালেঞ্জ রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখনো ‘‌চক ও ডাস্টার’ শিক্ষার সঙ্গে পরীক্ষাকেন্দ্রিক মূল্যায়নের মধ্যে আবদ্ধ। ফলে স্নাতকরা ডিগ্রি নিয়ে বের হয়, কিন্তু সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা, সমস্যা সমাধান, অভিযোজনযোগ্যতা ও ডিজিটাল দক্ষতা নিয়ে বের হন না। নিয়োগকর্তারা চায় উদ্ভাবক, রুটিন শিক্ষার্থী নয়।

চতুর্থ শিল্প বিপ্লব আমাদের সঙ্গে হোক বা না হোক, তা দ্রুত এগিয়ে চলেছে। তাই মূল প্রশ্ন হলো—কীভাবে পরিবর্তন আনা যায়। বাংলাদেশের সবচেয়ে কার্যকর কৌশল হতে পারে মিশ্র পদ্ধতি: শ্রমনিষ্ঠ খাতগুলোয় ধাপে ধাপে পরিবর্তন, উদীয়মান শিল্পে দ্রুত পদক্ষেপ। যদি শিল্প ও বিশ্ববিদ্যালয় একসঙ্গে এগোয়, বাংলাদেশ কেবল টিকে থাকা পর্যায় পেরিয়ে নেতৃত্বের আসনে উঠবে—উদ্ভাবন, স্থায়িত্ব ও মানব উন্নয়নের কেন্দ্রে রেখে। সময় এখনই কাজ করার।

এমএম শহিদুল হাসান: ডিস্টিংগুইশড প্রফেসর, ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি ও সাবেক উপাচার্য, ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি