তথ্যপ্রযুক্তির যুগে ইন্টারনেট এখন বিশ্বের উন্মুক্ত জ্ঞানভাণ্ডারে প্রবেশপথের চাবিকাঠি। ইন্টারনেটের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ডিজিটাল প্রযুক্তিনির্ভর সব কর্মকাণ্ড। ব্যবসা-বাণিজ্য, প্রশাসন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, চিকিৎসা, কৃষি, শিল্প, ব্যাংক ব্যবস্থাসহ সরকারের প্রায় সব সেবাই ডিজিটাল প্রযুক্তিনির্ভর। অনলাইনে পাঠদান, এমনকি টেলিমেডিসিন সেবা গ্রহণেও অনলাইন-নির্ভরতা বেড়েছে। প্রশ্ন হলো এভাবে ইন্টারনেট-নির্ভরতা বাড়া সত্ত্বেও এত উচ্চ মূল্য হলে বাংলাদেশ কীভাবে এগোবে? বর্তমান বিশ্ব প্রেক্ষাপট বিবেচনায় বলা যায়, সাশ্রয়ী মূল্যের ইন্টারনেট সেবা নিশ্চিত করার বিকল্প নেই। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রকৃত মানবসম্পদ তৈরিতে ইন্টারনেট এখন একটি মৌলিক অনুষঙ্গ। সার্বিক দিক বিবেচনায় তথ্যপ্রযুক্তির যুগে সাশ্রয়ীমূল্যে ইন্টারনেট সেবা নিশ্চিত করতে সরকারের গ্রাহকবান্ধব নীতি গ্রহণ করা উচিত। দেশের উন্নয়নের স্বার্থে ইন্টারনেট সেবাকে জনবান্ধব করতে যৌক্তিক কর ও শুল্ক কাঠামো গ্রহণ করা দরকার।
আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইডথের প্রবাহ নিশ্চিত করে রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিকম অপারেটর বাংলাদেশ সাবমেরিন কেবলস পিএলসি (বিএসসিপিএলসি) এবং বেসরকারি খাতের ইন্টারন্যাশনাল টিরেস্ট্রিয়াল কেবল অপারেটর। এ দুই অপারেটর ইন্টারনেট সরবরাহ করে মূলত ইন্টারন্যাশনাল ইন্টারনেট গেটওয়ে (আইআইজি) অপারেটরদের কাছে। আইআইজি অপারেটররা মোবাইল নেটওয়ার্ক অপারেটর (এমএনও), ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডারদের (আইএসপি) ব্যান্ডউইডথ সরবরাহ করে। এমএনও অপারেটররা ইন্টারনেট সেবা দিতে টাওয়ার কোম্পানির ওপর নির্ভরশীল। আর সব অপারেটর সেবা নিতে নির্ভর করতে হয় নেশনওয়াইড টেলিকমিউনিকেশন ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক (এনটিটিএন) অপারেটরের ওপর। অর্থাৎ গ্রাহক পর্যন্ত ইন্টারনেট সেবা দিতে অতিক্রম করতে হয় সাতটি ধাপ। প্রতিটি ধাপ থেকেই বিপুল পরিমাণ অর্থ আদায় করে সরকার। একটি অংশ নেয় বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) এবং অন্য একটি অংশ আদায় করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এ কারণে ইন্টারনেট ডাটার দাম কমার বদলে দিন দিন বেড়েই চলেছে। এজন্য প্রতি স্তরে কর ও শুল্ক আদায়ের পরিবর্তে একটি যৌক্তিক কর ও শুল্ক কাঠামো গ্রহণ করা উচিত। এর মাধ্যমে মোবাইল ফোন অপারেটরগুলোর ডাটা প্যাকেজগুলোও জনবান্ধব করা দরকার। যাতে ইন্টারনেট সেবা গ্রাহকের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে থাকে এবং সব মানুষ সাশ্রয়ী মূল্যে সেবা গ্রহণ করতে পারে। এটা নিশ্চিত করা না গেলে দেশের মানুষ প্রযুক্তির অগ্রসরতায় ও বিশ্বায়নের যুগে পিছিয়ে পড়বে।
বাংলাদেশে জিডিপিতে টেলিকম খাতের অবদান মাত্র ১ শতাংশ। কিন্তু সরকারের রাজস্ব আয়ের ৫ শতাংশই আসে এ খাত থেকে। অথচ মার্চেন্ট, পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত এবং অ-তালিকাভুক্ত ব্যাংক, ইন্স্যুরেন্স ও অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানের তুলনায় মোবাইল খাতের ওপর করপোরেট কর বেশি। পাশাপাশি নিয়ন্ত্রক সংস্থার অর্থ আদায়ে বাধ্যবাধকতা রয়েছে। রেভিনিউ শেয়ার, সামাজিক দায়বদ্ধতা তহবিল ফান্ড (এসওএফ) ও ভ্যাটসহ বিভিন্ন ব্যয় বাদ দিলে ইন্টারনেট সেবার ব্যয়ের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ কমিয়ে আনা সম্ভব। এ ধরনের পদক্ষেপ নেয়া হলে ইন্টারনেট ব্যবহার বাড়ার পাশাপাশি মানুষের প্রবেশগম্যতা বৃদ্ধি পাবে।
দেশে ডাটার ব্যবহার বাড়ছে। পাশাপাশি আইএসপি (ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার) অপারেটরদের দেয়া ব্রডব্যান্ড সংযোগেরও গ্রাহক বেড়েছে। তবে সিংহভাগ গ্রাহকই সেলফোন অপারেটরদের ইন্টারনেট সেবা ব্যবহার করছে। ফোরজি প্রযুক্তি অপারেটরদের ডাটাভিত্তিক সেবা আরো সম্প্রসারণের সুযোগ এনে দিয়েছে। এটিকে কাজে লাগিয়ে অপারেটররা ব্যবসা করলেও সাশ্রয়ী মূল্যে ইন্টারনেট সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে গ্রাহক। অনেকের অভিযোগ, উচ্চ গতি ও উন্নত সেবার বিজ্ঞাপন প্রচার করা হচ্ছে সর্বক্ষণ। তাদের মতে, মোবাইল অপারেটরগুলো প্রতি বছর শত শত কোটি টাকা খরচ করে তাদের বিভিন্ন প্যাকেজ ও সেবার বিজ্ঞাপন প্রচারের ক্ষেত্রে। এছাড়া রেভিনিউ শেয়ার, সামাজিক দায়বদ্ধতা তহবিল ফান্ড (এসওএফ) ও ভ্যাটের মাধ্যমে সরকার বিপুল পরিমাণ অর্থ আয় করছে। কোম্পানিগুলোর বিজ্ঞাপন খাতে অপ্রয়োজনীয় অর্থ খরচ কমানো ও সরকারের রেভিনিউ শেয়ার, সামাজিক দায়বদ্ধতা তহবিল ফান্ড (এসওএফ) ও ভ্যাটের মাধ্যমে আয় বাদ দিলেই গ্রাহককে সাশ্রয়ী মূল্যে ইন্টারনেট সেবা দেয়া সম্ভব হবে। এছাড়া নেটওয়ার্কের বেহাল, কল ড্রপসহ গ্রাহক হয়রানির কোনো শেষ নেই। অপারেটরদের শহরকেন্দ্রিক মনোযোগ বেশি। কিন্তু গ্রামে তাদের মনোযোগ কম। ফলে গ্রাম এলাকায় ফোরজি সেবা এখনো পর্যাপ্ত নয়। অপারেটরগুলোকে গ্রাম ও শহরকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। কেননা উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে তথ্যপ্রযুক্তি সেবা পৌঁছেছে।
মোবাইল ইন্টারনেটের গতির দিক থেকে এগিয়ে থাকা দক্ষিণ কোরিয়া ও সিঙ্গাপুরের ব্যবস্থাটি অনুসরণ করা যেতে পারে। দেশ দুটি নিয়মিত সেবার মান পর্যবেক্ষণ করে। সময়ে সময়ে অপারেটরদের পরামর্শ গ্রহণ ও তাদের ওপর বিভিন্ন নির্দেশনার মাধ্যমে সেবার মান বাড়িয়ে চলেছে। এর সুবিধাও দেশগুলো পাচ্ছে। প্রযুক্তি ব্যবহারের দিক থেকেও তারা এগিয়ে। সেবার মান উন্নয়নে তারা নির্দিষ্ট গাইডলাইন প্রণয়ন করেছে। দক্ষিণ এশিয়ায় মোবাইল ইন্টারনেটের সেবার মান অনেকে ভালো মালদ্বীপে। প্রযুক্তির উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে ইন্টারনেট সেবা উন্নয়নের গুরুত্ব বাড়ছে। ই-কমার্স থেকে শুরু করে অনেক কাজেই নিয়মিত ইন্টারনেট ব্যবহার হচ্ছে। প্রায় প্রতিটি দেশই নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী সাশ্রয়ী মূল্যে ইন্টারনেট সেবার পাশাপাশি মানোন্নয়নের চেষ্টা করছে। বিশ্বের অন্যান্য এলাকার মতো এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যেও ইন্টারনেট সেবার মানোন্নয়নের প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। বছরের হিসাবে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের দেশগুলোর ইন্টারনেট সেবার গড় গতি উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। এসব ক্ষেত্রে বাংলাদেশের পিছিয়ে থাকার কোনো সুযোগ নেই।
প্রশ্ন হচ্ছে, গ্রাহককে সাশ্রয়ী মূল্যে ইন্টারনেট সেবা দেয়ার উপায় কী? উপায় একটাই—নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে আরো গতিশীল, উদ্যোগী ও উদ্যমী ভূমিকা পালন করতে হবে। সরকারকে গ্রাহকবান্ধব নীতি গ্রহণ করে তা বাস্তবায়ন করতে হবে। সব অপারেটর গ্রাহককে সাশ্রয়ী মূল্যে সেবা দিচ্ছে কিনা সেটা নিশ্চিত করার দায় কিন্তু এ নিয়ন্ত্রক সংস্থারই। মোবাইল অপারেটরগুলোর নেটওয়ার্ক ব্যবস্থাপনায় যে ব্যয় হয় তার বাইরেও বড় ধরনের ব্যয় রয়েছে। এসব ব্যয়ের একটি বড় অংশ সরকারকে দিতে হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে ২০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক, সিম কার্ডপ্রতি ৩০০ টাকা কর, ৪৫ শতাংশ করপোরেট কর, টেলিকম পণ্য আমদানিতে ৫ শতাংশ শুল্ক ইত্যাদি। এছাড়া স্পেকট্রাম বরাদ্দ সরকারের রাজস্ব আয়ের একটি বড় উৎস। বিটিআরসির রেগুলেটরি ফি, সামাজিক দায়বদ্ধতা তহবিলেও অর্থ প্রদান করতে হয় সেলফোন অপারেটরদের। গ্রাহককে সাশ্রয়ী মূল্যে ইন্টারনেট সেবা নিশ্চিত করতে হলে সরকারের গ্রাহকবান্ধব নীতি গ্রহণ করতে হবে।
বাংলাদেশে সেলফোনের বিপ্লব সম্ভব হয়েছে মূলত উন্মুক্ত বাজার ব্যবস্থার কারণে। ফলে এ খাতে বিপুল পরিমাণ বিদেশী বিনিয়োগ ও গ্রাহক বেড়েছে। সর্বোপরি সেলফোন সেবা সর্বসাধারণের যোগাযোগের সহজতর মাধ্যম হয়ে উঠতে সক্ষম হয়েছে এবং এ সেবার মাধ্যমে ব্যাপক পরিসরে অন্যান্য সেবা, যেমন টাকার লেনদেন, ই-কমার্স, ই-কৃষি, অ্যাপসভিত্তিক নানা ধরনের সেবার মাধ্যমে ডিজিটাল অর্থনীতির ভিত তৈরি হচ্ছে। সাধারণ মানুষের যোগাযোগের ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণ, সরকারের রাজস্ব আয়ের অন্যতম উৎস হয়ে ওঠা ও প্রযুক্তির অবিশ্বাস্য পরিবর্তন সব মিলিয়ে এ শিল্পের প্রসার দ্রুত ঘটছে। এখন দরকার এ বিশাল জনগোষ্ঠীকে মানসম্পন্ন সেবার পাশাপাশি সাশ্রয়ী মূল্যে ইন্টারনেট সেবা দেয়া। একটি যৌক্তিক কর ও শুল্ক কাঠামো নিরূপণ করা গেলে গ্রাহককে ইন্টারনেট ব্যবহারে ইতিবাচকভাবে উৎসাহিত করা সম্ভব হবে। এক্ষেত্রে সরকার অতিদ্রুত বিটিআরসি ও এনবিআরের সঙ্গে বিবেচনাপ্রসূত এবং গঠনমূলক আলোচনার মাধ্যমে অতিরিক্ত কর ও শুল্কহার কমানোর বিষয়ে একটি সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নেবে বলে প্রত্যাশা।










