দেশের জ্বালানি খাত আমদানিনির্ভর হওয়ায় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের নাজুক পরিস্থিতিতে হিমশিম খাচ্ছে সরকার। এরই মধ্যে জ্বালানি বিল পরিশোধ করতে ব্যর্থ হওয়ায় বিদ্যুৎ কেন্দ্রে উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো বিড়ম্বনার মুখোমুখিও হয়েছে জ্বালানি বিভাগ। চরম এ সংকটের মুহূর্তেও আমদানিনির্ভরতার নীতি থেকে বের হয়ে আসা সম্ভব হচ্ছে না। বিভিন্ন সূত্র অনুযায়ী প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে দেখা গেছে, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানির সরবরাহ নিশ্চিত করতে চলতি বছর থেকে ২০৩০ সাল পর্যন্ত শুধু তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) ও কয়লা আমদানি করতেই সরকারকে প্রায় ৪২ বিলিয়ন ডলার অর্থ ব্যয় করতে হবে। বিপুল এ অর্থের জোগান কীভাবে হবে তা নিয়ে দুশ্চিন্তার ছায়া ফুটে উঠেছে সংশ্লিষ্টদের মাঝে। কেননা বর্তমানে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ নিয়ে বাংলাদেশ অত্যন্ত নাজুক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
বণিক বার্তায় প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী এ মুহূর্তে দেশের কোষাগারে ৩০ বিলিয়ন ডলারেরও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ নেই। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এ রিজার্ভ সংস্থান নিয়ে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) আপত্তি জানিয়েছে। সংস্থাটির ভাষ্যমতে, রফতানি উন্নয়ন তহবিলসহ (ইডিএফ) অন্যান্য তহবিল এবং সরকারি কয়েকটি সংস্থা ও শ্রীলংকাকে দেয়া ঋণের অর্থ রিজার্ভে দেখানো যাবে না। তাদের হিসাব অনুযায়ী দেশে নিট রিজার্ভের পরিমাণ ২১-২২ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে রয়েছে। আইএমএফের ঋণের শর্ত অনুযায়ী, চলতি মাসের মধ্যে এ নিট রিজার্ভের সংস্থান সাড়ে ২৪ বিলিয়ন ডলারের বেশি করতে হবে। এ শর্ত পূরণ করার ক্ষেত্রে আমদানি নিয়ন্ত্রণসহ নানা পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। কিন্তু চলতি মাসের মধ্যে এ নিট রিজার্ভের শর্ত পূরণ হবে কিনা তা নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারাও শঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জ্বালানি খাতে স্থানীয় সরবরাহ বৃদ্ধিতে মনোযোগ ও বিনিয়োগ বাড়ানো গেলে সংকট অনেকাংশেই এড়ানো সম্ভব হতো। কিন্তু বহিস্থ প্রভাবকের ওপর অতিমাত্রায় সংবেদনশীল এ আমদানিনির্ভরতা থেকে জ্বালানি বিভাগ এখনো বের হতে পারছে না। এজন্য এলএনজির ওপর নির্ভরশীলতাকে দায়ী করা হয়। দেশে এলএনজি আমদানি হয় দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় ও স্পট মার্কেট থেকে ক্রয়ের ভিত্তিতে। সবচেয়ে রক্ষণশীল হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছর থেকে ২০৩০ সাল পর্যন্ত আট বছরে শুধু এলএনজি আনতেই বাংলাদেশের অন্তত ১৯ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন পড়বে। দেশে এলএনজির আমদানি চাহিদা আগামীতে আরো অনেক বেড়ে যাবে। সেক্ষেত্রে ২০৩০ সাল পর্যন্ত এলএনজি আমদানিতে বাংলাদেশের বার্ষিক ব্যয়ও প্রায় দ্বিগুণ হবে বলে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন।
দেশের বিদ্যুৎ খাতের সক্ষমতা মূলত কয়লাভিত্তিক। স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় আগামী বছরের আগেই দেশের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুতের উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় সাত হাজার মেগাওয়াট হওয়ার কথা। বিশেষজ্ঞদের হিসাব অনুযায়ী, এ সক্ষমতা বজায় রাখতে বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোয় বছরে কয়লা প্রয়োজন সাড়ে ২৫ মিলিয়ন টন। প্রতি টনের গড় দাম ১৩০ ডলার ধরে এ পরিমাণ কয়লা আমদানিতে বছরে ৩ দশমিক ৩১ বিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থ প্রয়োজন। সে অনুযায়ী, আগামী বছর থেকে ২০৩০ সাল পর্যন্ত সাত বছরে ২৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থের প্রয়োজন পড়বে। অন্যদিকে দেশের জ্বালানি খাতের মহাপরিকল্পনার বড় একটি অংশ জুড়ে রয়েছে এলএনজি আমদানি। এর মধ্যে আবার নতুন করে গতকাল আরেকটি এলএনজি টার্মিনালের অনুমোদন দেয়া হয়েছে। পাইপলাইনে আরো একটি টার্মিনাল রয়েছে। এভাবে এলএনজি ও কয়লা আমদানির জন্যই বৈদেশিক মুদ্রার সমৃদ্ধ রিজার্ভ দরকার। কিন্তু এক্ষেত্রে কোনো উন্নতি পরিলক্ষিত হচ্ছে না। প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স বৈধ চ্যানেলে আনার উদ্যোগ ব্যাহত হচ্ছে। এক্ষেত্রে প্রণোদনা দেয়ার পরও খুব একটা উন্নতি হয়নি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, প্রবাসীরা মে মাসে ব্যাংকিং চ্যানেলে ১ দশমিক ৬৯ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স দেশে পাঠিয়েছেন। এক্ষেত্রে গত বছরের তুলনায় দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহ প্রায় ১০ দশমিক ২৭ শতাংশ কমে গেছে। প্রবাসী বাংলাদেশীরা ব্যাংকিং চ্যানেলের চেয়ে হুন্ডির মাধ্যমে টাকা পাঠাতে পছন্দ করেন। খোলাবাজারের তুলনায় ব্যাংকিং চ্যানেলে ডলারের দাম কম দেয়া হয় বলে প্রবাসীরা হুন্ডিতে বেশি টাকা পাঠান বলে ব্যাংকাররা মনে করেন। এজন্য প্রবাসীদের কাছে কীভাবে পৌঁছানো যায় সে উদ্যোগ নিতে হবে। কারণ হুন্ডি কারবারিরা প্রবাসীরা যেখানে থাকে সেখানে গিয়ে ডলার সংগ্রহ করে—এমন তথ্য ইতোপূর্বে বণিক বার্তায় প্রকাশ হয়েছে।
জ্বালানি খাতে আমদানিনির্ভরতা দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক ফল বয়ে আনবে না। যে কারণে স্থানীয় সরবরাহের প্রতি গুরুত্বারোপ করা প্রয়োজন। কেননা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগামী তিন-চার বছর পর দেশের বৃহৎ গ্যাস উৎপাদনশীল বিবিয়ানা গ্যাসক্ষেত্রে গ্যাসের প্রেশার কমে যাবে। তখন কী হবে? এর আশু সুরাহা অনিশ্চিত। যে কারণে জ্বালানি আমদানির জন্য যে পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করা দরকার, এ অর্থের বড় অংশই এখন গ্যাস অনুসন্ধানে বিনিয়োগ জরুরি। তা না হলে কয়লা আর এলএনজিনির্ভর জ্বালানি খাতে একটা বিপর্যয়ের শঙ্কা রয়েছে। আমরা প্রত্যাশা করব, দেশের জ্বালানি খাতে স্থানীয় সরবরাহের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা হবে। এজন্য রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেডকে (বাপেক্স) আরো দক্ষ করে গড়ে তোলা প্রয়োজন। বিশেষ করে নতুন গ্যাসকূপ অনুসন্ধান এবং সমুদ্রতলে গ্যাস অনুসন্ধানের প্রক্রিয়া আরো জোরদার করতে হবে। সব মিলিয়ে দেশের চলমান অর্থনৈতিক সংকটে রিজার্ভ বৃদ্ধির পাশাপাশি জ্বালানি খাতে স্থানীয় সরবরাহ বাড়ানোর জন্য পরিকল্পিত উদ্যোগ নেয়া হবে—সেটিই সবার কাম্য।










