ব্যাপক সমালোচিত ও বিতর্কিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮ রহিত করে বিগত সরকার সাইবার নিরাপত্তা আইন ২০২৩ প্রণয়ন করে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এ আইনে উল্লেখযোগ্য কোনো পরিবর্তন ছিল না। নতুন মোড়কে পুরনো নিবর্তনমূলক ধারাগুলোই এ আইনে সন্নিবেশিত হয়েছিল। কোনো গুণগত পরিবর্তন আনা হয়নি। কার্যত এটি সাইবার নিরাপত্তার নামে বিগত সরকারের রাজনৈতিক অভিসন্ধি পূরণ তথা বাকস্বাধীনতা, মত প্রকাশের অধিকার, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা খর্ব, ভিন্নমত দমন ও নিপীড়নের হাতিয়ার হয়ে উঠেছিল।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর আইনটি বাতিলের জোর দাবি ওঠে। এর পরিপ্রেক্ষিতে এ সরকার আইনটি বাতিলের নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়। পরবর্তী সময়ে এ-সংক্রান্ত আইনের একটি নতুন খসড়া চূড়ান্ত করা হয়। সম্প্রতি আগের সাইবার নিরাপত্তা আইনে থাকা বেশকিছু বিতর্কিত ধারা বাদ দিয়ে ‘সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ ২০২৪’-এর খসড়া অনুমোদন করা হয়েছে। এছাড়া নতুন করে যুক্ত হয়েছে বেশ কয়েকটি ধারা। এ বিষয়ে প্রত্যাশা হলো এটি আগের মতো দমন-পীড়নের হাতিয়ার না হয়ে সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিতেই প্রয়োগ করা হবে।
বিগত সরকারের আমলে যে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বেশির ভাগ মামলা করা হয়েছে। ২০১৮ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে করা ১ হাজার ৪৩৬টি মামলার তথ্য বিশ্লেষণের ভিত্তিতে তৈরি এক গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা যায়, অভিযুক্তের মধ্যে ৩২ শতাংশের বেশি রাজনীতিবিদ, ২৯ দশমিক ৪০ শতাংশ সাংবাদিক। অভিযোগকারীর প্রায় ৭৮ শতাংশই বিগত সরকারের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এছাড়া তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর মানহানির অভিযোগে মামলা হয়েছে ১৯০টি। বেশির ভাগ মামলা করেছেন তার সমর্থকরা। এরপর বেশি মামলা করেছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এদিকে গত ৩০ সেপ্টেম্বর আইন মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তি থেকে জানা যায়, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন ২০০৬; ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮ এবং সাইবার নিরাপত্তা আইন ২০২৩-এর অধীনে গত আগস্ট পর্যন্ত দেশের আটটি সাইবার ট্রাইব্যুনালে মোট ৫ হাজার ৮১৮টি মামলা চলমান। বর্তমানে স্পিচ অফেন্স-সম্পর্কিত মোট ১ হাজার ৩৪০টি মামলা চলমান। এর মধ্যে ৪৬১টি মামলা তদন্তাধীন। আর ৮৭৯টি মামলা দেশের আটটি সাইবার ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন। এসব মামলার মধ্যে ডিজিটাল মাধ্যমে মুক্তমত প্রকাশের কারণে দায়ের হওয়া মামলাগুলোকে ‘স্পিচ অফেন্স’ এবং কম্পিউটার হ্যাকিং বা অন্য কোনো ডিজিটাল ডিভাইসের মাধ্যমে জালিয়াতিকে ‘কম্পিউটার অফেন্স’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এরই মধ্যে বর্তমান সরকার স্পিচ অফেন্স-সংক্রান্ত মামলাগুলো দ্রুত প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ১ হাজার ৩৪০টি স্পিচ অফেন্স-সম্পর্কিত মামলার মধ্যে বিচারাধীন ৮৭৯টি মামলা আইন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ের মাধ্যমে দ্রুত প্রত্যাহার করা হবে। পাশাপাশি তদন্তাধীন ৪৬১টি মামলা চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিলের মাধ্যমে দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য তদন্ত কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেয়া হবে বলে জানা গেছে। আশা করা যায়, সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশটি কার্যকর হলে জনসাধারণের ভোগান্তি আরো কমে আসবে এবং সাইবার সুরক্ষা জোরদার হবে।
কেননা এ অধ্যাদেশে একটি বড় পরিবর্তন আনা হয়েছে ‘সাইবার সুরক্ষা’র সংজ্ঞায়। আগের আইনে ‘সাইবার নিরাপত্তা’ বলতে কেবল ডিজিটাল ডিভাইস, কম্পিউটার বা কম্পিউটার সিস্টেমের নিরাপত্তাকে বোঝানো হতো। বর্তমান অধ্যাদেশে সাইবার সুরক্ষার আওতায় ডিজিটাল ডিভাইস, কম্পিউটার, স্মার্টফোন, ডিজিটাল ওয়্যারলেস, কম্পিউটার সিস্টেম, কম্পিউটার ডাটা, সিগন্যালিং ডাটা, ট্যারিফ ডাটা, ডাটা সেন্টার ও ক্লাউড স্পেসে ভৌত অবকাঠামো সুরক্ষার পাশাপাশি ব্যক্তিগত, প্রাতিষ্ঠানিক, আর্থিক ও ব্যবসায়িক তথ্যের সুরক্ষাকে বোঝানো হয়েছে।
একই সঙ্গে আগের আইনের বেশকিছু বিতর্কিত ধারা বাদ দেয়া হয়েছে। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ২১ নং ধারাটি। এ ধারায় মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, জাতীয় সংগীত বা জাতীয় পতাকা সম্পর্কে বিদ্বেষ, বিভ্রান্তি ও কুৎসামূলক প্রচারণার দণ্ড ধারাটি বাতিল হয়েছে। এছাড়া ২৪ ধারায় পরিচয় প্রতারণা বা ছদ্মবেশ ধারণ; ২৫ ধারায় আক্রমণাত্মক, মিথ্যা বা ভীতি প্রদর্শক, তথ্য-উপাত্ত প্রেরণ, প্রকাশ ইত্যাদি; অনুমতি ব্যতীত পরিচিতি তথ্য সংগ্রহ, ব্যবহার ইত্যাদির দণ্ড; ২৬ ধারায় অনুমতি ব্যতীত পরিচিতি তথ্য সংগ্রহ, ব্যবহার ইত্যাদির দণ্ড; সম্প্রচার ইত্যাদি; মানহানিকর তথ্য প্রকাশ, প্রচার ইত্যাদি; পরোয়ানা ব্যতিরেকে তল্লাশি, জব্দ ও গ্রেফতার; ২৯ ধারায় মানহানিকর তথ্য প্রকাশ, প্রচার ইত্যাদি; ৩১ ধারায় আইন-শৃঙ্খলার অবনতি ঘটানো, ইত্যাদির অপরাধ ও দণ্ড; ৩২ ধারায় হ্যাকিং সংক্রান্ত অপরাধ ও দণ্ড এবং মহাপরিচালকের ক্ষমতা অর্পণসংক্রান্ত ৫৫ ধারা বাদ দেয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। এছাড়া সাইবার নিরাপত্তা আইনের বেশির ভাগ ধারা সংশোধন করে রাখা হচ্ছে সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশে।
অপরাধের আওতায় নতুন করে যুক্ত হয়েছে ব্ল্যাকমেইলিং (প্রতারণা) বা অশ্লীল বিষয়বস্তু প্রকাশসংক্রান্ত অপরাধ ও দণ্ড। খসড়ায় যে কারো মামলা করার সুযোগ বন্ধ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, সরাসরি সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি বা তার নিয়োগকৃত ব্যক্তি অথবা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য বাদে অন্য কেউ এ আইনের অধীন মামলা করতে পারবেন না। এতে যে কারোর উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা করার সুযোগ কমে আসবে বলে ধারণা করা যাচ্ছে। এছাড়া সাইবার স্পেসে জুয়া খেলার অপরাধ ও দণ্ডের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি ৪৪ ধারা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে যেখানে উল্লেখ রয়েছে, অন্য কোনো আইনে যেটাই থাকুক না কেন, এ আইনের অধীনে প্রাপ্ত বা সংগৃহীত কোনো ফরেনসিক প্রমাণ বিচারকাজে সাক্ষ্য হিসেবে বিবেচিত হবে।
তবে আগের আইনের অন্যতম বিতর্কিত ৪১ ধারাটি নতুন অধ্যাদেশের খসড়ায়ও রয়ে গেছে। এ ধারায় বিনা পরোয়ানায় সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে তল্লাশি, কম্পিউটার নেটওয়ার্ক সার্ভারসহ সবকিছু জব্দ ও গ্রেফতারের ক্ষমতা দেয়া হবে পুলিশকে। যার মাধ্যমে পুলিশকে কার্যত এক ধরনের ‘বিচারিক ক্ষমতা’ দেয়া হয়েছিল। অধ্যাদেশের ৩৬ নম্বর ধারায় আগের ধারাটিকে বলবৎ রাখা হয়েছে, যা কোনোভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। বিগত সময়ে, বিশেষ করে গণ-অভ্যুত্থান চলাকালীন দেখা গেছে পুলিশকে সরকার নিপীড়নমূলক রাষ্ট্রযন্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছে। সুতরাং অধ্যাদেশ কার্যকরের আগে এ ধারা নিশ্চিতভাবে পুনর্মূল্যায়নের দাবি রাখে। ভবিষ্যতে কোনো সরকারই যেন সাইবার সুরক্ষা আইনকে গোষ্ঠীস্বার্থে ব্যবহার না করতে পারে, সেটি নিশ্চিত করা এ আইনের অন্যতম লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য।










