ড. এ কে এনামুল হক ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির ফ্যাকাল্টি অব বিজনেস অ্যান্ড ইকোনমিকসের ডিন ও অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক। এছাড়া তিনি এশিয়ান সেন্টার ফর ডেভেলপমেন্টের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। সাম্প্রতিক অর্থনীতির নানা প্রসঙ্গ নিয়ে সম্প্রতি কথা বলেন বণিক বার্তার সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সাবিদিন ইব্রাহিম

সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময় দাবি করা হচ্ছে আমরা খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। কিন্তু বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য বছরজুড়ে আমদানি করে যাচ্ছি। আমাদের কৃষিতে সমস্যা কোথায়? 

আমাদের সমস্যা উৎপাদনে নয়। আমরা যথেষ্ট উৎপাদন করি। সমস্যা হলো আমাদের বাজার ব্যবস্থাপনায়। আমাদের বাজার যথেষ্ট প্রতিযোগিতাপূর্ণ নয়। প্রতিযোগিতা কমিশনসহ বাজার তদারকির জন্য আমাদের যেসব প্রতিষ্ঠান আছে সেগুলো আসলে ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে। আমাদের সমস্যাটা কাঠামোগত সমস্যা। এটা হচ্ছে আমার পর্যবেক্ষণ। আর আজকের দিনে উৎপাদন কোনো বিষয় নয়। সৌদি আরব কি কোনো কিছু উৎপাদন করে! তাদের কি কখনো খাদ্য সংকট হয়েছে? তাদের যদি না হয়, তাহলে আমাদের কেন হবে? পৃথিবীর বহু দেশ খাদ্য উৎপাদন না করলেও তাদের খাদ্য সংকট হয় না, আমাদের কেন হবে? আমাদের বাজারের কাঠামো যথেষ্ট প্রতিযোগিতামূলক হতে হবে। বাজারের সমস্যাটা আসলে উৎপাদনের সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়। 

বর্তমানে সরকার যে পেনশন স্কিম চালু করেছে তা নিয়ে আপনি কী মনে করছেন?

পেনশন স্কিম চালু সরকারের একটি ভালো উদ্যোগ এবং এটা নিয়ে তৎপরতা বাড়ানো উচিত বলেই মনে করি। অর্থনীতি যেভাবে বড় হচ্ছে, তার সঙ্গে সঙ্গে বয়স্কদের সংখ্যা আরো বাড়ছে। এ ধরনের অর্থনৈতিক পরিবেশে যদি সরকার জনগণকে শক্তিশালী পেনশন স্কিম না দেয়, তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত না করে তাহলে সমাজ ও অর্থনীতিতে এক ধরনের ভারসাম্যহীনতা দেখা দেবে। সুতরাং অর্থনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখতে এবং জীবনের কর্মহীন সময়টায় সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পেনশন স্কিম বাড়াতে হবে। আমাদের বেসরকারি খাতের সবাইকে বাধ্য করে এ স্কিমে যুক্ত করা উচিত। কিন্তু সরকারকে এটা মনে রাখতে হবে, আস্থার সংকট থাকলে তা বাস্তবায়ন করা যাবে না। আস্থা অর্জন করতে হলে পেনশন স্কিম পরিচালনায় পেশাদারত্ব ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে। স্রেফ আমলাতান্ত্রিকতা দিয়ে এটা সাফল্য পাবে না। একটা কর্তৃপক্ষ তৈরি করা যায়, যারা থাকবে এ স্কিমের প্রধান অথরিটি। 

সরকার তো স্মার্ট বাংলাদেশের পথে এগোচ্ছে। আমরা ক্যাশলেস সোসাইটি তৈরি করতে চাই। কিন্তু আমাদের অবকাঠামো ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা খুব দুর্বল। স্মার্ট বাংলাদেশের সামনে কী চ্যালেঞ্জ দেখছেন? 

স্মার্ট বাংলাদেশ শব্দটার অর্থ আমি যেভাবে বুঝি—সময়ের সঙ্গে উপযোগী হওয়া। বাংলাদেশে অবশ্যই ক্যাশলেস সোসাইটি আসবে। সময় ও যুগের প্রয়োজনেই একপর্যায়ে আমাদের সেখানে যেতে হবে। পৃথিবীর অনেক দেশ ক্যাশলেস লেনদেন করছে। আমরা যে টাকাপে চালু করেছি তা ভালো একটি সূচনা। আমরা অযথাই ভিসাকে প্রচুর কমিশন দিচ্ছি। বৈশ্বিক রাজনীতি এত অস্থিতিশীল যে আমাদের স্রেফ ভিসা ও মাস্টারকার্ড-নির্ভর হলে চলবে না। নিজস্ব ও আঞ্চলিক অন্যান্য মাধ্যমও ব্যবহার করতে হবে। যেমন চীনের ইউনিপের সঙ্গে আমাদের সংযোগ বাড়ানো দরকার। এক্ষেত্রে মাথায় রাখতে হবে, যুক্তরাষ্ট্র এটা সহজে করতে দেবে না। তাই বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোয় সেগুলো চালু করা যেতে পারে। একই সঙ্গে চীনা ব্যাংকগুলোকেও বাংলাদেশে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। তাদের সঙ্গে আমাদের আমদানি তো কম হচ্ছে না! এখন সরকারকে আসলে বিভিন্ন স্ট্র্যাটেজি নিয়ে এগোতে হবে, সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করতে হবে। মেরুকৃত বিশ্বে এ ধরনের সমস্যার মধ্য দিয়েই আমাদের যেতে হবে। আমরা স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড যেমন রাখছি, তেমনি আমাদের চীনা ব্যাংকও রাখতে হবে। আমরা কেন রাশিয়ার ব্যাংক আনছি না। তাদের সঙ্গেও তো আমাদের বাণিজ্য সম্পর্ক রয়েছে। আমরা যদি ষাটের দশকের গতানুগতিক ধারায় পড়ে থাকি তাহলে তো হবে না। আমাদের চিন্তাভাবনা ও পলিসিতে যথেষ্ট পরিবর্তন আনতে হবে। 

চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক নিয়ে সম্প্রতি বেশ আলোচনা হচ্ছে। কীভাবে আমরা চীনের সঙ্গে স্বার্থ সুরক্ষায় আরো ভালো দেনদরবার করতে পারি? 

চীনের সঙ্গে আমাদের দেনদরবার হবে—কীভাবে তাদের বাজারে প্রবেশ করা যায়। আমরা চীন থেকে অনেক কিছু আমদানি করলেও চীন আমাদের থেকে তেমন কিছু আমদানি করে না। তবে সম্প্রতি কিছুটা পরিবর্তনের হাওয়া বইছে। গত ৪০ বছর পশ্চিমা বিশ্ব যা করেছে, চীন এখন তা শুরু করেছে। তারা ছাত্রদের বৃত্তি দিয়ে চীনে পড়াশোনার সুযোগ দিচ্ছে। ফলে তাদের দেশে ব্যবসার সুযোগ বাড়ছে। আমাদের সুবিধার দিক হলো, আমরা চাইলেই পশ্চিমা বিশ্বের পাশাপাশি চীনের সঙ্গেও সুসম্পর্ক রাখত পারব। এ রকম বহু দেশ আছে, যারা এ পন্থা অবলম্বন করে চলছে। কিন্তু আমাদের ঝুঁকির জায়গা হলো, ব্যাংকিংসহ বিভিন্ন যে অবকাঠামো আছে তা পশ্চিমা। আমাদের প্রাচ্যের দুনিয়ার সঙ্গেও কানেক্টিভিটি বাড়াতে হবে। পশ্চিমা বিশ্ব জানে কীভাবে একটা দেশকে কাবু করে ফেলা যায়। যেমন ভিসা কার্ড দিয়ে চাইলেই বাংলাদেশকে কাবু করা যাবে। বাংলাদেশ কেন এ রকম অনিরাপদ অবস্থার মধ্য দিয়ে যাবে। 

আমাদের রফতানি বাজারের ৮০-৯০ শতাংশ পশ্চিমা বিশ্বে, যাদের জনসংখ্যা ৩০-৫০ কোটি। দক্ষিণ এশিয়া, পূর্ব এশিয়া, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকার জনসংখ্যা এর চেয়ে বেশি। সেখানে কি আমাদের রফতানির সুযোগ আছে? 

এশিয়ায় আমাদের সম্ভাবনা বেশ। কিন্তু আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকা নিয়ে আমার পর্যবেক্ষণ হলো, ওদের অর্থনীতি এখনো বেশ দুর্বল। ফলে আমি আফ্রিকা বা লাতিন আমেরিকায় সুবিধা দেখছি না। তাছাড়া ওদের সঙ্গে আমাদের এমন কোনো বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক নেই। তবে সমস্যা হলো, আমাদের অনেক বিনিয়োগকারী আফ্রিকায় বিনিয়োগ করছেন। আফ্রিকার ফরেন এক্সচেঞ্জ পলিসির কারণে বিনিয়োগকারীরা ওদিকে চলে যাচ্ছেন। তারা আমাদের বিপদে ফেলতে পারে। 

আর যদি কোনো কোম্পানি যেতে পারে তাহলে একমাত্র ‘‌প্রাণ’ই পারবে। কারণ বাংলাদেশের বাজারে প্রাণের গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। আমাদের প্রথম টার্গেট করা উচিত আমাদের প্রতিবেশী দেশগুলোকে। প্রতিবেশী বলতে ভারতকে বোঝাচ্ছি। হ্যাঁ, তারা বাধা দেবে। তাও আমাদের চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। চীনের ক্ষেত্রেও তাই। যেহেতু চীন থেকে আমরা আমদানি করি তাই খুব সহজেই চীনে রফতানি করা যাবে। 

মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমরা রেমিট্যান্স আনছি, সেখানে কি আমাদের রফতানি বাড়ানোর কোনো সুযোগ আছে? 

মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয় আমাদের রফতানি অনেক বাড়ানোর সুযোগ নেই, এটা একান্তই আমার ব্যক্তিগত মতামত। কারণ মধ্যপ্রাচ্যের মানুষ আমাদের ইতিবাচকভাবে দেখে না। যারা আমাদের নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখে সেখানে গিয়ে আমরা তেমন কিছু করতে পারব না। 

জাপানের বাজারে রফতানির ক্ষেত্রে আমাদের সম্ভাবনা কেমন দেখছেন?

শুরু থেকেই জাপানের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক ভালো এবং তারা আমাদের খুব ইতিবাচকভাবে দেখে। এ কারণে জাপানের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্ভাবনা অনেক ভালো। গাড়ি শিল্পের যন্ত্রাংশ, টায়ার, টিউব যদি তৈরি করতে পারি তাহলে জাপানে আমাদের ভালো সুযোগ রয়েছে। এখন আমাদের গার্মেন্টস-বহির্ভূত পণ্যের কথা চিন্তা করতে হবে। মধ্যপ্রাচ্যে রফতানির কথা না ভেবে ইরান, তুরস্ক এসব দেশেও রফতানির কথা ভাবা উচিত। 

ডিজিটাল দুনিয়ায় আমরা সম্ভাবনা কতটুকু কাজে লাগাচ্ছি?

এরই মধ্যেই বাংলাদেশে ইন্টারনেটের অবকাঠামো দাঁড়িয়ে গেছে। কিন্তু ভৌত ও অ-ভৌত অবকাঠামো দাঁড় করানো এক বিষয় এবং তার ওপর ভিত্তি করে অর্থনীতি দাঁড় করানো আরেক বিষয়। কভিড মহামারীর ধাক্কায় কিন্তু বাংলাদেশের ইন্টারনেট ইকোনমি দাঁড়িয়ে গেছে। এখন বিশাল এক জনগোষ্ঠী ইন্টারনেটের মাধ্যমে তাদের প্রাত্যহিক বাজার-সদাইয়ে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। বাংলাদেশে বসে একজন সৌদি আরবের বিল্ডিংয়ের ডিজাইন করতে পারছে। ফলে অর্থনীতির স্ট্রাকচার পরিবর্তন হচ্ছে। 

চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের যে টানাপড়েন চলছে, তার প্রভাব কি আমাদের রফতানিতে পড়বে? 

আমি আগেও বলেছি, এমনটা হওয়ার সম্ভাবনা নেই। রাজনীতির দিক দিয়েই যদি বিবেচনা করি, বাংলাদেশকে স্যাংশন দেয়া মানে সে চীনের পকেটে চলে যাওয়া। পশ্চিমা দুনিয়া এ রকম দুর্বল কৌশল নেয় না। তবে তারা আমাদের একেবারে ছেড়ে দেবে না, চাপে রাখবে। বাংলাদেশকে এ চাপ নিয়েই কাজ করতে হবে। 

অ্যাপল ও স্যামসাংয়ের মতো প্রযুক্তি কোম্পানি কিংবা নাইকি অ্যাডিডাসের মতো জুতার কোম্পানি বাংলাদেশে আসছে না কেন? 

আমাদের প্রধান সমস্যা রেগুলেটরি কাঠামোয়। দেখা গেছে, আমাদের এখান থেকে তারা অর্থ নিতে পারছে না। এ রকম রেগুলেটরি কাঠামোয় কেউ আসবে না। আমাদের কর কাঠামোয়ও পরিবর্তন আনতে হবে। আমাদের এখানে গার্মেন্টস খাত বিকাশ হয়েছে, কারণ এটা আউটসোর্স হিসেবে এসেছে। অন্যান্য খাতেও যদি এগোতে চাই তাহলে আমাদের গার্মেন্টসের মডেলেই যেতে হবে। 

ব্লু-ইকোনমি নিয়ে এক যুগেরও বেশি সময় ধরে আলোচনা হচ্ছে। আমরা সম্ভাবনা কতটুকু কাজে লাগাতে পেরেছি? 

যদি বঙ্গোপসাগরের ফিশিং রেকর্ড দেখি তাহলে দেখব, পুরোটাই তাইওয়ানিজ ও চীনা জাহাজের নিয়ন্ত্রণে। মৎস্য সম্পদ তো ব্লু-ইকোনমির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু সমুদ্র থেকে মৎস্য আহরণের কাজে বিনিয়োগ করার মতো লোক কোথায়? আমাদের এখানে ব্লু-ইকোনমি মানে হচ্ছে সমুদ্র থেকে তেল-গ্যাস আহরণ করা। চীন, নরওয়ে বা ইউরোপের অনেক দেশের প্রধান উপার্জনকারী খাত ব্লু-ইকোনমি। সব উপার্জন কি তাদের টেরিটরি থেকে আসে? উত্তর হচ্ছে—না। তারা পুরো পৃথিবী ঘুরে বেড়ায়। পৃথিবীর ৯৮ শতাংশ সমুদ্রভাগই সবার জন্য উন্মুক্ত।