যেকোনো শিক্ষার্থীর জন্য মাধ্যমিক শিক্ষাকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভাবা হয়। কারণ এ স্তরে শিক্ষার্থীরা উপযুক্ত শিক্ষা ও সঠিক দিকনির্দেশনা পেলে উচ্চশিক্ষার ভিত সুদৃঢ় হবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এ স্তরে শিক্ষকের দক্ষতা ও প্রশিক্ষণের মান এখনো সন্তোষজনক নয়। শিক্ষকের প্রশিক্ষণ গ্রহণের হার বাড়লেও সেগুলোর গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ফলে দক্ষ ও মানসম্পন্ন প্রশিক্ষিত শিক্ষক তৈরি হচ্ছে না, যা সরাসরি মাধ্যমিক শিক্ষার মানে প্রভাব ফেলছে। শিক্ষার এ গুরুত্বপূর্ণ স্তরে যদি শিক্ষকরা আধুনিক পাঠদানের কৌশল ও বিষয়ভিত্তিক দক্ষতায় পারদর্শী না হন, তবে শিক্ষার্থীদের বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান বিকাশ ব্যাহত হবে। এমনকি উচ্চশিক্ষার ভিত্তিও দুর্বল হয়ে পড়বে। তাই মাধ্যমিক স্তরে মানসম্পন্ন শিক্ষক প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা জরুরি।
দেশের মাধ্যমিক স্তরে গত দুই বছরের তুলনায় প্রশিক্ষিত শিক্ষকের হার বেড়েছে। বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) তথ্য অনুযায়ী, এ স্তরে মোট শিক্ষক রয়েছেন ২ লাখ ৭৮ হাজার ৫১৮ জন। তাদের মধ্যে ৭১ দশমিক ৮৬ শতাংশই প্রশিক্ষিত, যা ২০১৯ সালের তুলনায় ৫ দশমিক ৮৬ শতাংশীয় পয়েন্ট বেশি। প্রশিক্ষিত শিক্ষকরা কি সত্যিই শিক্ষাদানে দক্ষ হয়ে উঠছেন? প্রশিক্ষিত শিক্ষকের হার বাড়লেও প্রশিক্ষণের মান ও শিক্ষকের দক্ষতা নিয়ে রয়েছে নানা প্রশ্ন।
ব্যানবেইসের জরিপে প্রশিক্ষিত শিক্ষক হিসেবে বিএড-এমএড ডিগ্রিধারীদের বিবেচনা করা হয়। বর্তমানে এসব প্রফেশনাল ডিগ্রির জন্য ১৪টি সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজ (টিটিসি) এবং ৯০টি বেসরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজ রয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়েও (বাউবি) শিক্ষকদের জন্য রয়েছে বিএড-এমএড কোর্স। বাংলাদেশের মাধ্যমিক শিক্ষা নিয়ে ২০২৩ সালে একটি জরিপ করে জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি (জাইকা)। ওই জরিপের প্রতিবেদনে দেশের মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার অন্যতম চ্যালেঞ্জ হিসেবে অপর্যাপ্ত ও মানহীন শিক্ষক প্রশিক্ষণকে উল্লেখ করা হয়। তাতে আরো উল্লেখ করা হয়, বাউবিতে সপ্তাহে একদিন অনলাইন ক্লাসের মাধ্যমে বিএড ডিগ্রি অর্জনের সুযোগ দেয়ায় শিক্ষকদের বড় অংশই টিচার্স ট্রেনিং কলেজের তুলনায় ওই প্রতিষ্ঠানটিকেই বেছে নেন। সেই সঙ্গে দক্ষতা অর্জনের চেয়ে ডিগ্রি অর্জন, অর্থাৎ সার্টিফিকেটকেই বেশি প্রাধান্য দেন প্রশিক্ষণার্থী শিক্ষকরা। শুধু পদোন্নতির শর্ত পূরণের উদ্দেশ্যেই প্রশিক্ষণ গ্রহণ করছেন তারা। ফলে বিএড বা এমএড ডিগ্রির হার বাড়লেও সেই ডিগ্রিধারীদের মাধ্যমে শিক্ষার মানোন্নয়ন ঘটছে না। এ ধরনের প্রশিক্ষণ আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য বড় সতর্কবার্তা। কারণ প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্যই যদি কাগজে-কলমে সার্টিফিকেট অর্জন হয়, তবে তার কোনো বাস্তব সুফল শিক্ষার্থীরা পাওয়ার কথা নয়। শিক্ষকের প্রশিক্ষণ কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়, এটি শিক্ষার প্রাণ, পাঠদানের দক্ষতার মূলভিত্তি। তাই এখন সময় এসেছে প্রশিক্ষণ ব্যবস্থাকে পুনর্মূল্যায়ন করার; প্রশিক্ষণের মান, সময়কাল ও ব্যবহারিক প্রয়োগে জোর দিতে হবে। নইলে দক্ষ শিক্ষক তৈরি হবে না।
সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজগুলোয় (টিটিসি) শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের আগ্রহ কম। আসন সংখ্যার বিপরীতে ভর্তির হারও কম। বর্তমানে সরকারি ১৪টি টিটিসিতে প্রায় সাত হাজার আসনের বিপরীতে ভর্তি হয়েছে মাত্র দেড় হাজারের কম শিক্ষার্থী। অন্যদিকে বেসরকারি টিটিসিগুলো সহজে ডিগ্রি প্রদান করায় শিক্ষকরা সেদিকেই ঝুঁকছেন। ফলে প্রশিক্ষণ ব্যবস্থায় গুণগত মানের উন্নতি হচ্ছে না। এ ধরনের প্রশিক্ষণ প্রবণতা দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য গভীর উদ্বেগজনক। প্রশিক্ষিত শিক্ষকের সংখ্যা বাড়ছে ঠিকই কিন্তু দক্ষতা ও গুণগত মানের উন্নয়ন ঘটছে না। যখন শিক্ষক প্রশিক্ষণের মূল উদ্দেশ্যই দক্ষতা উন্নয়নের পরিবর্তে সার্টিফিকেট অর্জনের প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়, তখন শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয়। তাই এখনই প্রয়োজন সরকারি টিটিসিগুলোর সক্ষমতা বাড়ানো, আসন সংখ্যা বাড়ানো ও আধুনিক প্রশিক্ষণ সরঞ্জাম সংযোজনের পাশাপাশি বেসরকারি টিটিসিগুলোর কার্যক্রমে কঠোর তদারকি নিশ্চিত করা। অন্যথায় শিক্ষক প্রশিক্ষণে প্রশিক্ষিত শিক্ষকের সংখ্যা বাড়লেও বাস্তবে মানসম্পন্ন প্রশিক্ষিত ও দক্ষ শিক্ষক তৈরি হবে না। মানসম্পন্ন প্রশিক্ষণ গ্রহণ না করায় শিক্ষকদের অনেকেই প্রশিক্ষণ শেষে শ্রেণীকক্ষে নতুন পদ্ধতি প্রয়োগ করতে পারেন না। কারণ প্রশিক্ষণের বিষয়বস্তু ও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার মধ্যে বিরাট তফাৎ রয়েছে।
এবারের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা এবং এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফলেও দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার প্রকৃত চিত্র উঠে এসেছে। দেশে গুণগত শিক্ষার অভাব কতটা প্রকট হয়েছে তার চিত্রই প্রতিফলিত হয়েছে এবারের ফলাফলে। বিগত সরকারের সময় রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে পাসের হার বাড়ানোর চাপ ছিল শিক্ষকদের ওপর। কিন্তু এবার পরীক্ষার হলে এবং খাতা মূল্যায়নে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করায় এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার ফলে প্রকৃত চিত্র উঠে এসেছে। শিক্ষায় গুণগত মান বাড়াতে হলে দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ ও শিক্ষকদের দক্ষতা বাড়ানো আবশ্যক। দক্ষ ও দায়িত্বশীল শিক্ষক তৈরি না হলে ফলাফলে আরো অবনতি ঘটবে। শিক্ষার্থীদের মানোন্নয়নে অভিভাবকদেরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
প্রশিক্ষণকে সার্টিফিকেটনির্ভর না করে দক্ষতানির্ভর করতে হবে। প্রশিক্ষণের বিষয়বস্তু শ্রেণীকক্ষের বিষয়ভিত্তিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া জরুরি। সরকারি টিটিসিগুলোর আসন সংখ্যা ও সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো প্রয়োজন, যাতে শিক্ষকরা মানসম্পন্ন প্রশিক্ষণ গ্রহণে উৎসাহিত হন। বাউবিসহ বেসরকারি টিটিসিগুলোর কার্যক্রমে কঠোর তদারকি প্রয়োজন। যেসব প্রতিষ্ঠান নামমাত্র ক্লাস নিয়ে বিএড বা এমএড সার্টিফিকেট দেয়, তাদের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থা নেয়া উচিত। তাছাড়া প্রশিক্ষণ শেষে একজন শিক্ষক শ্রেণীকক্ষে কতটা দক্ষভাবে সেই জ্ঞান প্রয়োগ করতে পারছেন, তা মূল্যায়নের একটি কাঠামো থাকা জরুরি। শিক্ষা ব্যবস্থার ভিত্তি যে শিক্ষক, তা আমরা প্রায়ই ভুলে যাই। আধুনিক যুগে প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা স্মার্ট ক্লাসরুম যতই উন্নত হোক না কেন, শিক্ষকের মানোন্নয়ন ছাড়া শিক্ষার সামগ্রিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। কেবল প্রশিক্ষিত শিক্ষকের সংখ্যা বাড়লেই শিক্ষার মানোন্নয়ন হবে না, প্রশিক্ষিত শিক্ষকের গুণগত মানের দিকেও নজর দিতে হবে। শিক্ষকরা যদি দক্ষ না হন, তবে শিক্ষার কাঠামো যতই সাজানো হোক না কেন, তা টেকসই হবে না।










