টিউশন ফি, ভর্তি ফি ও আবাসন ব্যয় মিটিয়ে যে অর্থ বিশ্ববিদ্যালয়টি বাংলাদেশী শিক্ষার্থীদের থেকে সংগ্রহ করেছে তার বড় অংশই এসেছে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের সঞ্চয়, ব্যাংক ঋণ কিংবা আত্মীয়-স্বজনের কাছ থেকে ধার করা টাকা থেকে। ভিসার জন্য প্রয়োজনীয় নথি জমা না দেয়ায় শিক্ষার্থীরা ভর্তি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারেননি। আবার বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান দেউলিয়া ঘোষিত হওয়ায় এ অর্থ ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনাও এখন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। ঘটনাটিকে সামান্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বিদেশে বাংলাদেশী উচ্চ শিক্ষার্থীপ্রত্যাশীদের আর্থিক ও আইনি সুরক্ষায় কার্যকর কোনো আইনি কাঠামো গড়ে ওঠেনি।
শিনগিয়ংজু বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনা থেকে অন্তত তিনটি কাঠামোগত দুর্বলতা সামনে আসে। বিদেশী বিশ্ববিদ্যালয় ও তাদের বাংলাদেশে নিয়োজিত প্রতিনিধি বা শিক্ষা পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সক্ষমতা, প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা কিংবা বিশ্বাসযোগ্যতা যাচাইয়ের কোনো সরকার স্বীকৃত ব্যবস্থা এখনো নেই। কোনো পরামর্শক প্রতিষ্ঠান একটি বিদেশী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধিত্ব শুরু করার আগে সে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বীকৃতি বা আর্থিক অবস্থা যাচাইয়ের বাধ্যবাধকতা না থাকায় শিক্ষার্থীরা তথ্যের ঘাটতি সত্ত্বেও বড় অংকের অর্থ পাঠিয়ে দেন। ভর্তির অফার পাওয়ার পর পরই সম্পূর্ণ টিউশন ফি, ভর্তি ফি ও আবাসন ব্যয় অগ্রিম পরিশোধের যে চর্চা চালু আছে, তাতে শিক্ষার্থীর অর্থের কোনো সুরক্ষা থাকে না। ভিসা অনুমোদনের আগে পুরো অর্থ পরিশোধ করতে হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ গাফিলতি করলে বা প্রাতিষ্ঠানিক সংকটে পড়লে সব ঝুঁকি গিয়ে বর্তায় শিক্ষার্থীর ওপর। সবচেয়ে বড় দুর্বলতা, কোনো ধরনের সমস্যা দেখা দিলে অভিযোগ জানানো বা প্রতিকারের সুনির্দিষ্ট ও প্রাতিষ্ঠানিক পথ নেই। শিক্ষার্থীরা মাসের পর মাস বিশ্ববিদ্যালয় ও এজেন্টের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও কার্যকর সাড়া পাননি। আবার কূটনৈতিক চ্যানেলে সহায়তা চাইতে হলে তার জন্য যে প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তুতি দরকার, তা এখনো অনুপস্থিত।
কেবল দক্ষিণ কোরিয়া নয়, উচ্চ শিক্ষার জনপ্রিয় বিভিন্ন গন্তব্যেই সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশী শিক্ষার্থীদের ভিসাপ্রাপ্তি জটিল হয়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্প প্রশাসন সম্প্রতি স্টুডেন্ট ভিসা নীতিতে বড় পরিবর্তন এনেছে। কয়েক দশক ধরে চালু থাকা ‘ডিউরেশন অব স্ট্যাটাস’ ব্যবস্থা তুলে দিয়ে এখন আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের অবস্থানের সময়সীমা নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়েছে। নতুন এ নীতিমালার ফলে দেশটিতে সর্বোচ্চ চার বছর, যদিও এর চেয়ে বেশি সময় লাগা পিএইচডি বা দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা কোর্সের শিক্ষার্থীদের ওপর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা বেশি। ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসও শিক্ষার্থী ভিসাধারীদের সতর্ক করে বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে। অস্ট্রেলিয়ায় গত জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশ, ভারত ও নেপালসহ দক্ষিণ এশিয়ার কয়েকটি দেশকে ভিসা যাচাইয়ে ‘অ্যাসেসমেন্ট লেভেল থ্রি’ বা উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ শ্রেণীতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এজন্য বাংলাদেশী শিক্ষার্থীদের অর্ধেকের বেশি স্টুডেন্ট ভিসা আবেদন প্রত্যাখ্যাত হচ্ছে বলে সাম্প্রতিক অনেক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। মালয়েশিয়াতেও সম্প্রতি স্নাতক-পরবর্তী কাজের অনুমতি নিয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচারের অভিযোগ খণ্ডন করতে হয়েছে দেশটির উচ্চ শিক্ষামন্ত্রীকে, যা থেকে বোঝা যায় ভুল তথ্যের কারণেও শিক্ষার্থীরা বিভ্রান্ত হচ্ছেন। অর্থাৎ তুলনামূলক কম খরচ ও সহজ বৃত্তির আশায় জনপ্রিয় হয়ে ওঠা দক্ষিণ কোরিয়ার মতো গন্তব্যের পাশাপাশি ঐতিহ্যবাহী গন্তব্য দেশগুলোতেও ভিসানীতি ক্রমেই কঠোর হচ্ছে। এসব সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশী শিক্ষার্থীদের বিদেশে উচ্চ শিক্ষার পথ আরো অনিশ্চিত করে তুলছে।
এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সরকারকে কয়েকটি পদক্ষেপে অগ্রাধিকার দিতে হবে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অধীনে বিদেশী শিক্ষা পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ও এজেন্টদের বাধ্যতামূলক নিবন্ধন এবং জবাবদিহিতার কাঠামো তৈরি করতে হবে। এভাবে কোনো প্রতিষ্ঠান বিদেশী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধিত্ব করার আগে তার স্বীকৃতি ও আর্থিক অবস্থা যাচাই করতে বাধ্য থাকে। শিক্ষার্থীদের আর্থিক ও আইনি সুরক্ষার জন্য দূতাবাসগুলোকে সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে। অর্থাৎ নির্দিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে সংকট দেখা দিলে দ্রুত সতর্কবার্তা প্রচার এবং শিক্ষার্থীদের পক্ষে কূটনৈতিক তদবিরে উদ্যোগী হতে হবে। ভর্তির আগে সম্পূর্ণ অর্থ পরিশোধের বদলে এস্ক্রো বা তৃতীয় পক্ষ নিয়ন্ত্রিত পেমেন্ট ব্যবস্থা চালুর সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা দরকার। এ পদ্ধতিতে ভিসা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত শিক্ষার্থীর অর্থ সুরক্ষিত থাকে। সরকারিভাবে একটি কেন্দ্রীয় তথ্যভাণ্ডার বা পরামর্শ পোর্টাল তৈরি করা যেতে পারে। এ ধরনের পোর্টালে বিদেশী বিশ্ববিদ্যালয় ও পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ, সতর্কতা ও হালনাগাদ তথ্য অন্তর্ভুক্ত করা হবে। এছাড়া ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীদের জন্য দ্রুত আইনি সহায়তা ও অভিযোগ নিষ্পত্তির প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা থাকা দরকার। বিদেশে সংকটে পড়া শিক্ষার্থীরা যেন একা না লড়েন সেজন্যও উদ্যোগ নিতে হবে সরকারকে।
বিদেশে উচ্চ শিক্ষা এখন বাংলাদেশের লাখো তরুণ-তরুণীর স্বপ্ন এবং পরিবারগুলোর দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ। যদিও আধুনিক ও টেকসই শিক্ষা অবকাঠামো ও সুবিধা নিশ্চিত করলে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিক্ষার্থীই বিদেশে যেতে আগ্রহী হবেন না। কিন্তু বিদেশে উচ্চ শিক্ষাও জ্ঞান আদান-প্রদানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ। এ বিনিয়োগ যেন প্রতারণা বা প্রাতিষ্ঠানিক গাফিলতির শিকার না হয়, তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। প্রবাসী, ডায়াসপোরা এমনকি বাংলাদেশ থেকে যাওয়া শিক্ষার্থীদের আইনি ও অন্যান্য সুবিধা দেয়া রাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। শিনগিয়ংজু বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনাকে তাই বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে না দেখে সামগ্রিক নীতি সংস্কারের সুযোগ হিসেবে নেয়া উচিত, যাতে ভবিষ্যতে কোনো শিক্ষার্থীকে স্বপ্নভঙ্গের পাশাপাশি সঞ্চিত অর্থ হারানোর ঝুঁকিতে পড়তে না হয়।










