পহেলা বৈশাখ, বাংলা নববর্ষ। প্রতি বছর এই দিনে ছায়ানটের উদ্যোগে রমনার বটমূলে ঐতিহ্যবাহী সংগীতানুষ্ঠানের মাধ্যমে বর্ষবরণের আয়োজন করা হয়। একই সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে থাকে। ঢাকাসহ সারা দেশই নববর্ষকে বরণ করতে নানা আয়োজনে মত্ত থাকে। এ বছরও এর ব্যতিক্রম হয়নি। পরম সমারোহে পালিত হয়েছে বাংলা নববর্ষ-১৪৩১ বঙ্গাব্দ। মঙ্গল শোভাযাত্রার স্লোগান ছিল ‘আমরা তো তিমিরবিনাশী’; অন্ধকার ডিঙিয়ে আলোর পথে যাত্রা। নতুন বছরে দেশে দীর্ঘদিন ধরে চলমান অর্থনৈতিক সংকট দূর হোক, সাংস্কৃতিক সম্প্রীতি, সৌহার্দ বাড়ুক।

বাংলা নববর্ষ উদযাপনের পর পুরো বৈশাখজুড়ে চলতে থাকে বৈশাখী মেলা। উভয়ই অর্থনীতির চাকাকে সচল রাখতে সহায়তা করে। সম্রাট আকবরের সময় খাজনা আদায়ের সুবিধার জন্য বাংলা নববর্ষ চালু হয়। এর পর থেকে নববর্ষ কেন্দ্র করে ব্যবসায়ীরা সারা বছরের হিসাব-নিকাশ করে থাকেন। ফসল ওঠার পর ক্রেতারা বকেয়া শোধ করতেন। খোলা হতো হিসাবের নতুন খাতা। যাকে বলে হালখাতা। বর্ষবরণের দিন ক্রেতারা এক ধরনের ঋণমুক্ত হয়। আর মালিক পক্ষের কাছে পুঁজির প্রবাহ বাড়ে, যা নতুন বিনিয়োগ সৃষ্টি করে। কালক্রমে এটি বাঙালির অসাম্প্রদায়িক উৎসবের রূপ পরিগ্রহ করে। এতে বাঙালির জাতীয় ঐক্য ও গৌরব মিলিত। এ উৎসব পালনের বেচাকেনা বেড়ে যায়। বিশেষত গ্রামীণ অর্থনীতির গতি ত্বরান্বিত হয়। এ মেলা উপলক্ষে কুমোর, ময়রা, তাঁতি, বাঁশ-বেতশিল্পীদের জন্য নতুন কর্ম নিয়োজনের সুযোগ সৃষ্টি হয়। গ্রামীণ কুটির শিল্প জায়গা করে নেয় শহরের মেলায়। এভাবে বৈশাখের অর্থনীতি পুরো দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে প্রভাব বিস্তার করে থাকে। বাংলা নববর্ষ হয়ে ওঠে বাঙালির সর্বজনীন উৎসব। বাঙালির আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে বাংলা নববর্ষের রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। 

বাংলা নববর্ষ বাঙালির সমগ্র সত্তা, অস্তিত্ব ও অনুভবের সঙ্গে মিশে আছে। এটা বাঙালি সংস্কৃতির উজ্জ্বল দিক। বাংলা সনের প্রথম এ দিনটি বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, আসাম, ত্রিপুরাসহ দেশ-বিদেশে বসবাসরত প্রতিটি বাঙালি নববর্ষ হিসেবে পালন করে। এ উৎসবের রঙ একটি অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র গড়তে বাঙালি জাতিকে এগিয়ে নিয়েছে বারবার। দেশ স্বাধীনের পর বাঙালির অসাম্প্রদায়িক চেতনার প্রতীকে পরিণত হয় বাংলা বর্ষবরণ অনুষ্ঠান। 

পহেলা বৈশাখের উৎসব সর্বজনীনতায় রূপ নিলেও চলমান সময়ে দেশে বিরাজমান অর্থনৈতিক সংকটে মানুষের নাভিশ্বাস উঠে গেছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের ওপর চাপ বেড়েছে। ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) খাবারের ট্রাকে মানুষের সারি দিনে দিনে বড় হচ্ছে। ডলার সংকটে কাঁচামাল ও মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি ব্যাহত হচ্ছে। গ্যাস সংকটে শিল্পের উৎপাদন স্থবির হয়ে পড়ছে। বিদেশী বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কোনো সুসংবাদ নেই, কমেছে রেমিট্যান্সও। ফলে বৈশাখকেন্দ্রিক যে অর্থনীতির জোয়ার বয়ে যাওয়ার কথা, সেটিও চলতি বছর কিছুটা স্তিমিত হয়ে আছে। তবে এ বছর ঈদুল ফিতর ও নববর্ষ মিলিয়ে কর্মজীবী মানুষ ছুটি পেয়েছে অনেক দিনের। ফলে পর্যটন খাত তুলনামূলক গতিশীল হয়েছে। দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির কয়েকটি জায়গায় দীর্ঘদিন ধরে যেসব সমস্যা বিরাজ করছে, সেগুলোর দিকে নজর দিতে হবে। কর খাত, ব্যাংক খাত, বাণিজ্যনীতি, মুদ্রার বিনিময় হার—এসব খাতে আমরা কীভাবে সংস্কার করব এবং যৌক্তিকভাবে এসব সংস্কার কীভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, সেদিকে আমাদের গভীরভাবে নজর দেয়া দরকার।

তবু মানুষ নববর্ষের আনন্দ উদযাপন করেছে। অন্ধকারকে বিনাশ করে আলোর পথ খুঁজে নিতে তৎপর হয়েছে। তবে এ তৎপরতা একদিনেই শেষ হয়ে গেলে চলবে না। উৎসবের আনুষ্ঠানিকতার বাইরে গিয়ে জীবনযাপনে ‘তিমির‍বিনাশী’ স্লোগানের চর্চা অব্যাহত রাখতে হবে। সামাজিক, সাংস্কৃতিক প্রতিবন্ধকতা, অরাজকতা থেকে তবেই মুক্তি মিলবে। সবচেয়ে জরুরি সাংস্কৃতিক সম্প্রীতি বজায় রাখা। সম্প্রতি নববর্ষ উদযাপন ঘিরে দেশে নানা ধরনের বিতর্ক দেখা যাচ্ছে, যা অনেকটা মুক্তমনা বনাম রক্ষণশীল মানুষের ভাবনা-চিন্তা থেকে উৎসারিত। বাঙালি নাকি মুসলমান—এমন একটি দ্বন্দ্বে ঘুরপাক খাচ্ছে মানুষ। এক্ষেত্রে প্রয়োজন পরমতসহিষ্ণুতা। সবার মনে রাখা উচিত ভাবনার পার্থক্য থাকাটাই স্বাভাবিক, তবে তা অন্যের ওপর বল প্রয়োগ করাটা অস্বাভাবিক। পারস্পরিক সম্মানবোধ এখানে জরুরি। তবেই জাতি হিসেবে আমাদের মধ্যে ঐক্য ও সম্প্রীতি বজায় থাকবে। 

বাঙালির সবচেয়ে বড় উৎসব পহেলা বৈশাখ। এটা এমন একটা উৎসব যাকে মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, আদিবাসী নৃগোষ্ঠীসহ সবাই সর্বজনীনভাবে আনন্দে বরণ করে নেয়। অর্থাৎ এ উৎসবে ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সব সম্প্রদায়ের মানুষ অংশগ্রহণ করে। বৈশাখী উৎসব দেশের অর্থনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করে। উৎসবের পাশাপাশি বৈশাখের রয়েছে বাণিজ্যিক গুরুত্ব। নতুন বছরে প্রত্যাশা থাকবে অর্থনীতিতে স্বস্তি ফিরে আসবে। এতে সাধারণ মানুষের দুর্দশা লাঘব হবে। ব্যবসা-বাণিজ্যে ছন্দ ফিরবে। সম্প্রীতির পথে উৎসবের আনন্দ সবার জীবনে ছড়িয়ে পড়ুক—আমরা সে প্রত্যাশাই করি। সবাইকে বাংলা নববর্ষের শুভেচ্ছা। স্বাগত ১৪৩১।