চাকরি পাওয়ার আগে অর্থাৎ আগামী বন্যায় তার পরিবারের বসতভিটা থাকবে তো? সুনামগঞ্জের হাওরের একজন তরুণীর উচ্চ শিক্ষার আকাঙ্ক্ষা আছে, কিন্তু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, যাতায়াত ও ডিজিটাল সংযোগ—এ তিনটি পাওয়াই তার জন্য শহরের একজন শিক্ষার্থীর তুলনায় কঠিন। সাতক্ষীরার উপকূলের তরুণ কৃষকের ভাবনা, লবণাক্ততা বাড়লে আগামী বছর জমিতে কী ফলবে? আর ঢাকার একজন তরুণ উদ্যোক্তা ভাবছেন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে নিজের দক্ষতাকে কীভাবে প্রতিযোগিতামূলক রাখবেন। তাদের বাসস্থান আলাদা, সংকট আলাদা, সুযোগও সমান নয়। অথচ প্রত্যাশা প্রায় একই, একটি সম্মানজনক জীবন, ভালো শিক্ষা, কর্মসংস্থান, নিরাপত্তা, নিজের মতপ্রকাশের সুযোগ এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে নিশ্চয়তা।
এ বাস্তবতাকেই যেন ধারণ করেছে এবারের আন্তর্জাতিক যুব দিবসের প্রতিপাদ্য, ‘ভিন্ন বাস্তবতা, অভিন্ন আকাঙ্ক্ষা।’ পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে তরুণদের জীবনযাত্রার পরিস্থিতি ভিন্ন হলেও তারা প্রায় একই জিনিস চায়। সেটি হলো মর্যাদা, সুযোগ, মানসম্মত শিক্ষা, শোভন কাজ, অর্থবহ অংশগ্রহণ ও একটি টেকসই ভবিষ্যৎ। বিশেষভাবে স্বল্পোন্নত দেশ বা এলডিসি, স্থলবেষ্টিত উন্নয়নশীল দেশ ও ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্রের তরুণদের ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। কারণ দারিদ্র্য, জলবায়ু পরিবর্তন, ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা ও ডিজিটাল বৈষম্য তাদের সুযোগকে বহুমাত্রিকভাবে সীমিত করে।
বাংলাদেশের তরুণদের সবচেয়ে বড় আকাঙ্ক্ষিত বিষয় হলো কর্মসংস্থান। বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি এখন আর স্বয়ংক্রিয়ভাবে চাকরির নিশ্চয়তা দেয় না, বরং শিক্ষিত বেকারত্ব এবং শিক্ষা ও শ্রমবাজারের চাহিদার মধ্যে স্কিল মিসম্যাচ ক্রমে উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে। অনেক তরুণ বছরের পর বছর চাকরির প্রস্তুতি নেন; অনেকে এমন কাজে যুক্ত হন যেখানে তাদের শিক্ষা ও দক্ষতার সামান্য অংশই ব্যবহার হয়। শুধু বেকারত্বের হার দিয়ে সমস্যাটিকে পুরোপুরি বোঝা যায় না। একজন বিশ্ববিদ্যালয় স্নাতক যদি এমন কাজে যুক্ত হন, যেখানে তার দক্ষতার যথাযথ মূল্য নেই, তখন তিনি পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে বেকার নন। কিন্তু তার সম্ভাবনার পূর্ণ ব্যবহার হচ্ছে না। তরুণ নারীদের ক্ষেত্রে সমস্যাটি আরো জটিল: শিক্ষা অর্জনের পরও পরিবার, নিরাপত্তা, সামাজিক মানদণ্ড, যাতায়াত, শিশুযত্ন ও কর্মক্ষেত্রের পরিবেশ তাদের শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ সীমিত করছে। বাংলাদেশের জনমিতিক লভ্যাংশের আলোচনায় তাই শুধু ‘বড় যুব জনসংখ্যা’ নিয়ে আশাবাদী হলে চলবে না। জনমিতিক লভ্যাংশ মানুষের বয়স দিয়ে তৈরি হয় না; তৈরি হয় সেই মানুষের স্বাস্থ্য, শিক্ষা, দক্ষতা ও উৎপাদনশীল কর্মসংস্থানের মাধ্যমে।
কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হলে জনমিতিক সুযোগ একসময় জনমিতিক চাপেও পরিণত হতে পারে। এখানে নীতির কেন্দ্রবিন্দু হওয়া উচিত উপযুক্ত চাকরি। যেকোনো কাজ নয়, বরং এমন কাজ দরকার, যেখানে আয়, নিরাপত্তা, সামাজিক সুরক্ষা, দক্ষতা ব্যবহারের সুযোগ এবং ভবিষ্যৎ উন্নতির দিকনির্দেশনা থাকে। শিল্পায়ন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ, কৃষিভিত্তিক মূল্যশৃঙ্খল, সেবা খাত, সবুজ অর্থনীতি এবং ডিজিটাল অর্থনীতিতে বড় পরিসরে নতুন কাজ সৃষ্টি ছাড়া যুবসমাজের আকাঙ্ক্ষা পূরণ হবে না।
বাংলাদেশের একজন উপকূলীয় বা চরাঞ্চলের তরুণের কাছে জলবায়ু পরিবর্তন কোনো ভবিষ্যৎ বৈজ্ঞানিক পূর্বাভাস নয়। তার কাছে এটি নদীভাঙনে জমি হারানো, লবণাক্ততায় কৃষি উৎপাদন কমে যাওয়া, ঘূর্ণিঝড়ে সম্পদ নষ্ট হওয়া অথবা জীবিকার জন্য শহরে চলে আসার বর্তমান বাস্তবতা। জলবায়ু পরিবর্তন শুধু জমি বা ঘরবাড়ি কেড়ে নেয় না; এটি একজন তরুণের জীবনের গতিপথ বদলে দিতে পারে। একটি দুর্যোগের কারণে একজন শিক্ষার্থীর পড়াশোনা বন্ধ হতে পারে। পরিবারের আয় নষ্ট হলে একজন তরুণকে অল্প বয়সেই শ্রমবাজারে ঢুকতে হতে পারে। কৃষিজীবিকা টেকসই না হলে তাকে বাধ্য হয়ে শহরে বা বিদেশে পাড়ি দিতে হতে পারে। ফলে জলবায়ু ঝুঁকি শিক্ষা, কর্মসংস্থান, অভিবাসন, স্বাস্থ্য ও সামাজিক স্থিতিশীলতার প্রশ্নের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। তাপমাত্রা বৃদ্ধি, দীর্ঘস্থায়ী গরম, পানি বাহিত রোগ, লবণাক্ততা, কৃষি উৎপাদনের অনিশ্চয়তা এবং দুর্যোগ এ সবই তরুণদের কর্মক্ষমতা ও ভবিষ্যৎ আয়ের ওপর প্রভাব ফেলে। তাই যুবনীতি ও জলবায়ু নীতিকে আলাদা দুটি নীতিক্ষেত্র হিসেবে দেখার সুযোগ ক্রমেই কমছে। প্রয়োজন জলবায়ুসহনশীল যুব কর্মসংস্থান। এ কর্মসংস্থানের অধীনে কৃষি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, পানি ব্যবস্থাপনা, বর্জ্য পুনর্ব্যবহার, সবুজ নির্মাণ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, জলবায়ু তথ্যসেবা ও প্রযুক্তির মতো খাতে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে। জলবায়ু অভিযোজনকে কেবল অবকাঠামো নির্মাণে সীমাবদ্ধ না রেখে তরুণদের দক্ষতা ও জীবিকার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।
বাংলাদেশ আয়তনে ছোট দেশ হলেও সুযোগ অসম। ঢাকায় জন্মানো একজন তরুণ এবং কুড়িগ্রামের চর, সুনামগঞ্জের হাওর, ভোলার দ্বীপ বা সাতক্ষীরার উপকূলে জন্মানো একজন তরুণ একই দেশের নাগরিক হলেও তাদের সুযোগের প্রাপ্যতা এক নয়। ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতার অর্থ শুধু দূরত্ব নয়। এর অর্থ একটি ভালো কলেজে পৌঁছতে বেশি সময়; একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে যাওয়ার অতিরিক্ত খরচ; বিশেষজ্ঞ চিকিৎসা না পাওয়া; ইন্টার্নশিপের সুযোগ সীমিত থাকা; উদ্যোক্তা হলে বাজারের সঙ্গে যোগাযোগের সমস্যা; কোনো চাকরির সাক্ষাৎকারে যেতে একটি পুরো দিন ব্যয় করা। একজন শহুরে তরুণের কাছে কোনো সুযোগ হয়তো একটি ক্লিক দূরে। একই সুযোগ অন্য তরুণের কাছে নৌকা, বাস, কয়েক ঘণ্টার যাত্রা ও অতিরিক্ত অর্থের বিষয়। এ ভৌগোলিক বৈষম্য শেষ পর্যন্ত যুবকদের সামাজিক গতিশীলতাকে প্রভাবিত করে। দরিদ্র ও দূরবর্তী এলাকার সন্তান যদি মানসম্মত শিক্ষা, প্রযুক্তি ও কর্মসংস্থানের সুযোগ না পায়, তাহলে জন্মস্থানই ধীরে ধীরে তার ভবিষ্যতের সীমারেখা নির্ধারণ করতে শুরু করে। উন্নয়ন তখন অন্তর্ভুক্তিমূলক থাকে না। এ বৈষম্য কমাতে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে মানসম্মত দক্ষতা উন্নয়ন, ডিজিটাল কাজের অবকাঠামো, স্থানীয় শিল্প ও উদ্যোগের বিকাশ, পরিবহন সংযোগ এবং শিক্ষা-স্বাস্থ্যসেবার গুণগত মান বাড়ানো জরুরি। উন্নয়নের অর্থ শুধু মানুষকে ঢাকামুখী করা নয়; দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এমন সুযোগ সৃষ্টি করা, যাতে একজন তরুণ নিজের এলাকায় থেকেও সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ নির্মাণ করতে পারেন।
বাংলাদেশে মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেটের বিস্তার নিঃসন্দেহে একটি বড় অর্জন। কিন্তু একটি স্মার্টফোন হাতে থাকা আর ডিজিটাল সুযোগের সমান অধিকার থাকা এক বিষয় নয়। শহর ও গ্রামের মধ্যে ইন্টারনেট ব্যবহার, ডিভাইসের মান, সংযোগের গতি, ডিজিটাল দক্ষতা এবং প্রযুক্তি ব্যবহারে বড় পার্থক্য রয়েছে। এ ব্যবধান আজকের তরুণদের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। কারণ ইন্টারনেট এখন শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়। চাকরির আবেদন, অনলাইন শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন, ফ্রিল্যান্সিং, ই-কমার্স, ব্যাংকিং, সরকারি সেবা, উদ্যোক্তা নেটওয়ার্ক—সবকিছুই ক্রমে ডিজিটাল হচ্ছে। ভবিষ্যতের শ্রমবাজারে ডিজিটাল দক্ষতা ক্রমেই একটি মৌলিক সক্ষমতায় পরিণত হচ্ছে।
আগামীতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এ ব্যবধানকে আরো বড় করতে পারে। একজন তরুণ যদি দ্রুতগতির ইন্টারনেট, কম্পিউটার, ইংরেজি দক্ষতা এবং এআই ব্যবহারের সুযোগ পান, তার উৎপাদন শীলতা বহুগুণ বাড়তে পারে। অন্যদিকে যে তরুণ কেবল সীমিত ডেটা প্যাক দিয়ে একটি নিম্নমানের স্মার্টফোন ব্যবহার করেন, তিনি প্রযুক্তির যুগেও নতুন ধরনের বঞ্চনার মধ্যে থেকে যেতে পারেন। তাই আগামী দিনের বৈষম্যের একটি বড় রেখা সম্ভবত শুধু ধনী-দরিদ্রের মধ্যে নয়, বরং প্রযুক্তিগতভাবে ক্ষমতায়িত এবং প্রযুক্তিগতভাবে বিচ্ছিন্ন মানুষের মধ্যেও তৈরি হবে। সাশ্রয়ী উচ্চগতির ইন্টারনেট, কম্পিউটার ও ডিভাইস ব্যবহারের সুযোগ, বাংলা ভাষায় মানসম্মত ডিজিটাল কনটেন্ট এবং বিদ্যালয় পর্যায় থেকে এআই ও উপাত্ত সাক্ষরতা গড়ে তোলা এখন সামাজিক ন্যায়েরও প্রশ্ন।
বাংলাদেশের তরুণদের সমস্যা একরকম নয় এবং সেটিই এবারের আন্তর্জাতিক যুব দিবসের প্রতিপাদ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। একজন দরিদ্র পরিবারের তরুণের জন্য প্রথম প্রয়োজন অর্থনৈতিক নিরাপত্তা। উপকূলের তরুণের জন্য তার সঙ্গে জলবায়ুসহনশীল জীবিকা। চরের তরুণের জন্য যোগাযোগ ও শিক্ষা। একজন তরুণ নারীর জন্য নিরাপত্তা ও শ্রমবাজারে সমান সুযোগ। শহরের শিক্ষিত তরুণের জন্য দক্ষতার উপযোগী কাজ। ডিজিটালভাবে পিছিয়ে থাকা তরুণের জন্য প্রযুক্তির প্রকৃত প্রবেশাধিকার। নীতিও তাই ‘সব তরুণের জন্য একই সমাধান’ হতে পারে না। প্রয়োজন স্থান-সংবেদনশীল, লিঙ্গ-সংবেদনশীল ও ঝুঁকি-সচেতন যুবনীতি, যেখানে কে কোথায় জন্মেছে, তার পরিবারের আর্থিক অবস্থা কী, সে নারী না পুরুষ, জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বাস করে কিনা এবং তার প্রযুক্তিগত প্রবেশাধিকার কত, এসব বাস্তবতা বিবেচনায় নেয়া হবে।
বাংলাদেশ উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। কুড়িগ্রামের চর থেকে ঢাকা, সুনামগঞ্জের হাওর থেকে খুলনার উপকূলের বাস্তবতা ভিন্ন হতে পারে। কিন্তু তরুণের স্বপ্নের মূল্য ভিন্ন হতে পারে না। ‘ভিন্ন বাস্তবতা, অভিন্ন আকাঙ্ক্ষা’—এবারের আন্তর্জাতিক যুব দিবস তাই শুধু একটি প্রতিপাদ্য নয়; বাংলাদেশের জন্য এটি একটি উন্নয়ন প্রশ্ন। ভিন্ন বাস্তবতায় জন্ম নেয়া তরুণদের আমরা কি সত্যিই একই স্বপ্ন দেখার এবং সে স্বপ্ন বাস্তবায়নের সমান সুযোগ দিতে পারছি? উত্তরটি নির্ধারণ করবে শুধু আজকের তরুণদের ভবিষ্যৎ নয়, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎও।
আবু হাসানাত মো. কিশোয়ার হোসেন: বিভাগীয় প্রধান ও প্রকল্প পরিচালক, পপুলেশন সায়েন্সেস বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়










