অনেক ক্ষেত্রেই ব্যবসা, বাণিজ্য ও বিনিয়োগকে আলাদা করে দেখানো হয়েছে। কিন্তু আমার মনে হয় তিনটিই একই সূত্রে গাথা। অতএব আমার কথার ভেতরেও বিনিয়োগের কথাটা চলে আসবে। ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে আমাদের সমাজ এখনো কী চিন্তা করে সেটাই আমি আজ পর্যন্ত বুঝে উঠতে পারিনি। ব্যবসা বলতেই লোকে বলেন, ব্যবসায়ীরা মুনাফাখোর, ব্যবসায়ীরা অযৌক্তিকভাবে মুনাফা করেন, কিন্তু আমি যতটুকু লেখাপড়া করেছি তাতে আমার ধারণা, ব্যবসা-বাণিজ্য করা নৈতিকও নয়, অনৈতিকও নয়। বরং ধর্ম এটাকে আরো উৎসাহিত করে। যদি নৈতিকতা ও অনৈতিকতার প্রশ্ন ওঠে, তাহলে উঠবে যারা ব্যবসা-বাণিজ্য করেন তাদের ওপর। এখন আমাদের দেশের সমস্যা হলো, এখানে যারা ব্যবসায়ীদের নৈতিকতা-অনৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠান, তারাই সমাজের সবচেয়ে অনৈতিক কাজগুলো করে থাকেন। কারণ ব্যবসা, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সমাজে সম্পদ সৃষ্টি করে। সম্পদ সৃষ্টি করে উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে এবং এ উৎপাদন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সম্পদ সৃষ্টি করে ব্যবসায়ীরাই এ দেশের প্রবৃদ্ধিতে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখেন। এখন যারা এ ব্যবসা-বাণিজ্য করেন, তাদের নৈতিকতা নিয়ে যদি সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত প্রশ্ন করা হয়, তাহলে এসব ব্যবসায়ী, বিনিয়োগকারীরা তো আর উৎসাহিত বোধ করবেন না।

যা-ই হোক, আজকে আমাদের আলোচনার বিষয়বস্তু নির্ধারণ করা হয়েছে বৈষম্যের ওপর। আমাদের সমাজে বৈষম্য বহুমাত্রিক। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত আমরা যে জীবন যাপন করি সেখানে প্রতিটি ক্ষেত্রেই বৈষম্য এবং বেশির ভাগ বৈষম্যই কিন্তু আমরা নিজেরাই সৃষ্টি করি। আমাদের আয়ের বৈষম্য, আমাদের সম্পদের বৈষম্য, সামাজিক বৈষম্য, স্বাস্থ্য ও শিক্ষার বৈষম্য, লৈঙ্গিক বৈষম্য এবং আইন প্রয়োগ ও আইনি অধিকারে বৈষম্য—এ রকম আমি হাজারো বৈষম্যের কথা আপনাদের বলতে পারি। কিন্তু এ বৈষম্য সৃষ্টি করা বা তৈরি হওয়ার পেছনে কারণটা কী? কারণ আমাদের দেশে আপনি বৈষম্য কমাতে পারবেন একমাত্র যদি আপনি সম্পদ বৃদ্ধি করতে সক্ষম হন, তাহলেই না আমরা দেশে বৈষম্য কমাতে পারব। কিন্তু মূলত সম্পদ যারা সৃষ্টি করেন, সম্পদের বিলি-বণ্টনের কাজ তো আর তাদের হাতে নয়। সম্পদ যারা বিলি-বণ্টন করেন, তারাই যদি বৈষম্য সৃষ্টি করেন, তারাই যদি সমাজে অনৈতিক কাজ করেন, দুর্নীতি করেন, তাহলে এখানে যারা সম্পদ সৃষ্টি করেন, তাদের দোষ দিয়ে তো কোনো লাভ নেই। কিন্তু যখন থেকে আমি বাংলাদেশে ব্যবসা-বাণিজ্য করছি তখন থেকেই আমি একটা জিনিস লক্ষ করে এসেছি যে যারা সম্পদ সৃষ্টি করেন, তাদেরকেই সব দোষারোপ করা হয়। যারা সম্পদ সৃষ্টি না করে, চুরি করে বা লুণ্ঠন করে সম্পদ অর্জন করে, তারাই আবার এসব সম্পদ সৃষ্টিকারীদের ওপর দোষ চাপান প্রতিদিন, প্রতিনিয়ত। সেজন্য এখন আমি বলতে চাই যে সমাজের দুটি গোষ্ঠী বিদ্যমান, একটি হলো সম্পদ সৃষ্টিকারী। আরেকটা হলো, যারা সম্পদ অর্জন করেন সৃষ্টি না করেই। যত সমস্যা বা ফ্যাসাদের মূলে রয়েছে এ দ্বিতীয় শ্রেণীটি যারা কিনা সৃষ্টি না করে সম্পদ অর্জন করে থাকে। আমরা যখন বৈষম্যের কথা বলছি, আমাদের যত আন্দোলন হয়েছে গত কয়েক মাস আগে, সেটা তো মূলত ছোট্ট একটা ইস্যুতে আন্দোলন শুরু, সেটা হলো সরকারি চাকরিতে বৈষম্য বা কোটাবৈষম্য। কিন্তু বৈষম্যের কথা উঠালে প্রশ্ন ওঠে, কতগুলো সরকারি চাকরি আছে দেশে? দেশে প্রতি বছর ২০-২২ লাখ লোক চাকরির বাজারে প্রবেশ করে যারা কর্মক্ষম। আমাদের কর্মক্ষমতা শুরু হওয়ার বয়স ১৬ বছর। তার সঙ্গে প্রতি বছর কৃষি খাত থেকে কর্মচ্যুত হয়ে আরো এক-দুই লাখ লোক কর্মবাজারে প্রবেশ করে। আমরা তো এদের সবাইকে বিদেশে পাঠাতে পারব না। এদের সবার পক্ষে বৈদেশিক মুদ্রা আয় করে এনে দেশে দেয়া সম্ভব নয়;৷ মাত্র ৩০০ ডলারের জন্য পারলে আমাদেরকেও বিদেশে পাঠায় এ দেশের সরকার। তো সেজন্য আমরা চাই দেশে বিনিয়োগ করে আমাদের দেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে। কিন্তু সমস্যা হলো বিনিয়োগ যদি না হয় তাহলে কর্মসংস্থানের সুযোগ কীভাবে হবে? তাহলে তো এভাবেই সমাজে আরো বৈষম্য বাড়বে এবং ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগ আমরা যা-ই করি না কেন সেসবের জন্য প্রাথমিক কিছু কাজ বা বিষয়ে বা উপাদানের দরকার। সবচেয়ে বেশি দরকার সামাজিক মূলধন, এটাকে আপনারা সামাজিক ব্যবসায়ের সঙ্গে একত্রিত করে দেখবেন না, আমি আলাদা করে শুধু সামাজিক মূলধনের কথা বলছি। সামাজিক মূলধন সৃষ্টি হয় দেশের মানুষের মধ্যে যদি একতা থাকে, আইনের যদি সুষম প্রয়োগ করা হয়, আমরা যদি একে অন্যকে বিশ্বাস করি, যথাযথ উপায়ে যদি চুক্তির বাস্তবায়ন করা হয়। সমাজে এ ধরনের অনেকগুলো সামাজিক রীতিনীতি ও সামাজিক মূলধন সৃষ্টি হয়। যে সমাজে একে অন্যকে বিশ্বাস করে না, একে অন্যকে দেখলেই শত্রু মনে করে, এক দল আরেক দলের বিরুদ্ধে প্রতিনিয়ত মারামারিতে জড়িত সেই সমাজে তো সামাজিক মূলধন কখনো সৃষ্টি হবে না। এবার আসি আর্থিক মূলধনে, কথা হলো আর্থিক মূলধন বেসিক্যালি আসার কথা পুঁজিবাজার থেকে; একটু আগে আমাদের এক সহ-আলোচক তো পুঁজিবাজার নিয়ে আপনাদের বললেন। তো সেখানে সমস্যা হলো, আমাদের আর্থিক মূলধন নিতে হচ্ছে ব্যাংক খাত থেকে। এখানে সমস্যা হলো, ব্যাংক খাতে সঞ্চয় বা ডিপোজিট শর্ট টার্মের কিন্তু বিনিয়োগ তো করা হয় লং টার্মে। যখনই আমরা শর্ট টার্ম সঞ্চয়ের বিপক্ষে লং টার্ম বিনিয়োগ করব তখনই ব্যাংক খাতে অনেক সমস্যার সৃষ্টি হবে। এ খাতের লুণ্ঠন, পাচার যা কিছু হচ্ছে এগুলো না হয় আমি আপাতত বাদ দিলাম। তবে একটা কথা না বললেই নয়, এখানে আমাদের দুজন স্বনামধন্য ব্যাংকার কথা বলেছেন, যাদের একজন ব্র্যাক ব্যাংকের সিইও, আরেকজন সিটি ব্যাংকের সিইও। ব্র্যাক ব্যাংকের সিইও যে কথাগুলো বলেছেন সেটা আমাদের ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ বলে মনে হয়নি। আমাদের উচিত সমাজ ও বেসরকারি খাতকে বোঝা, বেসরকারি খাতের সমস্যাকে আরো ভালো করে স্টাডি করা। শুধু তার একটা ব্যাংক খুব ভালো যাচ্ছে সেজন্য পুরো ব্যাংক খাত একেবারে ভালো, দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি খুব ভালো—এগুলো আমার কাছে খুব একটা বিশ্বাসযোগ্য বলে মনে হয়নি। এরপর আসুন, সমাজে যখন এ আর্থিক খাতের মূলধন আমরা নিই, তখনই একটা প্রশ্ন চলে আসে সেটা হলো সরকারের মনিটারি পলিসি অর্থাৎ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুদ্রানীতি। কারণ বাংলাদেশ ব্যাংক দেশের মনিটারি পলিসি করে থাকে। বাংলাদেশে অনেক সময় কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলে সংকুচিত মুদ্রানীতি বেসরকারি খাতের জন্য সংকুচিত; কিন্তু সরকারের জন্য সেই মুদ্রানীতি সম্প্রসারিত। এখন একটা দেশে যদি দুটো বিপরীত মুদ্রানীতি একই সঙ্গে নির্ধারণ করা হয় বা অনুসরণ করা হয়, যেখানে বেসরকারি খাতে যারা বিনিয়োগ করেন তাদের জন্য সংকোচনমূলক নীতি প্রয়োগ করা হচ্ছে আর সরকার, যারা শুধু ব্যয় করে তাদের জন্য সম্প্রসারণ নীতি প্রয়োগ করা হয় তাহলে তো এ পদ্ধতি নিজেই একটা অসংগতি সৃষ্টি করে সমাজে। অতএব এ অবস্থায় বিনিয়োগকারীরা খুব স্পষ্টভাবে বুঝতে পারেন না তারা কীভাবে বিনিয়োগ করে লভ্যাংশ তুলে আনতে পারবেন বা ফলপ্রসূ জায়গায় ফলপ্রসূ বিনিয়োগ করতে পারবেন।

এখন বাংলাদেশে যেমন একটা মুদ্রানীতি অনুসরণ হচ্ছে, কারণ আমরা বিদ্যমান উচ্চ মূল্যস্ফীতি কমাতে চাই। কিন্তু মুদ্রানীতির কাজ তো শুধু উচ্চ মূল্যস্ফীতি কমানো নয়। মূল্যস্ফীতি বহু কারণে সৃষ্টি হয় সেটার জন্য অন্তত ১০-১৮টা কারণ আছে। এর মধ্যে একটা হলো, বেশি করে মুদ্রা সরবরাহ করলে মূল্যস্ফীতি বাড়ে। এখন যদি আমরা মূল্যস্ফীতি কমাতে গিয়ে এমন এক মুদ্রানীতি অনুসরণ করি যেটা সমাজের সব অর্থনীতিকে গলা টিপে ধরবে। সেটা কোনো কার্যকর মুদ্রানীতি বলে আমার কাছে বিশ্বাস হয় না। মুদ্রানীতির আরেকটা কাজ হলো, দেশে বিনিয়োগ বৃদ্ধির মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা। আমরা যদি এমন মুদ্রানীতি অনুসরণ করি, যেখানে অর্থনীতির গলা টিপে ধরে বিনিয়োগকে রুদ্ধ করা হয়, আর বিনিয়োগ না হলে কর্মসংস্থান হবে না। তাহলে যে কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এমন মুদ্রানীতি প্রণয়ন করে সেটার বিপরীতেই এটা কাজ করে।

যা-ই হোক, ক্ষমতা আর দায়িত্ব হলো জমজের মতো। যেমন রাজনীতি ও অর্থনীতি পরস্পর ভাই। একটা দেশের রাজনৈতিক অবস্থা খুব ভালো আর অর্থনৈতিক অবস্থা খারাপ হলে সেটা অসম্ভব ও অবিশ্বাস্য ব্যাপার। যে দেশের অর্থনীতি ভালো সে দেশের রাজনীতি ভালো। এখন যে দেশের রাজনীতি ঠিক নেই, সেখানের অর্থনীতি ভালো হতে হবে—এমনটা হয় না। যারা অর্থনীতি চালায় বা বেসরকারি খাত চালায় তারা খুব ভালো লোক হবে—এটাও তেমনি বিশ্বাসযোগ্য কথা নয়।৷ কারণ রাজনীতি অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করে আর অর্থনীতিও দিনশেষে রাজনীতিকে পরিচালিত করে। দেশের অর্থনীতি যদি ভালো করতে হয়, দেশের আর্থিক খাতকে ভালো করতে হয়, তাহলে আগে রাজনীতিকে ভালো করতে হবে। মৌলিকভাবে ভালো রাজনীতি ছাড়া কোনো জিনিসই সঠিক পথে আসবে না। এটা আমি জানি এবং এটাই বুঝি যে এর বাইরে কেউ কিছু যদি আমাকে বোঝাতে চান আমি চেষ্টা করব সেটা বুঝতে। কিন্তু আমি অবুঝের মতো কথা বলছি না। রাজনীতিই হলো একটা দেশের সারবত্তা। সেজন্য আগে দেশের রাজনীতি ঠিক করতে হবে। আর রাজনীতি বলতে আমি এটাও বোঝাচ্ছি যে দেশে গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যদি গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠা না করেন আপনি, তাহলে যে সুচিন্তিত রাজনীতি আমাদের লাগবে বা যেই তর্ক-বিতর্কের মাধ্যমে আপনি দেশের জন্য একটি ভালো ব্যবস্থাপনার সৃষ্টি করবেন, ঐকমত্যের ভিত্তিতে যে ভবিষ্যৎ চিন্তা করবেন, সেটা কখনই প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে না। কোনো একদল একতরফাভাবে কোনোদিন একটা দেশের উন্নয়ন করতে পারে না। আরেকটা ব্যাপার হলো, এখানে আমরা কেউ শুধু রাজনীতি করি, যারা অর্থনীতিতে সরাসরি কাজ করেন তাদের গালি দিই; আবার কেউ আমরা অর্থনীতিতে কাজ করে রাজনৈতিকদের গালি দিই, কিন্তু এটা দিয়ে কোনো কাজ হবে না। অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রিত করে, অর্থনীতির স্বার্থে রাজনীতিকে পরিচালিত করতে পারে এমন একটি রাজনৈতিক ও সমাজ ব্যবস্থা যদি আমরা তৈরি করতে না পারি তাহলে আমাদের সারা জীবন একই অভিযোগ করে যেতে হবে। সুতরাং আমরা চাই, আমাদের যারা এখন দায়িত্বে আছেন, তারা দায়িত্বের সঙ্গে কাজ করুন। ‘আমার ক্ষমতা নাই, খালি দায়িত্ব নিছি’—এ কথা বলে দায় এড়ালে কাজ হবে না। যারা দায়িত্বে আছেন তারা ক্ষমতায়ও আছে। আমরা চাই আমাদের দেশের রাজনীতি ভালো হোক, আমরা চাই আমাদের দেশের অর্থনীতি ভালো হোক, আমরা চাই আমাদের সমাজের উন্নয়ন হোক। আমরা চাই আমাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সত্যিকার অর্থে বিলি-বণ্টনের মাধ্যমে সামাজিক বৈষম্য কমুক, অর্থনৈতিক বৈষম্য কমুক, সম্পদের বৈষম্য কমুক, সর্বোপরি আয়বৈষম্য কমুক।

আবদুল আউয়াল মিন্টু : চেয়ারম্যান, মাল্টিমোড গ্রুপ ও ন্যাশনাল ব্যাংক লিমিটেড

[১১ নভেম্বর বণিক বার্তা আয়োজিত ‘বৈষম্য, আর্থিক অপরাধ ও বাংলাদেশের অর্থনীতির নিরাময়’ শীর্ষক তৃতীয় বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সম্মেলন ২০২৪-এ প্যানেল আলোচকের বক্তব্য]