জানা গেছে তিস্তা, ধরলা, দুধকুমার, সুরমা-কুশিয়ারা, ব্রহ্মপুত্র-যমুনা, আত্রাই ও ছোট যমুনার মতো প্রধান নদ-নদীর পানি বিভিন্ন পয়েন্টে সতর্কসীমার কাছাকাছি বা তা অতিক্রম করার পথে।

নদীতীরবর্তী অঞ্চলে বন্যা হলে খাদ্যনিরাপত্তা, জীবিকা, অবকাঠামো ও জনস্বাস্থ্যের মতো একগুচ্ছ পরস্পর সংযুক্ত সংকট দেখা দেয়। এরই মধ্যে বগুড়ার সবজিখেতে ক্ষতি হয়েছে। তা বৃহত্তর আউশ-আমন মৌসুমেও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। বগুড়ায় নতুন করে নদীভাঙন এখনো দেখা না দিলেও পুরনো ভাঙনপ্রবণ এলাকা ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। ভাঙনে ভিটেমাটি হারানো মানুষ প্রতি বছর নতুন করে ভূমিহীন হয়ে পড়ে, যা দীর্ঘমেয়াদি দারিদ্র্যের একটি বড় কারণ। নেত্রকোনার কলমাকান্দায় উপদাখালী নদীর পানির তীব্র স্রোতে একাধিক সড়ক ভেঙে গেছে। প্রত্যন্ত ইউনিয়নের সঙ্গে উপজেলা সদরের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হলে ত্রাণ, চিকিৎসাসেবা ও জরুরি উদ্ধারকাজ ব্যাহত হবে। বন্যার পানির সঙ্গে দূষিত পানি মিশে ডায়রিয়া, চর্মরোগ ও পানিবাহিত রোগের প্রকোপ বাড়ে। নলকূপ তলিয়ে যাওয়ায় বিশুদ্ধ খাবার পানির সংকট দেখা দেয়, বিশেষ করে প্রত্যন্ত চর ও হাওরাঞ্চলে। নিম্নাঞ্চলের বিদ্যালয় ভবন প্রায়ই বন্যার সময় আশ্রয় কেন্দ্রে রূপান্তর হয়, ফলে শিক্ষাকার্যক্রম দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকে এবং শিক্ষাবর্ষের ধারাবাহিকতা ব্যাহত হয়। সরকারকে বাড়তি সতর্কতাও নিতে হবে। কারণ সিলেট-সুনামগঞ্জ অঞ্চলে মেঘালয়ের পাহাড়ি ঢলজনিত আকস্মিক বন্যা সাধারণত অতি অল্প সময়ে আঘাত হানে, যেখানে পূর্বাভাসের সময় সীমিত থাকায় প্রস্তুতির সুযোগও কম মেলে।

বন্যাকালীন এসব সংকটের কোনোটিই নতুন নয়। তবু বাস্তবায়ন ও সমন্বয়ের ঘাটতির কারণে প্রতি বছরই দুর্যোগে ক্ষয়ক্ষতি স্বীকার করতে হয়। এজন্য পূর্বাভাস ব্যবস্থাকে কেবল জেলা প্রশাসন পর্যন্ত সীমাবদ্ধ না রেখে ইউনিয়ন পর্যায়ে মোবাইল বার্তা, কমিউনিটি রেডিও ও স্থানীয় মসজিদ-মন্দিরের মাইকিংয়ের মাধ্যমে সরাসরি ঝুঁকিপূর্ণ পরিবার পর্যন্ত পৌঁছতে হবে। বাপাউবোর পূর্বাভাস কেন্দ্রের সক্ষমতা বাড়িয়ে সতর্কতার সময়সীমা আরো দীর্ঘ করা জরুরি, বিশেষত সিলেট অঞ্চলে আকস্মিক বন্যার ক্ষেত্রে, যেখানে মেঘালয়ের বৃষ্টিপাতের তথ্য প্রায় রাতারাতি বিপৎসীমা অতিক্রমে রূপ নেয়। বাঁধ ও তীররক্ষা কাঠামোর নিয়মিত অডিট প্রয়োজন। সিরাজগঞ্জ শহররক্ষা বাঁধ বা বগুড়ার ভাঙনপ্রবণ পয়েন্টগুলোয় বর্ষার আগেই সংস্কারকাজ শেষ করার রেওয়াজ থাকলেও বাস্তবে তা প্রায়ই বর্ষার মুখে ঝুলে থাকে। বাঁধ নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণে বরাদ্দের স্বচ্ছতা এবং কাজের মান পর্যবেক্ষণে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সুশীল সমাজের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা দরকার, যাতে প্রতি বছর একই স্থানে ভাঙন পুনরাবৃত্তি না ঘটে। কৃষি ক্ষতি মোকাবেলায় স্বল্পমেয়াদি ফসল বীমা ও দ্রুত ক্ষতিপূরণ বিতরণ ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন, যাতে কৃষক মৌসুম হারানোর ধাক্কা সামলে পরবর্তী চাষে ফিরতে পারেন। পাশাপাশি বন্যাসহিষ্ণু এবং স্বল্পমেয়াদি জাতের ধান ও সবজির সম্প্রসারণ দীর্ঘমেয়াদে ক্ষয়ক্ষতি কমাতে পারে। আশ্রয় কেন্দ্র ব্যবস্থাপনায় বিদ্যালয়নির্ভরতা কমিয়ে বহুমুখী কমিউনিটি সেন্টার নির্মাণের কথা ভাবতে হবে, যাতে শিক্ষা কার্যক্রম ও দুর্যোগকালীন আশ্রয় দুটোই একসঙ্গে ব্যাহত না হয়।

বাংলাদেশের বন্যার ইতিহাস দীর্ঘ ও তিক্ত। ১৯৮৮ সালের বন্যা দেশের প্রায় ৬০ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয়েছিল এবং তা এখনো দেশের সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হয়। এক দশক পর ১৯৯৮ সালের বন্যায় দেশের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ এলাকা পানির নিচে চলে যায়। তিনটি প্রধান নদীর একযোগে প্রবাহ বৃদ্ধি ও ব্যাক ওয়াটার প্রভাবে পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে ওঠে। ২০০৭ সালের বন্যায়ও দেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চল প্লাবিত হয় এবং ব্যাপক মানবিক ক্ষতি হয়। ২০১৭ সালে সিলেট, সুনামগঞ্জসহ প্রায় ২০ জেলায় যে আকস্মিক বন্যা আঘাত হানে, তা হাওরাঞ্চলের বোরো ফসল একরকম নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছিল, যা কৃষকদের বছরজুড়ে সংকটে ফেলে। ২০২২ সালে সিলেট-সুনামগঞ্জে স্বল্প সময়ের মধ্যে পাহাড়ি ঢলের কারণে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যায় বিদ্যুৎ, মোবাইল নেটওয়ার্ক ও সড়ক যোগাযোগ একযোগে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, যা পূর্বাভাস ব্যবস্থা ও দ্রুত সাড়াদানের সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা প্রকট করে তোলে। প্রতিটি বড় বন্যার পর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় নতুন নীতিমালা ও কাঠামো তৈরি হয়েছে, কিন্তু বাস্তবায়নের ধারাবাহিকতা প্রশ্নবিদ্ধ থেকে গেছে। পূর্বাভাস মিললেও প্রস্তুতিতে যে ফাঁক থেকে যায়, ছোট-বড় প্রতিটি বন্যায় তা ফিরে ফিরে আসে।

বর্তমান পূর্বাভাসকে সামনে রেখে সরকারের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কাঠামোয় কয়েকটি পদক্ষেপ অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে বন্যা প্রস্তুতি কমিটিগুলোকে কেবল কাগুজে সভার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তব মজুদ অর্থাৎ শুকনো খাবার, বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট, নৌকা ও চিকিৎসা সরঞ্জাম নিশ্চিত করতে হবে। বাপাউবোর হাইড্রোলজিক্যাল মডেলিং সক্ষমতা ও উজানের তথ্য বিনিময় (বিশেষত মেঘালয়-আসাম অববাহিকা-সংক্রান্ত) জোরদার করা, যাতে আকস্মিক বন্যার সতর্কতা সময় বাড়ে। প্রতি বছর বর্ষার আগে স্বাধীন প্রকৌশল পরিদর্শন করে ঝুঁকিপূর্ণ পয়েন্টগুলোয় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সংস্কার সম্পন্ন করা দরকার। বন্যা-পরবর্তী সময়ে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের জন্য কাজের বিনিময়ে টাকা কর্মসূচি দ্রুত চালু করে আয়ের ধারাবাহিকতা রক্ষার উদ্যোগ নিয়েও ভাবা দরকার।

১৬ জেলার নদ-নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে বন্যার এ সবশেষ সতর্কতা বাংলাদেশের জন্য নতুন কোনো পরীক্ষা নয়; বরং প্রতিবার ফিরে আসা একই পরীক্ষার আরেকটি অধ্যায়। ১৯৮৮, ১৯৯৮, ২০১৭ কিংবা ২০২২ সালের অভিজ্ঞতা বলে দেয়, পূর্বাভাস যত নির্ভুলই হোক না কেন, বাস্তবায়নের ঘাটতি থেকে গেলে তার সুফল মাঠপর্যায়ে পৌঁছায় না। এখনই সময় পূর্বাভাসকেন্দ্রিক সতর্কতাকে কার্যকর প্রস্তুতিতে রূপান্তর করার, যাতে প্রতিটি বর্ষায় একই সংকট নতুন করে জাতীয় বিপর্যয়ে পরিণত না হয়।