লজিস্টিকস হলো সুশৃঙ্খল সরবরাহ ব্যবস্থাপনার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ, যা পণ্যের দৃশ্যমান ও অদৃশ্য প্রবাহের পরিকল্পনা, ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণকে বোঝায়। লজিস্টিকস শব্দটি সামরিক বাহিনীর রসদ সম্পদ ব্যবস্থাপনা থেকে আহরিত, যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত ও জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
সরবরাহ এবং চাহিদার ভারসাম্য বজায় রাখতে লজিস্টিকস একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। লজিস্টিকস একীকরণের মাধ্যমে পরিবহন ব্যয় হ্রাস, গুণমান রক্ষা ও সময়মতো বিতরণ নিশ্চিত করা হয়, যা গ্রাহকদের জন্য প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা তৈরি করে। লজিস্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা সরাসরি প্রভাব বিস্তার করে।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সম্প্রসারণের মাধ্যমে বাংলাদেশও ১৯৮০-এর সূচনালগ্নে কোনো প্রস্তুতি ছাড়াই এ শিল্পের ব্যবহার শুরু হয়। নানা বিঘ্ন-বাধা থাকা সত্ত্বেও কোনো ধরনের নীতিমালা ছাড়া এ শিল্পের বিকাশ হয়েছে এবং বিশ্ব বাণিজ্যে একটি দৃঢ় অবস্থানও করে নিয়েছে।
১৯৯০ সালে প্রথম আন্তর্জাতিক লজিস্টিক কোম্পানিগুলো বাংলাদেশের বাজারে প্রবেশ করে। কোম্পানিগুলোর জ্ঞান ও প্রযুক্তি প্রণয়নের মাধ্যমে তারা এ শিল্প সম্প্রসারিত করতে সহায়তা করে। তখন থেকে আন্তর্জাতিক তৈরি পোশাক শিল্পের ব্যবসায়ীরা ব্যবসা বৃদ্ধির প্রয়াস চালান। এক্ষেত্রে বিদেশী ও স্থানীয় উভয় লজিস্টিকস সংস্থাই অবদান রাখছে। এরপর থেকে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে এ শিল্পের অবদান উল্লেখযোগ্য, যা মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) আনুমানিক ১৫-২০ শতাংশ। বর্তমানে বাংলাদেশ অন্যতম প্রধান উদীয়মান বাজার হিসেবে বিশ্ববাজারে পরিচিতি লাভ করেছে। ফলে মানবসম্পদেরও উন্নয়ন ঘটে, যা এখন প্রায় ৫০ লাখ লোকের কর্মসংস্থানের খাত। এটি প্রমাণ করে যে বাংলাদেশের লজিস্টিকস শিল্প দ্রুত বিকাশমান।
১৯৯১-৯২ সালের দিকে যখন বাংলাদেশে এ শিল্প বিস্তার লাভের পথে এগোচ্ছিল, তখনো প্রাথমিকভাবে কোনো নির্দেশিকা ছিল না, ছিল না কোনো শিল্প-সম্পর্কিত নীতি। এমনকি সরকারি কর্মকর্তা, রফতানিকারক এবং আমদানিকারকদেরও খুব কমই ধারণা ছিল কীভাবে এ বিশাল কর্মযজ্ঞ পরিচালনা করা হবে।
এ খাতের মূল চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে রয়েছে—অবকাঠামো উন্নয়ন, প্রক্রিয়াগত ও প্রযুক্তিগত ব্যবস্থাপনার অগ্রযাত্রা এবং ব্যবস্থাপনা দক্ষতা উন্নতির পূর্ণাঙ্গ জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা। বন্দরগুলোর স্বয়ংক্রিয় কার্যক্রম বাস্তবায়ন, আধুনিক গুদামজাতকরণ ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি অপরিহার্য। যদিও অভ্যন্তরীণ রেলপথ এবং জলপথ অত্যন্ত সম্ভাবনাময়, তবু এগুলো কম এবং অপরিকল্পিতভাবে ব্যবহৃত হয়।
দেশ এখনো তৈরি পোশাক শিল্পের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। তবে এ পরিস্থিতি বদলাতে হলে শিল্পে বৈচিত্র্য আনতে হবে, অন্যান্য শিল্পপণ্যের সম্প্রসারণ ঘটাতে হবে এবং একক পণ্যের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে বাণিজ্যে ভারসাম্য আনতে হবে। কৃষিপণ্য, সিরামিক, প্রক্রিয়াজাত, হিমায়িত খাদ্য, হস্তশিল্প, স্বাস্থ্যসেবা, জুতা, চামড়াজাত পণ্য, ইলেকট্রনিকস ইঞ্জিনিয়ারিং এবং ফার্মাসিউটিক্যাল খাতে এরই মধ্যে বাংলাদেশ তার সম্ভাবনা প্রমাণ করেছে। দেশীয় চাহিদা পূরণের পর বিশ্ব বাণিজ্যে অবস্থান আরো দৃঢ় করতে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণে আমরা পিছিয়ে পড়েছি।
সরকারকে অবশ্যই পরিবহন ও লজিস্টিকস খাতকে শক্তিশালী করার জন্য যথাযথ পদক্ষেপ নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। ক্রমবর্ধমান অর্থনীতি ও রফতানি চাহিদা পূরণে শক্তিশালী নেটওয়ার্ক উন্নয়ন অপরিহার্য। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের যাত্রা এরই মধ্যে একটি সফল মাইলফলক হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে, বিনিয়োগকারীদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে, এ উন্নয়ন অব্যাহত রাখতে পারলে বাজারে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে পারে।
নীতিনির্ধারণে অনিশ্চয়তা, পারস্পরিক যোগাযোগের অভাব, অসঙ্গতিপূর্ণ নীতিমালা—সবই বাজারে ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি করে। বাণিজ্য বাধা দূরীকরণ, মসৃণ লজিস্টিক কার্যক্রম নিশ্চিত করা এবং দক্ষতা বৃদ্ধি বাংলাদেশের বিনিয়োগ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
লজিস্টিকস খাতের অবদান বাংলাদেশের অর্থনীতিতে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। অবকাঠামোগত বিনিয়োগ, উন্নয়ন এবং প্রযুক্তিগত অগ্রগতি, স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত পণ্যের মানোন্নয়ন এবং বৈদেশিক প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে এটি অনুঘটক হিসেবে কাজ করে।
বিবেচ্য বিষয়াদি:
অবিলম্বে প্রয়োজনীয় পরিবর্ধন ও পরিমার্জন সাপেক্ষে জাতীয় লজিস্টিকস নীতি ২০২৪-এর যথাযথ প্রয়োগ সুনিশ্চিত করা।
বন্দর কর্তৃপক্ষ, শুল্ক, বন্দর ব্যবহারকারী, ব্যাংকসহ সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে সমন্বয় জোরদার করা।
সমস্ত বন্দর (জল, স্থল ও আকাশ) সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিচালিত করার কৌশলের অন্তর্ভুক্ত করা।
সরবরাহ প্রক্রিয়া ও নথিপত্র কাগজবিহীন স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থায় রূপান্তর করা।
দক্ষ সড়ক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা।
অভ্যন্তরীণ জলপথে পর্যাপ্ত অবকাঠামো উন্নয়ন এবং নদী সংযোগ নেটওয়ার্ক বৃদ্ধি; পানগাঁও নদীবন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি।
একটি কেন্দ্রীয় তথ্যশালা তৈরি করে বন্দর, শুল্ক, রেল, সড়ক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে একীভূত করা। একই সঙ্গে মানবসম্পদের উন্নয়নের ব্যবস্থা করা।
নির্মাণাধীন বে-টার্মিনালের কাজ অতি দ্রুত সম্পন্ন করা প্রয়োজন, যা লজিস্টিকস খাতের উন্নয়নের জন্য অত্যন্ত জরুরি।
ধীরাশ্রম আইসিডির নির্মাণ দ্রুত সম্পন্ন করে সমুদ্রবন্দর ও রেলপথ সংযোগ জোরদার করা; নতুন আইসিডি নির্মাণ (ঈশ্বরদী, সৈয়দপুর, মিরসরাই ইজেড) এবং চট্টগ্রাম বন্দর ও উপসাগর টার্মিনালের সঙ্গে সংযুক্ত করা।
বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ কর্তৃক পৃথক আইসিডি অনুমোদন, যা আকাশপথে রফতানি পণ্যের পরিবহন প্রক্রিয়াকে সহজ করবে।
গুণগত মান বৃদ্ধি ও দক্ষতা অর্জন লজিস্টিকস খাতকে আরো উচ্চতায় নিয়ে যাবে। অন্যান্য দেশ যেখানে সবুজায়ন উদ্যোগ ও স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থায় অগ্রসর হচ্ছে, সেখানে আমাদের এখনো পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো সম্পূর্ণ করতে পারিনি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ড্রোন ব্যবহার ও রোবট প্রযুক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে বাংলাদেশের লজিস্টিকস খাতকে আধুনিকায়ন করা এখন সময়ের দাবি।
সৈয়দ এরশাদ আহমেদ: লজিস্টিকস বিশেষজ্ঞ এবং ফেলো, দ্য চার্টার্ড ইনস্টিটিউট অব লজিস্টিকস অ্যান্ড ট্রান্সপোর্ট (যুক্তরাজ্য)










