জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় দেশের একমাত্র আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়। অপরিকল্পিতভাবে বিভাগ বাড়ানো ও শিক্ষার্থীর চাপের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য এখন আর আগের মতো নেই। বিশ্ববিদ্যালয়টির আয়তন প্রায় ৬৯৭ একর। আবাসিক ও একাডেমিক ভবন বাড়ানো সম্ভব হলেও ভবিষ্যতে এর আয়তন বাড়ানো কঠিন। বর্তমানে নতুন নতুন আবাসিক ও একাডেমিক ভবন নির্মাণে ভূমির সদ্ব্যবহারে গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন। অপরিকল্পিতভাবে নতুন ভবন নির্মাণ করা হলে অদূর ভবিষ্যতে ভূমি সংকটে পড়তে পারে বিশ্ববিদ্যালয়টি।
১৯৬৮ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের প্রথম মহাপরিকল্পনা (মাস্টারপ্ল্যান) করেন প্রখ্যাত স্থপতি মাজহারুল ইসলাম। অবশ্য সময় যত গড়িয়েছে, ব্যত্যয় ঘটেছে সেই মহাপরিকল্পনারও। নতুন করে সেই মহাপরিকল্পনা মানা হচ্ছে না অধিকতর উন্নয়ন কর্মকাণ্ড করতে গিয়েও। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের প্রয়োজন বিবেচনায় উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। অবশ্যই তা হতে পরিকল্পনামাফিক ও জীববৈচিত্র্যকে গুরুত্ব দিয়ে। এর সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।
২০১৮ সালে ‘জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকতর উন্নয়ন’ প্রকল্পটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে (একনেক) পাস হয়। প্রকল্পে ১ হাজার ৪৪৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ২১টি অবকাঠামো নির্মাণ করা হচ্ছে। প্রকল্পটির আওতায় প্রশাসনিক ভবন, একাডেমিক ভবনের সম্প্রসারণ, শিক্ষার্থীদের জন্য হল, শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসিক ভবন ও খেলার কমপ্লেক্স নির্মাণকাজ চলমান রয়েছে। এটি প্রণয়নের আগে প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে বুয়েটের বিশেষজ্ঞদের দিয়ে একটি সমীক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। প্রকল্প গ্রহণের আগে সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় বিশ্ববিদ্যালয়টিতে বাস্তুসংস্থান ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় বেশকিছু উদ্যোগ নেয়ার সুপারিশ করা হয়েছিল। কিন্তু সুপারিশের বড় একটি অংশ পরিপালন করা হয়নি। বরং প্রাকৃতিক পরিবেশ বিনষ্ট করেই যত্রযত্র নতুন স্থাপনা নির্মাণ করা হচ্ছে, যা অত্যন্ত দুঃখজনক।
বণিক বার্তার প্রতিবেদন অনুসারে, ক্যাম্পাসের ভেতরে প্রায় অর্ধশত ভবন রয়েছে, যেগুলার কোনোটি অব্যবহৃত, আবার কোনোটি ব্যবহারের ক্ষেত্রে ঝুঁকিপূর্ণ। অব্যবহৃত থাকা ভবনগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ওয়াজেদ মিয়া বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্রসংলগ্ন পুরনো বিজ্ঞান কারখানা, বিশমাইল এলাকাসংলগ্ন চতুর্থ শ্রেণীর স্টাফ কোয়ার্টার, বিশমাইল গেটসংলগ্ন চতুর্থ শ্রেণীর স্টাফ কোয়ার্টার ও স্বপ্ননগরসংলগ্ন তৃতীয় শ্রেণীর স্টাফ কোয়ার্টার। দীর্ঘদিন ব্যবহার হয় না আল বেরুনী হলের সম্প্রসারিত ভবন, তুলনামূলক সাহিত্য ও সংস্কৃতি ইনস্টিটিউটের পাশের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের ল্যাব, বিশমাইল এলাকার পানির ট্যাংক ও পুরনো পরিবহন অফিস।
কিন্তু ক্যাম্পাসের বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ ও ব্যবহারের অনুপযোগী ভবনগুলো যথাযথ প্রক্রিয়ায় ভেঙে সেখানে নতুন নতুন স্থাপনা নির্মাণ করা যেত। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমির সদ্ব্যবহার হতো। একই সঙ্গে প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখাও সম্ভব হতো।
এদিকে বিভিন্ন সময়ে আবাসিক ও একাডেমিক ভবনের ব্যবস্থা না করেই বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভাগ বাড়ানো হয়েছে, শিক্ষার্থী ভর্তি বাড়ানো হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়টিতে এখন ৩৪টি বিভাগ ও চারটি ইনস্টিটিউট রয়েছে। শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১২ হাজার ও শিক্ষকের সংখ্যা সাত শতাধিক। গত এক দশকে বিভাগ বেড়েছে আটটি, ইনস্টিটিউট দুটি। সে অনুপাতে আবাসিক ও একাডেমিক ভবন বাড়েনি। শিক্ষক-শিক্ষার্থী বাড়ায় আবাসন ও একাডেমিক ভবনে জায়গার সংকট তৈরি হয়েছে, যা বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশ পাচ্ছে। এ কারণে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় আইন-১৯৭৩ লঙ্ঘিত হচ্ছে। আইন অনুসারে, বিশ্ববিদ্যালয়ের সব শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ক্যাম্পাসের আবাসস্থলে থাকা বাধ্যতামূলক। ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের আবাসিক সুবিধা না থাকায় তারা ক্যাম্পাসের বাইরে থাকছেন কিংবা একজনের কক্ষে একাধিক শিক্ষার্থীকে থাকতে হচ্ছে। এতে ব্যাহত হচ্ছে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ। আবার শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসিক ভবনে বাসা খালি থাকা সত্ত্বেও তাদের কেউ কেউ বাইরে থাকছেন।
একাডেমিক, আবাসিক এবং অন্যান্য সুবিধা সম্প্রসারণের আগে মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন প্রয়োজন। শিক্ষার মান উন্নয়ন এবং গুণগত ও মানসম্পন্ন শিক্ষার জন্য উপযুক্ত শিক্ষাদান এবং শিক্ষার পরিবেশ সৃষ্টি করতে হলে প্রাকৃতিক পরিবেশ বজায় রাখতে গুরুত্ব দিতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন নতুন স্থাপনা নির্মাণের আগে প্রাকৃতিক পরিবেশ ও ভূমির সুষ্ঠু ব্যবহারে গুরুত্ব দিতে হবে কর্তৃপক্ষকে।
বিশ্ববিদ্যালয়টির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত এর অনিন্দ্যসুন্দর প্রাকৃতিক পরিবেশ, যা দেশ-বিদেশের পর্যটক আকর্ষণের পাশাপাশি পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আকর্ষণ করছে পক্ষীকুলকে। গাছ-পাখি, লতা-পাতা, ফুল ও জলাধারের কারণে ক্যাম্পাসটিকে অনেকে ‘জীবন্ত ল্যাবরেটরি’ও বলে থাকেন। জাবির প্রাণিবিদ্যা বিভাগের তথ্যমতে, ১৯৮৬ সাল থেকে এখানকার জলাশয়গুলোয় পরিযায়ী পাখি আসছে। এখন পর্যন্ত দেশী-বিদেশী ২০৪ প্রজাতির পাখির দেখা মিলেছে ক্যাম্পাসে। এর মধ্যে দেশী প্রজাতি রয়েছে ১২৬টি ও বিদেশী ৭৮টি। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোয় উঁচু উঁচু ইট-কাঠের স্থাপনা নির্মাণের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববৈচিত্র্য চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে।
এদিকে প্রকল্পের আওতায় অবকাঠামো নির্মাণে বিশ্ববিদ্যালয়ের দেড় হাজার গাছ কেটে ফেলার প্রয়োজন দেখা দেয়। এজন্য পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে ছাড়পত্র সংগ্রহের পর নির্মাণকাজ শুরুর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। বিষয়টি নিয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরে একটি প্রতিবেদনও জমা দেয়া হয়। ২০২০ সালের ২০ অক্টোবর অনুমোদন পায় প্রতিবেদনটি। অনুমোদনপত্রে বন অধিদপ্তরের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে বৃক্ষরোপণের উদ্যোগ নিতে বলা হয়। কিন্তু বৃক্ষরোপণের কোনো ব্যবস্থা না নিয়েই প্রায় দেড় হাজার গাছ কাটা হয়। এভাবে অবাধে গাছ কাটায় বিশ্ববিদ্যালয়ে সীমিত হয়ে আসছে বিভিন্ন প্রাণীর আবাসস্থল ও বিচরণক্ষেত্র।
এ বিশ্ববিদ্যালয়ের পাখিবিশেষজ্ঞরা জানান, প্রতি বছর শীতে আগমন ঘটে তিন থেকে সাত হাজার পরিযায়ী পাখির। কিন্তু গত কয়েক বছরের চিত্র পর্যালোচনা করে দেখা যায়, এ সংখ্যা এখন ক্রমাগত কমছে। ২০১৯ ও ২০২০ সালে সর্বোচ্চ সাড়ে সাত হাজার পাখি এসেছিল। এরপর ২০২১ সালের শীত মৌসুমে পাখির সংখ্যা কমে হয় সাড়ে চার হাজার। সর্বশেষ ২০২২ সালে মাত্র আড়াই-তিন হাজার পরিযায়ী পাখি এসেছিল। এজন্য পরিবেশ দূষণ, উন্নয়ন প্রকল্পে পাখিদের অবাধ চলাচলের বিষয় বিবেচনা না করা ও অবাধে গাছ কাটাকে পাখির সংখ্যা হ্রাসের জন্য দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বাস্তুসংস্থানের প্রতি অবহেলায় সবুজ ক্যাম্পাসও এখন ধীরে ধীরে ইট-পাথরের ক্যাম্পাসে পরিণত হচ্ছে বলে জানান বিশ্লেষকরা। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নয়নমূলক অবকাঠামো নির্মাণের ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ ও অংশীজনদের পরামর্শ নেয়া জরুরি হিসেবে দেখা দিয়েছে। পরিবেশ-প্রতিবেশের প্রতি তোয়াক্কা না করে কংক্রিটের স্থাপনা নির্মাণ হলে জীববৈচিত্র্যের আকর্ষণ হারাবে সবুজ ক্যাম্পাসটি। পুরনো ও জরাজীর্ণ ভবন যথাযথ প্রক্রিয়ায় অপসারণ করে সেখানে নতুন স্থাপনা নির্মাণের উদ্যোগ নিতে হবে। ভূমির সদ্ব্যবহারে টেকসই ও কার্যকর পদক্ষেপ কাম্য। তা না হলে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ভূমি সংকটে পড়তে হবে। দেশের শীর্ষস্থানীয় এ বিদ্যাপীঠে প্রাণ এবং প্রকৃতির প্রতি অবজ্ঞাও দুঃখজনক। আশা করি, পরিকল্পিত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়টি তার আবাসিক চরিত্র ফিরে পাবে।










