ক্যান্সার বিশ্বব্যাপী এক নীরব মহামারীতে রূপ নিয়েছে। বাংলাদেশও এ বৈশ্বিক সংকট থেকে মুক্ত নয়। উন্নত দেশগুলো যেখানে ক্যান্সার মোকাবেলায় আধুনিক অবকাঠামো, প্রযুক্তি ও গবেষণায় বহুমুখী উদ্যোগ নিচ্ছে, সেখানে বাংলাদেশে এখনো মৌলিক চিকিৎসাসেবাই নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। দেশে ক্যান্সার রোগীর সংখ্যা দ্রুত বাড়লেও সে অনুপাতে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি, সক্ষমতা ও চিকিৎসা অবকাঠামো গড়ে ওঠেনি।
ক্যান্সার চিকিৎসার গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতিগুলোর একটি রেডিওথেরাপি। এর মাধ্যমে টিউমার ছোট করতে, ক্যান্সার কোষ ধ্বংস করতে ও উপসর্গ উপশমে উচ্চশক্তির বিকিরণ ব্যবহার করা হয়। এটি একক চিকিৎসা হিসেবে অথবা অস্ত্রোপচার, কেমোথেরাপি বা ইমিউনোথেরাপির মতো অন্যান্য চিকিৎসার সঙ্গেও ব্যবহৃত হয়। ক্যান্সারের ধরন ও পর্যায়ের ওপর নির্ভর করে এ চিকিৎসা দেয়া হয়ে থাকে। কিন্তু বাংলাদেশে এ গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসার প্রাপ্যতা এখনো সীমিত। সরকারি-বেসরকারি মিলে মাত্র ২৪টি হাসপাতালে রেডিওথেরাপি সেবা পাওয়া যায়, যা দেশব্যাপী ক্যান্সার রোগীর তুলনায় একেবারেই অপ্রতুল। বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান রোগীর তুলনায় দেশের রেডিওথেরাপি যন্ত্রপাতি, আধুনিক প্রযুক্তি ও দক্ষ জনবলের ঘাটতি প্রকট। ফলে অনেক রোগীকেই চিকিৎসা পেতে মাসের পর মাস অপেক্ষায় থাকতে হয়। কিন্তু রেডিওথেরাপিতে এমন বিলম্ব শুধু চিকিৎসা ব্যাহত করে না; এটি মৃত্যুঝুঁকি তৈরি করে।
বণিক বার্তার প্রতিবেদন জানাচ্ছে, দিনাজপুরের ফুলবাড়ী উপজেলার কাজিহাল ইউনিয়নের বাসিন্দা আফিয়া বেগমের ২০২৪ সালের শেষ দিকে ক্যান্সার ধরা পড়ে। কেমোথেরাপি ও অস্ত্রোপচার-পরবর্তী ধাপে প্রয়োজন হয় রেডিওথেরাপির। স্বল্প খরচে চিকিৎসার আশায় তিনি জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে (এনআইসিআরএইচ) যান। কিন্তু এ সেবা পেতে সিরিয়াল দেয়া হয় চার মাস পর। অর্থাভাবে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে তার পক্ষে চিকিৎসা নেয়া কঠিন। আবার এতদিন পর থেরাপি দেয়া হলে ক্যান্সার ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে।
আফিয়ার এ অভিজ্ঞতা দেশের ক্যান্সার চিকিৎসা ব্যবস্থার বাস্তব সংকটকে স্পষ্ট করে সামনে আনে। ক্যান্সার শনাক্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসা শুরু করাই যেখানে রোগীর জীবন রক্ষার প্রধান শর্ত, সেখানে রেডিওথেরাপি পেতে মাসের পর মাস অপেক্ষা করা আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার বেহাল দশা তুলে ধরে। সরকারি হাসপাতালে সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা, বেসরকারি হাসপাতালে ব্যয়বহুল চিকিৎসা, আধুনিক যন্ত্রপাতি ও দক্ষ জনবলের অভাবে ক্যান্সার চিকিৎসা এখনো দেশের অধিকাংশ মানুষের কাছে সহজলভ্য হয়ে ওঠেনি।
নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীর ক্যান্সার রোগীদের ভরসাস্থল এনআইসিআরএইচ। কারণ বেসরকারি হাসপাতালে ক্যান্সার চিকিৎসা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। কেমোথেরাপি, রেডিওথেরাপির খরচ গুনতে গিয়ে সাধারণ পরিবারের সঞ্চয় ফুরিয়ে যায় ও অনেকেই ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েন। কিন্তু সমস্যার জায়গা হলো—দীর্ঘদিন ধরেই এনআইসিআরএইচে ক্যান্সার শনাক্তের দুই ধরনের যন্ত্রপাতি এমআরআই ও মেমোগ্রাফি সবই অচল, শয্যা সংকট প্রকট, জনবল ঘাটতি ও ওষুধ প্রাপ্তির অভাব। দীর্ঘদিন সিটিস্ক্যান অচল থাকলেও একটি সচল করা হয়েছে। আবার তিনটি এমআরআই মেশিন কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। এছাড়া হাসপাতালটিতে দুটি রেডিওথেরাপি মেশিন রয়েছে, যা রোগীর চাপ বিবেচনায় যৎসামান্য।
যারা আর্থিক অসামর্থ্যের কারণে এখানেই চিকিৎসা নিতে বাধ্য, তাদের দীর্ঘ সময় চিকিৎসা পেতে অপেক্ষা করতে হয়। আবার চিকিৎসা অসম্পূর্ণ অবস্থায় বন্ধ করতে বাধ্য হন অনেকে। ধনী বা উচ্চবিত্তরা ক্যান্সার চিকিৎসার বিকল্প খুঁজে পেলেও নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তদের জন্য বিকল্প নেই। বিশেষায়িত হাসপাতালের এ অবস্থা প্রমাণ করে, ক্যান্সারের মতো জটিল ও দীর্ঘমেয়াদি রোগে চিকিৎসা ব্যবস্থা যতটা দরকার, তার তুলনায় সরকারি পর্যায়ে বিনিয়োগ ও উদ্যোগ খুবই কম। তাই নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের সহজলভ্য চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে হলে সরকারি হাসপাতালগুলোর ক্যান্সার চিকিৎসার সক্ষমতা বাড়ানো দরকার। এছাড়া হাসপাতালে নষ্ট যন্ত্রপাতি ব্যবহারোপযোগী করার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় নতুন যন্ত্রপাতি স্থাপন করে মানুষের চিকিৎসাসেবা নির্বিঘ্ন রাখতে হবে। কেননা ক্যান্সার যত দ্রুত শনাক্ত করা যায়, চিকিৎসার সাফল্য তত বেশি হয়।
ক্যান্সার চিকিৎসায় রেডিওথেরাপি যন্ত্রের অপ্রতুলতার বিষয়টি যুক্তরাজ্যভিত্তিক চিকিৎসাবিষয়ক জার্নাল দ্য ল্যানসেটের গবেষণায়ও উঠে এসেছে। গবেষণার তথ্য বলছে, দেশে ক্যান্সার রোগীর তুলনায় রেডিওথেরাপি যন্ত্রের অপ্রতুলতা রয়েছে। দেশে যে সংখ্যক মেশিন রয়েছে, তা দিয়ে ক্যান্সার আক্রান্তের মাত্র ১২ দশমিক ৯ শতাংশ মানুষ চিকিৎসা পায়। অর্থাৎ ৮৭ শতাংশ রোগীই রেডিওথেরাপি সুবিধার বাইরে থাকে। দক্ষিণ এশিয়ায় সার্কভুক্ত দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশ পিছিয়ে রয়েছে। স্বাস্থ্য খাতে অবকাঠামো ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নে দীর্ঘদিনের অবহেলা এর প্রধান কারণ। ক্যান্সার চিকিৎসার মতো জটিল রোগে এ ধরনের অবহেলা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
বাংলাদেশে ক্যান্সার রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির প্রকৃত সংখ্যা জানা নেই কারো। কারণ তার জন্য প্রয়োজন ক্যান্সার রেজিস্ট্রির। আবার ক্যান্সার রেজিস্ট্রিও দুই ধরনের হতে পারে। একটি জনসংখ্যার ওপর ভিত্তি করে আর দ্বিতীয়টি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ক্যান্সার রোগীদের ওপর ভিত্তি করে। কিন্তু আমাদের কেবল সরকারি-বেসরকারি কিছু হাসপাতালে ক্যান্সার রোগীদের তালিকা পাওয়া যায়। জাতীয় পর্যায়ে ক্যান্সার রোগীদের কোনো রেজিস্ট্রি এখনো তৈরি করা হয়নি। অথচ প্রকৃত সংখ্যা জানাটা প্রতিরোধ ও প্রতিকারে দরকার। সে তুলনায় চিকিৎসা খাতের আকার কতটুকু বাড়ানো প্রয়োজন তা বোঝা সহজ হবে।
দেশে ক্যান্সার আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) গবেষণা অনুযায়ী, দেশে প্রতি লাখে ১১৪ জন ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছেন। গবেষণাটিকে ভিত্তি হিসেবে বিবেচনায় নিলেও দেশের মোট জনসংখ্যা ১৭ কোটি ৩০ লাখের মধ্যে ক্যান্সার রোগী আছে ১ লাখ ৯৭ হাজারের বেশি। অন্যদিকে বৈশ্বিক ক্যান্সার গবেষণা জার্নাল ল্যানসেট অনকোলজির ২০২৪ সালের ডিসেম্বর সংস্করণে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী দেশে ক্যান্সার আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ১৫ লাখ। ২০৪০ সালের মধ্যে তা ২১ লাখ ছাড়িয়ে যাবে। আর এখন পর্যন্ত এ রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃতের সংখ্যা কমবেশি ১০ লাখের কাছাকাছি। ২০৪০ সালের মধ্যে তা ১৪ লাখে উন্নীত হবে। সার্কভুক্ত অন্য দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশে ক্যান্সারের রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। সে তুলনায় বাড়ছে না চিকিৎসাসেবা ও সুবিধা। এ পরিসংখ্যান দেশের ক্যান্সারের ভয়াবহতা সম্পর্কে ইঙ্গিত দিচ্ছে।
দেশে ক্যান্সার চিকিৎসা সবার জন্য সহজলভ্য করতে রাষ্ট্রকে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। আধুনিক রেডিওথেরাপি মেশিন স্থাপন, দক্ষ জনবল তৈরি ও সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের মাধ্যমে সেবা সম্প্রসারণে সমন্বিত পদক্ষেপ নেয়া জরুরি। ক্যান্সার একটি দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জ। তাই এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় এখনই পরিকল্পিত বিনিয়োগ ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের বিকল্প নেই। দেশের প্রতিটি জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে সরকারি হাসপাতালগুলোয় ক্যান্সার চিকিৎসার প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, যন্ত্রপাতি ও দক্ষ জনবল নিশ্চিত করতে হবে।










