বৈশ্বিক বাজারে নিত্যপণ্যের দাম কমলেও এখনো তার প্রভাব পড়ছে না দেশের বাজারে। আটার মতো চাল, ডাল, তেল, চিনি, আদা, রসুন, ডিম, মাছ, গরুর মাংস ইত্যাদি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম আকাশচুম্বী। দৈনন্দিন বাজারের দাম কিছুটা কমে, কিছুটা বাড়ে। কিন্তু বাজার আগের দামে ফেরত যাচ্ছে না। এমনকি আগের দরের কাছাকাছি দামেও কিনতে পারছেন না ক্রেতারা। স্বল্প আয়ের মানুষ এতে চাপে পড়েছে। ভোজ্যতেল, আটা, ময়দা, পেঁয়াজ ও রসুনের মতো নিত্যপণ্যের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বাজারে ১৬ থেকে ৬৩ শতাংশ দাম কমলেও স্থানীয় বাজারে তার কোনো প্রভাব দেখা যাচ্ছে না। আর দ্রুত পড়ে যাচ্ছে টাকার দাম। অর্থাৎ টাকার নিরিখে ডলারের দাম বাড়ছে। অবমূল্যায়নের ধাক্কাটা যদি শুধু সমাজের উপরতলার গুটিকয়েক মানুষের ওপর পড়ত, যদি এর কুপ্রভাব কিছু বিত্তবান বিদেশ ভ্রমণেচ্ছুদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকত, তাহলে বিষয়টা নিয়ে এত দুশ্চিন্তার কিছু ছিল না। কিন্তু টাকার দাম কমতে থাকায় এরই মধ্যে আমদানীকৃত সব নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে গেছে। বণিক বার্তায় প্রকাশিত প্রতিবেদন বলছে, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দ্রব্যমূল্য ও বাজার পরিস্থিতি পর্যালোচনা-সংক্রান্ত টাস্কফোর্স। ব্যবসায়ীরা বলছেন, ডলার সংকট, সময়মতো এলসি (ঋণপত্র) খুলতে না পারা এবং পণ্য খালাসে বিলম্বের কারণে দেশে আমদানির পর পণ্যের মূল্য আগের চেয়ে বেশি পড়ছে। সেজন্য ভোক্তারা এর সুফল পাচ্ছে না। তবে বাজার ব্যবস্থাপনায় দুর্বল মনিটরিং ও সিন্ডিকেশন কার্যক্রমকে দায়ী করছেন অর্থনীতিবিদরা।
এদিকে পরিকল্পনামন্ত্রী বলেছেন, মূল্যস্ফীতি কবে নাগাদ কমবে তা এখন বলা সম্ভব নয়, মূল্যস্ফীতি কমানোর জন্য সরকার নানা কৌশল নিচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমার ফলে বিদেশে নিত্যপণ্যের দাম রাতারাতি কমলেও দেশে এর প্রভাব পড়ছে না। তিনি আরো জানান, আমরা অনেক পণ্যের দাম দুই মাস আগে পেমেন্ট করেছি। সেগুলো এখনো হাতে পাইনি। এছাড়া ডলারের দাম যেহেতু এখনো কমেনি, ফলে দেশে নিত্যপণ্যের দাম কমতে সময় লাগবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। নতুন প্রস্তাবিত বাজেটে মূল্যস্ফীতি ৬ শতাংশ ধরা হয়েছে। তবে মূল্যস্ফীতি ৬ শতাংশে নামিয়ে আনা সম্ভব হবে না।
বিশ্বজুড়ে কভিড ও ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে অর্থনৈতিক সংকট চলছে। স্থানীয় মুদ্রার তুলনায় ডলারের দাম বেড়ে চলছে। পণ্যদ্রব্যের ঊর্ধ্বমুখী বেড়ে চলা দামের মধ্যে আরো একটি দুঃসংবাদ হলো, ডলারের দরের ঊর্ধ্বগতি কোনোভাবেই ঠেকানো যাচ্ছে না। যে কারণে মুদ্রাবাজারে তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে ডলারের। তার ওপর আছে বিদেশী মুদ্রার রিজার্ভের সংকট। আমদানি বাড়ায় ডলারের চাহিদা বেড়েছে কিন্তু সেই পরিমাণে ডলার না থাকার কারণে সংকট দেখা দিয়েছে। পণ্য ও পরিষেবার দাম বাড়ছে। বাড়ছে খাদ্যদ্রব্যের দাম। এতে সবচেয়ে বিপদে পড়ছে সাধারণ মানুষ। অনেকেই ভাঙিয়ে ফেলছেন নিজেদের সঞ্চয়। এদিকে বাজারে নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ার কারণ হিসেবে আমদানিকারকরা বলছেন, ব্যাংকগুলো যথাসময়ে ডলার দিতে না পারায় আমদানি বিঘ্নিত হচ্ছে। শতভাগ এলসি মার্জিনের কারণে কস্ট অব ফান্ড বেড়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে ডলার সরবরাহে ঘাটতি থাকার ফলে সরকারকে নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে ডলার কিনতে হচ্ছে। যার ফলে ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে। তারা আরো জানায়, আমদানীকৃত পণ্য যথাসময়ে খালাস করতে না পারায় জাহাজের ড্যামারেজ বা ক্ষতিপূরণ চার্জ দিতে হচ্ছে। এ কারণেও আমদানীকৃত পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাদের কথামতে, বেশি দামে ডলার কিনে কাঁচামাল আমদানির ঋণপত্র (এলসি) খোলার পর শুল্ক কর বেশি পড়ছে। এছাড়া দাম বাড়ার কারণের মধ্যে রয়েছে বাজার ব্যবস্থাপনার কাঠামোগত ও নীতিগত দুর্বলতা, যথাযথ প্রতিযোগিতার অভাব, ক্রয়-বিক্রয়ের রেকর্ড সংরক্ষণের অভাব। নিত্যপ্রয়োজনীয় এসব পণ্যের দাম কমানোর জন্য ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মাধ্যমে জনবল বাড়িয়ে দেশব্যাপী কার্যকর মনিটরিং কার্যক্রম বৃদ্ধির উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন। আর মুদ্রাবাজারে বাংলাদেশ ব্যাংকের নজরদারি আরো বাড়াতে হবে। ডলার সংকট রোধে ব্যবসা-বাণিজ্যের স্বাভাবিক গতি ধরে রাখতে সহায়তা প্রদানের উদ্যোগ নিতে হবে।
বাজারের আর পাঁচটা জিনিসের মতো টাকা-ডলারের বিনিময় মূল্যও নির্ভর করে চাহিদা ও জোগানের ওপর। টাকার নিরিখে ডলারের দাম বাড়ছে, অর্থাৎ টাকা-ডলার বিনিময়ের বাজারে চাহিদার তুলনায় ডলারের জোগান কমছে। টাকার সঙ্গে ডলার বিনিময়ের একটা বড় সূত্র আমদানি ও রফতানি। যিনি আমদানি করছেন, তিনি টাকা দিয়ে ডলার কিনতে চাইছেন; যিনি রফতানি করছেন, তিনি ডলার উপার্জন করে টাকার বিনিময়ে সেই ডলার বিক্রি করছেন। আমদানির তুলনায় রফতানি কম হতে থাকলে ডলারের চাহিদা তার জোগানের থেকে বাড়তেই থাকবে, ফলে বাজারের নিয়মে টাকার দাম কমে যাওয়ার প্রবণতা দেখা দেবে। এ প্রবণতা ঠেকানো যেতে পারে, যদি অন্য কোনো সূত্রে ডলার পাওয়া যায়। আমদানি ও রফতানি মূল্যের মধ্যে তফাতের পোশাকি নাম আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ঘাটতি। সাধারণত এ ঘাটতির কিছুটা মেটানো হয় অনাবাসী বাংলাদেশীদের বিদেশ থেকে পাঠানো ডলার দিয়ে, কিছুটা সরাসরি বিদেশী বিনিয়োগ থেকে প্রাপ্ত ডলার দিয়ে, খানিকটা আবার বিদেশী ঋণ কিংবা আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো থেকে পাওয়া অর্থ দিয়ে। বছরের পর বছর ধরে বাংলাদেশের মোট আমদানির মূল্য রফতানি মূল্যের থেকে বেশি হয়ে আসছে। সমস্যা হলো, ইদানীং এ দুইয়ের ফারাকটা খুব বেড়ে গেছে, যা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির পেছনে আরেকটি জিনিস কাজ করে সেটা হলো, বাজার সিন্ডিকেট বা চক্র ও মধ্যস্বত্বভোগী। এরা যোগসাজশের মাধ্যমে পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেয়। কখনো কখনো তারা পণ্যের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে। নানা অজুহাত তুলেও বাড়ানো হয় পণ্যের দাম। এ অবস্থায় বেশি দামে পণ্য ক্রয় করা ছাড়া ভোক্তাদের কোনো উপায় থাকে না। এভাবে দ্রব্যমূল্য, বিশেষত নিত্যপণ্যের দাম বাড়ানো অপরাধ বটে। এজন্য সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের শাস্তি হওয়া উচিত। কিছুদিন আগে বাণিজ্যমন্ত্রীও তার অসহায়ত্ব প্রকাশ করে বলেছেন, ‘সরকার চিনির বিক্রয়মূল্য নির্ধারণ করে দিলেও বাজারে এর প্রভাব পড়েনি। অসাধু ব্যবসায়ীরা সুযোগ নিচ্ছেন।’ অতীতে দেখা গেছে, ঘোষিত দর কখনই বাজারে প্রতিফলিত হয় না, বরং বেঁধে দেয়া দরের চেয়ে বেশি দামে পণ্যসামগ্রী বিক্রি হয়। দুঃখজনক হলো এসব তদারকির তেমন কোনো ব্যবস্থা নেই। এ কারণে অসাধু সিন্ডিকেট ক্রেতাদের জিম্মি করে অধিক মুনাফা হাসিলের সুযোগ পাচ্ছে। বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকার নানা পদক্ষেপ নিলেও কোনো কাজে আসছে না। সাধারণ মানুষ তার সুফল পাচ্ছে না। বৈশ্বিক মহামারী করোনার কারণে সরবরাহ চেইন ভেঙে গিয়েছিল। জাহাজ ভাড়াও বেড়েছে। রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাতের কারণে তা আরো বেড়েছে। আগে থেকেই আন্তর্জাতিক বাজারে নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বমুখী। আমদানি বিঘ্নিত হওয়ায় বাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছিল। এতে আসলে চরম বিপাকে পড়েছে নিম্ন আয়ের মানুষ। এ থেকে পরিত্রাণের জন্য বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারকেই উদ্যোগী হতে হবে। প্রয়োজন সরকারের সদিচ্ছা ও বাস্তব পরিকল্পনা এবং পণ্যসামগ্রীর চাহিদা ও জোগানের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার ব্যবস্থা করা। এজন্য দেশে কৃষি উৎপাদন বাড়ানোর দিকে কাজ করতে হবে। দেশের উৎপাদন ব্যবস্থার পুরোপুরি সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়া পণ্য পরিবহন নির্বিঘ্ন রাখতে বিশেষ করে কৃষিপণ্যের সরবরাহে যাতে কোনো বাধার সৃষ্টি হতে না পারে সেদিকে নজর রাখতে হবে সংশ্লিষ্টদের। এর বাইরে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ কর্তৃপক্ষ ও প্রশাসন থেকে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে বাজার পরিস্থিতি তদারকি অব্যাহত রাখতে হবে। কেন্দ্র থেকে স্থানীয় উৎপাদন ক্ষেত্র পর্যন্ত ব্যবস্থাপনাও নজরদারির আওতায় আনা জরুরি। কৃষিপণ্য সংরক্ষণের ব্যবস্থা জোরদার করা প্রয়োজন। আর অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের এলসি খোলার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ডলার সরবরাহ নিশ্চিতকরণ এবং শতভাগ মার্জিনের শর্ত শিথিল করা দরকার। বাংলাদেশ ব্যাংক সরকার নির্ধারিত মূল্যে ডলার সরবরাহের ব্যবস্থা করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে। সর্বোপরি আমদানীকৃত ও দেশজ উৎপাদিত এ দুই ধরনের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন রাখার ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে।










