ড. শামসুল আলম সাবেক পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী। ২০০৯ সালে পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য হিসেবে যোগদান করেন। সিনিয়র সচিব পদে দীর্ঘ এক যুগ চুক্তিভিত্তিক দায়িত্ব পালন করে ২০২১ সালে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব নেন। তিনি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি ব্যবসা ও বিপণন বিভাগে দীর্ঘ ৩৫ বছর সরাসরি অধ্যাপনায় যুক্ত ছিলেন। রূপকল্প ২০২১-এর আলোকে প্রণীত বাংলাদেশের প্রথম দীর্ঘমেয়াদি প্রেক্ষিত পরিকল্পনা (২০১০-২১), ষষ্ঠ (২০১১-১৫), সপ্তম (২০১৬-২০) ও অষ্টম (২০২১-২৫) পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা তার নেতৃত্বে ও অংশগ্রহণে প্রণীত হয়। অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখায় মুজিব বর্ষ ২০২০-এ বাংলাদেশের অন্যতম সর্বোচ্চ বেসামরিক রাষ্ট্রীয় পদক ‘একুশে পদক’প্রাপ্ত হন। দেশে সাম্প্রতিক অস্থিরতার আর্থসামাজিক প্রভাব, অব্যাহত মূল্যস্ফীতি সংকট, খাদ্যনিরাপত্তা, কৃষির ভবিষ্যৎ সংকট ও সম্ভাবনা নিয়ে সম্প্রতি কথা বলেন বণিক বার্তায়। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সাবিদিন ইব্রাহিম

দেশে গত এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে অচলাবস্থা চলছে, কারফিউ বিরাজমান। এ অবস্থায় সাপ্লাই চেইন পুরোপুরি বিপর্যস্ত। ফলে খাদ্য ও মূল্যস্ফীতির কেমন প্রভাব দেখছেন? 

সরবরাহ চেইন সচল থাকাটা কৃষিপণ্যের জন্য অপরিহার্য। কারণ কৃষিপণ্য পচনশীল, একদিন-দুদিন যদি পণ্য না আসতে পারে, সেক্ষেত্রে পণ্যের একটা বিশাল অংশ পচে যায়। এ কোটা আন্দোলনের জন্য কয়েকদিন আমাদের যানবাহন চলাচল বন্ধ। এমনিতেও পরিবহন ব্যাহত হলেই এটা সামগ্রিকভাবে রফতানি বাণিজ্যে প্রভাব ফেলে। কারণ বন্দরগুলোয় পণ্য যেতে পারে না। কৃষিপণ্যের মতো পচনশীল পণ্য যখন গ্রাম এলাকা থেকে উৎপাদন হয় তখন মধ্যবর্তী বাজারে আসতে পারে না, কেন্দ্রীয় বাজারে আসতে পারে না ও ঢাকায় আসতে পারে না। ফলে এটা কৃষকের জন্যও অনেকটা ক্ষতির কারণ। যেহেতু সরবরাহ চেইন বাধাগ্রস্ত হয়েছে, দামও বেড়ে যাবে। যদি পণ্য সরবরাহ আবার চালুও হয়, অন্তত ৭-১০ দিন লেগে যাবে আগের অবস্থায় দরদাম ফিরে যেতে। মূল্যস্ফীতিতে বিশেষ করে কৃষিপণ্যের দাম বাড়বে। সরবরাহ চেইনে যেকোনো বাধা এলে সেটা মূল্যস্ফীতি বাড়িয়ে দেয়। তাই দ্রুত চেষ্টা করতে হবে যেন পরিবহন আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে। এছাড়া মাঝপথে কথিত যে অভিযোগ আছে চাঁদাবাজির, সেগুলো কঠোর হাতে দমন করতে হবে। কৃষিবাজারকে স্বাভাবিক অবস্থায় নিয়ে আসতে হলে এটা করতে হবে।

ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় বৈদেশিক বাণিজ্যে অচলাবস্থা বিরাজ করছে। আমদানি-রফতানি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আবার ব্যাংকও অনেকটা অচল। ফলে অর্থনীতিতে কী প্রভাব পড়ছে?

এটার ব্যাপক ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়বে। বিশেষ করে রফতানি বাণিজ্য পুরোপুরি স্থবির হয়ে পড়েছে। কারণ বন্দরে যথাসময় পণ্য পৌঁছতে না পারলে অনেক অর্ডার ক্যানসেল হয়ে যায়। আমাদের দেশে প্রায় ছয় লাখ তরুণ-তরুণী ইন্টারনেটের মাধ্যমে আউটসোর্সিং করে থাকে। অনেকেই কাজ হারাবে। গত কয়েকদিনে কাজ জমা না দিতে পারায় তারা কাজ হারাবে, টাকাও হারাবে। এর বড় রকমের প্রভাব পড়বে অর্থনীতিতে। যার অভিঘাত গিয়ে পড়বে সার্বিক মূল্যস্ফীতিতে। এ আন্দোলন আমাদের জন্য অনেক ব্যয়বহুল হিসেবে দেখা দিয়েছে। অনেক জীবন চলে গেছে এটাও অনেক দুঃখজনক, আবার দেশের বাজারটাও কিছুদিন অস্থিতিশীল থেকে যাবে। 

আপনি দীর্ঘদিন সরকারের অংশ ছিলেন। শিক্ষার্থীদের কোটা আন্দোলন সরকার যেভাবে মোকাবেলা করেছে তা কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

সরকারের হয়তো তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নেয়ার প্রয়োজন ছিল, বিশেষ করে ২০১৮-এর অভিজ্ঞতা থেকে। সেটা হয়তো যথাসময় আমরা নিতে পারিনি বা সরকার সেটা নিতে পারেনি। হয়তো ভেবেছিল আলাপ-আলোচনা করে বোঝানো যাবে। আমাদের দেশে বেকার সমস্যা এখন অন্যতম বড় সমস্যা। বহু বেকার তরুণ-তরুণী আশায় থাকে লেখাপড়া শেষ করে কোনো না কোনো চাকরি পাবে। কিন্তু বাংলাদেশে চাকরির বাজার ইদানীং সীমিত। সরকার যদি একটু আগে অনুধাবন করত তাহলে হয়তো পরিস্থিতি এড়ানো যেত। যেকোনো কারণেই হোক সরকার হয়তো ভেবেছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারবে, ছাত্রদের বোঝাতে পারবে। গত কয়েকদিন সবাই আসলে উদ্বিগ্ন ছিল।  স্কুলের ছাত্ররাও কিন্তু আন্দোলনে নেমেছে। কারণ তারা বুঝতে পেরেছে, ভবিষ্যতে তাদেরও চাকরি করতে হলে এটা উন্মুক্ত থাকতে হবে যতটা সম্ভব। ছাত্ররাও যুক্তিবাদী ছিল, তারা কিন্তু কোটা উঠিয়ে দিতে বলেনি, তারা চেয়েছে সংস্কার। এ বিষয়ে সিদ্ধান্তে আসতে আমাদের হয়তো কিছুটা সময় লেগে গেল। এর মধ্যে আমাদের আর্থিক, সামাজিক, নৈতিক, অর্থনৈতিক; সব রকমের ক্ষতির সম্মুখীন হতে হলো। হয়তো এটা কাটিয়ে উঠতে পারব, তবে সবসময় জনদাবি অত্যন্ত সংবেদনশীলতার সঙ্গে আমলে নিতে হবে। 

আমাদের অর্থনীতি প্রায় এক দশকের বেশি সময় ধরে একটা ভালো প্রবৃদ্ধির ধারায় ছিল। এ সময়ে বেসরকারি খাত আরো সম্প্রসারিত করতে পারলাম না কেন? তরুণরা কেন সরকারি চাকরিমুখী হচ্ছে? আমরা আনুষ্ঠানিক খাতকে আরো সম্প্রসারণ করতে পারিনি কেন?

আনুষ্ঠানিক খাতের অন্যতম সরকারি চাকরিতে সুযোগ-সুবিধা অনেক বাড়ানো হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে আর্থিক সুবিধা, যানবাহনের সুবিধা, মোবাইল সুবিধা, দ্রুত পদোন্নতির সুবিধা। আগে যেমন ছিল এখন বেসরকারি খাত অতটা লোভনীয় নয়। একসময় মেধাবী তরুণরা সরকারি চাকরিতে না গিয়ে বেসরকারি চাকরিতে যেত কারণ সেখানে সরকারি চাকরির তুলনায় দুই গুণ, তিন গুণ বেতন ছিল। বেসরকারি খাতে এখন আর সে চমক নেই। এর একটা বড় কারণ বেসরকারি খাত অনেকটা যন্ত্রনির্ভর হয়ে যাচ্ছে, ব্যক্তিনির্ভরতা কমছে। গত ১৫ বছরে আমাদের যে প্রবৃদ্ধি হয়েছে, সে হারে কর্মসংস্থান বাড়েনি। সুযোগ-সুবিধার দিক থেকে অনেক পিছিয়েছে বেসরকারি খাত। এখানে পেনশনের সুবিধা নেই, বেতন আগের মতো আকর্ষণীয় নেই। সরকারি চাকরিতে নিশ্চিত একটা পেনশন সুবিধা আছে তাই তরুণরা এদিকেই আগ্রহী বেশি। বেসরকারি খাত কী কী সুযোগ-সুবিধা দিচ্ছে তা সরকারকে মনিটর করতে হবে। সে লক্ষ্যেই সরকার সার্বজনীন পেনশন স্কিম চালু করেছে। বেসরকারি খাতে যারা আছে, তারা যেন বঞ্চিত না হয় সেজন্য আরো পদক্ষেপ নিতে হবে। মুখের কথায় যেন চাকরি চলে না যায় সেদিকে দৃষ্টি রাখতে হবে। আবার ছাঁটাই হলে যাতে যথেষ্ট কমপেনসেশন পায় তা নিশ্চিত করতে হবে।  

আমাদের জনপ্রতি আমিষ গ্রহণের পরিমাণ কমে গেছে, যেমন মাছ, মাংস, দুগ্ধজাত পণ্য। আমাদের কিন্তু কিছু সাফল্যের জায়গা ছিল—মাছ, পোলট্রি খুব সাশ্রয়ী দামে পাওয়া যেত। এই প্রোটিন ইনটেক কমার বিষয়টিকে কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন? 

মানুষের আয় যখন বাড়ে তখন তারা মানসম্পন্ন, ভালো ও স্বাস্থ্যসম্পন্ন খাবার খেতে চায়। কিন্তু এখন বাজারে প্রাণিজ আমিষ জাতীয় খাদ্য—মাছ, মাংস, দুধ, ডিমের দাম অত্যধিক বেড়েছে। এমনকি কৃষিজ আমিষ—যেমন মসুর ডালের দামও সাধারণ ক্রেতার ক্রয়ক্ষমতার বাইরে। তারা অধিক ফলমূলও কিনে খেতে পারছেন না। কাজেই প্রচুর সরবরাহ বাড়াতে হবে। এজন্য কৃষিপ্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে, গবেষণা বাড়াতে হবে, আবহাওয়া নিয়ন্ত্রিত পদ্ধতি ও প্রযুক্তি কৃষিতে ব্যবহার করতে হবে। আবার দেখা যায় বণ্টন ব্যবস্থাও সুষম নয়, যেমন গ্রামাঞ্চলে দুধের চাহিদার চেয়ে জোগান বেশি হওয়ায় দুধের দাম কম, যেখানে শহরে অনেক দাম। আবার মান নিয়ে ক্রেতারা আস্থাহীনতায় ভোগেন। তারা নির্দিষ্ট পরিচিত উৎস থেকেই আমিষজাতীয় খাদ্য বা কৃষিজ খাদ্য বা ফলমূল ক্রয় করে থাকেন। ফলে তাদের আমিষ গ্রহণের পরিমাপেও এক ধরনের তারতম্যের সৃষ্টি হয়। এটা মাননিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যর্থতাও বটে। পণ্যের ওপর আস্থাহীনতা কাটিয়ে উঠতে হবে, খাদ্যপণ্যের মান নিশ্চিত করতে হবে। 

গত বছর বিশ্ব খাদ্য সংস্থার একটি রিপোর্ট থেকে দেখা গেছে, ২০২৩ সালের মে থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে জরিপকৃত ১ কোটি ১৯ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় ভুগেছে। এ সংকট মোকাবেলায় সরকারের পক্ষ থেকে কী পদক্ষেপ নেয়া উচিত?

খাদ্য সংকটের মূলে আছে আমাদের এ প্রলম্বিত মূল্যস্ফীতির ধারা। এ ধারা প্রায় দুই বছর ধরে চলমান, বিশেষ করে গত ১২ বছরের মধ্যে এখন মূল্যস্ফীতি সর্বোচ্চ পর্যায়ে। আর মূল্যস্ফীতির বৈশিষ্ট্য হলো, এটা প্রান্তিক পর্যায়ের বা নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর সর্বাধিক চাপ সৃষ্টি করে। খরচের খাতে নানা পরিবর্তন এনে কোনোমতে চলার চেষ্টা করছে তারা। যেমন চিকিৎসাসহ জরুরি খাতে কিছু টাকা কাছে রাখতে চায়। এর চাপ গিয়ে পড়ে খাদ্য গ্রহণে। ফলে মূল্যস্ফীতির প্রভাবে তারা আরো গভীর খাদ্য সংকটে পতিত হয়। এতে খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় পড়া জনসংখ্যা বেড়েছে। 

খাদ্যসংকট মোকাবেলা করতে হলে আমাদের প্রথমত, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। খাদ্যনিরাপত্তা জোরদারে অবশ্যই কৃষি সরবরাহকে আরো উজ্জীবিত করতে হবে বা বাড়াতে হবে। আমাদের মূল্যস্ফীতি খরচতাড়িত মূল্যস্ফীতি, চাহিদা বৃদ্ধিজনিত মূল্যস্ফীতি নয়। কাঁচামালের দাম বাড়ায় চূড়ান্ত পণ্যেরও দাম বেড়েছে। তাই চাহিদা কমা-বাড়ার সঙ্গে এ মূল্যবৃদ্ধির সম্পর্ক নেই। সুতরাং মূল্যস্ফীতি কমাতে হলে কৃষিপণ্যের সরবরাহ বাড়ানোর পাশাপাশি এর মান বাড়াতে হবে, উৎপাদন খরচও কমাতে হবে। সরকারিভাবেও সংযুক্ত খাতগুলোয় প্রয়োজনীয় প্রণোদনা ও সহযোগিতা বাড়াতে হবে। গবেষণায় আরো বরাদ্দ দিতে হবে, বিশেষত কৃষি গবেষণায়। ব্লক-ফান্ড তৈরি করে হলেও এটা করতে হবে যাতে আমরা ব্যয়সাশ্রয়ী উৎপাদন প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে পারি। এতে খাদ্যনিরাপত্তাও যেমন বাড়বে, মূল্যস্ফীতির প্রবণতাও তেমনি কমে আসবে।

সরবরাহের কথা উঠলে অভিযোগ আছে, বাংলাদেশে প্রচুর খাদ্যশস্য আমদানি করে মুষ্টিমেয় কিছু কোম্পানি ও প্রতিষ্ঠান। আমদানির কথিত এ সিন্ডিকেটকে আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারছি না কেন?

সাধারণভাবে এটাই মনে করা হয়। সিন্ডিকেট হয় যখন আমদানি ১০-৫০ বা সীমিতসংখ্যক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে থাকে। কিন্তু বাংলাদেশে চাল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান প্রায় ৩ হাজার ৪০০। যদিও সবাই একই সময়ে আমদানি করে না। কিন্তু অধিকাংশই, ধরা যাক দেড় থেকে আড়াই হাজার প্রতিষ্ঠান একই সময়ে আমদানি করে। তার মানে এই নয়, সিন্ডিকেট করা সম্ভব নয়। সিন্ডিকেট করা সম্ভব, কারণ তাদের মধ্যে সমিতি আছে। এখানে আমাদের ভোক্তা অধিকার কমিশন, প্রতিযোগিতা কমিশনকে নজরদারি রাখতে হবে। তাদের দেখতে হবে, এ নিবন্ধিত আমদানিকারকরা আঁতাত করে চাল আনছে নাকি আলাদাভাবে প্রতিযোগিতামূলকভাবে আমদানি করছে।

কারণ যখনই কোনো গোষ্ঠী চালের মূল্যকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করবে, তখনই মনে করতে হবে আমদানি প্রতিযোগিতামূলক নয়। এখানে যেমন সিন্ডিকেট গড়ে তোলা সম্ভব তেমনি সিন্ডিকেটকে প্রতিহত করাও সম্ভব। এজন্য সম্ভব, কারা কারা আমদানি করছে, কত দামে আমদানি করছে, কতদিন তারা সংরক্ষণ করছে, কত দামে চাল বাজারে ছাড়ছে সেসব তথ্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন এ কমিশনের কাছে থাকে, কৃষি মন্ত্রণালয়ের কাছে থাকে, সংশ্লিষ্ট বাজার পর্যবেক্ষণকারী সংস্থাসহ বেশকিছু কর্তৃপক্ষের কাছে থাকে। সুতরাং তাদের দায়িত্ব এ বিষয়গুলো গভীরভাবে মনিটরিং বা পরীবিক্ষণ করা এবং সরকারকে আমদানিসংক্রান্ত তথ্য যেমন কত দামে পণ্য আনা হচ্ছে, কত তারিখে আনা হচ্ছে, কবে বন্দরে পণ্য আনলোডেড ও লোডেড হলো—সেসব দিকেও কড়া নজর রাখতে হবে। সর্বাপেক্ষা শক্তিশালী ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে এবং তাদেরকে সিন্ডিকেট গড়ে তোলা প্রতিরোধে ভূমিকা রাখতে হলে আমদানিকারকের ওপরও নজরদারি বাড়াতে হবে। ৫-১০ শতাংশ মুনাফা স্বাভাবিক। কিন্তু তা যদি ১৫-১৮ শতাংশ ছাড়িয়ে যায় তাহলে ধরে নিতে হবে এটা অস্বাভাবিক মুনাফা। এ পরিমাপক দিয়ে মুনাফালোভী সিন্ডিকেটকে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে।

দেশে মূল্যস্ফীতি প্রায় আড়াই বছর ধরেই অসহনীয় পর্যায়ে রয়ে গেছে। স্বল্পমেয়াদে এ মূল্যস্ফীতি কমাতে সরকারের কী কী পদক্ষেপ নেয়া উচিত বলে আপনি মনে করেন?

স্বল্পমেয়াদে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব তখনই হতো যদি আমাদের মূল্যস্ফীতি চাহিদাজনিত হতো। সেক্ষেত্রে সুদের হার বাড়ালে বা ব্যয় কমানোর প্রচেষ্টা গ্রহণ করলে বা মুদ্রা সরবরাহ কমালে মানুষ ব্যয় কমাতে বাধ্য হতো। আমাদের ক্ষেত্রে এ অবস্থা সৃষ্টির কারণ হিসেবে আমি আবারো বলব আমাদের মূল্যস্ফীতি চাহিদাজনিত নয়, বরং এটি উৎপাদন খরচতাড়িত মূল্যস্ফীতি। অর্থাৎ উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ার ফলে এ মূল্যস্ফীতি সৃষ্টি হয়েছে। এটি থেকে সহজে পরিত্রাণ পাওয়া যাবে না। এজন্য কয়েকটি উৎপাদন মৌসুম বিশেষত কৃষি উৎপাদনের মৌসুম অপেক্ষা করতে হবে। এ মৌসুমগুলোয় যদি কৃষিজ পণ্যগুলো ভালোভাবে উৎপাদন করা সম্ভব হয় তাহলে উৎপাদন খরচতাড়িত এ মূল্যস্ফীতি কমে আসবে। এখানে আমি বারবারই বলেছি, সরবরাহ বাড়াতে হবে এবং উৎপাদন ব্যয় কমাতে হবে। স্বল্প সময়ের মধ্যে বা আগামী দু-তিন মাসে পরিস্থিতি ভালো হবে না। কয়েকটি উৎপাদন মৌসুম অপেক্ষা করতে হবে। পণ্য ঘাটতি দেখা দিলে আমদানি সহজতর করতে হবে। পণ্য ঘাটতি না থাকলে সিন্ডিকেট করা সম্ভব নয়। এরই মধ্যে আমাদের বোরো মৌসুমের উৎপাদন ভালো হয়েছে এবং চালের বাজার এটার প্রভাবে অনেকটাই স্থিতিশীল। একইভাবে আগামী আমন ধানের মৌসুম ভালো হলে এবং বড় ধরনের কোনো দুর্যোগের মুখোমুখি না হলে আগামী ডিসেম্বর থেকে মূল্যস্ফীতি কমতে থাকবে। এছাড়া শাকসবজি উৎপাদন ও সরবরাহ যদি ভালো হয় তাহলে সবজির দামও কমতে থাকবে। এভাবেই যেহেতু এটি সরবরাহজনিত ও উৎপাদন ব্যয়তাড়িত মূল্যস্ফীতি, তাই আগামী পাঁচ-ছয় মাসের মধ্যে এটি কমতে পারে বলে আশা রাখা যায়। সরবরাহ যত বাড়বে মূল্যস্ফীতি তত নিয়ন্ত্রণে আসবে। 

শ্রুতলিখন: মাইশা মারজানা ফারিহা