সংগীত নিয়ে বাংলাদেশের তরুণদের একটি ক্ষোভ রয়েছে। ক্ষোভের জায়গাটি হলো দেশের শিল্পীদের কাছ থেকে অ্যালবাম পাওয়া যায় না। কেবল তরুণ নয়, সংগীত ভালোবাসেন এমন সবাই কমবেশি এ কথা বলে থাকেন। নব্বইয়ের দশকে দেশে ব্যান্ড থেকে শুরু করে শিল্পীদের যৌথ, একক অ্যালবাম মুক্তি পেত। আর ব্যান্ডের কথা তো বলাই বাহুল্য। এ শতকের শুরুর দশকেও আসত অ্যালবাম। পরিচিতি পেয়েছিলেন বেশ কয়েকজন তরুণ শিল্পী। কিন্তু সে ধারা অব্যাহত থাকেনি। না থাকার অন্যতম একটি কারণ পাইরেসি। সিডি, ডিভিডির মাধ্যমে এ পাইরেসি শুরু হয় এবং ইন্টারনেট জনপ্রিয় হওয়ার পর ডাউনলোড সুবিধা শুরু হলে পয়সা খরচ করে গান শোনার ব্যাপারটি আমাদের আর হজমই হলো না। ফলে ধ্বংস হলো সম্ভাবনাময় একটি ইন্ডাস্ট্রি।

পাইরেসির এ ভূত চেপেছিল সিনেমার ওপরও। সেটাও ওই একই সময়ে। পাইরেসির ভূতটি পুরনো। বিশেষত বইয়ের ক্ষেত্রে পাইরেসি অনেক আগে থেকেই হয়ে আসছে এবং বর্তমানে ভূতটি বইয়ের কাঁধেই চেপে বসেছে। তার চেয়ে বড় কথা, কাজটি হচ্ছে সবার চোখের সামনেই এবং সেখানে কারো যেন কিছু বলার নেই। এক সময় নীলক্ষেতে বই পাইরেসি এবং বিকিকিনি হলেও বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কল্যাণে সবার সেলফোনে পৌঁছে গেছে পাইরেটেড বই। কোনো রকম অনুমোদনের তোয়াক্কা না করে দেশ ও দেশের বাইরের বই ছাপিয়ে অনলাইন ও অফলাইনে বিক্রি করছেন ব্যবসায়ীরা। এর ক্রেতাও কম নয়। ফলে দ্রুতই একটা বাজার তৈরি হয়ে গেছে। সেখানে কেনাবেচা হচ্ছে কোনো রকম অনুশোচনা ছাড়াই।

বইয়ের পাইরেসি হওয়ার বেশকিছু কারণ রয়েছে। প্রথমত এর পেছনে রয়েছে বহুদিনের অভ্যাস। পাইরেটেড বই কেনাবেচা আমাদের দৈনন্দিন আচরণ বা কালচারের একটা অংশ হয়ে উঠেছে। কেননা পাইরেসি করা বইগুলো তুলনামূলক কম দামে কেনা যায়। কিন্তু এর ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে ক্রেতাদের অনেকেরই কোনো ধারণা নেই। পাইরেসি করা বইয়ের কোনো মুনাফা প্রকাশকের ঘরে ওঠে না, এটা স্বাভাবিক বিষয়। কিন্তু প্রকাশকের তুলনায় বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন লেখক। কেননা পাইরেটেড বইয়ের বিক্রি থেকে লেখকের কোনো রয়্যালটি আসে না। বরং তার মূল প্রকাশনীর বই বিক্রি কমে যাওয়ার কারণে সেখান থেকে যে অর্থ আগমনের সম্ভাবনা থাকে তাও কমে যায়। কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে পাইরেসি নিয়ে লেখক বা প্রকাশক সক্রিয় পদক্ষেপ নেন না।

লেখক ও প্রকাশকের এ নিষ্ক্রিয়তার রয়েছে বিচিত্র কারণ। বাংলাদেশের বইয়ের বাজারটি খুবই ছোট। মজার (আসলে আফসোসের) ব্যাপার, বই কেনার ব্যাপারটিও বাংলাদেশে নাগরিক কালচারে সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে। এখানে ‘বই কেনা’র কথা বলা হলো কেননা বই কিনলেও আমাদের মধ্যে বই পড়ার অভ্যাস ক্রমাগত কমে যাচ্ছে। যারা বই কেনেন, তাদের অনেকেই সে বই পড়েন না। আমাদের জীবনযাপন, আচরণ ও আদর্শে পরিবর্তন আসার কারণে এ রকম হয়েছে। অন্যদিকে নাগরিক কালচারের কথা বলার কারণ, বড় শহরগুলো বাদে গ্রাম তো দূর অস্ত, মফস্বলেও বইয়ের দোকান ক্রমেই কমছে। সেখানে বই পড়া, কেনাবেচা হয় না। হলেও তা এতই কম যা উল্লেখযোগ্য নয়। তাহলে পাইরেসি কেন হয়?

পাইরেসি আগেও হতো সে কথা বলা হয়েছে। ১০-১২ বছর আগেও সে বই কিনতে নীলক্ষেত যেতে হতো কিংবা রেলস্টেশনে পাওয়া যেত। কিন্তু বিগত চার-পাঁচ বছরে সোশ্যাল মিডিয়ার ক্রমাগত জনপ্রিয়তায় বিশেষত ফেসবুক সেখানে তৈরি হয়েছে ‘মার্কেটপ্লেস’। সহজ করে বলতে গেলে, ফেসবুকে তৈরি হয়েছে অসংখ্য অনলাইন বুকশপ। অনলাইনে পেমেন্ট করে ঘরের ঠিকানা জানিয়ে দিলে বই পৌঁছে যায় দোরগোড়ায়। হাত বাড়ালেই অন্যান্য পণ্যের মতো বইও পৌঁছে যাচ্ছে। সে সুযোগ কাজে লাগিয়ে ব্যবসায়ীরা তৈরি করছেন পাইরেটেড বই আর সে সবের দাম কম হওয়ায় পাঠক-ক্রেতাও কিনে নিচ্ছেন খুশিমনে। এক্ষেত্রে এগিয়ে থাকছে পশ্চিমবঙ্গের বই। বিশেষত জনপ্রিয় ধারার বইগুলো অনেক বিক্রি হয়। আগেও হতো।

বই পড়ুয়া তৈরি হওয়া বা বই পড়ার শুরুর দিনগুলোয় বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এ ক্ল্যাসিক বইগুলোর প্রভাব রয়েছে। প্রত্যেকেই কোনো না কোনো সময় পাইরেটেড বই পড়েছেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এর বিকল্প আদতে ছিল না। যেমন ভারতীয় বইগুলো পড়ার ক্ষেত্রে। পাইরেসি হওয়ার অন্যতম একটি কারণ বই বিনিময়প্রথার দুর্বলতা। প্রথমত পশ্চিমবঙ্গের বই, বিশেষত সাহিত্যের একটি বড় পাঠককুল বাংলাদেশে রয়েছে, কিন্তু সে বইগুলোর মূল্য অত্যধিক। রুপির বিপরীতে টাকার মূল্যমান যা-ই হোক না কেন, এ বইগুলো বৈধ উপায়ে কিনতে মলাটমূল্যের দ্বিগুণ খরচ করতে হয়। সাম্প্রতিক ডলারের মূল্যবৃদ্ধি, নভেল করোনাভাইরাসের কারণে সীমান্ত বন্ধ থাকা ইত্যাদি কারণে বই আমদানি বেশি বাধাগ্রস্ত হওয়ার কারণে বই আসা কমে যাচ্ছে, মূল্য বাড়ছে। ফলে বাড়ছে পাইরেসি।

বহুদিন ধরে বইয়ের ক্রেতা হওয়ার কারণে ভারতের মূল বই কেনা হয়। সে সূত্রেই পরিচয় হয়েছে কয়েকজন আমদানিকারকের সঙ্গে। সম্প্রতি তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল বই আমদানি করার জন্য এলসি খুলতেই ঘাম ছুটে যাচ্ছে। এলসি সংকট, ডলারের দাম বাড়া ও সীমান্তে নানা কারণে দেরির ফলে বইয়ের মূল দামের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে নানা ধরনের খরচের চাপ। চাইলেও তারা কম মূল্যে বই বিক্রি করতে পারছেন না। ছয় মাস আগেও যেখানে এক রুপির বিপরীতে ১ টাকা ষাট পয়সা হারে বই কেনার সুযোগ ছিল, এখন সেখানে কোনো কোনো ক্ষেত্রে ১ রুপি ২ টাকা হারে বই বিক্রি করতে হচ্ছে তাদের।

আমাদের দেশে সাহিত্যের বইয়ের পাঠকের একটি বড় অংশ স্কুল-কলেজগামী ছাত্রছাত্রী। তাদের পক্ষে অধিক দামে বই কেনা কষ্টকর। তাই পাইরেটেড বই-ই ভরসা। চাহিদা আছে বলেই তৈরি হয়েছিল পাইরেটেড বইয়ের বাজার কিন্তু সে বাজার এখন স্থানীয় বইয়ের বাজারকেও গিলে খেতে উদ্যত হয়েছে। এর একটি শিকার বিদেশী বইয়ের আমদানিকারকরা। তারা বই আমদানি করছেন কিছু কিছু এবং সে বই ১ কপি কিনে নিয়ে তা থেকেই রাতারাতি তৈরি হচ্ছে পাইরেটেড বই। বছরখানেক হলো সেখানে নতুন কৌশল নেয়া হয়েছে। ৮০ গ্রাম ক্রিম কালার অফসেটে ছাপানো এসব বইয়ের নাম দেয়া হচ্ছে ‘প্রিমিয়াম প্রিন্ট’। বছর ১২ আগে পাইরেটেড বই বলতে নিউজপ্রিন্টে বাজে ছাপার বইয়ের বদলে এখন পাওয়া যাচ্ছে ঝকঝকে প্রিন্ট। ফলে ক্রেতারাও খুশি। কিন্তু এ বাজার প্রভাব ফেলছে আমাদের দেশীয় বইয়ের ক্ষেত্রেও।

জনপ্রিয় দেশীয় লেখকদের বইও পাইরেসি হচ্ছে কয়েক বছর ধরে। আগে তুলনামূলক গোপনে হলেও এখন খোলামেলাভাবেই চলছে বিক্রি। হুমায়ূন আহমেদ, জাফর ইকবালদের পাশাপাশি জনপ্রিয় হওয়া নতুন লেখকদের বইও পাইরেসি হয়। দুঃখজনক ব্যাপার, কোনো কোনো ক্ষেত্রে পাইরেসি হওয়া বইয়ের কাগজের মান মূল বইয়ের তুলনায় ভালো। একজন নবীন লেখক কোনো পদক্ষেপ নিতে পারেন না, কেননা পাইরেসির বাজারের কাণ্ডারিরা এতটা সংঘবদ্ধ যে সেখানে একা লেখকের কিছু করার থাকে না। এমনকি প্রকাশনীও সেখানে নির্বিকার। সিন্ডিকেট এতই বড় যে তারাও সে অলিগলিতে পা রাখতে বোধ করি ভয়ই পান।

কিন্তু পাইরেসি নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় সমালোচনা হচ্ছে, কিন্তু তাতে থেমে নেই বই তৈরি ও বিক্রি। হয়তো যিনি সমালোচনা করছেন তিনিও কিনছেন। লেখকরা বই থেকে যে রয়্যালটি পান তার পরিমাণ এতই সামান্য যে পাইরেসি ঠেকাতে আইনি কোনো ব্যবস্থায় যাওয়ার কথা ভাবা যায় না। আমদানিকারকরা কখনো বলছেন কিন্তু সরব হওয়া যাকে বলে তা সম্ভব হচ্ছে না। কোনো কোনো প্রকাশক হয়তো পুলিশ নিয়ে যাচ্ছেন কিন্তু মাস না পেরোতে ফের সেই প্রকাশনীর বই পাইরেসি হয়ে আবার আসছে বাজারে।

অতিমারীর পর কয়েক দফায় বেড়েছে কাগজের দাম। দেশের প্রকাশনা শিল্প ও ব্যবসায়ীরা এ নিয়েই দুশ্চিন্তায়। এ বছর বই প্রকাশে খরচ বেড়ে গেছে ৩০-৪০ শতাংশ। মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে উঠেছে পাইরেসি। পশ্চিমবঙ্গে এ নিয়ে রীতিমতো সমালোচনা ও হাসাহাসিই হয়। এতকিছুর পরও পাইরেসি থামানোয় সক্রিয় হওয়ার যেন কোনো সুযোগ নেই। ইঁদুরের সেই পুরনো গল্পটার মতো অবস্থা হয়ে গেছে। পাইরেসি নিয়ে অনেকেই চিন্তিত কিন্তু বন্ধ করতে নেয়া হচ্ছে না কোনো শক্ত পদক্ষেপ। পাইরেসির গলায় ঘণ্টা বাঁধার কেউ নেই। তবে বন্ধ করা না গেলে এ প্রকাশনা ও বইয়ের ব্যবসায়ও ধস নামতে সময় নেবে না। পাওলো কোয়েলহোর বই বিশ্বব্যাপী বিক্রি হয় বলে তিনি পাইরেসির অনুমতি দিতেই পারেন, কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে পাইরেসির (বিশেষত বই) বিরুদ্ধে দাঁড়ানো খুবই জরুরি। নয়তো সংগীতের মতো বইয়ের বাজার নষ্ট হতে খুব বেশি সময় নেবে না।

 

মাহমুদুর রহমান: লেখক ও সাংবাদিক