সরকারের লক্ষ্য স্বাস্থ্য খাতের বাজেটকে জিডিপির ৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো। কিন্তু এ মহৎ স্বপ্ন ও প্রতিশ্রুতি পূরণে সরকারকে জনগণের করভিত্তিক অর্থায়নের পাশাপাশি অর্থায়নের আরো কিছু কার্যকর ও উদ্ভাবনী পথ খুঁজতে হবে। কর-জিডিপি অনুপাত বাংলাদেশে ৭। এ পরিমাণ কর দিয়ে ভালো কিছু হবে না। কিন্তু অতিরিক্ত অর্থ কোথা থেকে আসবে? এক্ষেত্রে সিন ট্যাক্স, করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা তহবিল, বিভিন্ন সেবার ওপর সারচার্জ, গণচাঁদা, অনুদান ইত্যাদি উৎসের অর্থকে কাঠামোগতভাবে স্বচ্ছ আর্থিক ব্যবস্থাপনার মধ্যে আনা দরকার। প্রয়োজনীয় সংগঠন ও দক্ষ ব্যবস্থাপকও তৈরি করতে হবে। প্রতিষ্ঠিত খাতের কর্মীদের জন্য আইনের মাধ্যমে সামাজিক স্বাস্থ্যবীমা (সোশ্যাল হেলথ ইন্স্যুরেন্স) চালু করা যায়। এর আওতায় সরকারি কর্মকর্তাসহ প্রাতিষ্ঠানিক খাতের কর্মকর্তারা স্বাস্থ্যসেবা ক্রয় করবেন। ফলে অর্থের যে সাশ্রয় হবে তা থেকে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে বিনামূল্যে সর্বজনীনভাবে দেয়া যাবে। জার্মানিতে ১৮৮৩ সাল থেকে স্বাস্থ্যসেবার অর্থায়নের জন্য একটি বাধ্যতামূলক বিধিবদ্ধ সামাজিক স্বাস্থ্য বীমা কৌশল রয়েছে। দেশটির ৯০ শতাংশ মানুষ এ বীমার আওতাভুক্ত। বাংলাদেশে একটি বৃহৎ অপ্রাতিষ্ঠানিক খাত রয়েছে, তাই সামাজিক স্বাস্থ্যবীমা ও গণকরের পাশাপাশি আমাদের অন্যান্য ধরনের আর্থিক কৌশলের প্রয়োজন হবে।
ভূতপূর্ব স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশন মত দিয়েছিল একটি শক্তিশালী রেফারেল ব্যবস্থা মানুষের যাতায়াতের সময় ও খরচ বাঁচানোর পাশাপাশি নিজ নিজ কাজে সংযুক্ত থেকে তারা উপার্জন হ্রাসের হাত থেকে মুক্তি পাবে। এটি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের আরো সময় সাশ্রয় করবে এবং বিশেষজ্ঞ পরিষেবার প্রয়োজন এমন ব্যক্তিদের আরো বেশি সময় দিতে পারবে। অন্যদিকে রেফারেল ছাড়া উচ্চতর কেন্দ্রগুলোয় পরিষেবা নিলে তার জন্য শাস্তিমূলক মূল্য ধার্য করার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। বাজেট সীমাবদ্ধতার কথা মাথায় রেখে, সরকারি হাসপাতালে সবার সব সেবা বিনামূল্যে পাওয়া উচিত নয়। সামর্থ্য অনুযায়ী পরিষেবার জন্য কিছু মূল্য দেয়ার ব্যবস্থা থাকা উচিত। এটি নৈতিক ঝুঁকি প্রতিরোধ করবে এবং প্রকৃত অভাবগ্রস্ত ব্যক্তিদের পরিষেবা নিতেও বাধা দেবে না। স্বাস্থ্যসেবার অর্থায়নে একটি জাতীয় স্বাস্থ্যবীমা ব্যবস্থা চালু এবং পরিচালনা করা কঠিন হবে। বিশেষ করে আমাদের প্রশাসনিক ও ব্যবস্থাপনা সংস্কৃতিতে স্বচ্ছতার অভাব থাকায় সমস্যাটি থেকে যাবে। স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশন সুপারিশ করেছিল বেসরকারি হাসপাতালগুলোর লাইসেন্স পাওয়ার জন্য ১০ শতাংশ শয্যার সেবা বিনামূল্যে দেয়ার শর্ত রাখতে হবে। একই সঙ্গে সরকারি হাসপাতালের ১০ শতাংশ শয্যাসংশ্লিষ্ট পরিষেবা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য বিনামূল্যে দেয়া উচিত এবং অন্যদের কাছ থেকে তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী মূল্য নেয়া উচিত। এর মাধ্যমে ও অর্থায়নের বর্তমান ঘাটতি পূরণ হবে। এজন্য সেবার মান বৃদ্ধি এবং জটিল ও জরুরি রোগের সেবার ক্ষেত্রে বিলম্ব পরিহার করতে হবে।
স্বাস্থ্য খাতে কিছু সমস্যা থাকায় বাজেট দেয়া ও বাস্তবায়নের পথে চ্যালেঞ্জ তৈরি হবে। সুশাসন ও সংস্কারের সংকট এখানে প্রধান। অর্থায়ন ঘাটতিও কম নয়। দেশের ভেতর থেকে সরকার কর্তৃক ঋণ সংগ্রহের কারণে ব্যক্তি খাতে মূলধনের ঘাটতি, ফলে ব্যক্তি খাতে প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগে ও অন্যান্য সেবাকার্য সংগঠনে স্থবিরতা; বিদেশনির্ভর প্রযুক্তির উন্নয়নের ক্ষেত্রে দুর্বলতা; বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ; জ্বালানির মূল্য পরিশোধ—এগুলো সামনের দিনগুলোয় আরো বাড়বে। সাংগঠনিক দুর্বলতা আমাদের ক্রয় সক্ষমতা কমাবে। এসব কারণে ব্যক্তি খাতে দেশের কারো পক্ষে সেন্টার অব এক্সেলেন্স হাসপাতাল তৈরি সম্ভব নাও হতে পারে। এ কারণে চিকিৎসার জন্য বিদেশমুখী প্রবণতাও বন্ধ করা সহজ হবে না।
সরকার কর্তৃক উচ্চতর বেতন ভাতা এবং নতুন নিয়োগ ইত্যাদি কারণেও মূল্যস্ফীতি ও স্ট্যাগফ্লেশনের সম্ভাবনা আছে। তাই সরকারের সদিচ্ছা থাকলেও জিডিপির পাঁচ ভাগ বা বার্ষিক উন্নয়ন পরিকল্পনার ১৫ শতাংশ, যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্রদত্ত পরামর্শ বাস্তবায়ন আপাতত সম্ভব নয়। এছাড়া সঠিক/দক্ষ, নিবেদিত ও জনবান্ধব সেবাপ্রদানকারীর অভাব এবং অনানুপাতিক স্থিতি। প্রয়োজনীয় ও আধুনিক যন্ত্রপাতি এবং প্রযুক্তির স্বল্পতা (যেমন আইসিইউ, সিসিইউর ঘাটতি), পরিচালন ব্যয়ের স্বল্পতা, সঠিক, প্রয়োজনানুগ, সুচারু ও সেবাগ্রহীতাবান্ধব ভৌতিক অবকাঠামোর অভাব, বরাদ্দের ব্যয়ে স্থানীয় পর্যায়ে অযাচিত হস্তক্ষেপ, ব্যয় ও বাস্তবায়নে নিরীক্ষা বিভাগের প্রশ্নসাপেক্ষ আপত্তি, ব্যবস্থাপনার এবং নেতৃত্বের দুর্বলতাও সরকারের পরিকল্পনায় ব্যাঘাত ঘটাতে পারে।
স্বাস্থ্যসেবা পৃথিবীব্যাপী জনবলের শক্তি, সামর্থ্য ও দক্ষতা নির্ভর। এজন্য যে বাজেট বরাদ্দ করা হবে তার শর্ত হতে হবে স্বচ্ছ, দক্ষ ও সঠিক নেতৃত্ব এবং ব্যবস্থাপনার উপস্থিতি। জনগণ যে সেবাকে তাদের জন্য প্রয়োজনীয় ও মূল্যবান মনে করে, যেমন ওষুধ, পরীক্ষাগার, অ্যাম্বুলেন্স এবং রক্ত পরিসঞ্চালনকেন্দ্রিক সেবাসমূহ, এসবের নিশ্চয়তা বিধান করতে হবে অগ্রগণ্য কার্যক্রম এবং বাজেটের অগ্রগণ্য খাত হিসেবে। স্বাস্থ্য খাতের বাজেট ও বাজেট ব্যবস্থাপনার মূল লক্ষ্য হতে হবে প্রাথমিক সেবা পর্যায়ে প্রয়োজনীয় মান এবং পরিমাণ নিশ্চিত করে সেবাগ্রহীতার সংখ্যা বাড়ানো। উচ্চতর সেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর মান বাড়িয়ে তা করতে হবে। এসব সফল করতে ব্যবস্থাপনা ঘাটতি ও বরাদ্দ অপচয় কমিয়ে আনতে হবে। স্বাস্থ্য খাতে প্রয়োজন অনুযায়ী বাজেট করা হবে। সঠিক খাতে মঞ্জুরি ও সঠিক ব্যয় ব্যবস্থাপনা দরকার। স্বাস্থ্য খাতের প্রাথমিক স্তরে উপযুক্ত জনবল নিয়োগ দিতে হবে। দ্বিতীয় স্তরে প্রযুক্তির প্রাধান্য, বাজেট প্রাক্কলন, কর্মসূচি বাস্তবায়ন এবং সম্পদ ব্যবস্থাপনায় উপযুক্ত নেতৃত্ব নিশ্চিত করতে হবে।
সবার জন্য বিনামূল্যে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার সম্প্রসারণ এবং রেফারেল পর্যায়ে সেবার মান উন্নয়নকে অগ্রগণ্যতা দিতে হবে। ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোর জন্য যখন প্রয়োজন অনুযায়ী ভৌত অবকাঠামো, জনবল, চিকিৎসা প্রযুক্তি এবং ক্লিনিক্যাল সম্পদ পর্যাপ্ত ও উপযুক্ত হবে, তখনই প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবাকেন্দ্রগুলো রোগী আকর্ষণ করবে এবং রেফারেল কার্যকরী হবে। দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও প্রচলিত রীতি অনুযায়ী স্বাস্থ্য খাতে প্রয়োজনীয় বাজেট বরাদ্দ করা সম্ভব নয়, তাই উদ্ভাবনী অর্থায়ন-কৌশল প্রয়োজন। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পর্যায়ে প্রতিরোধমূলক, উন্নয়নমূলক (পুষ্টি), রোগ নিয়ন্ত্রণ ও রোগ নজরদারি, মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্য, পরিবার পরিকল্পনা, এবং বার্ধক্যকালীন সেবা যাতে ব্যয় সাশ্রয়ী ও দক্ষ হয়, এজন্য এ স্বাস্থ্য ইউনিটগুলোকে একটি জনস্বাস্থ্য কাঠামোয় পুনর্গঠন ও পুনর্বিন্যাস করতে হবে। রেফারেল ব্যবস্থা প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পর্যায় থেকে শুরু হওয়া উচিত। উচ্চ পর্যায়ে তা ক্রয়ক্ষমতা অনুযায়ী নির্ধারণ করলে টেকসই হবে। হাসপাতালের সেবার মান নিশ্চিত করার জন্য সব প্রয়োজনীয় সংস্থান উপলব্ধ থাকা উচিত।
কমিউনিটি স্তর থেকে বিশেষায়িত হাসপাতাল পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টা ওষুধ, রোগনির্ণয় পরীক্ষার সুবিধা, রক্ত সঞ্চালন ও অ্যাম্বুলেন্স পরিষেবা রাখতে হবে। এগুলো নিজ নিজ নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পরিচালিত হবে। অর্থনৈতিকভাবে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ২০ শতাংশের জন্য হাসপাতালের সেবা বিনামূল্যে হওয়া উচিত, যার ১০ শতাংশ হবে বেসরকারি হাসপাতালে। মানবসম্পদকে দক্ষ ও মানসম্মত করতে হবে এবং সেবার ধরন বা শ্রেণী এবং অনুপাত ও প্রয়োজন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সংখ্যক সেবাপ্রদানকারীর উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে। মানবসম্পদকে যৌক্তিকভাবে পদায়ন করতে হবে এবং দুর্গম অঞ্চলে দায়িত্ব পালনকালে তাদের জন্য ক্ষতিপূরণ ও উৎসাহ ভাতা এবং পুরস্কার দিতে হবে। কাঠামোগত ও প্রশাসনিক পুনর্গঠন, কার্যকর সমন্বয় এবং পুনরাবৃত্তি রোধ করে সম্পদ ব্যবস্থাপনার দক্ষতা বাড়াতে হবে; যাতে ব্যয় যৌক্তিক হয়। প্রস্তাবিত কৌশলগুলো প্রণয়নে কমিশন, প্রযুক্তিগত কমিটি, টাস্কফোর্স, ওয়ার্কিং গ্রুপ ইত্যাদি গঠন করতে হবে। এসব কার্যক্রমে বাজেট রাখতে হবে। স্বাস্থ্যের উন্নয়নের জন্য সেবা এবং এর ব্যবস্থাপনা, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ, কার্যক্রমের মূল্যায়ন ইত্যাদি ক্ষেত্রে এবং এসবের জন্য কাঠামোগত ও উদ্ভাবনী সংস্কারে গবেষণাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। এগুলো সবই দীর্ঘমেয়াদে বড় চ্যালেঞ্জ। কিন্তু সঠিক কৌশল প্রণয়ন করলে এগুলোর বাস্তবায়ন কঠিন হবে না।
ড. আবু মুহাম্মদ জাকির হোসেন: সাবেক পরিচালক, প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিচর্যা ও রোগ নিয়ন্ত্রণ, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর; আঞ্চলিক উপদেষ্টা, বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দপ্তর; স্টাফ কনসালট্যান্ট, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক এবং সদস্য, ভূতপূর্ব স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশন










