জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের মূল চেতনা বৈষম্যবিরোধী। শ্রমবাজার ও সরকারি চাকরিতে বৈষম্য দূর করা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছিল। এরপর নানা পটপরিবর্তন দেখেছি। শ্রমবাজার খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। সার্বিক বৈষম্য বিশেষ করে আর্থিক বৈষম্য কমানোর গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও গুণগতমানের সমৃদ্ধ কর্মসংস্থান তৈরি। এ অনুষ্ঠানে আমার আলোচনার বিষয় লিঙ্গবৈষম্য। বাংলাদেশের অর্থনীতির ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা পরিবর্তন হয়েছে। লিঙ্গবৈষম্য বিশেষ করে শ্রমবাজারে নারী-পুরুষের অংশগ্রহণের হার পরিবর্তন হয়েছে এবং যে ফারাকটা ছিল তা কমেছে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে, তা হলো ২০২২ সালের শ্রমশক্তি জরিপে দেখা যাচ্ছে লিঙ্গবৈষম্য কমার ক্ষেত্রে উল্লম্ফন ঘটেছে এবং কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন হয়েছে। শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণ ৪২ শতাংশের বেশি। সেটি আগের তুলনায় ইতিবাচক চিত্র দেখাচ্ছে। তবে এ পরিবর্তনকে সংখ্যাগত দিক দিয়ে বিবেচনা না করে গুণগত দিক দিয়ে বিবেচনা করা দরকার। গুণগত দিক দিয়ে বিবেচনা করলে দেখা যাবে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গ্রামভিত্তিক অর্থনীতির কার্যক্রমে নারীদের অংশগ্রহণ বেড়েছে। কিন্তু সার্বিকভাবে গত দুটি সময়ের মধ্যে অর্থাৎ ২০১৭-২২ সাল পর্যন্ত শ্রমশক্তি জরিপগুলোয় দেখা যাচ্ছে, শহরাঞ্চলে অধিকতর আনুষ্ঠানিক যে কাজগুলো রয়েছে সেখানে নারীদের অংশগ্রহণের হার সাম্প্রতিক সময়ে কমেছে। এখানে সার্বিকভাবে বলা যায় যে গুণগতমানের দিক বিবেচনায় যে ধরনের কাজগুলোয় কম মজুরি ও কম উৎপাদক, সে ধরনের কাজে নারীদের অংশগ্রহণ গুরুত্ব পেয়েছে।

  • তখন একটি প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই সামনে আসে যে গুণগত মানের দিক থেকে নারীরা কোন ধরনের কাজ করছে? সেক্ষেত্রে লিঙ্গবৈষম্যের চিত্র ফুটে ওঠে। এক্ষেত্রে ৯৬ শতাংশ নারী অনানুষ্ঠানিক কাজে জড়িত। কিন্তু অনানুষ্ঠানিক ক্ষেত্রে পুরুষদের সংখ্যাটি এত বেশি না। কৃষিভিত্তিক কাজগুলোয় অর্থাৎ অপেক্ষাকৃত অস্থায়ী এবং যে ধরনের কাজে ঝুঁকি বেশি সে ধরনের কাজে নারীরা বেশি অংশগ্রহণ করছে। নারীদের ক্ষেত্রে আর্থিক নিরাপত্তা খুবই কম। তারা পারিবারিক শ্রমভিত্তিক কাজগুলো বেশি করছে এবং সেগুলোর অনেক ক্ষেত্রেই তারা মজুরি পাচ্ছে না। এখানে উল্লেখ করা দরকার, গুণগত মান বিবেচনায় উচ্চপদস্থ কাজগুলো বিশেষ করে আনুষ্ঠানিক কাজ বা ম্যানেজারিয়াল পদগুলোয় নারীদের অংশগ্রহণ মাত্র ৭ দশমিক ৩ শতাংশ, যা ১০ শতাংশেরও কম। কিন্তু বাকিগুলোয় পুরুষরা অংশগ্রহণ করছে। গুণগত বিচারে এসব জায়গা বা আনুষ্ঠানিক ক্ষেত্রে বৈষম্য প্রকটভাবে বিরাজমান। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই বৈষম্য কিছু ক্ষেত্রে কমলেও গুণগত মান বিবেচনায় ব্যবধান যতটুকু কমার কথা ছিল, সে পরিমাণ কমেনি।
  • বাংলাদেশের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিক তরুণ জনশক্তি। বাংলাদেশ জনমিতির ক্ষেত্রে একটি সুবিধাজনক অবস্থায় রয়েছে। কিন্তু সেই সুবিধাজনক অবস্থানে থেকে আমরা কতটুকু সুবিধা প্রকৃতপক্ষে নিতে পেরেছি? সেদিকে লক্ষ করলে দেখা যাবে, তরুণদের মধ্যে একটি বড় অংশ নারী। অথচ এ নারীরা শিক্ষা, শ্রমবাজারে নেই, এমনকি তারা কোনো প্রশিক্ষণেও নেই। আমরা বিভিন্ন সময়ে তারুণ্যের যে শক্তি সেই শক্তির প্রকাশ ঘটতে দেখেছি। অথচ সে শক্তিকে সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারছি না। বিশেষ করে নারী শক্তিকে। তাই এ জায়গাগুলোয় বড় ধরনের কাজ করার দরকার রয়েছে। গুণগত মানের পরিবর্তন দরকার।
  • আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে কী ধরনের কাজ করছে? সেক্ষেত্রে স্বনিয়োজিত কাজ। এ স্বনিয়োজিত কাজে নারী অংশগ্রহণ করছে অর্থাৎ তারা সামনে এগিয়ে এসেছে। তার পরও স্বনিয়োজিত কাজের কথা বিবেচনা করলে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে মূলধন (ক্যাপিটাল) দরকার। আর্থিক অন্তর্ভুক্তির বিভিন্ন গবেষণায় দেখেছি, মূলধনের সহযোগিতায় এখনো বিরাট ফাঁক রয়েছে। বিশেষ করে আনুষ্ঠানিক ক্ষেত্র অর্থাৎ ব্যাংক থেকে মূলধন নেয়ার ক্ষেত্রে অনেক ফাঁক রয়েছে। এক্ষেত্রে নারীরা পিছিয়ে আছে। আমরা যতই নারী উদ্যোক্তার কথা বলছি না কেন, উদ্যোক্তা হিসেবে একজন নারী যতটা সহযোগিতা পাওয়ার কথা সেই সহযোগিতা তারা পাচ্ছে না। নারীরা সার্বিকভাবে মূলধারার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে আছে। শ্রমবাজারে নারীদের অবস্থানকে প্রতিষ্ঠিত করতে যে জায়গাগুলো রয়েছে, সেই জায়গাগুলোয় এখনো অনেক প্রতিবন্ধকতা আছে। আনুষ্ঠানিক ক্ষেত্রে বিশেষ করে ব্যাংকভিত্তিক ঋণ ব্যবস্থাকে সহজলভ্য ও সেখানকার প্রতিবন্ধকতাগুলো দূর করা গেলে শ্রমবাজারে কর্মসংস্থানের এ ব্যবধান বা খারাপ অবস্থাটি কিছুটা হলেও কমানো যাবে।
  • আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় শিক্ষা। শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। শিক্ষা ক্ষেত্রেও গুণগত মানের বিষয় জড়িত। কারণ প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় অনেক ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন দেখেছি। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে টারশিয়ারি পর্যায়ে। উচ্চ শিক্ষায় নারী কিংবা তরুণীরা পিছিয়ে রয়েছে। আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা বা আধুনিক পৃথিবীতে বিভিন্ন বিজ্ঞানভিত্তিক বিষয়গুলো রয়েছে, যা আধুনিক বাংলাদেশকে গড়ার ক্ষেত্রে সহায়তা করবে, সেই জায়গায় নারীর অংশগ্রহণের যে ফারাক রয়েছে তা সেভাবে দূর করতে পারিনি। একটা বড় ধরনের ফারাক কিন্তু বিদ্যমান।
  • একটি আশার কথা এখানে বলা দরকার, উচ্চ শিক্ষায় ফারাক থাকলেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এ বছর ৫০ শতাংশের বেশি নারী ভর্তি হয়েছে। এর অর্থ, যদি সুযোগ দেয়া হয়, বিশেষ করে সার্বিকভাবে সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে চলার পথটি সুগম করে দেয়া হলে তারা উচ্চ শিক্ষায়, বিশেষ করে মেধাভিত্তিক উচ্চ শিক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে। এখন শিক্ষায় যেসব বাধা রয়েছে, বিশেষ করে উচ্চ শিক্ষায় সেগুলো দূর করতে হবে। নারীদের জন্য আবাসন, নিরাপত্তা ও পরিবহনের ব্যবস্থা করতে হবে। এসব সুবিধা মৌলিক চাহিদার অন্তর্ভুক্ত। নারীদের জন্য এসব সুবিধা নিশ্চিত করতে পারলে শিক্ষায়, বিশেষ করে উচ্চ শিক্ষায় নারী-পুরুষের যে পার্থক্য রয়েছে তা কমিয়ে আনা সম্ভব হবে। শিক্ষায় নারী-পুরুষের ব্যবধান কমিয়ে আনা গেলে শ্রমবাজারে তার প্রতিফলন ফুটে উঠবে। এটি নারীর আর্থিক ক্ষমতায়ন ও আর্থিক ক্ষেত্রে যে ফারাক রয়েছে তা কমাতে সহায়তা করবে।
  • সার্বিকভাবে নীতিগত ক্ষেত্রে জেন্ডার রেস্ট্রিক্টিভ একটি নর্ম কাজ করে। এটি নারীকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে উচ্চ শিক্ষা ও শ্রমবাজারে কাজ করার ক্ষেত্রে বাধা তৈরি করে। আরেকটি বিষয় নারীদের অপ্রদর্শিত আয় ও শ্রম (আনপেইড কেয়ার ওয়ার্ক) রয়েছে। সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, একজন নারী সারা দিনে ৫ দশমিক ৮ ঘণ্টা ব্যয় করে এ ধরনের অপ্রদর্শিত আয় ও শ্রমের ক্ষেত্রে। কিন্তু পুরুষের ক্ষেত্রে এটি ১ ঘণ্টারও কম। সুতরাং যদি নারীদের অপ্রদর্শিত আয় ও শ্রমকে কিছুটা লাঘব করা যায়, পরিবহন ব্যবস্থা, নিরাপত্তা ও আবাসনের ব্যবস্থা করার পাশাপাশি বাল্যবিবাহসহ সামাজিক প্রতিবন্ধকতাগুলো নিরসনে জোর দেয়া যায়, তাহলে লিঙ্গবৈষম্য বিশেষ করে শিক্ষা, সামাজিক ও অর্থনীতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে কিছুটা হলেও কমিয়ে আনা যাবে।

ড. সায়মা হক বিদিশা: উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) ও অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

[১১ নভেম্বর বণিক বার্তা আয়োজিত ‘বৈষম্য, আর্থিক অপরাধ ও বাংলাদেশের অর্থনীতির নিরাময়’ শীর্ষক তৃতীয় বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সম্মেলন ২০২৪-এ প্যানেল আলোচকের বক্তব্য]