কয়েক বছর ধরে দেশের অর্থনীতি বহুমুখী চাপের মধ্যে রয়েছে। এতে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার বাধাগ্রস্ত হয়েছে। আবার গত দেড় দশকে রাজনৈতিক মদদে কতিপয় অলিগার্ক ব্যবসায়ী শ্রেণী তৈরি হয়েছে। এসব ব্যবসায়ীর রয়েছে হাজার হাজার কোটি টাকার খেলাপি ঋণ। দেশের ব্যাংক খাতকে তারা ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়েছে। একই সঙ্গে বিপুল পরিমাণ অর্থও পাচার করেছে। এছাড়া ভিন্ন রাজনৈতিক মতবাদের কারণে অনেক ব্যবসায়ীকে অযথা হয়রানির শিকার হতে হয়েছে।

রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দুর্দশা ছাড়াও দেশে ব্যবসা-বাণিজ্য বিকাশের ক্ষেত্রে নানা সমস্যা বিদ্যমান। বিশেষত আমলাতান্ত্রিক ও জমিসংক্রান্ত জটিলতায় ব্যবসার পথটি এখনো অমসৃণ রয়ে গেছে। ফলে ব্যবসা সহজ করার সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান পেছনের দিকে। ব্যবসা-বাণিজ্যের এসব প্রতিবন্ধকতা ও সংকট সমাধানে সরকারের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া বাড়াতে চাইছেন দেশের বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তারা। সম্প্রতি বণিক বার্তা আয়োজিত ‘বৈষম্য, আর্থিক অপরাধ ও বাংলাদেশের অর্থনীতির নিরাময়’ শীর্ষক তৃতীয় বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সম্মেলন ২০২৪-এ বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তারা এ আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তাদের এ আহ্বানে সাড়া দেয়া প্রয়োজন। স্বল্প ও মধ্যমেয়াদি এমন কিছু পদক্ষেপ নেয়া দরকার, যাতে পরবর্তী সময়ে কোনো রাজনৈতিক সরকার এসে খাতটিকে আর কোণঠাসা করতে না পারে। খাতটি যেন বঞ্চনার শিকার না হয়। ভঙ্গুর অর্থনীতির পুনরুদ্ধারে এবং সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতার জন্য এটা অতীব জরুরি।

যেকোনো দেশের অর্থনীতিতে বেসরকারি খাতের অবদান সবচেয়ে বেশি। বাংলাদেশের অর্থনীতিও বেসরকারি খাতনির্ভর। প্রায় ৮৬ শতাংশ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয় বেসরকারি খাতে। আর সরকারি খাতের অংশ মাত্র ১৪ শতাংশ। অর্থনীতির সুবিশাল খাতটিতে বর্তমানে তারল্য সংকট রয়েছে। গত সরকারের অতিরিক্ত ব্যাংক ঋণনির্ভরতার কারণে ঋণবঞ্চিত হয়েছে খাতটি। আবার গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে বহুদিন ধরেই বিভিন্ন কলকারখানায় উৎপাদন গতি শ্লথ হয়ে এসেছে। দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিচারে নতুন বিনিয়োগের মাত্রাও কমেছে। সব মিলিয়ে এক প্রকার ধুঁকে ধুঁকে চলছে খাতটি। যার ফলে কর্মসংস্থান প্রবৃদ্ধিতেও স্থবিরতা নেমে এসেছে। এতে বেকারত্বের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে, যা অর্থনীতির বড় ক্ষত। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সরকারের বেসরকারি খাতের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া বাড়ানো আবশ্যক। কীভাবে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটানো যায় এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা যায় তা নিয়ে কাজ করতে হবে। বেসরকারি খাতের গতি বাড়লে তা সামষ্টিক অর্থনীতির গতিশীলতা বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা রাখবে।

বেসরকারি খাতে ব্যবসার প্রসারে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করতে হবে। দেশে জমি কেনা ও ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড শুরু করার ক্ষেত্রে প্রায় অভিযোগ ওঠে দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে। চলতি বছরের শুরুর দিকে বাংলাদেশ বিজনেস ক্লাইমেট ইনডেক্স জরিপ প্রকাশ পায়। এ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৩ সালে দেশের ব্যবসার পরিবেশের অবনতি হয়েছে, বিশেষত ঋণ প্রাপ্যতার ক্ষেত্রে। এছাড়া ব্যবসা শুরুর সনদ গ্রহণ, জমির প্রাপ্যতা, অবকাঠামোসহ সাতটি সূচকের অবস্থাও নিম্নমুখী। সুতরাং এসব আমলাতান্ত্রিক সমস্যাগুলো জরুরি ভিত্তিতে সমাধান প্রয়োজন।

বলাবাহুল্য, ব্যবসা-পরিবেশের সূচক নিম্নগামী হওয়ায় দেশী ও বিদেশী বিনিয়োগকারীরা নিরুৎসাহিত হয়েছেন নতুন বিনিয়োগে। ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগে আস্থার সংকট দেখা দিয়েছে। আবার শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য অবকাঠামো, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংযোগ প্রভৃতি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। কিন্তু দেশে এসব সংকটও প্রকট। তাছাড়া ডলার সংকটে বিনিয়োগের মুনাফা প্রত্যাবাসনেও জটিলতার সম্মুখীন হতে হয়েছে বিদেশী বিনিয়োগকারীদের। উপরন্তু গণ-অভ্যুত্থানের মুখে সরকার পরিবর্তনের পর থেকে নতুনভাবে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, যা বিনিয়োগের পরিবেশকে আরো অস্থিরতার দিকে নিয়েছে। এ অবস্থায় বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে হলে সার্বিকভাবে স্থিতিশীলতা ফেরানোয় মনোযোগ দিতে হবে। এক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণমূলক অনিশ্চয়তা দূর করতে হবে। এতে ব্যবস্থাপনায় বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়, যা উৎপাদনশীলতা হ্রাস ও উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে দেয়। যার প্রভাব বাজারদরে পড়ে। মোটাদাগে এমন অনিশ্চয়তা বিনিয়োগে বাধা সৃষ্টি করে। আবার রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে কোনো ব্যবসায়ী যাতে হয়রানির শিকার না হয় তা নিশ্চিত করতে হবে। নয় তো দীর্ঘমেয়াদে ব্যবসার সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখা দুষ্কর হবে।

দেশে বর্তমানে বিনিয়োগ আকৃষ্ট করায় অন্যতম প্রতিবন্ধকতা জ্বালানি সংকটও। এর সমাধানও তাই অধিক গুরুত্বপূর্ণ। জ্বালানি নিরাপত্তা ছাড়া নিরবচ্ছিন্ন শিল্প উৎপাদন সম্ভব নয়। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নেও এটি গুরুত্বপূর্ণ। এর জন্য নতুন গ্যাসকূপ অনুসন্ধানে গতি বাড়াতে হবে। অফশোর ও অনশোরে গ্যাস অনুসন্ধানে জোর দিতে হবে। দেশে ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল করা হয়েছে। তবে আমাদের দেশে আবহাওয়ার কথা বিবেচনায় স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল দরকার। কারণ বর্ষা মৌসুমে সাগর উত্তাল থাকলে ভাসমান টার্মিনালে গ্যাস সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হয়। সরকারের এসব বিষয় বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। পাশাপাশি তেল পরিশোধন রিফাইনারির আধুনিকায়ন প্রয়োজন, যাতে সব ধরনের অপরিশোধিত জ্বালানি (ক্রুড অয়েল) পরিশোধন করা যায়।

দেশের ব্যবসার পরিবেশের অন্যতম আরেকটি প্রতিবন্ধকতা অর্থসংস্থান। বাজেট ঘাটতি মেটাতে বিগত সরকারের ব্যাংক ঋণনির্ভরতা ও ঋণের বাড়তি সুদের চাপে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমেছে। নীতি সুদহার দফায় দফায় বাড়ায় বেসরকারি খাতের ওপর বাড়তি সুদের চাপ এখনো বিদ্যমান। এ খাতের উদ্যোক্তাদের ঋণ প্রাপ্তি কীভাবে আরো সহজ করা যায় এবং সুদহার কমিয়ে আনা যায় তা বিবেচনায় আনতে হবে।

ব্যবসা সহজ করতে প্রয়োজনে বিদ্যমান আইনগুলো পুনর্মূল্যায়ন করতে হবে। প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টিকারী আইন সংশোধন করে ব্যবসাকে কাঠামোবদ্ধ করতে হবে।

দীর্ঘ বছরের প্রতিবন্ধকতা ও সমস্যা রাতারাতি সমাধান সম্ভব নয়। তবে বর্তমান সরকার বেসরকারি খাতে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসারে আবশ্যকীয় কিছু উদ্যোগ নেবে, এর মাধ্যমে এ খাতের সঙ্গে সরকারের মিথস্ক্রিয়া বাড়বে—এটাই প্রত্যাশা।