রাজধানীতে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে সরকার এরই মধ্যে অনেকগুলো পরিকল্পনা নিয়েছে। এআই ব্যবহার হচ্ছে। এগুলো কি আমাদের যানবাহনে শৃঙ্খলা ফেরাতে সহযোগিতা করছে?

সড়কে যে সংকট রয়েছে সেদিকে আমাদের আরো আগে থেকেই মনোযোগ দেয়া প্রয়োজন ছিল। দেশের গণপরিবহন ব্যবস্থা উচ্ছৃঙ্খল, কারণ আমরা ব্যবস্থাপনায় মনোযোগ দিতে পারিনি। বিষয়টি বরাবরই উপেক্ষিত থেকেছে। অতীতে সব নীতিনির্ধারকই অবকাঠামোর পেছনে ছুটেছে। এজন্য ভারী বিনিয়োগ রয়েছে। সড়ক ব্যবস্থাপনা যে এক ধরনের প্রকৌশলগত বিজ্ঞান সেটাতে আমরা গুরুত্ব দিতে পারিনি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই আসলে ব্যবস্থাপনারই একটি অংশ। এটি এখন শুরু হওয়া নানা কারণেই ইতিবাচক। বণিক বার্তারই এক প্রতিবেদনে আপনারা বলেছিলেন, সড়কের প্রতি চারটি বাসের মধ্যে একটিই আনফিট। অনেক যানের নম্বর প্লেট নেই। এগুলো অবৈধ যান। আবার অনেক ক্ষেত্রে একই নম্বর প্লেট একাধিক যানবাহনে থাকে এবং সেগুলো নির্বিঘ্নে চলাচল করছে। এই যে এক ধরনের বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সেখানে প্রথমে সড়কে নজরদারি প্রতিষ্ঠা জরুরি ছিল। সরকারের সাম্প্রতিক উদ্যোগের কারণে এরই মধ্যে যানবাহনের বড় একটি অংশ এআই লেন্সের মধ্যে চলে আসছে। তাই কিছুটা হলেও সড়কে শৃঙ্খলা মানার এক ধরনের সংস্কৃতি তৈরি হচ্ছে।

কিন্তু বিষয়টি এখানেই শেষ নয়। বিশ্বের অনেক দেশই এখন এ প্রযুক্তি ব্যবহার করে সফল হচ্ছে। তারা সফল হচ্ছে কারণ সড়ক ব্যবস্থাপনায় একটি গোটা ইকোসিস্টেম তারা গড়ে তুলতে পেরেছে। বিজ্ঞানসম্মতভাবে সেখানে সড়ক শৃঙ্খলা আছে। সব যানবাহনকে নিবন্ধনের আওতায় আনা হয়। এজন্যই এ পদ্ধতি সফলতা পেয়েছে। আমরা এআই দিয়ে শুরু করায় বড় ধরনের সুবিধা পাচ্ছি। কিন্তু শতভাগ সুফল পাওয়ার জন্য অবৈধ, ফিটনেসবিহীন, লক্কড়ঝক্কড় যানগুলোকে অবশ্যই সড়ক থেকে সরাতে হবে।

সরকার কিন্তু যানবাহনে জিপিএস প্রতিষ্ঠা বাধ্যতামূলক করেছে। আগস্ট থেকেই তা কার্যকর হয়েছে। তবে এখনো বাধ্যতামূলকভাবে প্রতিষ্ঠা করা গেছে কিনা এ বিষয়ে আমাদের ধারণাও নেই। আপনার পর্যবেক্ষণ কী এ বিষয়ে?

প্রত্যেক যানে জিপিএস বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্তটি মূলত যাত্রীদের নিরাপত্তা ও মনিটরিং জোরদার করার জন্য নেয়া হয়েছে। আমাদের গণপরিবহন ব্যবস্থার যে ঘনত্ব তা বিবেচনা করেই শৃঙ্খলায় নিয়ে আসা জরুরি। আর এজন্যই জিপিএস প্রযুক্তিটি উপকারী। আমরা জানি যে টার্মিনালগুলোতে বাস রাখা যাচ্ছে না। ঢাকার টার্মিনালগুলোতে ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি বাস রয়েছে। অনেক টার্মিনালকে অগোচরে ডিপো বানিয়ে ফেলা হচ্ছে। আর যেহেতু নির্ধারিত টার্মিনালে বাস রাখা হচ্ছে না, বরং অন্য কাজে ব্যবহার হচ্ছে তাই টার্মিনালের বাড়তি চাপ পার্শ্ববর্তী সড়কে পড়ছে। আশপাশের রাস্তায় চাপ তৈরি হচ্ছে। জিপিএস বসালে মনিটরিং করার সুবিধা বাড়বে। আবার কোনো যানের অবস্থান নির্ণয় করার ক্ষেত্রেও এটি কার্যকর। যানবাহন কোথায় থামছে বা কোথাও কোনো সমস্যায় পড়েছে কিনা তা দ্রুত বোঝা যাবে।

এখন এখানে শঙ্কার জায়গাটা অন্যখানে। এটিকে বাধ্যতামূলক করার পরও সব যানবাহন এ প্রযুক্তি ব্যবহার করেছে কিনা জানা জরুরি। এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে সংবাদমাধ্যম বা সরকারের তরফে আমরা কোনো তথ্য পাইনি। ফলে এটির সুফল নিয়ে এখনই আলোচনা করা একটু কঠিন। দেখা যেতে পারে যানবাহনকে জিপিএসের আওতায় আনা হলো। কিন্তু যেগুলোর ফিটনেস নেই সেগুলো আর বিআরটিএতে যাবে না। সেগুলোকে কীভাবে শনাক্ত করা হবে? এটার একটাই সমাধান। যেসব গাড়িতে জিপিএস থাকবে না সেগুলোর নিশ্চিত কোনো সমস্যা রয়েছে ধরে নিতে হবে। ট্র্যাকারের বাইরে থাকা যানগুলোকে আমরা স্ক্র্যাপ নীতিমালার আওতায় নিয়ে আসতে পারব। আমাদের এ উদ্যোগ আরো আগেই নেয়া উচিত ছিল।

আমরা অতীতে যাত্রী সুবিধার কথা ভেবে টিকিট পদ্ধতি চালু করেছিলাম। কিন্তু যাত্রী তো বটেই এমনকি পরিবহন খাতসংশ্লিষ্টদের তীব্র অসহযোগিতায় এটি ব্যর্থ হয়। তবে ভবিষ্যতে যদি এমন উদ্যোগ নিতে চাই তাহলে কোন দিকগুলোয় মনোযোগ দেয়া জরুরি?

ই-টিকিট চালু হওয়ার সময়ই আমি বলেছিলাম এটি সফল হবে না। এ খাতসংশ্লিষ্ট অনেকেরই এমন অনুমান ছিল। গণপরিবহন একটা গোটা ব্যবস্থা। শুধু ভালো বাসই গণপরিবহন নয়, এটা একটা ইকোসিস্টেম। যাত্রীরা নির্ধারিত স্থানে আরামদায়কভাবে অবস্থান করবেন। তাদের নিরাপত্তা থাকবে। পর্যাপ্ত টিকিট কাউন্টার থাকবে এবং যাত্রীরা নিয়মতান্ত্রিকভাবে পজ মেশিনের মাধ্যমে টিকিট নেবেন। কিন্তু এটা আমাদের মূল রোগ না। সমস্যাটা আমরা এখনো বুঝিনি। দেশের গণপরিবহন ব্যবস্থা ফ্র্যাগমেন্টেড মালিকানায় চলে। এখানে মালিকানা বিক্ষিপ্ত। একই রুটে বিভিন্ন ব্যানারের বাস চলে। আবার একই ব্যানারে একাধিক বাস মালিক। বলা যায়, বাস মালিক ও বাসের সংখ্যা একই। আবার যিনি ব্যানার মালিক তার নেই বাস। শুধু রুট পারমিট নিয়েছেন। এ ধরনের বিশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনায় ই-টিকিট কাজ করবে না। কারণ বিক্ষিপ্ত মালিকানায় পরিবহন ভাড়া নির্ধারিত হয় পরিবহন খাতের শ্রমিক, কমিটি আর চালকদের মাধ্যমে। ভাড়াটা তাদের মৌখিক চুক্তির ভিত্তিতে নির্ধারিত। একজন চালক মালিকের কাছে বাস ধার নেয় এবং সারা দিন শেষে একটা নির্ধারিত টাকা দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়। এমন অদ্ভুত ব্যবস্থা পৃথিবীর আর কোথাও নেই। এভাবে গণপরিবহন চলতে পারে না।

ই-টিকিটিং সফল করার জন্য ফ্র্যাঞ্জাইজি করতে হবে। চালকদের বেতন কাঠামোর আওতায় আনতে হবে। পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা দিতে হবে। এমনটা হলে সড়কে তারা অসুস্থ প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হবে না। এমন অবস্থায় ই-টিকিট জনপ্রিয় ও কার্যকর হবে। কারণ বাস একটা নিয়মের অধীনে সড়কে চলবে। ভাড়া নিয়েও কোনো অস্বচ্ছতা থাকবে না। এটা অনেক যাত্রীর জন্য সমস্যাও হতে পারে। কারণ এখন অনেকের স্টপেজের বাইরে কোনো না কোনো জায়গা থেকে ওঠার অভ্যাস গড়ে উঠেছে। ই-টিকিট হলে ভাড়া স্টপেজ টু স্টপেজ হবে। এসব বিষয় আছে। ভাড়ার বিষয়টা এখানে এত জটিল ও গুরুত্বপূর্ণ না। আসল বিষয় হলো আমরা বাস ফ্র্যাঞ্জাইজি গড়তে কতটা এগোতে পেরেছি। একটা রুটে একটা কোম্পানির বাস চলবে এবং বাসগুলো তখন দেখা যাবে যে স্টপেজেই থামবে। যাত্রীরাও স্টপেজ থেকে উঠবেন। তখন এটাকে আধুনিক ই-টিকিটিং সিস্টেমের মধ্যে আনা যাবে। কিন্তু অতীতে ই-টিকিটিংয়ের জন্য কোম্পানি ফার্ম না করে ব্যানারের অধীনেই এ ব্যবস্থা চালু করা হলো। এটার সফলতা অসম্ভব।

আধুনিক ই-টিকিটিং ব্যবস্থার প্রসঙ্গই যখন এল তখন সম্প্রতি বিআরটিসি নারীদের জন্য আলাদা একটি যাত্রীসেবা চালু করেছে। ‘পিংক বাস’ বলে অভিহিত এ যাত্রীসেবা দেশের তিন জেলায় ১৫টি বাস দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। এখানেও পজ মেশিনে টিকিট কাটার সুযোগ আছে। এ উদ্যোগের বিষয়ে আপনার মত কী?

যেমনটা আগেও বলেছি, ফ্র্যাঞ্জাইজি শক্তিশালী না করলে আসলে এ ধরনের বিশেষ উদ্যোগও কাজে আসবে না। বাংলাদেশের সড়কের প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে এ ধরনের উদ্যোগ নিশ্চয়ই প্রশংসার দাবি রাখে। তবে এটাও মনে রাখতে হবে, শুধু কোনো উদ্যোগ শুরু করলেই হয় না। একটা নিয়মবদ্ধ ব্যবস্থার মধ্যে আনতে হবে। তিনটি জেলায় মাত্র ১৫টি বাস দিয়ে এ ধরনের উদ্যোগের যে লক্ষ্য তা পূরণ হবে কিনা এ নিয়ে সন্দেহ আছে। বিআরটিসি থেকে বাস কখন স্টপেজে যাতায়াত করবে তার সময়সূচি দেয়া হয়নি। তারা শুধু দেখিয়েছে বিশাল একটা রুট কাভার করবে এ সার্ভিস। কিন্তু বিশাল রুট কাভার করা তো এ উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য নয়, বরং কর্মজীবী ও সড়কে নিরাপত্তার অভাবে থাকেন এমন নারীদের সহজ যাত্রা নিশ্চিত করাই এ উদ্যোগের উদ্দেশ্য। এজন্য এতগুলো রুটে বাস চালানোর প্রয়োজনই ছিল না। আপাতত অনেক ব্যস্ত রুটে এটি চালিয়ে আস্তে আস্তে নারী যাত্রীদের অভ্যস্ত করে তোলা জরুরি ছিল। আগেও বিশাল রুটে ই-টিকিটিং ব্যবস্থা করতে গিয়ে শেষে তা বন্ধ হয়েছে। ফ্র্যাঞ্জাইজি শক্তিশালী করা গেলে এমনটি হতো না। আপাতত আমরা এটি নিয়ে পর্যবেক্ষণ করতে পারি। তবে এরই মধ্যে উদ্যোগটি নিয়ে যাত্রী মহলেই অসন্তোষ আসছে। এগুলো দূর না হলে এ সার্ভিস জনপ্রিয়তা পাবে কিনা সন্দেহ আছে।

সড়কে ইজিবাইক ও বাইক দুর্ঘটনা একটা বড় সমস্যা। আমরা এখনো এটিকে কেন একটি শৃঙ্খলার আওতায় আনতে পারলাম না?

গণপরিবহন ব্যবস্থার মেরুদণ্ডই শক্তভাবে দাঁড় করানো যায়নি বলে এতগুলো জটিলতা হয়েছে। রাজধানীতে বা বড় শহরে যে পরিমাণ যাত্রী ও যাতায়াত চাহিদা তার অনুপাতে যানবাহন আসলেই কম। কম বলেই তো ফিটনেসবিহীন গাড়িও চলাচল করতে পারে। আর এ চাহিদা পূরণের জন্য অটোরিকশা, ইজিবাইক ও মোটরবাইক বিকল্প ট্যাক্সি সেবা হয়ে উঠেছে। এটা যাত্রীদের যাতায়াত সুবিধা বাড়িয়েছে। সমাজের বড় একটি অংশ এটি গ্রহণও করেছে। এদিকগুলো আমলে নিয়ে অটোরিকশাকে সড়ক থেকে সরাতে হলে বা মাত্রাতিরিক্ত সংখ্যাকে নামাতে হলে গণপরিবহন ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনতে হবে।

সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে হবে। ভালো মানের ও যাত্রীদের জন্য আরামদায়ক গণপরিবহন লাগবে। বাসের একটা শিডিউল থাকবে, ভাড়ার তালিকা ও ন্যায্যমূল্য নির্ধারিত থাকবে, যাত্রী ছাউনি এমন স্থানে করা হবে যাতে যাত্রীরাও আরামে সেখানে পৌঁছতে পারেন। নির্ধারিত স্টপেজ ও টিকিট কাউন্টার গড়তে হবে। এভাবে আধুনিক গণপরিবহন ব্যবস্থা তৈরি হলে অটোরিকশার ওপর আমাদের নির্ভরতা কমে আসবে। তখন অটোরিকশা এমনিতেই মূল সড়ক থেকে সরে যাবে। বাইক ও অটোরিকশা মূল সড়কে আসে, কারণ এখানে ট্রিপের লেন্থ বড়। তাই এক ট্রিপে আয় বেশি হয়। এজন্য তারা শাখা সড়ক এড়িয়ে মূল সড়কে আসছে। মূল সড়কে নেই গণপরিবহন। এজন্য অটোরিকশার ওপর আমাদের নির্ভরশীলতা বাড়ছে। এটাকে অস্বীকারের সুযোগও নেই। আবার গণপরিবহনের ঘাটতির বিষয়ে সরকারকে কঠোর মনোযোগ দিতে হবে। ২০ বছর ধরেই আমরা এ নিয়ে আলোচনা করছি। আর এখন আমাদের আলোচনার প্রসঙ্গ হলো দেশে মূল সড়কের সংখ্যা বেশি নয়। এজন্য সরকারের পক্ষে হাজার কোটি টাকা অর্থায়ন করে উন্নত মূল সড়ক তৈরি করা কঠিন নয়। ফিটনেসবিহীন যানের সীমাবদ্ধতার কারণেই তারা আনুমানিক ২৫-৩০ শতাংশ যাত্রী পরিবহন করতে পারে। উন্নত গণপরিবহন ব্যবস্থা হলে অন্তত ৬০ শতাংশ যাত্রী আমরা পরিবহন করতে পারব। আর তখন অটোরিকশা এমনিতেই মূল সড়ক থেকে শাখা সড়কে চলে যাবে।

সরকার অটোরিকশার জন্য নীতিমালা তৈরি করেছে। এটি দ্রুত নির্ধারণ করে প্রজ্ঞাপন জারি করা জরুরি। এর আলোকে সড়কে যে অটোরিকশা চলবে সেগুলোর সংস্করণ, সংখ্যা ও নিবন্ধনের আওতায় থাকা চালকদের লাইসেন্সিংয়ের আওতায় আনা যাবে। এগুলো নির্ধারণ করার জন্যই আসলে কৌশলী হতে হবে। অন্তত শাখা সড়কে নিয়ন্ত্রণ তৈরির জন্য। অর্থাৎ সরকারকে কৌশলী হয়ে প্রথমে মূল সড়ক থেকে সরাতে হবে। শাখা সড়কে তাদের নিয়ন্ত্রণ করা দরকার। মূল সড়ক থেকে সরানোর জন্য গণপরিবহন, আর শাখা সড়কে তাদের নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য নীতিমালা সমন্বিত হতে হবে। এখন যেহেতু কোনো নিয়মনীতির তোয়াক্কা নেই তাই ক্যান্সারের মতো শহরে অটোরিকশা বাড়ছে।

বাংলাদেশে গণপরিবহনের অনেকগুলো সম্ভাবনা আছে। এজন্য শহরের জলাশয়কে পুনরুজ্জীবিত করেও যাতায়াত পথ করা যায়। আবার রেল একটি সাশ্রয়ী ব্যবস্থা। তবে আমাদের মনোযোগ মেট্রো বা মনোরেলেই আটকে আছে। আমরা কেন স্বল্প ব্যয়ের এ টেকসই পরিকল্পনার দিকে এগোতে পারিনি?

ঢাকা অনেক ব্যস্ত এক শহর। অপরিকল্পিত এক নগরী আর জনসংখ্যার ঘনত্ব অনেক বেশি। এখন ঢাকাকে কেন্দ্র করে যদি আরবান ট্রান্সপোর্ট গড়তে চান তাহলে প্রচলিত রেল দিয়ে নেটওয়ার্ক গড়া যাবে না। আবার অধিকাংশ জলাশয় ও বিল দখল হয়ে যাওয়ার কারণে আমরা এটিকে মূলধারায় নিয়ে আসতে পারব এমন নয়। তবে জলাশয়গুলো উদ্ধার করে একটি সমন্বিত ব্যবস্থায় নিতে পারলে এর সুবিধাভোগী আমাদের পক্ষে হওয়া সম্ভব। এজন্য মেট্রোরেল বা মনোরেল একটি ভালো উদ্যোগ। তবে সেগুলো অবশ্যই অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ রেখেই আমাদের বাস্তবায়ন করতে হবে।

ধাপে ধাপে দেশের গণপরিবহন ব্যবস্থাকে সমৃদ্ধ করার কাজ করতে হবে। গণপরিবহনে মেরুদণ্ড শক্তিশালী করার কাজটি এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। মেট্রো বা মনোরেলের সুবিধাগুলোও আমরা কাজে লাগাতে পারি। যেসব সড়কে বাস প্রবেশ করতে পারে না, সেখানে মনোরেল ফিডার কানেক্টিভিটি তৈরি করতে পারে। গণপরিবহনের অনেকগুলো সংস্করণ দিয়েই এ নেটওয়ার্ক তৈরি করতে হবে। এ মেলবন্ধন করে আমরা প্রথাগত রেললাইন অর্থাৎ কমিউটার রেলকে কাজে লাগাতে পারব। মানে যেসব জায়গায় মেট্রোরেল আমাদের দরকার নেই যেমন কমলাপুর ও বিমানবন্দরের আশপাশের শহরতলি এলাকাগুলো সংযুক্ত করতে। এভাবে শহরের আরবান ট্রান্সপোর্টের সঙ্গে শহরতলি এলাকার সংযোগ তৈরি হবে। এটি বিকেন্দ্রীকরণের বড় সুযোগ তৈরি করবে।

ওভারলোডিং আমাদের সড়কে দুর্ঘটনার প্রধান কারণ। বিশেষত ধর্মীয় উৎসবের মৌসুমে দুর্ঘটনা বেশি ঘটে। সড়কে ওভারলোডিং কমাতে আমাদের কী উদ্যোগ নেয়া দরকার?

দেশে সড়কের দুর্ঘটনার তিনটি কারণ রয়েছে। এটিকে আমরা বলি তিন ‘ও’। অর্থাৎ ওভারলোডিং, ওভারস্পিডিং ও ওভারটেকিং। ভারী যানবাহনের কারণেই মূলত ওভারলোডিং হয়। প্রতিনিয়ত ভারী যানবাহন দুর্ঘটনার কবলে পড়ে। এক্সেল ভেঙে রাস্তায় বসে আছে। তাতে হচ্ছে যানজট। অন্য পরিবহনের জন্যও এগুলো ঝুঁকি। এটা ঠেকানোর জন্য এখনই আমাদের সেতুতে ভারী যান ওঠার আগে ওয়েব্রিজে ওজন স্কেল বসিয়ে মাপা হয়। এটি কার্যকর হবে না। ওয়ে স্কেলে মালিকরা সচরাচর যেতে চান না। এমনটিতে আসতে বাধ্য করলে পরিবহন খাতে ধর্মঘটসহ অনেক ধরনের ঘটনা অতীতে ঘটতে দেখেছি।

এ সমস্যার সমাধানে আমাদের প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ আছে। গাড়ি না থামিয়ে স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার দিকে আমরা যেতে পারি। ওয়ে ইন মোশন শব্দটা আমি ব্যবহার করছি। ভারী যানবাহন রাস্তা দিয়ে চলতে চলতেই রাস্তার পাশে ডিভাইস থাকবে। সেটি ওই যানের নম্বর, লোডের ক্যাপাসিটি এবং কতটুকু লোড নিছে সব বের করে ফেলবে।

এভাবে সড়কে সময় অপচয় কমবে, আবার মামলা দেয়ার নাম করে অবৈধ পথে অর্থ আদায়ের সুযোগও কমবে। স্বয়ংক্রিয় হলে সবকিছু সার্ভারে আসবে। আর রিয়েল টাইম ডেটার ভিত্তিতে জরিমানা ও মামলা নির্ধারণ হবে।

একটা স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থাপনায় যেতে হবে। কারণ হচ্ছে যারা এ ধরনের যানবাহন চালান তাদের অ্যাসোসিয়েশন, পরিবহন মালিক-শ্রমিক সমিতি অনেক শক্তিশালী। সড়কে থামিয়ে মামলা দেয়াটা অনেক সময় প্রশাসনের জন্য কঠিন হয়। এ কালচার থেকে বের হওয়ার জন্য এটা স্বয়ংক্রিয় করাটা অনেক জরুরি বলে আমি মনে করি।