নতুন বাজেট নিয়ে অন্যান্য সময়ের মতোই বহু আলোচনা, বিশ্লেষণ ও সংলাপ হয়েছে। কিন্তু শিরোনামের তিনটি বিষয়ের প্রত্যেকটির যে স্বতন্ত্র মনোযোগ পাওয়া দরকার ছিল, সেটা দেখা যায়নি।
প্রথমেই উল্লেখ্য যে অর্থনৈতিক দর্শন ও তার বাস্তব প্রতিফলন শুধু এক বছরের সময়সীমায় সম্পন্ন হয়ে যাবে, এমনটা না ঘটাই স্বাভাবিক, বরং মধ্যমেয়াদে এর বিস্তৃতি কাম্য ও প্রত্যাশিত। এ অর্থনৈতিক দর্শনের সঙ্গে রাজনৈতিক প্রক্রিয়া, মধ্যমেয়াদের উন্নয়ন কৌশলের সাযুজ্য কাম্য হবে। কীভাবে অর্থনীতির রূপান্তর ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির কৌশলের সঙ্গে গণতান্ত্রিক মুনাফা, মানবিকতা সমৃদ্ধ খাতভিত্তিক উন্নয়ন ইত্যাদি পরস্পরের সম্পূরক হতে পারে, সেই পথ চিহ্নিত করার জন্য এসব ধারণা নিয়ে আরো আলোচনা ও বিশ্লেষণ অব্যাহত থাকা দরকার।
এ বিষয়গুলো বাজেট প্রস্তাবে বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করা হয়নি। কীভাবে সেগুলো প্রস্তাবিত পদক্ষেপগুলোয় প্রতিফলিত সেটা আরো ভালোভাবে তুলে ধরার জন্য এ নিবন্ধ। বাজেট বিশ্লেষণের যে প্রচলিত ধারা, সেই ধারায় অনেক আলোচনাই হয়েছে এবারের বাজেট নিয়ে। সেখানে এসেছে অতি আশাবাদী লক্ষ্যমাত্রা, রাজস্ব আহরণ লক্ষ্য, বিনিয়োগ সম্ভাবনার বিশ্লেষণ, মূল্যস্ফীতি ও ঘাটতি বাজেটের চক্র ইত্যাদি। কিন্তু উন্নয়ন দর্শন মাফিক যে প্রত্যাশা জাগ্রত হয়েছে সেটা কীভাবে পূরণ হতে পারে সেদিকে তেমন মনোযোগ দেয়া হয়নি। সেটা খাতভিত্তিক ব্যয় দিয়ে সরাসরি ঘটবে না, বরং সেই ব্যয় কীভাবে কার্যে পরিণত হবে তার সঙ্গে জড়িত।
প্রথমে বাজেটের শিরোনামের তিনটি বিষয়ের মর্ম অনুধাবন দরকার। বিশেষত গতান্ত্রিক অর্থনীতি বা অর্থনীতির গণতন্ত্রায়ন একটি নতুন ধারার সূচনার ইঙ্গিত দেয়। সেই সঙ্গে মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির অঙ্গীকার। পরের দুটিকে প্রথমটির কৌশল হিসেবে না দেখে পৃথক লক্ষ্য বা দর্শন হিসেবে দেখাটাই সমীচীন। গণতান্ত্রিক অর্থনীতি কী, তার উপকরণ বা প্রক্রিয়া নিয়ে অর্থনীতির প্রধান তাত্ত্বিকদের মধ্যেও দ্বন্দ্ব ও বিতর্ক রয়েছে। সংক্ষেপে বললে এটা রাজনীতিতে গণতন্ত্রের সমান্তরাল ধারা। গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে জনগণের মতামতের প্রতিফলন থাকতে হয়; সরকারের নীতি কৌশল ও অবস্থানের পক্ষে-বিপক্ষে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকে, যা নীতি কৌশল প্রণয়নে সহায়তা করে। সেভাবেই অর্থনীতির গণতন্ত্রায়ন অর্থনৈতিক কাজে, তা শিল্প, কৃষি বা অন্য খাতে, রাষ্ট্রের দ্বারা পরিচালিত হোক বা বেসরকারি খাতে জড়িত সব পক্ষের মতামত নিতে হবে এবং কার্যকর করতে হবে। এভাবে এগিয়ে গেলে অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি থেকে সব পক্ষই সুফল পাবে, ন্যায্যতা নিশ্চিত হবে আর গণতন্ত্রের মুনাফা যোগ হবে।
মানবিক অর্থনীতির বিষয়টি বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। একদিকে এটা সীমিতভাবে দেখা যায়, যেখানে অর্থনীতির উন্নয়ন ও মানবিক সুসম্পর্ক ও সম্প্রীতি একসঙ্গে ঘটবে। বৃহত্তর ও সম্প্রসারিত অর্থে সেটা মানব উন্নয়নের ধারণা (ইউএনডিপি প্রচলিত) হিসেবে দেখা যায়, যেখানে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আয়, জীবনমান সবদিকের সমন্বিত উন্নয়ন হতে হবে।
অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি বা অর্থনীতি প্রসঙ্গটি মূলত আন্তর্জাতিক সংস্থার (এডিবি, বিশ্বব্যাংক) আলোচনায় প্রাধান্য পেয়েছে একসময়। সেখানে প্রবৃদ্ধির সঙ্গে কর্মসংস্থানের প্রসার আবশ্যক মনে করা হয়েছে। অনেক অর্থনীতিবিদ এখানে বৈষম্য হ্রাস অন্তর্ভুক্ত করতে চেয়েছেন, যা সবসময় আমলে নেয়া হয়নি। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের উন্নয়ন দর্শন হিসেবে এ তিন লক্ষ্য অন্তর্ভুক্ত করার পরও তাই বৈষম্য হ্রাস মনোযোগ পাবে কিনা নিশ্চিত হওয়া যায় না। যদিও বাজেট বক্তৃতা খুঁটিয়ে পড়লে সেখানে ন্যায্যতা ও বৈষম্য হ্রাস শব্দগুচ্ছ পাওয়া যায়।
এবার আসা যাক খাতভিত্তিক ব্যয় বণ্টন ও কার্যক্রমের প্রস্তাবগুলো কীভাবে এ তিন লক্ষ্যের সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ করা যায় সেই আলোচনায়। বাজেটের মানবিক দিক সবচেয়ে সুস্পষ্ট, সেটা প্রথম উল্লেখ করা যাক। মানবিক দিক থেকে বাজেটের যে অগ্রাধিকার, বিশেষত শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে, তা যৌক্তিক। এছাড়া আছে সামাজিক নিরাপত্তাবলয় সম্প্রসারণ। ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষি কার্ড এখানে ইতিবাচক সংযোজন। তবে সবাই যা বলে থাকেন, এগুলো স্বচ্ছতার সঙ্গে বাস্তবায়ন করা দরকার। বাস্তবায়ন প্রসঙ্গে শেষে আবার মন্তব্য থাকছে। এ বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি তৈরিতেও অবদান রাখতে পারে।
মানবিক দিকের অন্যান্য নতুন সংযোজনের মধ্যে রয়েছে ক্রীড়া ও সংস্কৃতির প্রসারের জন্য বরাদ্দ ও বিভিন্ন কর হ্রাসের মাধ্যমে উৎসাহ প্রদান। সৃজনশীল কাজের সঙ্গে অর্থনীতির সম্পর্ক স্থাপন নতুন ধারার সূচনা করতে পারে। এ বিষয়গুলোর সঙ্গে পরিবার, স্কুল ও শিক্ষকদের একাত্ম করতে পারলে মানবিক গুণের পূর্ণ বিকাশ সহজতর হবে। উপরোক্ত অগ্রাধিকারগুলো অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি গড়ার জন্য দক্ষতা ও মানবপুঁজি সৃষ্টিতে অবদান রাখতে পারবে। তবে শিক্ষা-স্বাস্থ্য খাতে শুধু বরাদ্দ বাড়ানো যথেষ্ট নয়, সে অর্থ যেন শিক্ষার অর্জন বৃদ্ধিতে সহায়ক হয় তার উপযুক্ত কার্যক্রমে ব্যয় করতে হবে। শিক্ষার মান বৃদ্ধির বিষয়টি বেশ জটিল, এ স্বল্প পরিসরে যে আলোচনা সম্ভব নয়।
অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির প্রধান কৌশল হচ্ছে দ্রুত কর্মসংস্থান বাড়ানো। এ বাজেটে নানাভাবে এদিকে মনোযোগ দেয়া হয়েছে। নতুন কিছু শ্রমনিবিড় খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর পরিকল্পনা আছে। তরুণরা উৎসাহিত হবে এমন কিছু উপখাতে কর ছাড়সহ বেশকিছু সুবিধা দেয়া হয়েছে। যেমন ফ্রিল্যান্সিং। সৃজনশীল খাত, স্টার্ট আপ, স্থানীয় দক্ষতানির্ভর কাজ ইত্যাদি উৎসাহিত করা হয়েছে। কিন্তু শুধু করবিষয়ক সুবিধা বা ঋণ এসব খাতে নতুন তরুণ উদ্যোক্তা তৈরির জন্য যথেষ্ট নয়। বাজারে সংযোগ এবং চাহিদার লক্ষকৃত প্রশিক্ষণ ও অন্যান্য অবকাঠামো সুবিধা যথাযথ হতে হবে।
এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জের কার্যকর ভূমিকা গড়ে তোলার প্রস্তাব আছে। তবে শিক্ষিত বেকারত্বের বড় কারণ তরুণ শিক্ষিত জনগোষ্ঠীকে নিয়োগ দেয়ার মতো চাহিদার অভাব রয়েছে। কর্মসংস্থান দ্রুত বাড়লে তথ্যের অভাব দূর করার ব্যবস্থা তখন নানাভাবে হয়েই যাবে। আর কর্মসংস্থানের জন্য বিনিয়োগ উৎসাহিত করার আয়োজন বাজেটে নানা দিক থেকে আছে। তার পরও নতুন উদ্যোক্তাদের বড় বিনিয়োগ আনতে হলে জ্বালানি নিশ্চয়তা, আইন-শৃঙ্খলার উন্নয়ন দৃশ্যমান হতে হবে। সব মিলিয়ে বলা যায়, অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির কিছু রূপরেখা আছে, যদিও সে পথ তত মসৃণ নয়।
অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নে বর্তমান বাংলাদেশে বৈষম্য হ্রাসকে সামনে আনতে হবে, যেটা বাজেটে তেমনভাবে জোর দেয়া হয়নি। কর্মসংস্থানের অভাব এবং বৈষম্য বৃদ্ধির জের ধরেই হয়েছিল চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান। কাজেই যা কিছু কার্যক্রম নতুন কর্মসংস্থানের জন্য, সেখানে আঞ্চলিক সমতা, গ্রাম-শহরের সমতার আয়োজন লক্ষণীয় হতে হবে। গত কয়েক বছরে শ্রমবাজারে নারীর অবস্থানে অবনতি ঘটেছে। কাজেই নারী-পুরুষ সমতার দিকে জোর দিতে হবে। গণতান্ত্রিক অর্থনীতিতে ওপরের সব উপকরণই অবদান রাখবে। কিন্তু সেগুলো যথেষ্ট নয়। সেখানে সব শ্রেণী-পেশা-বয়স ও অঞ্চলের মানুষের সুবিধা-অসুবিধা বিষয়ে মতের প্রতিফলন থাকতে হবে। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের সদিচ্ছা থাকলে সরকারি কার্যক্রমের মাধ্যমে সেটি সম্ভব।
অর্থনীতিতে গণতান্ত্রিক পর্যায় আনতে গেলে ব্যক্তি খাতের উদ্যোক্তাদের সেই চর্চায় উৎসাহিত করতে হবে। সেটা একদিকে সরকারি ব্যয়ের ক্ষেত্রে উদাহরণ সৃষ্টির মাধ্যমে হবে। অন্যদিকে বড় উদ্যোক্তাদের অংশীদারত্ব উৎসাহিত করার মাধ্যমেও এগোবে। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের এক্ষেত্রে ভূমিকা থাকবে। কৃষির ক্ষেত্রে ছোট উদাহরণের সাহায্যে এটা তুলে ধরা যায়। কৃষিতে অতি ক্ষুদ্র ও ক্ষুদ্র জমির মালিক যারা, ভবিষ্যতের কৃষি উন্নয়নে তাদের ভূমিকাকে গুরুত্ব দিয়ে নীতি গ্রহণ করতে হবে সরকারকে। সেখানে কী ফসল চাষ বাড়াতে হবে, কোন প্রযুক্তি উৎসাহিত করতে হবে, কারা কীভাবে বিপণনে যুক্ত হবে সেসব প্রশ্নে ক্ষুদ্র কৃষকদের স্বার্থকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিতে হবে।
আসলে অর্থনীতিতে গণতন্ত্র এক ধরনের সংস্কৃতি, যেটা রাজনীতিতে গণতন্ত্রের মতোই ছেদহীনভাবে চর্চার বিষয়। সেটা শুরু হতে পারে বাজেটে যেসব পদক্ষেপের আয়োজন করা হয়েছে, সেখানে বিভিন্ন অঞ্চলের, বিভিন্ন গোষ্ঠীর জনগণের চাওয়ার সঙ্গে সযত্নে মেলবন্ধন ঘটিয়ে। সেজন্য প্রয়োজন হবে সূক্ষ্ম কিছু পরিমার্জন ও গুরুত্বের সঙ্গে বাস্তবায়ন। পাশাপাশি থাকতে হবে বাস্তবায়নকারীদের জবাবদিহি ও কার্যক্রমের স্বচ্ছতা। শুরু থেকেই পরিবীক্ষণ দরকার হবে, শুধু উন্নয়ন কার্যক্রমের ব্যয় সময়মতো হচ্ছে কিনা তা নয়, বরং বাজেটের যে দর্শন সেই পথে অগ্রগতি হচ্ছে কিনা তা যাচাই প্রয়োজন। গণতান্ত্রিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি বাজেটের এক বছরের সময়সীমার মধ্যেই অর্জিত হবে, সেটা অবাস্তব আশা; কিন্তু দৃশ্যমান কিছু অগ্রগতির প্রতীক্ষা থাকবে।
রুশিদান ইসলাম রহমান: অর্থনীতিবিদ ও বিআইডিএসের সাবেক গবেষণা পরিচালক










