ঢাকায় ছয়টি মেট্রোরেলের লাইন নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে ঢাকার প্রথম মেট্রোলাইন-৬-এর উত্তরা-মতিঝিল অংশ চালু হয়েছে। মতিঝিল-কমলাপুর পর্যন্ত অংশের কাজ চলছে। এ মেট্রোরেল লাইন নির্মাণে প্রতি কিলোমিটারে দেড় হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। যদিও এ ব্যয় ভারতসহ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক বেশি। ঢাকায় বর্তমানে আরো দুটি মেট্রোরেল নির্মাণ প্রকল্প চলমান। বাস্তবায়নাধীন দুটি মেট্রোরেল হচ্ছে এমআরটি লাইন-১ (কমলাপুর থেকে বিমানবন্দর ও কুড়িল থেকে পূর্বাচল) এবং এমআরটি লাইন-৫ (সাভারের হেমায়েতপুর থেকে গাবতলী, মিরপুর, গুলশান হয়ে ভাটারা)। ঢাকার নতুন দুটি মেট্রোরেল প্রকল্প নির্মাণে সরকারের প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে মোট ৯৩ হাজার ৭৯৯ কোটি টাকা। মেট্রোরেল লাইন দুটির বিভিন্ন প্যাকেজে ঠিকাদারের দেয়া দর পাওয়ার পর সম্ভাব্য ব্যয় নিয়ে বিশ্লেষণ করে ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল)। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোর দরপত্র বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, মেট্রোরেল দুটি নির্মাণে ব্যয় দাঁড়াতে পারে প্রায় ২ লাখ কোটি টাকা, যা সরকারের প্রাক্কলনের প্রায় দ্বিগুণ। প্রতি কিলোমিটার নির্মাণ ব্যয় দাঁড়াতে পারে ৩ হাজার কোটি টাকারও বেশি। এ নির্মাণ ব্যয় শুধু অস্বাভাবিকই নয় বরং বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাস্তবায়িত মেট্রোরেলের নির্মাণ ব্যয়ের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি।
এ ব্যয়বৃদ্ধির পেছনে অন্যতম প্রধান কারণ ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান জাপানের উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা জাইকার বেঁধে দেয়া বিভিন্ন শর্ত ও কম প্রতিযোগিতা। বেঁধে দেয়া শর্তের কারণে কেবল জাপানি প্রতিষ্ঠান কিংবা জয়েন্ট ভেঞ্চারই দরপত্রে অংশ নিতে পারছে। শুধু তাই নয়, দর প্রস্তাব বেশি হলে তা কমানোর জন্য দ্বিতীয়বার দরপত্র আহ্বানেরও সুযোগ রাখা হয়নি। দরপত্রে প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশের অনুপস্থিত থাকায় প্রকল্পে নির্মাণ ব্যয় অস্বাভাবিক বাড়িয়ে দিচ্ছে। ফলে প্রতিযোগিতার অনুপস্থিতি প্রকল্পের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়েও দেখা দিয়েছে প্রশ্ন। প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে দরপত্র প্রক্রিয়া প্রতিযোগিতামূলক করার বিকল্প নেই।
বাস্তবায়নাধীন দুটি মেট্রোরেলই পাতাল ও উড়ালপথের সমন্বয়ে বাস্তবায়ন করা হবে। দুটি মেট্রোরেলই পরামর্শক হিসেবে জাপানের প্রতিষ্ঠানগুলোই ছিল। নির্মাণ ব্যয় তারাই প্রাক্কলন করে দিয়েছে। দরপত্রও জাইকাসহ জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলো প্রস্তুত করে দিয়েছে। এখন দরপত্র আহ্বানের পর জাপানি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান যদি প্রাক্কলনের দ্বিগুণ দর প্রস্তাব করে, সেটি গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
জাইকা স্বল্পসুদ ও দীর্ঘ গ্রেস পিরিয়ডের সুযোগ দিয়ে ঋণ দিলেও দরপত্রে বিভিন্ন শর্ত জুড়ে দিয়ে বাংলাদেশের জন্য পরিস্থিতিকে প্রতিকূল করে তুলেছে। উচ্চ ব্যয়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন শুধু দেশের জন্য বিপজ্জনকই হবে না বরং তা শেষ পর্যন্ত দেশের ওপর অর্থনৈতিক চাপও তৈরি করবে। ব্যয় কমাতে ও প্রতিযোগিতামূলক করতে সরকার এরই মধ্যে জাইকার সঙ্গে দরকষাকষি করছে। জাইকা যদি দরপত্রের শর্ত সহজ না করে এবং দরপত্রগুলো প্রতিযোগিতামূলক না হতে দেয়, তাহলে এ ধরনের প্রকল্প গ্রহণ না করাই উত্তম। তাদের বদলে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও বিশ্বব্যাংকসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের ঋণ নিয়ে প্রকল্প করা উচিত।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সাম্প্রতিককালে নির্মিত মেট্রোরেলের কিলোমিটারপ্রতি নির্মাণ ব্যয়ের একটি বিশ্লেষণ করেছে ডিএমটিসিএল। তাতে দেখা যায়, অন্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে খরচ অনেক বেশি পড়ছে। অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে প্রতি কিলোমিটার মেট্রোর নির্মাণ ব্যয় ১ হাজার ৭৪৭ কোটি টাকা, তুরস্কে ৬৭২ কোটি, আইভরিকোস্টে ৪৪৮ কোটি, দক্ষিণ কোরিয়ার সিউলে ৭৮৪ কোটি, থাইল্যান্ডের ব্যাংককে ৭৪০ কোটি, ভিয়েতনামের হো চি মিন সিটিতে ১ হাজার ৫৫২ কোটি টাকা। ভারতের পাটনার মেট্রোরেলের দৈর্ঘ্য আট কিলোমিটারের বেশি। পুরোটাই পাতালপথে। এ কাজের জন্য ঠিকাদার নিয়োগ দেয়া হয়েছে প্রতি কিলোমিটারে প্রায় ৪৫০ কোটি টাকায়। পাটনার এ মেট্রোরেল লাইনটি নির্মাণেও অর্থায়ন করছে জাইকা। পার্থক্য হলো সেখানে কাজের মূল ঠিকাদার সব ভারতীয়। প্রতিবেশী দেশ ভারতও বিদেশী ঋণে প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে তারা ঋণে এমন কোনো শর্ত মানে না, যা ঠিকাদার নিয়োগের প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশকে নষ্ট করে। এক্ষেত্রে ভারতের মতো নীতি আমরাও অনুসরণ করতে পারি।
বেশি ব্যয়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোয় বহুমুখী সমস্যা সৃষ্টি করে। প্রকল্পে অতিরিক্ত ব্যয়ের কারণে সরকারকে অধিক ঋণ গ্রহণ করতে হয়। এতে দেশের মোট ঋণের পরিমাণ বাড়ে। দীর্ঘমেয়াদে দেশের আর্থিক স্থিতিশীলতা হুমকির মুখে পড়ে। একদিকে প্রকল্প ব্যয়ে অস্বাভাবিক বৃদ্ধি ঘটলে অন্যদিকে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি কিংবা সামাজিক সুরক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোয় বরাদ্দ কমে যায়, যা সামগ্রিক উন্নয়নকে ব্যাহত করে। এছাড়া অতিরিক্ত ব্যয়ের কারণে প্রকল্পের কাজ ধীরগতিতে এগোয়, সময়সীমা পেরিয়ে যাওয়ায় আরো ব্যয় বাড়ে, যা একটি চক্রে পরিণত হয়।
সরকার ব্যয় কমাতে ও প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র প্রক্রিয়ার ওপর জোর দিয়ে জাইকার সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছে। নিশ্চয়ই এ প্রয়াস ইতিবাচক অগ্রগতি। প্রকল্প ব্যয়ের স্বচ্ছতা, আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে সাশ্রয়ী নির্মাণ ব্যয় এবং স্থানীয় ও বৈশ্বিক মানসম্পন্ন ঠিকাদারদের অংশগ্রহণ নিশ্চিতে দরপত্রের শর্ত সহজ করাও জরুরি। প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে যেন অযৌক্তিক ব্যয় বৃদ্ধি না হয়, তা নিশ্চিত করাই সরকারের মূল দায়িত্ব। জাইকা হোক বা অন্য যেকোনো ঋণদাতা সংস্থা—বাংলাদেশকে অবশ্যই তার সার্বভৌম অর্থনৈতিক স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র ও প্রকল্পের ব্যয় কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে রাজধানীবাসীর জন্য একটি আধুনিক, টেকসই ও সাশ্রয়ী গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।










