২০২৩ সালে বাংলাদেশের ইতিহাসে রেকর্ড সর্বোচ্চ প্রায় সাড়ে তিন লাখ মানুষ ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়। একই সময়ে প্রায় দুই হাজার জন মারা যায় বলে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) তথ্যে উল্লেখ পাওয়া যায়। পরের দুই বছর এ সংখ্যা ঊর্ধ্বমুখীই ছিল। এদিকে চলতি বছরও ডেঙ্গুর প্রকোপ প্রকট হচ্ছে। গত শনিবার সকাল ৮টা থেকে গতকাল সকাল ৮টা পর্যন্ত চলতি বছরে রেকর্ড ১০৯৭ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে এবং তিনজন মারা গেছে বলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যে বলা হয়েছে। এ পরিসংখ্যান দেখে এটিই প্রতীয়মান হয় যে এবারো ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে দায়িত্বপ্রাপ্তরা কোনো কার্যকর উদ্যোগ নিতে পারেননি। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে যে ডেঙ্গুর বিস্তার ঠেকাতে রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশনসহ সারা দেশে সর্বাত্মক চেষ্টা চলছে। কিন্তু ডেঙ্গুর মতো বিস্তারের ঝুঁকি অনুমান করা যায় এমন রোগের বিস্তার যখন বেড়ে চলে তা অকার্যকর চেষ্টাকেই নির্দেশ করে।

দেশে বর্ষা মৌসুমে মূলত ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়তে শুরু করে, যা শীত মৌসুম আসার আগ পর্যন্ত চলমান থাকে। শীতে ধীরে ধীরে কমতে থাকে। অর্থাৎ জুলাই, আগস্ট, সেপ্টেম্বর, অক্টোবর ও নভেম্বরের শুরুর দিকেও ডেঙ্গুর সংক্রমণ প্রকট থাকে। অন্যদিকে ডেঙ্গু পরিস্থিতি বোঝা ও মোকাবেলার জন্য প্রতি বছর প্রাক-বর্ষা জরিপ পরিচালনা করা হয়। এ জরিপের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে মশার প্রজনন উৎস হিসেবে সিমেন্টের পানির ট্যাংক সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ, ২২ শতাংশ। দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে মেঝেতে জমে থাকা পানি। অন্যান্য প্রজনন উৎসের মধ্যে রয়েছে প্লাস্টিকের ড্রাম, ওয়াটার মিটার চেম্বার, প্লাস্টিকের বালতি, ফুলের টব ও ট্রে, প্লাস্টিকের পাইপের গর্ত, পরিত্যক্ত টায়ার, বাড়ির ভেতরের পানির চ্যানেল ইত্যাদি। আর এডিস মশার লার্ভার সবচেয়ে বেশি ঘনত্ব পাওয়া গেছে বহুতল ভবনগুলোয়, যার হার ৫৮ দশমিক ৮৮ শতাংশ। এর অর্থ হলো, ডেঙ্গুর বিস্তার কখন এবং কোত্থেকে হতে পারে সেগুলোর একটা স্পষ্ট ধারণা কর্তৃপক্ষের রয়েছে।

আবার ডেঙ্গু ছড়ায় এডিস মশা থেকে। তাই এ মশার লার্ভা নির্মূল করে ডেঙ্গু প্রতিরোধ করা সম্ভব বলে কীটতত্ত্ববিদরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন। কিন্তু এর পরও যখন ডেঙ্গুর প্রকোপ বেড়ে যায় তখন বলতেই হয় যে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের এদিকে বিশেষ মনোযোগ নেই। কেবল ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে গেলে সব সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয় সর্বাত্মক চেষ্টা চালানোর। কিন্তু বাস্তবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, যার আশঙ্কা এবারো করা হচ্ছে।

অন্যদিকে বিশ্বের বহু দেশ ডেঙ্গু প্রতিরোধে সফলতার নজির রেখেছে। এমনকি বড় কোনো প্রযুক্তি ব্যবহার না করে কেবল কমিউনিটি বা ক্লাস্টারভিত্তিক পদ্ধতি, র‍্যাপিড অ্যাকশন টিম গঠন, জনগণকে সম্পৃক্ত করে এটি সম্ভব হয়েছে। যেমন সিঙ্গাপুরে একটি নির্দিষ্ট এলাকার মধ্যে দুজন বা তার অধিক ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী পাওয়া গেলেই সেটাকে ডেঙ্গু ক্লাস্টার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এরপর দ্রুত সেখানে এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করার উদ্যোগ নেয়া হয়। পাশাপাশি স্থানীয় জনগণকে সতর্ক করা হয়। এছাড়া সিঙ্গাপুরে নির্মাণকাজের সময় কন্ট্রাক্টরদের পেস্ট কন্ট্রোল অফিসার ও পরিচ্ছন্নতা কর্মী নিয়োগ দেয়া বাধ্যতামূলক, যাদের অন্যতম কাজ পানি যেন না জমে সেটি নিশ্চিত করা। এদিকে এক প্রাক-বর্ষা জরিপের তথ্যে মশার প্রজননের ঝুঁকিপূর্ণ উৎসগুলো উল্লেখ করার পরও সেগুলো তদারক করার মতো কোনো কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায় না; কিছু প্রচলিত উদ্যোগ ছাড়া। যেমন ফগিং মেশিনের ব্যবহার। অথচ কেবল ফগিং মেশিনের মাধ্যমে কীটনাশক ছিটিয়ে এডিস মশা বা ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। এমনকি সঠিক ও নিয়মিতভাবে কীটনাশক প্রয়োগ না করারও অভিযোগ রয়েছে। এর বাইরে রয়েছে অপরিকল্পিত নগরায়ণ, পানি নিষ্কাশন সমস্যা ও আবহাওয়ার প্রভাবে মশার বংশবিস্তার। এগুলোর জন্য বিভিন্ন সরকারি দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থার সমন্বয়হীনতার দায়ও রয়েছে। এমনকি এক্ষেত্রে স্বাস্থ্য খাতের অদূরদর্শিতা ও অব্যবস্থাপনাও চোখে পড়ে। সব মিলিয়ে ডেঙ্গু রোগ ও রোগী ব্যবস্থাপনার কোনো কার্যক্রমই বিজ্ঞানসম্মতভাবে হচ্ছে না। এভাবে চলতে থাকলে ডেঙ্গু কখনো প্রতিরোধ করা যাবে বলে প্রতীয়মান হয় না। বিবেচনায় নেয়া প্রয়োজন, ডেঙ্গু কেবল স্বাস্থ্য সমস্যা নয়; এটি নগর ও পরিবেশ ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ রক্ষা ও শাসন ব্যবস্থার সঙ্গে জড়িত। ফলে ডেঙ্গুর সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ার অর্থ হলো দেশের বিভিন্ন খাতে এক ধরনের অব্যবস্থাপনা রয়েছে, যা জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। সুতরাং সরকারকে ডেঙ্গু প্রতিরোধ করতে হলে অব্যবস্থাপনাগত সংকটগুলো কাটিয়ে উঠতে হবে, যার জন্য অবশ্যই বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থা ও স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয় থাকাটা জরুরি। পৃথিবীতে ডেঙ্গু প্রতিরোধের যত নজির রয়েছে সেটা ব্যবস্থাপনা দক্ষতাকেই তুলে ধরেছে। সুতরাং এক্ষেত্রে ছাড় দিলে ডেঙ্গু কখনই প্রতিরোধ করা যাবে না।