বাংলাদেশের বিপ্লবী কমিউনিস্ট রাজনীতির পুরোধা, মার্ক্সবাদী-লেনিনবাদী তাত্ত্বিক ও লেখক, জাতীয় মুক্তি কাউন্সিলের সভাপতি বদরুদ্দীন উমরের জীবনাবসান হয়েছে ৭ সেপ্টেম্বর সকালবেলায় রাজধানীর একটি হাসপাতালে। তার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে এ ভূখণ্ডের রাজনীতির ইতিহাসে একটি যুগাবসান হলো—এ কথা বললে ভুল বলা হয় না সম্ভবত। তিনি দীর্ঘদিন থেকেই বার্ধক্যজনিত রোগে আক্রান্ত ছিলেন, অতিসম্প্রতি একাধিকবার তাকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছিল। গত ১৮ জুলাই ঢাকার প্রেস ক্লাবে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের এক বছর পূর্তি উপলক্ষে জাতীয় মুক্তি কাউন্সিলের আলোচনা সভায় উপস্থিতি ও বক্তব্য প্রদান ছিল তার জীবনের শেষ রাজনৈতিক কাজ। এর পর থেকেই তিনি ক্রমাগত শারীরিক বিভিন্ন সমস্যায় ভুগছিলেন। এ ভূখণ্ডের (এখানে ‘ভূখণ্ড’ অর্থ বর্তমান বাংলাদেশের মানচিত্রে সীমাবদ্ধ অঞ্চল নয় কেবল, গোটা উপমহাদেশকেই ধরা যেতে পারে, যদিও তার রাজনৈতিক কাজ মূলত বাংলাদেশকেন্দ্রিক ছিল) শ্রমজীবী ও নিপীড়িত মানুষের শোষণমুক্তির সংগ্রামে বদরুদ্দীন উমরের যে অবদান তা কয়েকটি অনুচ্ছেদ সংবলিত সংক্ষিপ্ত পরিসর কোনো নিবন্ধে তুলে ধরা যাবে না। আজকের দিন পর্যন্ত তার রাজনৈতিক কাজের যে মূল্যায়নই হয়ে থাকুক না কেন, ভবিষ্যতে শ্রমজীবী মানুষের রাজনীতি নির্মাণে ও তাকে এগিয়ে নেয়ায়, বিকশিত ও জয়যুক্ত করায় বদরুদ্দীন উমরের সামগ্রিক কাজকে মূল্যায়ন করতেই হবে। এর কোনো বিকল্প নেই।
বদরুদ্দীন উমরের প্রয়াণে নিকট ও দূরের বহু মানুষের শোক প্রকাশের কোনো কমতি নেই। এর মধ্যে তার স্বজন, আত্মীয়-পরিজন ছাড়াও আছেন দেশ ও দেশের বাইরের রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, শিক্ষাবিদ, বুদ্ধিজীবী, লেখক-কবি, বিভিন্ন সংস্থার প্রধান থেকে শুরু করে বর্তমান সরকারের উপদেষ্টারা ও অন্যান্য মহল। অন্যদিকে শত্রুপক্ষের মধ্যেও তার মৃত্যুকে ঘিরে চাপা ও নগ্ন উল্লাস দেখা যাচ্ছে। এ উল্লাসে বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই। যে শ্রেণীর রাজনীতিকে ব্যবচ্ছেদ করে বদরুদ্দীন উমর তার তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে এর খোলস উন্মোচন করে দেখিয়েছেন তার নগ্ন কুৎসিত রূপ—জনগণের মাথার ওপর চেপে বসে থাকা সেই লুণ্ঠনজীবী শোষক শ্রেণীর প্রতিনিধিরা যে এখন উল্লসিত হবেই এটা স্বাভাবিক ব্যাপার। যে শাসকগোষ্ঠী স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশে গঠিত হয়ে ক্রমেই বিকশিত হয়েছে এবং এর সমান্তরালে যে আচরণগত সংস্কৃতি তাদের মধ্যে বিকাশ লাভ করেছে তাতে এর অন্যথা হওয়ার ছিল না, বদরুদ্দীন উমর নিজেই এর ব্যবচ্ছেদ করে রেখে গেছেন।
তবে তার যে গুণগ্রাহী মহল, তারাও সংখ্যায় নিতান্ত কম নন। তবে এদের অধিকাংশই উমরকে মূল্যায়ন করে থাকেন একজন তাত্ত্বিক, গবেষক, বুদ্ধিজীবী, শিক্ষাবিদ, ইতিহাসবিদ প্রভৃতি হিসেবে। এ অংশ হলেন স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের আগে-পরে বিকশিত হওয়া মধ্যশ্রেণীর যে যৎসামান্য আলোকিত অংশ আছে এর সদস্য। বদরুদ্দীন উমর নিজে কিন্তু এ মূল্যায়নের বিরোধী ছিলেন। বাংলাদেশের ইতিহাস, অর্থনীতি, সংবিধান, ভূরাজনীতি, মুক্তিযুদ্ধ, শিক্ষা, ধর্ম, স্বাস্থ্য, পরিবেশ, সংবিধান, শিল্প, কৃষি, জাতিসত্তা, সাহিত্য, সমাজতন্ত্র, সাম্রাজ্যবাদ—জনগণের জীবন ও স্বার্থকে প্রভাবিত করে এমন কোনো বিষয় নেই যা তার বিশ্লেষণের আওতায় আসেনি। এসব বিষয়েই তার লেখা গ্রন্থের সংখ্যা শতাধিক। কিন্তু এসব লেখালেখি বা বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা তিনি অলস বুদ্ধিজীবী হিসেবে করেননি, করেছেন তার নিরন্তর সংগ্রামী জীবনের অপরাপর কার্যক্রমের অনুষঙ্গ হিসেবে। এসব বুদ্ধিবৃত্তিক কাজই ছিল তিনি যে রাজনীতি জীবনভর করে এসেছেন তার অংশ। এ কথা আর কারো নয়, স্বয়ং বদরুদ্দীন উমরের।
মধ্যশ্রেণীর আলোকিত অংশটি হয়তো তার বিপুল রচনাসম্ভারের সাহচর্য পেয়েছেন, তার ক্ষুরধার বিশ্লেষণী ক্ষমতা দেখে বিস্মিত হয়েছেন। রাজনীতি-সচেতন মানুষ যারা বাংলাদেশকে নিয়ে চিন্তা করেন, উমরকে এড়িয়ে যাওয়ার উপায় তাদের নেই। তবে এ বিপুল রচনাসম্ভার কোনো বৈঠকখানা-বিহারী প্রতিভাবান মানুষের শৌখিন বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা ছিল না, শ্রমজীবী নিপীড়িত মানুষের মুক্তির মার্ক্সবাদী-লেনিনবাদী রাজনৈতিক অস্ত্রাগারে শাণিত হয়েই তা হয়ে উঠেছিল ক্ষুরধার বাঙ্ময়। এ রাজনীতিরই অংশ হিসেবে তিনি একের পর এক সংগঠন গড়ে তুলেছেন, প্রতিরোধ সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছেন। ১৯৭২-৭৫ সময়কালে শেখ মুজিবের শাসনামলে গড়ে ওঠা ফ্যাসিস্ট রক্ষীবাহিনীর হাতে যখন প্রগতিশীল বিরোধী দলীয় রাজনীতিকরা হত্যা-নির্যাতন-গুমের শিকার হচ্ছিলেন তখন তার উদ্যোগে গড়ে উঠেছিল ‘মৌলিক অধিকার সংরক্ষণ ও আইন সাহায্য কমিটি’। এ কমিটির তৎপরতায় উচ্চ আদালতে রিট করে প্রখ্যাত কমিউনিস্ট নেতা শান্তি সেনের স্ত্রী অরুণা সেনকে রক্ষীবাহিনীর নির্যাতনের কারাগার থেকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধের সময়ে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর অন্যতম দোসর, ঘৃণিত যুদ্ধাপরাধী ও জামায়াতে ইসলামীর নেতা গোলাম আযমকে বাংলাদেশে নিয়ে এসে তাকে নাগরিকত্ব প্রদানের প্রচেষ্টাকালে জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা আন্দোলন ও ‘একাত্তরের ঘাতক ও দালাল নির্মূল কমিটি’তে তার ছিল গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক ভূমিকা। এ সময়ে গড়ে তোলা গণ-আদালতেও তিনি সংগঠক পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করেছেন। পাহাড় ও সমতলে বাঙালি ভিন্ন অন্যান্য নৃগোষ্ঠীর ওপর বাংলাদেশের শাসকগোষ্ঠীর পরিচালনায় হত্যা-নিপীড়ন-উচ্ছেদ-ধর্ষণ-অপহরণের যে ‘মহোৎসব’ চালু হয়েছিল তা প্রতিরোধে ‘জাতিসত্তা মুক্তি সংগ্রাম পরিষদ’ গঠিত হয়েছিল তারই হাত ধরে। এছাড়া ‘ফ্যাসিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী জাতীয় কমিটি’তে এ দেশের প্রগতিশীল, গণতন্ত্রমনা, দেশপ্রেমিক ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী লেখক, সাহিত্যিক, কর্মীদের একতাবদ্ধ করেছিলেন তিনি। রাজনীতি ক্ষেত্রে কৃষক ও গ্রামীণ মজুর ফেডারেশন, ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশন (টাফ), বাংলাদেশ লেখক শিবির প্রভৃতি গণসংগঠনে নেতৃত্ব দিয়ে তিনি এ দেশের শ্রমিক-কৃষক-শিল্পী-সাহিত্যিক-বুদ্ধিজীবীদের প্রগতিশীল আন্দোলনের সম্মুখসারিতে নিয়ে এসেছেন। দেশের মেহনতি ও শ্রমজীবী মানুষের শোষণমুক্তির লড়াইয়ের রাজনৈতিক প্লাটফর্ম গণতান্ত্রিক বিপ্লবী জোট ও জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল তারই হাতে গড়া। আলোকিত মধ্যশ্রেণীর একটি বড় অংশ তার সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক কর্মতৎপরতার খবর রাখেননি অথবা এর তাৎপর্য অনুধাবন করতে ব্যর্থ হয়েছেন।
বদরুদ্দীন উমর কি ‘প্রতিভাবান’ ছিলেন? এ প্রশ্নের উত্তর এক বাক্যে দেয়া সম্ভব নয়। বাংলাদেশ এবং সমগ্র বিশ্বেও এ দৃষ্টান্ত বিরল নয় যে ইতিহাসে বহু ‘প্রতিভাধর’ ব্যক্তিই তাদের প্রতিভাকে কাজে লাগিয়েছেন শোষক-নিপীড়ক শ্রেণীর স্বার্থে, জনসাধারণের মৌলিক স্বার্থের বিরুদ্ধে এবং এভাবে নিজেদের ব্যক্তি ও শ্রেণীগত স্বার্থকে উদ্ধার করেছেন। বদরুদ্দীন উমরের ‘প্রতিভা’র প্রকৃত মূল্যায়ন এভাবেই হতে পারে যে তার প্রতিভাকে তিনি নিয়োজিত রেখেছিলেন শ্রমজীবী মানুষের শোষণমুক্তির স্বার্থে এবং এ কাজেই জীবনভর ব্যাপৃত ছিলেন। প্রতিভা না থাকলে তিনি শুরু থেকেই বিপ্লবী গণ-অভ্যুত্থানকে দেশের অবস্থা পরিবর্তনের একমাত্র পথ হিসেবে তুলে ধরতে পারতেন না। নির্বাচনমুখী ও গেরিলাযুদ্ধপন্থী বামপন্থীদের বক্তব্য ও অবস্থানের বিপরীতে দাঁড়িয়ে এ ভূখণ্ডের সমাজবাস্তবতা বিশ্লেষণ করে ঐতিহাসিক বস্তুবাদের আলোকে তিনি গণ-অভ্যুত্থানকে উপস্থাপন করেছেন মুক্তির লড়াইয়ের প্রধান পন্থা হিসেবে। একই সঙ্গে এ পর্যন্ত আমাদের ভূখণ্ডে যত গণ-অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়েছে তার প্রতিও অন্ধ হয়ে বসে থাকেননি। এর সাফল্য-ব্যর্থতা, সবলতা-দুর্বলতাগুলোকেও তিনি চিহ্নিত করতে পেরেছিলেন যথাযথভাবে। ২০২৪ সালে ছাত্র-শ্রমিক-জনতার দেশব্যাপী যে গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে দীর্ঘ ষোলো বছরের হাসিনা-সরকারের ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান হয়েছে তাকে তিনি আখ্যায়িত করেছেন উপমহাদেশের সবচেয়ে ব্যাপক গণ-অভ্যুত্থান হিসেবে এবং তা চূড়ান্ত পরিণতি লাভের আগেই। আবার বিগত এক বছরের মূল্যায়নে এ অভ্যুত্থানের দুর্বলতার দিক, শ্রমিক-কৃষকের স্বার্থ উপেক্ষিত হওয়ার বিষয়গুলোকেও তিনি অকপটে তুলে ধরেছেন তার জীবনের সর্বশেষ রাজনৈতিক বক্তৃতায়।
বাংলাদেশের সংবিধান নিয়ে এখন শাসকগোষ্ঠী, বুদ্ধিজীবী মহল, শিক্ষাবিদ, আইনজীবীদের মধ্যে অনেক তর্ক-বিতর্ক হচ্ছে। স্বাধীনতার পর যখন মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সর্বদলের সমন্বয়ে জাতীয় সরকার গঠন করে তার অধীনে সংবিধান সভার মাধ্যমে সংবিধান প্রণীত হওয়া আবশ্যক ছিল, তখন ইয়াহিয়ার সামরিক আমলে লিগ্যাল ফ্রেমওয়ার্ক অর্ডারের অধীনে অনুষ্ঠিত সত্তরের নির্বাচনে সংসদ সদস্য হওয়া মূলত আওয়ামী লীগের লোকজনের দ্বারা গঠিত সভায় সংবিধান প্রণয়নের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকেই। কিন্তু এ প্রশ্ন প্রথম উত্থাপন করেছিলেন বদরুদ্দীন উমর। শুধু তা-ই নয়, বাহাত্তর সালে তথাকথিত সংবিধান সভায় এ সংবিধান গৃহীত হওয়ার পর এ দেশের বুদ্ধিজীবী মহল যখন কোনো বিশ্লেষণ ছাড়াই প্রশংসার জোয়ারে গা ভাসিয়েছিলেন সেই সময়ে এর নির্মোহ বিশ্লেষণ করে তিনি দেখিয়েছিলেন, একদলীয় শাসন ও রাষ্ট্রপতির হাতে সর্বময় ক্ষমতা কেন্দ্রীভূতকরণ হচ্ছে এ সংবিধানের অনিবার্য পরিণতি। মাত্র দুই বছরের মাথায় তার এ পর্যবেক্ষণ অক্ষরে অক্ষরে সত্য প্রমাণিত হয়েছিল। জ্যোতিষশাস্ত্রের চর্চা অথবা নিছক ‘প্রতিভা’র জোরে নয়, এ বিশ্লেষণ তিনি করেছিলেন সঠিক রাজনৈতিক চিন্তাধারা ও বাস্তব কার্যক্রমের ওপর দাঁড়িয়ে। সংবিধানের মূলনীতি ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’র ভবিষ্যৎ সম্পর্কে তিনি বলেছিলেন বাংলাদেশকে একটি ‘ইসলামী প্রজাতন্ত্র’ হিসেবে ঘোষণা করা হবে কিনা এ দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হলে তা একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবেই বহাল থাকবে। কিন্তু এ দেশে ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহার হবে কিনা এ জায়গা থেকে মূল্যায়ন করা হলে বাংলাদেশ ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে থাকতে পারবে না। কেননা শাসকশ্রেণী তার কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে যত বেশি জনবিচ্ছিন্ন হবে, ততই ধর্মকে রাজনীতির ময়দানে টেনে আনবে, এর রাজনৈতিক ব্যবহার করবে। স্বাধীন বাংলাদেশের চুয়ান্ন বছর পেরিয়ে আজ আমরা কী দেখতে পাচ্ছি?
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে দলীয়করণ অথবা আওয়ামীকরণের বিরুদ্ধে এখন অনেক কোলাহল শোনা গেলেও এক্ষেত্রেও পথিকৃতের ভূমিকা পালন করেছেন তিনিই। মুক্তিযুদ্ধে দেশপ্রেমিক জনগণ, খেটে খাওয়া মানুষের আত্মত্যাগ, গৌরবময় ভূমিকাকে ম্লান করে দিয়ে ২৫ মার্চের কালরাতে পাকিস্তানি বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করা শেখ মুজিবুর রহমানকে মুক্তিযুদ্ধের একক নায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য পদসেবী ও মোসাহেব বুদ্ধিজীবীকুল, রাজনৈতিক নেতারা দেশের লাখ লাখ টাকা ব্যয় করে মিথ্যার প্রতিমূর্তি নির্মাণের যে প্রকল্প খুলে বসেছিলেন, তাতে বাদ সেধেছিলেন উমর। শুধু তা-ই নয়, ভাষা আন্দোলনের শেখ মুজিবের ভূমিকাকে অতিরঞ্জিত করে তার কন্যা ও অনুগ্রহপ্রত্যাশী বুদ্ধিজীবীরা যে ‘ইতিহাস’ দেশের জনগণকে শিক্ষা দিতে চেয়েছিলেন তার সামনেও পর্বতপ্রমাণ বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন তিনিই।
মুক্তিযুদ্ধ, ভাষা আন্দোলন, সংবিধান প্রশ্নেই শুধু নয়; জনগণের স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পরিবেশ, অর্থনীতি, সাম্রাজ্যবাদ; যা কিছু জনগণের স্বার্থের সঙ্গে সম্পৃক্ত তার প্রতিটি দিক নিয়েই তিনি কাজ করেছেন। এক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো শিক্ষাক্ষেত্রে শ্রেণীপ্রশ্ন। আমাদের দেশের শিক্ষায়তনে কার্যরত বামপন্থী সংগঠনগুলো সাধারণত আবাসন সমস্যা, গবেষণা খাতে বরাদ্দ, পাঠ্যক্রম এ বিষয়গুলো নিয়েই আন্দোলন করে। এ বিষয়ে প্রগতিশীল ছাত্রসংগঠনগুলোর দৃষ্টি আকর্ষণ করে বদরুদ্দীন উমরই প্রথম বলেছিলেন এগুলো বৈষম্য হলেও মূল বৈষম্য নয়, উপবৈষম্য। এ দেশের শ্রমজীবী মানুষের সন্তানদের যে বৃহদংশ শিক্ষার প্রাথমিক স্তরেই ঝরে পড়ছে, সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ তো দূরের কথা মাধ্যমিক স্তর পর্যন্তই পৌঁছতে পারছে না, প্রত্যন্ত অঞ্চলে প্রাথমিক শিক্ষার ন্যূনতম সুযোগটুকুও অনুপস্থিত; প্রগতিশীল সংগঠনগুলোকে তৎপরতা কেন্দ্রীভূত করতে হবে এখানেই। এটাই শিক্ষাক্ষেত্রের প্রকৃত বৈষম্য, যা শ্রেণীপ্রশ্নের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। বাংলাদেশে পাহাড়ে ও সমতলে অবাঙালি বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর ওপর চলে আসা নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ সংগঠন গড়ে তোলা ছাড়াও এ বিষয়ে তার রয়েছে ব্যাপক বুদ্ধিবৃত্তিক কার্যক্রম। তিনি দেখিয়েছেন, বাংলাদেশের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, রাজনৈতিক ও নাগরিক অধিকার ভোগের দৃষ্টিকোণ থেকে প্রকৃত সংখ্যালঘু তারাই। শোষকশ্রেণীর হাতে এ দেশের প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশ কীভাবে বিনষ্ট হচ্ছে সে বিষয়েও আমরা সচেতন হয়ে উঠি বদরুদ্দীন উমরের মাধ্যমেই।
বদরুদ্দীন উমরের প্রণীত গ্রন্থের সংখ্যা শতাধিক। এর মধ্যে ‘সাম্প্রদায়িকতা’, ‘সাংস্কৃতিক সাম্প্রদায়িকতা’, ‘সংস্কৃতির সংকট’, ‘পূর্ববঙ্গের ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি’, ‘ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও উনিশ শতকের বাঙালী সমাজ’, ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে বাঙলাদেশের কৃষক’, ‘যুদ্ধপূর্ব বাঙলাদেশ’, ‘যুদ্ধোত্তর বাঙলাদেশ’, ‘Emergence of Bangladesh’, ‘Politics and Society of East Pakistan and Bangladesh’ সহ আরো এমন অসংখ্য বইয়েরই নাম নেয়া যায় যেগুলোর নিবিষ্ট পাঠকরা ব্রিটিশ-ভারতের সময়কাল থেকেই এ দেশের মধ্যশ্রেণী ও বাংলাদেশের শাসকশ্রেণীর গড়ে ওঠার প্রক্রিয়ার সন্ধান লাভ করবেন। এটা অনেকটা মানুষের শরীরে অজস্র শিরা-উপশিরার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত রক্তধারার গতিপথ, কার্যক্রমের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার মতোই ব্যাপার।
বদরুদ্দীন উমর বিভিন্ন সময়ে, বিশেষত সাক্ষাৎকারে উল্লেখ করেছেন তাকে নিয়ে বাংলাদেশে খুব বেশি আলোচনা হয়নি। এ দেশের প্রতিষ্ঠিত শিক্ষিত বুদ্ধিজীবী মহলে তিনি অনেকটা উপেক্ষিত, অপাঙক্তেয়। বদরুদ্দীন উমরের এ আক্ষেপ কিসের জন্য? তিনি কি চেয়েছিলেন দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, প্রভাবশালী মহল, শাসকগোষ্ঠী ও বুদ্ধিজীবীর দল তাকে মাথায় তুলে রাখবে, তাকে শিরোমণি বানাবে? না, তিনি সেটা চাননি। শাসকগোষ্ঠীর কাছ থেকে তা প্রত্যাশাও করেননি। সেটাই যদি চাইতেন তাহলে দেশ স্বাধীনের পর থেকেই বাংলা একাডেমি পুরস্কার, একুশে পদক, স্বাধীনতা পুরস্কার—রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ এ স্বীকৃতিগুলোকে প্রত্যাখ্যান না করে সাদরে বরণ করে নিতেন। এ দেশের বুদ্ধিজীবীকুলের মধ্যে এমন দৃষ্টান্ত বিরল নয় যারা এসব স্বীকৃতির জন্য তদবির করেছেন, শাসকগোষ্ঠীর পদতলে মাথা কুটেছেন, মোসাহেবি করেছেন। তিনি আলোচিত হতে চেয়েছেন এ অর্থে যে এ দেশের সচেতন, প্রগতিশীল, গণতন্ত্রমনা মানুষ তার রচনাগুলো অধ্যয়ন করে তিনি যে রাজনীতির জন্য জীবনভর অঙ্গীকারবদ্ধ ছিলেন তার আবশ্যকতা উপলব্ধি করবেন এবং এ ভূখণ্ডের মানুষের শোষণমুক্তির সংগ্রামে সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে দৃঢ় প্রত্যয়ী পদক্ষেপে এগিয়ে যাবেন। বদরুদ্দীন উমরের মহাপ্রয়াণে অজস্র স্মৃতিতর্পণের ভিড়ে এ কর্তব্য নির্ধারণই তাকে শ্রদ্ধা ও সম্মান জানানোর প্রকৃষ্ট উপায়।
আবিদুল ইসলাম: কেন্দ্রীয় সদস্য, বাংলাদেশ লেখক শিবির










