২০১০ সালে শহরাঞ্চলের একটি পরিবারকে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ পেতে গড়ে প্রতি মাসে ৭৪৭ টাকা ব্যয় করতে হতো। ২০২২ সালে জ্বালানি ও বিদ্যুতায়নে ওই শহুরে পরিবারের গড় মাসিক ব্যয় দাঁড়ায় ২ হাজার ১৫০ টাকা। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো তাদের ‘ফাইনাল রিপোর্ট হাউজহোল্ড ইনকাম অ্যান্ড এক্সপেন্ডিচার সার্ভে ২০২২’ প্রকাশনায় এ তথ্য দিয়েছে (বিবিএস, ১৪ ডিসেম্বর ২০২৩, পৃ-৪২)। স্পষ্টতই দৃশ্যমান যে, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে শহুরে নাগরিকদের ব্যয় প্রায় তিন গুণ বেড়ে গেছে এক যুগের ব্যবধানে। পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য বলছে, গ্রামের ক্ষেত্রেও ব্যয়বৃদ্ধির হার প্রায় কাছাকাছি।

আওয়ামী লীগ সরকারের নেতৃত্বে গত ১৫ বছরে বিদ্যুৎ, জ্বালানি তেল ও গ্যাসের দাম বেড়েছে উপর্যুপরি। গ্রাহক পর্যায়ে এ পর্যন্ত তারা বিদ্যুতের দাম বাড়িয়েছে মোট ১৪ বার। সাধারণ গ্রাহকদের বিদ্যুৎ ব্যবহারের প্রবণতা প্রতি মাসে সর্বনিম্ন ১০০ ইউনিট এবং সর্বোচ্চ ৪০০ ইউনিট ধরে ১০০ ইউনিট ও ৩০১ থেকে ৪০০ ইউনিটের মূল্যবৃদ্ধির চিত্র একটি ছকে এখানে সংযুক্ত করা হলো। ছকটির দিকে তাকালে দেখা যায়, আওয়ামী লীগের একচ্ছত্র শাসনামলের ১৫ বছরে বিদ্যুতের মূল্য বেড়েছিল অস্বাভাবিক হারে। কিন্তু এর আগের ১৮ বছর রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা বজায় থাকার কারণে বিদ্যুতের মূল্য নিয়ন্ত্রণের মধ্যে ছিল।

 

বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি : ১৯৯১-২০২৪ (প্রতি ইউনিট/টাকা)

রাজনৈতিক সরকার
সময়পর্ব

মূল্যবৃদ্ধির আদেশ

১০০ ইউনিট পর্যন্ত দাম

মূল্যবৃদ্ধির হার

৩০১-৪০০ ইউনিট

পর্যন্ত দাম

মূল্যবৃদ্ধির হার

বিএনপি শাসনামল

(১৯৯১-৯৬)

১ বার

১.৬৫ থেকে ১.৬৫

০%

৩.১৫ থেকে ২.৭৫

-১২.৭%

আওয়ামী লীগ শাসনামল

(১৯৯৬-২০০১)

৯ বার

১.৬৫ থেকে ২.১৫

+৩০.৩%

২.৭৫ থেকে ৩.৩০

+২০%

বিএনপি শাসনামল

(২০০১-০৬)

৩ বার

২.১৫ থেকে ২.৫০

+১৬.৩%

৩.৩০ থেকে ৩.০০

-৯.১%

তত্ত্বাবধায়ক শাসনামল

(২০০৭-০৯)

১ বার

২.৫০ থেকে ২.৫০

০%

৩.০০ থেকে ৩.১৫

+৫%

আওয়ামী লীগ শাসনামল

(২০০৯-২৪)

১৪ বার

২.৫০ থেকে ৭.২০

+১৮৮%

৩.১৫ থেকে ৮.০২

+১৫৪.৬%

[সূত্র: কমপ্যারেটিভ স্টেটমেন্ট অব ট্যারিফ স্ট্রাকচার, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড এবং বিইআরসি]

 

কেবল বিদ্যুৎ নয়, জ্বালানি তেল এবং গ্যাসের ক্ষেত্রেও মূল্যবৃদ্ধি ঘটেছে অস্বাভাবিক হারে, নজিরবিহীনভাবে। গত ১৫ বছরে এমন চরম মূল্যবৃদ্ধির সপক্ষে আওয়ামী লীগ সরকার যুক্তি দেখিয়েছিল যে, উৎপাদনক্ষমতা বৃদ্ধি ও জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধির কারণে সরকারের ঘাটতি ও ভর্তুকি বেড়ে যাচ্ছিল। তাই এভাবে মূল্যবৃদ্ধি করা ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না। কনজিউমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা, বর্তমান বাংলাদেশের জ্বালানি খাতবিষয়ক প্রধান বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক এম শামসুল আলম বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন কর্তৃক বিদ্যুৎ-জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির বিভিন্ন শুনানিতে মূল্য না বাড়িয়ে কীভাবে বরং কমিয়ে আনা যায় তার কারিগরি হিসাব-নিকাশ উত্থাপন করেছিলেন। কিন্তু সরকার সে পথে হাঁটেনি, সেসব প্রস্তাব আমলে নেয়নি। এর মূল অনুঘটক ছিল দুর্নীতি, লুটপাট এবং রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার অনুপস্থিতি।

সরকার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ব্যবহার করে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী মহলের ‘অলিগোপলি’ তৈরি করেছিল। তারা বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতকে কুক্ষিগত করে হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাট করে। সব খাতে ভুয়া ব্যয় ও খরচের পরিমাণ বাড়তি দেখিয়ে ভর্তুকির অজুহাতে উপর্যুপরি মূল্যবৃদ্ধির বোঝা চাপিয়ে দেয়। অথচ ওই ভর্তুকিও দেয়া হতো জনগণের করের অর্থ থেকে। এ দুর্নীতি ও লুটপাটের খবর কিছু কিছু ক্ষেত্রে প্রকাশ পেয়ে যায়। দরপত্র আহ্বান ব্যতিরেকে কোনো প্রতিযোগিতা ছাড়াই সরকারের নির্দেশে বিদ্যুৎ খাতের উন্নয়ন, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে আলোচিত বালিশকাণ্ড দুর্নীতি, বিদ্যুৎ কেন্দ্র বসিয়ে রেখে ক্যাপাসিটি চার্জ প্রদান, আদানির বিদ্যুৎ আমদানিতে বাড়তি মূল্য নির্ধারণ, জ্বালানি তেল ও এলএনওজি আমদানিতে অনিয়ম, গ্যাস উত্তোলন না করে আমদানির মাধ্যমে লাভবান হওয়ার পরিকল্পনা, বিদেশী প্রতিষ্ঠানকে অযৌক্তিক মূল্যে প্রতিযোগিতাহীনভাবে কাজ দেয়া, সরকারি খাতের কম খরচের বিদ্যুৎ কেন্দ্রে গ্যাস না দিয়ে বেসরকারি খাতের উচ্চ দামের বিদ্যুৎ কেন্দ্রে গ্যাস সরবরাহের মতো নানামুখী অনিয়ম-দুর্নীতির খবর প্রকাশ পেলেও সরকার তা নিয়ন্ত্রণ করেনি। উপরন্তু অনিয়ম-দুর্নীতি চালিয়ে যেতে দায়মুক্তি আইন নামে পরিচিত ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানি দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন ২০১০’ প্রণয়ন করে এবং তার মেয়াদ বৃদ্ধি অব্যাহত রাখে। ইচ্ছাখুশিমতো বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্য বাড়াতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিইআরসিকে আইন সংশোধনের মাধ্যমে অকার্যকর করে দেয় এবং কোনো শুনানি ছাড়া প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে দফায় দফায় মূল্য বৃদ্ধি ঘটায়।

এভাবে আইনের বাতাবরণে সরকার অপরাধ চালিয়ে যায় এবং বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাত দুর্নীতির করালগ্রাসে পতিত হয়। জ্বালানি ও বিদ্যুতের চরম মূল্যবৃদ্ধি ঘটে। অর্থনীতি বিষয়ে ওয়াকিবহাল মানুষমাত্রই জানেন যে, জ্বালানি ও বিদ্যুতের ব্যয়বৃদ্ধির জন্য সমাজের দরিদ্র, নিম্নবিত্ত, ভূমিহীনদেরই বেশি দুর্ভোগ পোহাতে হয়। সরকারি তথ্য বলছে, ২০২২ সালে গ্রামের পরিবারগুলোকে তাদের গড় মাসিক ব্যয়ের ৫ দশমিক ১ শতাংশ অর্থ বিদ্যুৎ ও জ্বালানির জন্য ব্যয় করতে হয়েছে। কিন্তু একটি ভূমিহীন গ্রামীণ পরিবারের ক্ষেত্রে এ ব্যয় ছিল ৫ দশমিক ৯ শতাংশ। যেখানে কিনা সর্বোচ্চ জমির মালিকদের ক্ষেত্রে এটা ছিল ৪ দশমিক ৩ শতাংশ (বিবিএস, ১৪ ডিসেম্বর ২০২৩, পৃ-৪৩)। সহজভাবে বললে, যার মাসিক ব্যয় ১ লাখ টাকা, তিনি হয়তো বিদ্যুৎ-জ্বালানি বিল দিচ্ছেন ১০ হাজার টাকা, ব্যয়ের ১০ শতাংশ। আর যার মাসিক ব্যয় ১০ হাজার টাকা, তাকে বিদ্যুৎ-জ্বালানিতে খরচ করতে হচ্ছে ১৫০০ টাকা, ব্যয়ের ১৫ শতাংশ।

হতদরিদ্র, দরিদ্র, নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের জন্য বর্ধিত জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম বিরাট এক বোঝা। গত ১৫ বছরে যেভাবে দফায় দফায় জ্বালানি তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বেড়েছে, তাতে মানুষের নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। এর চরম প্রভাব পড়েছে পণ্য উৎপাদন, পরিবহন, মানুষের যাতায়াত, কৃষি, কুটির শিল্পসহ জীবনযাপনের সব পর্যায়ে। সবকিছুর ব্যয় বেড়ে গেছে, চরম মূল্যস্ফীতি ঘটেছে। বিপর্যয়কর অবস্থায় পড়েছে সারা দেশের জনসাধারণ। বর্তমান পরিস্থিতিতে তাই জনগণকে দম নেয়ার সুযোগ দেয়ার জন্যই জ্বালানি তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের মূল্য হ্রাস অত্যন্ত জরুরি। তবে মূল্যহ্রাসই একমাত্র সমাধান নয়। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ন্যায্যতা ও সুবিচার প্রতিষ্ঠায় এবং এ রকম একটি মৌলিক চাহিদা ও অধিকারকে বাস্তবায়নে এ খাতে জরুরি ভিত্তিতে নিম্নোক্ত পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা প্রয়োজন।

১. বিদ্যুৎ, গ্যাস ও জ্বালানি তেলের মূল্য অন্তত এক-তৃতীয়াংশ হ্রাস

২. বিদ্যুৎ ও জ্বালানি দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন বাতিল

৩. সব রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল বিদ্যুতের ক্যাপাসিটি চার্জ প্রদান বন্ধ করা

৪. বিইআরসি আইন সংশোধন ও সব ধরনের বিদ্যুৎ, জ্বালানির মূল্যহার বিইআরসি কর্তৃক গণশুনানির মাধ্যমে নির্ধারণ

৫. বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বিনিয়োগে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা, খাতভুক্ত সব কোম্পানি পরিচালনা থেকে আমলাদের প্রত্যাহার করা

৬. প্রাথমিক পর্যায়ে থাকা সব এলএনজি, কয়লা, তেল, বিদ্যুৎ ও বিদ্যুৎ আমদানি প্রকল্প বাতিল করা

৭. জরুরি ভিত্তিতে গ্যাস অনুসন্ধান ও আহরণের জন্য উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন

৮. বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে চলমান সব প্রকল্প, বিদেশী বিনিয়োগ ও আমদানি কার্যক্রমের ন্যায্যতা যাচাইয়ে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন

জরুরিভিত্তিতে এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে জ্বালানি খাত সংস্কারের সূচনা ঘটতে পারে এবং জনমনে স্বস্তি প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। এসব উদ্যোগের ফলে পণ্য উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় হ্রাস পাবে। সার্বিক অর্থনীতিও ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ পাবে।

 

আনিস রায়হান: রিসার্চ ফেলো, পাওয়ার অ্যান্ড এনার্জি সেল, কনজিউমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)