এজন্য আন্তর্জাতিক আট আইনি পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি হচ্ছে। এ চুক্তি ‘নো উইন, নো পে’ ভিত্তিতে কাজ করবে। বিদেশী প্রতিষ্ঠানগুলো নিজ খরচে ও নিজস্ব মডেলে সম্পদ অনুসন্ধান করবে এবং উদ্ধার করা সম্পদের নির্দিষ্ট অংশ পারিশ্রমিক হিসেবে পাবে। এজন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংককে কোনো অগ্রিম অর্থ দিতে হবে না। বর্তমানে প্রায় সাড়ে ৬ লাখ কোটি টাকা খেলাপি ঋণের সংকট মোকাবেলা করে ব্যাংক খাতের পুনরুদ্ধার সরকারের জরুরি অগ্রাধিকার। এমন পটভূমিতে পদ্ধতিগতভাবে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার উদ্যোগ সময়োপযোগী ও জরুরি। কারণ এটি বাংলাদেশের জন্য কৌশলগত দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। বৈশ্বিক স্বচ্ছতা ও অর্থনৈতিক সুশাসন মূল্যায়নে আমাদের অবস্থান দুর্বল। আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনতে এ উদ্যোগের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা তাই জরুরি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের উদ্যোগটি সফল হওয়ার সুযোগ বেশি। আন্তর্জাতিক দক্ষতা ও আইনি কাঠামোর সুযোগ নেয়া হচ্ছে। যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়ার আইনি ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য এবং সম্পদ উদ্ধারে দক্ষ। গ্র্যান্ট থর্নটন, বেকার ম্যাকেঞ্জি ও পিডব্লিউসির মতো প্রতিষ্ঠান বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত এবং তাদের ট্র্যাক রেকর্ড প্রমাণিত। এছাড়া ‘নো উইন, নো পে’ মডেল বাংলাদেশের জন্য সুবিধাজনক। এ ধরনের ঝুঁকি বণ্টন মডেল দুই পক্ষেরই স্বার্থ রক্ষা করে। বণিক বার্তার প্রতিবেদনে জানা গেছে, এ উদ্যোগ ব্যাংক ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহিতা নিশ্চিত করছে। ৩৮ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের সঙ্গে সরাসরি সভা এবং প্রতি ব্যাংকের প্রত্যাশা স্পষ্ট করা হয়েছে। অর্থাৎ কেন্দ্রীয় ব্যাংক সক্রিয় ও নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায় নিজেকে সংজ্ঞায়িত করার চেষ্টা করছে।

ইতিবাচক দিক ছাড়াও এ উদ্যোগের কিছু সীমাবদ্ধতা পুরোপুরি উপেক্ষা করা যায় না। আন্তর্জাতিক সম্পদ উদ্ধার দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। একটি নির্দিষ্ট দেশের আইনে সম্পদ জব্দ করা এবং তা বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার জন্য দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। প্রতিটি ধাপে আপিল ও পাল্টা আপিলের সুযোগ রয়েছে, যা প্রক্রিয়াটিকে আরো দীর্ঘ করে তোলে। সুইস ব্যাংকে নিহিত কালো অর্থ উদ্ধারে ভারত দশকের পর দশক অপেক্ষা করেছে। বাংলাদেশকেও এ বাস্তবতা মেনে নিতে হবে যে দ্রুত সমাধান সম্ভব নয়। বরং বিভিন্ন দেশের আইন, দ্বিপক্ষীয় চুক্তি ও আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনে চলার জটিল প্রক্রিয়াগুলোকে ধারাবাহিকভাবে অনুসরণের চেষ্টা বাড়াতে হবে। এক্ষেত্রে কূটনৈতিক মহলের সক্রিয় কার্যক্রম প্রত্যাশিত। কেন্দ্রীয় ব্যাংককে এ উদ্যোগের স্বচ্ছতা নিশ্চিতে যে আট পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করা হচ্ছে তাদের সঙ্গে আলোচনার তথ্য প্রকাশ করতে হবে। কী প্রক্রিয়ায় পরামর্শক প্রতিষ্ঠান বাছাই করা হয়েছে তা প্রকাশ না করলে স্বচ্ছতার অভাবের অভিযোগ আসতে পারে।

পাচার হওয়া সম্পদ উদ্ধার দীর্ঘমেয়াদি ও ক্লান্তিকর প্রক্রিয়া। কিন্তু বিভিন্ন দেশ তা ত্বরান্বিত করতে নানা কৌশল অবলম্বন করেছে। চুরি করা সম্পদ খুঁজে বের করতে বিশেষভাবে দক্ষ ফরেনসিক আর্কিটেকচার তৈরি করেছে সুইজারল্যান্ড। তারা কেবল বিদেশী পরামর্শক নিয়োগ করেনি, বরং নিজস্ব প্রতিষ্ঠান ও দক্ষতা বাড়িয়েছে। এডওয়ার্ড খোদার (মিসর) ও নাইজেরিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রীর পরিবারের সম্পদ উদ্ধারে সুইজারল্যান্ড সরাসরি সহায়তা করেছে। ভারতের অভিজ্ঞতা ভিন্ন। সুইজারল্যান্ডের সুইস ব্যাংকে ভারতীয় নাগরিকদের গোপন অ্যাকাউন্ট সম্পর্কে তথ্য পেতে ভারত দীর্ঘ কূটনৈতিক আলোচনা করে। তথ্য পাওয়ার পরেও বাস্তব উদ্ধার অত্যন্ত ধীর ছিল। বেশির ভাগ অর্থ এখনো বিদেশেই রয়ে গেছে, কারণ আইনি প্রক্রিয়া জটিল ও সময়সাপেক্ষ। মালয়েশিয়ার ওয়ান এমডিবি আরো জটিল উদাহরণ। রাজা সালমান ও তার পুত্র আল-ওয়ালিদের বিলাসবহুল সম্পত্তি (চিত্র, গহনা, শিল্পকর্ম) উদ্ধার করা হয়েছে জাতীয় সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতায়। কিন্তু সম্পূর্ণ অর্থের (প্রায় ৪ হাজার ৫০০ কোটি ডলার) ক্ষুদ্র একটি অংশ উদ্ধার করা গেছে। পাকিস্তানের অভিজ্ঞতা সবচেয়ে হতাশাব্যঞ্জক। আফতাব শাহিদ ও অন্যান্য ব্যক্তির বিদেশী সম্পদ উদ্ধারের প্রচেষ্টা বছরের পর বছর ধরে চলছে এবং ফলাফল ন্যূনতম। আইনি জটিলতা, আন্তর্জাতিক চুক্তির বাধা ও স্থানীয় রাজনীতির প্রভাব অত্যন্ত শক্তিশালী হওয়ায় এ জটিলতা। বাংলাদেশকেও এসব অভিজ্ঞতা বিবেচনা করে কৌশলগতভাবে এগোতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক উদ্যোগ ইতিবাচক। তবে সফলতার পথ অনেক দূর। অনেক ক্ষেত্রে অনিশ্চিত। ফলে শুধু পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীলতা নয়, নিজস্ব দক্ষতা বাড়াতেও মনোযোগী হতে হবে। ফরেনসিক অডিট, আর্থিক অপরাধ তদন্ত ও সম্পদ ট্র্যাকিংয়ে দেশীয় দক্ষতা তৈরি করতে হবে। দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশকে নিজস্ব প্রতিষ্ঠান ও দক্ষতা গড়ে তুলতে হবে। বিদেশী অর্থ ফেরত আসার আগে ঋণ ব্যবস্থাপনায় বিপ্লব দরকার। প্রতিটি ঋণ অনুমোদনে কঠোর নীতিমালা, নিয়মিত তদারক ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে হবে। ব্যাংক পরিচালকদের ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতা স্থাপন করতে হবে। বোর্ড অডিট কমিটির স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে। নতুবা ভবিষ্যতে আবার একই ধরনের বিপর্যয় ঘটবে। সম্পদ উদ্ধার একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া, যা আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, দেশীয় দক্ষতা ও রাজনীতিমুক্ত প্রশাসনের সমন্বয়ের প্রয়োজন। একই সঙ্গে যারা এ অর্থ লুণ্ঠন করেছে, তাদের দেশীয় বিচারের আওতায় আনতে হবে। বিদেশী সম্পদ উদ্ধার ও দেশীয় জবাবদিহিতা—এ দুটি প্রক্রিয়া সমান্তরালে চলতে হবে।