থ্যালাসেমিয়া একটি জন্মগত রোগ। বাবা ও মা উভয়ই থ্যালাসেমিয়া বাহক হলে তাদের সন্তানদের মধ্যে কেউ কেউ থ্যালাসেমিয়া রোগী হতে পারে। ফলে এক বছর বয়স থেকে রক্তশূন্যতা দেখা দেয় এবং প্রায় প্রতি মাসেই নিয়মিত রক্ত পরিসঞ্চালন করতে হয় তাদের স্বাভাবিক বয়োবৃদ্ধির জন্য। এ রোগ প্রতিরোধে দরকার জনসচেতনতা। এটি প্রতিরোধযোগ্য রোগ, কিন্তু সচেতনতার অভাবে প্রতিদিনই নতুন রোগী যুক্ত হচ্ছে। থ্যালাসেমিয়া রোগের ভয়াবহতার কথা চিন্তা করে এটি প্রতিরোধ করা একান্ত আবশ্যক। সেজন্য জনগণের মাঝে সচেতনতা সৃষ্টির বিকল্প নেই। এ রোগের চিকিৎসা খরচও অনেক বেশি। রোগীদের অন্যান্য রোগের আশঙ্কাও থাকে। দেশে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে থ্যালাসেমিয়া রোগী। তবে দেশে যে হারে থ্যালাসেমিয়া বাহকের হার বাড়ছে তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। দক্ষিণ এশিয়ার বেশির ভাগ দেশের তুলনায় বাংলাদেশে থ্যালাসেমিয়া বাহকের হার বেশি। সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন গবেষণা অনুসারে, ভারতের মোট জনসংখ্যার ৩-৪ শতাংশ, পাকিস্তানে ৫-৭, নেপালে ৪-৫, শ্রীলংকায় ২-৩ ও আফগানিস্তানে ৮-৯ শতাংশ থ্যালাসেমিয়া বাহক। অন্যদিকে বাংলাদেশে এ হার ১১ দশমিক ৪ শতাংশ। বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে আছে শুধু স্বল্প জনসংখ্যার মালদ্বীপ, ১৬-১৮ শতাংশ। সচেতনতা ও সঠিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে থ্যালাসেমিয়া বাহক শনাক্ত করে এ রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব। দেশে বাহকের সংখ্যা বাড়লেও হাসপাতালগুলোয় এ রোগের পর্যাপ্ত ও উন্নত চিকিৎসা অবকাঠামো গড়ে ওঠেনি, যা অত্যন্ত দুঃখজনক।

গতকাল বিশ্ব থ্যালাসেমিয়া দিবস পালিত হয়েছে। ১৯৯৪ সাল থেকে জনসচেতনতা বাড়াতে দিবসটি বিশ্বব্যাপী পালিত হয়ে আসছে। ১৯৯৮ সালে বাংলাদেশে এ রোগের চিকিৎসা শুরু হয় শিশু হাসপাতালে (বর্তমানে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট)। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য ‘থ্যালাসেমিয়ার জন্য সামাজিক ঐক্য গড়ি, রোগীর অগ্রাধিকার নিশ্চিত করি’। দিবসটি উপলক্ষে গত বুধবার বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল থ্যালাসেমিয়া সেন্টার এবং শিশু রক্তরোগ ও ক্যান্সার বিভাগ এক সেমিনারের আয়োজন করে। বাংলাদেশের থ্যালাসেমিয়া ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুসারে, প্রতি বছর ছয়-আট হাজার শিশু এ রোগ নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) জানাচ্ছে, বাংলাদেশের ১ কোটি ৮২ লাখের বেশি মানুষ থ্যালাসেমিয়া বাহক, যা মোট জনসংখ্যার ১১ দশমিক ৪ শতাংশ। দেশে বাহকের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে রোগীর সংখ্যা।

থ্যালাসেমিয়া বাহক আর থ্যালাসেমিয়া রোগী এক নয়। বাহকের তেমন কোনো উপসর্গ থাকে না, তেমন কোনো চিকিৎসাও লাগে না। তবে একজন বাহক পরবর্তী প্রজন্মে রোগ বহন করতে সক্ষম। অথচ সাধারণ রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমেই জানা যায় যে একজন ব্যক্তি থ্যালাসেমিয়া বাহক কিনা। কিন্তু পরীক্ষা-নিরীক্ষা না করার কারণে অনেকেই জানেন না যে তিনি থ্যালাসেমিয়া বাহক। অজান্তেই থ্যালাসেমিয়া বাহকদের মধ্যে বিয়ে হচ্ছে এবং দিন দিন থ্যালাসেমিয়া রোগী বাড়ছে। অথচ পূর্ব সতর্কতা অবলম্বন করে প্রতিরোধের মাধ্যমে থ্যালাসেমিয়ার হার কমিয়ে আনা সম্ভব। বিশ্বের অনেক দেশ পূর্ব সতর্কতা অবলম্বন ও প্রতিরোধের মাধ্যমেই থ্যালাসেমিয়া রোগীর সংখ্যা কমিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু পূর্ব সতর্কতা অবলম্বন করেই বিশ্বের বেশ কয়েকটি দেশ থ্যালাসেমিয়া রোগীর সংখ্যা প্রায় শূন্যের কাছাকাছি নামিয়ে আনতে পেরেছে। এর অন্যতম উদাহরণ ইরান, গ্রিস ও সাইপ্রাস। এসব দেশে একসময় রোগীর সংখ্যা অনেক ছিল।

থ্যালাসেমিয়া বংশগত রক্তস্বল্পতাজনিত একটি রোগ। এটি কোনো ছোঁয়াচে রোগ নয়। মূলত জিনগত ত্রুটির কারণে এ রোগে দেহে অস্বাভাবিক হিমোগ্লোবিন তৈরি হয়। এ কারণে লোহিত রক্তকণিকা নির্ধারিত সময়ের আগেই ভেঙে যায়। ফলে রক্তশূন্যতা দেখা দেয়। মা-বাবা উভয়ই থ্যালাসেমিয়া বাহক হলে সন্তানের থ্যালাসেমিয়া রোগী হওয়ার ঝুঁকি ২৫ শতাংশ, বাহক হওয়ার ঝুঁকি ৫০ শতাংশ আর সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা ২৫ শতাংশ। মা-বাবার যেকোনো একজন থ্যালাসেমিয়া বাহক হলে সন্তানের থ্যালাসেমিয়া বাহক হওয়ার ঝুঁকি ৫০ শতাংশ, সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা ৫০ শতাংশ। তবে থ্যালাসেমিয়া রোগী হওয়ার আশঙ্কা নেই। চাচাতো, মামাতো, খালাতো, ফুফাতো ভাইবোনের মধ্যে বিয়ে হলে থ্যালাসেমিয়া রোগী হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়।

এ রোগে আক্রান্ত রোগীদের সারা জীবন চিকিৎসার ওপর নির্ভরশীল থাকতে হয়। নিয়মিত ‘ব্লাড ট্রান্সফিউশন’ বা রক্ত স্থানান্তর থ্যালাসেমিয়ার প্রধান চিকিৎসা। এ পদ্ধতিতে সাধারণত দুই-চার সপ্তাহ পরপর রোগীর দেহের রক্ত পরিবর্তন করা হয়। থ্যালাসেমিয়া রোগীদের সারা জীবন রক্ত নিয়ে বেঁচে থাকতে হয়। চিকিৎসায় ন্যূনতম মাসিক খরচ হয় ১৩ হাজার টাকা। অন্যদিকে বোন ম্যারো ট্রান্সপ্লান্ট হচ্ছে এ রোগের একমাত্র স্থায়ী চিকিৎসা। বোনম্যারো ট্রান্সপ্লান্ট করতে খরচ হয় ১৫-১৮ লাখ টাকা। এ চিকিৎসাব্যবস্থা আমাদের দেশে এখনো অপ্রতুল ও সাধারণের সাধ্যের বাইরে। তবে রক্ত স্থানান্তরের ফলে শরীরে তৈরি হওয়া অতিরিক্ত লৌহকণিকার কারণে রোগীর যকৃৎ, হৃৎপিণ্ড আর অগ্ন্যাশয়ে সমস্যা তৈরি হয়। এসব শারীরিক সমস্যার সমাধানে রক্ত স্থানান্তরের পাশাপাশি বিশেষ ওষুধও গ্রহণ করতে হয়। কিন্তু নানা ঝুঁকি ও ব্যয়বহুল হওয়ায় খুব কম ক্ষেত্রেই বোন ম্যারো ট্রান্সপ্লান্টেশন করা হয়ে থাকে। সব থ্যালাসেমিয়া রোগীর জন্য চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে। এ চিকিৎসা করাতে যে টাকা খরচ হয় তা দরিদ্র জনসাধারণের জন্য ব্যয়বহুল। ফলে অনেক রোগী চিকিৎসা শেষ করতে পারেন না। যে কারণে তারা স্বাভাবিক মানুষের মতো জীবনযাপন করতে পারেন না। অন্যান্য শারীরিক সমস্যাও দেখা দেয়। সবার জন্য এ চিকিৎসা সহজলভ্য করতে প্রয়োজন সরকারি উদ্যোগ ও পৃষ্ঠপোষকতা।

থ্যালাসেমিয়া আগে থেকে প্রতিরোধ করা সম্ভব। এজন্য প্রয়োজন রোগের কারণ ও প্রতিকার সম্পর্কে জনগণের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো। থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধের প্রধান উপায় হচ্ছে স্বামী ও স্ত্রী থ্যালাসেমিয়া বাহক কিনা তা বিয়ের আগে পরীক্ষা করা। পরীক্ষায় যদি দুজনই থ্যালাসেমিয়া বাহক শনাক্ত হন, সেক্ষেত্রে তাদের মধ্যে বিয়েকে নিরুৎসাহিত করতে হবে। কেননা একজন সুস্থ মানুষ যে কাউকে (বাহক বা রোগীকে) বিয়ে করতে পারবে। কারণ তাদের সন্তানের রোগী হওয়ার আশঙ্কা নেই। তবে একজন বাহক আরেকজন বাহককে বিয়ে করতে পারবেন না। কারণ সন্তানের রোগী হওয়ার ঝুঁকি আছে। অর্থাৎ থ্যালাসেমিয়া বাহকদের মধ্যে বিয়ে না হলে পরবর্তী প্রজন্মে থ্যালাসেমিয়া রোগী জন্ম নেয়ার আশঙ্কা প্রায় থাকে না।

দেশে থ্যালাসেমিয়া বাহক ও নির্ণয়ের পদ্ধতি এখনো অনেকেরই অজানা, যার কারণে ক্রমেই বাড়ছে বাহকের সংখ্যা। মানুষ যাতে সহজেই দেশের সব হাসপাতালে বাহক নির্ণয়ের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে পারে সে বিষয়ে যত দ্রুত সম্ভব অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে। থ্যালাসেমিয়া রোগীর চিকিৎসা খুবই ব্যয়বহুল। এ কারণে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর পক্ষে এ রোগের চিকিৎসা নিয়মিত চালিয়ে যাওয়া কঠিন। তাই বাহক নির্ণয়ের পাশাপাশি থ্যালাসেমিয়া রোগীদের পর্যাপ্ত ও সহজলভ্য চিকিৎসা নিশ্চিত করা জরুরি। এজন্য দরকার দেশের সব হাসপাতালে থ্যালাসেমিয়া রোগীর অবকাঠামো গড়ে তোলা। এছাড়া মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে। যাতে তারা তাদের বাহক নির্ণয় পরীক্ষা করে এবং বাহকে বাহকে বিয়ে বন্ধ করে। এর মাধ্যমেই থ্যালাসেমিয়ার হার কমিয়ে এনে সুন্দর জীবন গড়ে তোলা সম্ভব। থ্যালাসেমিয়া রোগ ও বাহক সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করতে ব্যাপক হারে প্রচার-প্রচারণাও চালাতে হবে। এক্ষেত্রে সরকার ও বিভিন্ন সংস্থার দায়িত্বশীল ভূমিকা কাম্য।