১৩ আগস্ট প্রগতিবাদী চিন্তক, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, প্রাবন্ধিক ও স্বাধীনতা দিবস পদকপ্রাপ্ত অধ্যাপক যতীন সরকার চলে গেলেন পরপারে। পেছনে রেখে গেলেন বিশাল কর্মকাণ্ড। লেখাটি নিবেদন করা তার পুণ্য স্মৃতির উদ্দেশ্যে। যতীন স্যারের সঙ্গে আমার পরিচয় ১৯৬৫ সাল থেকে, যখন ময়মনসিংহে অবস্থিত বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে কৃষি অর্থনীতি অনুষদে স্নাতক শ্রেণীর ছাত্র হিসেবে আসি। তার সরাসরি ছাত্র হওয়ার সৌভাগ্য আমার হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে আমাকে প্রায়ই সাহিত্য প্রতিযোগিতার আয়োজন করতে হতো। প্রতিযোগিতার একজন অবধারিত বিচারক হিসেবে যতীন স্যারকে আমন্ত্রণ জানাতে যেতাম তার শহরের বাসায়। স্যার কখনো নিরাশ করেননি। সময়মতো অনুষ্ঠানে এসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা টিএসসির দোতলায় ঢালা মাদুরে বসে বিচারকের দায়িত্ব পালন করেছেন ক্লান্তিহীনভাবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রোগ্রামগুলোয় আরো দুজন সবসময় তার সঙ্গী হতেন। তাদের ঈর্ষণীয় সখ্যও ছিল সুপরিচিত। একজন অধ্যাপক গোলাম সামদানী কোরায়শী এবং অন্যজন অধ্যাপক রিয়াজুল ইসলাম। কখনো কখনো অনুষ্ঠান শেষ হতে অনেক রাত হয়ে যেত, যতীন স্যার রিকশায় চড়ে বাসায় ফিরে যেতেন হৃষ্টচিত্তে। আশ্চর্য হতাম, কখনো রিকশার ভাড়াটা দিতে পারিনি তার হাতে। উনি সহাস্যে বলতেন, কেন, তোমাদের ছাত্রদের সঙ্গে এতক্ষণ যে আনন্দে সময় কাটালাম তার দাম কি কম? এমন উদারচিত্ত শিক্ষক কোথায় পাই আর?

আমি ছাত্রজীবনে অসংখ্য বিতর্ক, কবিতা আবৃত্তি, নির্ধারিত ও উপস্থিত বক্তৃতা, রচনা প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেছি এবং পুরস্কারও পেয়েছি। এসব প্রতিযোগিতায় প্রায়ই নিয়মিত বিচারক থাকতেন যতীন স্যার। প্রতিটি আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় বিতর্ক প্রতিযোগিতায় যাওয়ার আগে যতীন স্যারের কাছ থেকে যত পারি পয়েন্ট টুকে নিতাম, পক্ষে-বিপক্ষের যুক্তিগুলো কীভাবে আরো শাণিত করা যায় তা জেনে নিতাম। অফুরন্ত ছিল তার যুক্তির ভাণ্ডার। ছাত্রদের অকৃপণ দান করে খুশি হতেন। জ্ঞানই শক্তি, কথাটি যতীন স্যারের বক্তৃতা ও লেখায় প্রমাণ হয়েছে বারবার।

যতীন স্যার আশির দশকের গোড়ার দিকে ময়মনসিংহ শহরে মুক্ত বাতায়ন পাঠচক্র শুরু করেন। মনে আছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অনুষদের তৎকালীন ডিন প্রফেসর আব্দুল ওয়াদুদ মিয়া জীবের উদ্ভবের ওপর দুই পর্বে দীর্ঘ বক্তৃতা দিয়ে এ প্রোগ্রাম শুরু করেন। দারুণ জমে উঠেছিল অনুষ্ঠানটি। পরবর্তী বক্তৃতা ছিল যতীন স্যারের নিজের, ভাষার উদ্ভব ও বিকাশের ওপর। জীবদেহের মতো মানুষের ভাষারও যে প্রাণ আছে, বহমান নদীর মতো তাও যে সমাজের কর্মকাণ্ডের বিস্তৃতির সঙ্গে বিবর্তিত হয় বা দীর্ঘদিন কোনো কর্মকাণ্ডের অবর্তমানে সংশ্লিষ্ট ভাষা যে বিলুপ্ত হয়ে যায়, অসংখ্য যুক্তি ও উপমা দিয়ে যতীন স্যার তা পরিষ্কারভাবে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন। ময়মনসিংহের বিদ্যাময়ী স্কুল প্রাঙ্গণে পাঠচক্রের কোনো এক পর্বে যতীন স্যারের উৎসাহে আমিও একটি বক্তৃতা দিয়েছিলাম জনসম্পদ অর্থনীতির ওপর। প্রত্যেকটিতে সঞ্চালকের দায়িত্ব পালন করতেন যতীন স্যার। তার সূচনা বক্তব্য প্রত্যেক বক্তৃতার প্রতি দর্শক শ্রোতাদের আকৃষ্ট করে ফেলতেন।

we

এটা সর্বজনবিদিত যে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে জাতিসংঘের অধিবেশনগুলোয় তীব্র বিতর্ক হয়েছিল। স্বাধীন বাংলাদেশের একেবারে প্রথমদিকে, যতদূর মনে পড়ে ১৯৭৩ সালের শুরুতে, ঐসব বিতর্কের আদলে আমরা একটি ‘‌ইউএন মক সেশন’ আয়োজন করেছিলাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের করিম ভবনের অডিটরিয়ামে। এই মক সেশনটির সামগ্রিক পরিকল্পনায় ছিলেন বাংলা বিভাগের অধ্যাপক এবং পরবর্তী সময়ে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান। এই মক সেশনে প্রফেসর খান নিজে চীনা রাষ্ট্রদূত হুয়া দু-এর ভূমিকায় অভিনয় করেন। যুগোশ্লাভিয়ার রাষ্ট্রদূতের ভূমিকায় ছিলেন অ্যাডভোকেট নাজাবত আলী। রাশিয়ার প্রতিনিধি হিসেবে অভিনয় করেছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের আলোকচিত্র শিল্পী নাইব উদ্দিন আহমেদ। ভারতের রাষ্ট্রদূতের ভূমিকায় ছিলেন অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক। তিনি বাংলাদেশকে সমর্থন করে তার জোরালো বক্তব্য দেয়ার পর পর যতীন স্যার ওঠে দাঁড়ান পাকিস্তানের প্রতিনিধি জুলফিকার আলী ভুট্টোর আগ্রাসী ভূমিকায়। পরনে ঢোলা পাজামা, লম্বা আচকান ও মাথায় জিন্নাহ টুপি লাগিয়ে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে প্রচণ্ড রেগে এমন ক্ষিপ্তস্বরে বক্তব্য দিলেন এবং কাগজপত্র ছিঁড়ে ছুড়ে ফেলে দিয়ে সভাস্থল থেকে বের হওয়ার অভিনয় করলেন, যা সেদিনের দর্শক-শ্রোতারা দারুণ উপভোগ করেছিলেন এবং মুহুর্মুহু করতালি দিচ্ছিলেন। একজন খাঁটি মুক্তিযোদ্ধা যতীন স্যার সেদিন ঈর্ষণীয় বাগ্মিতা ও দেহভঙ্গির‍ মাধ্যমে পাকিস্তান যে কতটা আগ্রাসী ও হিংসাত্মক মনোভাব নিয়ে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল তার সার্থক রূপায়ণ করে সেদিন সবার প্রশংসা কুড়ান। আমি ছিলাম সেদিন জাতিসংঘে বাংলাদেশের প্রতিনিধি। যতীন স্যার আমাকে দারুণ সাহস জুগিয়েছিলেন বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে আমার বক্তব্যের ভাষা, বাচনভঙ্গি ও দেহভঙ্গিমা ঠিকমতো রপ্ত করতে। তিনি এটাও শিখিয়ে দিলেন যে পাকিস্তানের প্রতিনিধি তিনি যত উত্তেজনাকর বক্তৃতাই দিতে থাকুন না কেন, কোনো অবস্থাতেই যেন বাংলাদেশের নবীন প্রতিনিধি হিসেবে আমার ধৈর্যচ্যুতি না ঘটে ও আমি যেন শান্ত থাকি ও অতি সংযমের পরিচয় দেই। তাতে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতি বিশ্ব সম্প্রদায়ের সহানুভূতি ও সমর্থন বাড়বে। আমি আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলাম, যতীন স্যারের নির্দেশনা মতো আমার দায়িত্বটি পালন করার।

অধ্যাপক যতীন সরকার ১৯ জুন ২০০৭ যুগান্তর পত্রিকার ‘‌শিক্ষকতার চাকরি ও শিক্ষকের দায়’ শীর্ষক একটি অসাধারণ লেখা লিখেছিলেন। প্রাঞ্জল ভাষায় লেখা প্রবন্ধটি একজন আদর্শ সমাজ সচেতন শিক্ষকের জীবন ছোঁয়া সত্য কথন, যা যে কোনো বিবেকবান শিক্ষকের মনে নাড়া না দিয়ে পারে না। তিনি যথার্থই বলেছেন, ‘ছাত্রছাত্রীদের যারা প্রকৃত শিক্ষা দিয়ে শিক্ষিত করে তুলতে চান, তেমন শিক্ষকের কদর এখন প্রায় শূন্যের কোটায় নেমে এসেছে। বাবা-মায়েরাও এখন আর ছেলেমেয়েদের শিক্ষার্থী বানাতে চান না, তা পরীক্ষার্থীরূপেই তাদের সন্তানটি কৃতিত্বের পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করুক। প্রকৃত অর্থে পরীক্ষার্থীও নয়, ছাত্রছাত্রীরা এখন নম্বরার্থী। পরীক্ষায় যিনি বেশি নম্বর পাওয়ার সুযোগ সন্ধান দিতে পারেন, তার কাছেই এখন ছাত্রছাত্রীদের ভিড়।’ সময়োপযোগী লেখাটি আমাদের বর্তমান সময়ের দর্পণ হয়ে আছে।

যতীন স্যারের বই-পুস্তকের সংগ্রহ বিশাল। প্রচুর পড়াশোনা সমাজ, সাহিত্য, রাজনীতি জীবনদর্শন নিয়ে। সত্তর ও আশির দশকে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিজয় দিবস, একুশে ফেব্রুয়ারি, স্বাধীনতা দিবস, নজরুল-রবীন্দ্র-সুকান্ত জন্মজয়ন্তীসহ যেকোনো অনুষ্ঠানে অধ্যাপক যতীন সরকার থাকতেন নিয়মিত বক্তা। শ্রোতার কোনো কমতি দেখিনি কখনো। সমাজতন্ত্র ও পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থার অন্তর্গত বৈশিষ্ট্য ও বিরোধ নিয়ে প্রচুর সেমিনার বক্তৃতা শুনেছি যতীন স্যারের। ছাত্রছাত্রীরা ঋদ্ধ হয়েছে।

কৌতুকপ্রিয়তা ও রসবোধ যতীন স্যারের স্বভাবজাত। অবস্থা বুঝে সঠিক উপমা প্রয়োগে তিনি অত্যন্ত পারঙ্গম। অবস্থার সঠিক ব্যাখ্যা ও বর্ণনায় তিনি অন্যদের উপমা ব্যবহারের কলাকৌশলও অকুণ্ঠচিত্তে উল্লেখ করেছেন। মনে আছে ‘যায়যায়দিন’ পত্রিকায় প্রকাশিত এক লেখায় যতীন স্যার কৃষক নেতা বোকাইনগরী পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর জমিদারদের ক্ষতিপূরণ দেয়ার বিরোধিতা করতে লোকায়ত গল্পের মাধ্যমে যেভাবে কৃষকদের উচ্চকিত করতেন তার সার্থক বর্ণনা দিয়েছিলেন। একটি উদ্ধৃতি দেই। বক্তৃতার মাঝে বোকাইনগরী প্রশ্ন ছুড়ছেন, ‘যখন আপনার রক্ত শুষে নেয়া জোঁকটিকে আপনার পা থেকে ছাড়ালেন, তখন কী আপনি তাকে আপনার শরীর থেকে আরো একটু রক্ত উপহার দিয়ে সম্মানিত করবেন? না, চুন আর হুঁক্কার পানি দিয়ে জোঁকটিকে মেরে কাঠিতে পুঁতে উঠানে টানা দিয়ে রাখবেন?’ পরিস্থিতির উদাহরণ টেনে মানুষকে যৌক্তিক সিদ্ধান্ত নেয়ার পথ দেখাতে পারতেন যতীন স্যার। যতীন স্যারের বহুমাত্রিক গুণের তুলনা শুধু তিনিই। পরপারে যতীন স্যার চিরশান্তিতে থাকুন—এ কামনা করি।

এমএ সাত্তার মণ্ডল: কৃষি অর্থনীতির ইমেরিটাস অধ্যাপক